গল্প: নোঙরের সঙ্গে উঠে গিয়েছিলো একটি পাঁজরের হাড়
ক্রিং ক্রিং...
-হ্যালো।
একবার ফোন হতেই মিভ ফোন ধরবে আমি ভাবি নি। তাই একটু হকচকিয়ে গেলাম। আসলে ও যে ফোