এক স্মৃতিকাতর গোধূলিবেলায় মনে পড়া কিছু খুব অপ্রয়োজনীয় কথা
একেকজনের পুরো জীবনটাই হতে পারে- একটা ভুলে ভরা জীবন। আমাদের কোন কাজটি যে আমাদের জন্য সঠিক আর কোনটি বেঠিক, সেটা কোনোকিছু দিয়েই নির্ধারণ করা যায় না। আমরা অনেক চেষ্টা করি নানাভাবে আগামী দিনের পূর্বাভাস পাবার, কিন্তু তাতে খুব বেশি লাভ হয় না। একেবারে যে হয় না, তা না। সততা, পরিশ্রম ইত্যাদির আবেদন চিরন্তন। তবে এই জিনিসগুলো জীবনের বিশাল ভবিষ্যতের খুব কম অংশকেই নিয়ন্ত্রণ করে। জীবনের বড় অংশটা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় যাপনকারীকেই। স্বহস্তে, নিজের জন্য নির্ধারিত চালকের আসনটিতে বসে।
যাক্ গ্রীষ্মের দিনগুলো আসলে ভিন্নরকম। মাঝে মাঝে ঝিম ধরা দুপুরে আমার শহরের কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কোনো কারণ ছাড়াই। সেদিন দুপুরের কথা, শহীদ মিনারের সামনের চিলতে ঘাসে ঢাকা স্থানটুকু দখল করে হইচই করছিলো একদল শিক্ষকস্থানীয় মানুষ। তাদের বোধহয় অনেক দাবি-দাওয়া আছে। তারা সেগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরতে চায়। যে কারণে মাইক-প্যান্ডেল টাঙিয়ে, ডেকোরেশনের চেয়ার-টেয়ার বিছিয়ে এলাহী এক যজ্ঞের আয়োজন করেছিলো। আমার হাতে কোনো কাজ ছিলো না। দুপুরটাও ঘুরছিলো লাটিমের মতো, একটা বিলম্বিত নির্দিষ্ট তালে। অলস দেহ-মন নিয়ে গিয়ে বসলাম শিক্ষকদের মাঝখানে।
মানুষগুলো যেভাবে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে চিৎকার করছিলো, সেটা দেখে আমার মনে কিছু প্রশ্ন জন্ম নিলো- এই কাজটি আসলে কেন করা হচ্ছে? উদ্দেশ্য কি? হয়তো এর মাধ্যমে শিক্ষক সমাজের একটি শ্রেণীর প্রতিনিধিদের পকেটে কিছু অর্থযোগ হবে। কিন্তু তারচে' বেশি কিছু হবার তো কোনো সম্ভাবনা দেখি না। দেশের সামগ্রিক শিক্ষা পরিস্থিতির উন্নয়ন নামক মিথ্যে কথাটা কি কখনো সত্যি হবে? মনে হচ্ছিলো না। অন্তত লোকগুলোর চেহারা তা বলছিলো না। পোড় খাওয়া ধান্দাবাজদের মতো মুখভঙ্গি একেকজনের। শব্দচয়নে ছিলো সুচতুর চাটুকারিতার আভাস। আমি বুঝতে পারছিলাম, প্যান্ডেলের নিচে ওটা একটা প্রহসনের মঞ্চ।
বসে বসে ভাবছিলাম, শহীদ মিনারের কেন্দ্রীয় কৃষ্ণচূড়াগুলো কি এই অনর্থক হই-চই দেখে বিরক্ত? আমি তাদের মনোভাব বোঝার মনোযোগী চেষ্টা চালালাম। হ্যাঁ, সত্যিই কৃষ্ণচূড়াগুলো বিরক্ত হচ্ছিলো। মায়া হলো ওদের জন্য। পুরো চরাচরে এক ফোঁটা বাতাস নেই। সূর্য্যিমামাও রোদ বিলাতে কসুর করছেন না। কেবল মাসটা বোশেখ বলেই রক্ষে। নাহলে পুড়ে ছারখার হয়ে যেতো সবকিছু। তবে রোদের তাপে সেই উত্তাপ না থাকলেও, বহু মানুষের উপস্থিতি জায়গাটাকে তপ্ত করে রেখেছিলো। একটা ফিঙে পাখিকে অলস বসে থাকতে দেখতে পাচ্ছিলাম উঁচু একটা কৃষ্ণচূড়ার ডালে। ও তার লম্বা কালো লেজ নিচের দিকে ঝুলিয়ে ঊর্ধ্বপানে চেয়ে বসে ছিলো। যেভাবে আমি মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ওস্তাদের দিকে তাকাই। মানুষ শুষে নিয়েছে পুরো পারিপার্শ্বিকের জীবনীশক্তি। তবে যন্ত্রগুলোর প্রাণশক্তি কেড়ে নিতে পারে নি। মাইকের তার-চিৎকার আর পাশের রাস্তা দিয়ে হুশহাশ করে বেরিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর তীক্ষ্ণ হর্ণ তাই কানের ভেতর আঘাত করছিলো চাবুকের মতো। নির্জনতার জন্য এ ধরনের জনারণ্যই আমার সবচে' পছন্দ।
ডিএমসি'র হলুদরঙা স্টাফ কোয়ার্টারগুলো নিজেদের সীমার ভেতর দাঁড়িয়ে আমার উদ্দেশ্যে বিদ্রুপের হাসি হাসছিলো আর পলাশীর দিকে চলে যাওয়া পিচঢালা রাস্তাটি মায়াময়ীর মতো হাতছানি দিয়ে ডাকছিলো। আমি সেই হাতছানি উপেক্ষা করে উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যালের শাদারঙা তিনতলা ভবনটির মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য আছে। ডিএমসি'র মতো চঞ্চল-চপলা নয়। আর এনেক্স ভবনটি তো যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃদ্ধাশ্রম। ওখানে একটা ক্যন্টিন আছে। ক্যন্টিনের নামটা বাংলা সাহিত্যের এক অমর চরিত্রের নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বলাইদা'র ক্যন্টিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ক্যন্টিনগুলোর তুলনায় ধর্মালয় বলা যায় এটাকে। ভেতরটা ধর্মালয়ের মতোই নিশ্চুপ, হৈ-হুল্লোড়বিহীন, ছায়া ছায়া অন্ধকারভরা। ফার্মগেটে একটা গীর্জা আছে। তার ভেতরে দিনে-দুপুরে অমন পরিবেশের দেখা মেলে।
অনেকক্ষণ শ্রবণযন্ত্রের ওপর অত্যাচার চললো। অথচ বিচলিত হলাম না। ফুলার রোডের হাতছানিটা টের পাচ্ছিলাম তখনো। ইচ্ছে করছিলো, সেখানে গিয়ে ফুটপাথে ওপর একটা কাগজ বিছিয়ে বসে থাকতে। হাতে থাকতে পারে একটা ঠান্ডা কোক। সঙ্গে থাকতে পারে কোনো এক প্রিয় বন্ধু। কিন্তু যাচ্ছিলাম না। ডা. ফজলে রাব্বী হলের দিকে গেলে হয়তো একটা মাদকময় পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারতাম। তাও করলাম না। সহস্র শব্দদূষক যন্ত্র আর রক্তচোষাবৎ মানুষদের মাঝে একা একা বসে থাকলাম। বিকেল গড়িয়ে গোধূলি নামলো।
একসময় মিলনমেলা ভাঙা শুরু হলো। শুনতে পাচ্ছিলাম, নিস্তেজ হয়ে আসছে মাইকের ভেতর দিয়ে ভেসে আসা মানুষের গলার আওয়াজ। গোধূলীর মোহনীয় আলোয় গণমানুষের চেহারা আমার কাছে সবসময়ই অন্যরকম লাগে। ওদের মুখের কঠোর বলিরেখার ভাঁজেও কোথায় যেন ফুটে থাকে একটা প্রশান্তির স্নিগ্ধ ছায়া। এই ছায়া কি আরেকটি জীবিত দিন পার করতে পারার আনন্দ থেকে উৎসারিত? আমি জানি না। মানুষের চেয়ে আমার বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগে। ওদের জীবনে স্থিরতা অনেক বেশি। গোধূলি তাদের বাহ্যিক চেহারায় কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। দেখলাম, দুপুরবেলার মতোই্ একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। লাল ফুল বা সবুজ পাতাগুলোও ছিলো একই রকম নিশ্চল।
অচলাবস্থা দেখতে আমার ভালো লাগে। নিজেও অচল জীবন যাপন করি তো, তাই। গাছগুলোর সঙ্গে আমার একটা মানসিক নৈকট্য টের পাই। অবশ্য সে ব্যপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারি না, কারণ গাছেদের ভাষা আমি বুঝি না। তবে ওদের মনের কথা না জানলেও আমি রাঙা আকাশের মনের কথা জানি। তার মুখেও ছিলো প্রশান্তির হাসি। বুঝতে পারি, আকাশও এখন ধ্বংসের আতঙ্ক নিয়ে বাস করে। শুধু আমারই যেন কোনো দুশ্চিন্তা নেই। উদাস বসে তোমায় নিয়ে ভাবি কেবল।
তোমার চোখের হাসি কল্পনায় দেখার চেষ্টা করি। তুমি যে মাঝে মাঝে আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাতে, সেই দৃশ্যটা ফুটিয়ে তুলি। মনে মনে তোমার পিঙ্গলরঙা চুলের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি, আলতো করে হাতও বুলাই। তুমি রাজি হওনি একটি শিশুর উদ্দেশ্যে একবার 'হ্যাঁ' বলতে। আমার জীবনটা থেমে গেছে সেখানেই।
তুমি কি জানো, তোমার সঙ্গে কাটানো স্মৃতির সুখচিন্তাগুলোই আজ আমার টিকে থাকার একমাত্র প্রেরণা? টিকেই আছি শুধু। মনে আছে, তোমায় বলেছিলাম- তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে পারবো না? আসলেও পারি নি। নিম্নস্তরের জীবদের মতো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছি। কারণ ইচ্ছেমৃত্যূ বরণ করার মতো সাহস আমার নেই।
ভালো থেকো। তোমায় আমার সবচে' প্রিয় কবিতাটি শোনাতে ইচ্ছে হচ্ছে। শোনাতে তো পারবো না। তাই এখানে লিখে দিলাম। প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা-
হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।
পৃথিবীর রাঙ্গা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো?
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
---





ফার্স্ট কমেন্ট
লেখা অসম্ভব ভালো হইসে। আপনার লেখা অবশ্য বরাবরই ভালো হয়। এটা আর নতুন করে কিছু বলার নাই
যারে এতো মিস করেন তারে সবসময় আপনার পকেটে নিয়া ঘুরলেইতো পারেন
সে তো আমার পকেটের চেয়ে অনেক বড়, তাই পারি না।
আপনারে ফার্স্ট কমেন্টের লাগি শুভেচ্ছা। নতুন লেখা দেন। প্রো-পিকটাও চেঞ্জান।
লেখা দারুন হইছে ব্রো.... সহজ, সরল, নির্মল ভালোবাসায় ভরে উঠুক জীবন....সবসময় শুভকামনা...ভালো থাকবেন।।
থ্যাংকস্ ডিউড! থ্যাংকস্ ফর দ্য উইশেস্
ব্যস্ত এখন। পরে পড়ে মন্তব্য করবো
ঘটনা হৈলো, ইদানীং অন্তত আপনার দুইটা লেখাতে বিষাদের সুর পাইলাম। বলি, ঘটনা কী কমরেড ? মন-টন খারাপ নাকি ? এরাম কৈরা 'তারে' ভাবলে চলবো ? অন্য কাম-কাইজ নাই নাকি ?
যে গেছে যাকনা। নতুন কিছু আসবে নিশ্চয়ই। খালি চোখ-কান খোলা রাখেন। দৃষ্টি যাতে না এড়িয়ে যায়। নতুন, আপন কারো ডাক যেনো শুনতে পান। পোড়া চোখ যাতে কারো অগমন দেখতে ব্যর্থ না হয়। ওস্তাদ আপনারে এবং সকলরে সুখি করুক।
কমেন্টটা খুবই সুন্দর। মেসবাহ ভাই, একদিন ছুটির দিনে বাসায় দাওয়াত দেন। ভাবীর হাতের রান্না খাবো। আর আপনার সঙ্গে আড্ডা দেবো। আর আপনারে যে আমি সেদিন ব্যবসার কথা বললাম, সেইটার মনে হয় কোনো গুরুত্বই দিলেন না!
লেখা দারুন হইছে ব্রো.... সহজ, সরল, নির্মল ভালোবাসায় ভরে উঠুক জীবন....সবসময় শুভকামনা...ভালো থাকবেন।।
সহজ, সরল, নির্মল ভালোবাসা চাই না।
কলিকাল, ঘোর কলিকাল!
অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে, আবার ইচ্ছেও করছে না।
তবে, জীবন এমন না হলেও তো পারতো!
ভালো থাকেন মীর। সবসময় যেনো ভালো থাকেন।
হিহি জীবন এমন না হলে কেমন হতো জয়িতা'পু? খুব বোরিং নিশ্চই? তারচে' এটাই ভালো, কি বলেন?
আপনের নতুন লেখা-জোকা কই? নাই তো নাই-ই। দীর্ঘসময় পার হয়ে যায়, আপনার নতুন লেখা না পড়েই...
লিখতে তো চাই। এই যে আপনি বললেন, লিখতে ইচ্ছে করে কিন্তু কত যে কথা মনে সব লেখা যায় না আর অন্য কিছু তো লিখতেও পারি না। কি করি বলেন তো!
জীবন এমন না হলে বোরিং লাগতো! হুমম, লাগতো। কিন্তু একটাই তো জীবন, ছোট ছোট চাওয়াগুলি পূরণ না হওয়াতে যদি কষ্ট থেকে যায়!
মনের কথা যা লিখতে পারেন, যতটুকু লিখতে পারেন- লিখে ফেলেন। কেউ আপনাকে কষ্ট দিয়েছে? লিখে ফেলেন। কাউকে আপনি ভুল করে কষ্ট দিয়ে ফেলেছেন? লিখে দেন- স্যরি, ভুল হয়ে গেছে। কোনোকিছু দেখে মন খারাপ? লিখুন। কোনোকিছু দেখে উৎফুল্ল লাগলে তাও লিখুন। যা মনে চায়। লাগলে লোকজনের নাম ধরে ধরে লিখুন। কে কি ভাবলো, কি যায় আসে তাতে? লিখলে দেখবেন হালকা লাগছে অনেক।
শুভকামনা থাকলো।
দিনগুলো সব চলেই গেলো এই ভাবেই!
মোবাই্ল ফেসবুকে লেখাটা দেখি সবাই শেয়ার দেয় তখন পড়ে নিলাম। যথারীতি চমকপ্রদ বয়ানে অসাধারন লেখা!
ভালো থাকবেন ভাইয়া। রাশি রাশি শুভকামনা
শুভকামনার জন্য রাশি রাশি ধইন্যবাদ ভাইয়া। আপনিও ভালো থাকবেন এই প্রত্যাশায় থাকলাম।
আপনে হয়তো আপনার মনের কষ্টের কথা লেখেন আর আমরা সেইগুলার শিল্পগুণ আর সাহিত্যমান বিচার করে আপনেরে বাহবা দেই
। আহারে লেখক হওয়ার এই হইল দুঃখ
(
লেখা সেরকম হইছে!!
ধন্যবাদ লিজা মন্তব্যের জন্য। আপনার নতুন লেখা পড়ি না অনেকদিন।
পড়ে গেলাম ...
কোথায় গেলেন কামাল ভাই? নতুন কিছু লেখেন না কেন? একটা নতুন লেখা লিখে লীনা আপুকে উৎসর্গ করেন।
লেখা বরাবরের মতই ভালো।
ইদানিং বিরহের সুর কেন লেখায় ????
জানি না বস্। যখন যেরকম সুর আসলে বের হয়।
এর উপর আমার কোনো হাত নাই।
সবাই বিষণ্ণ হয়ে গেলে হাসিখুশি থাকবে কে???
যখন সবাই হাসিখুশি থাকে, তখন যার বিষণ্নতার ডিউটি থাকে; সে।
মন্তব্য করুন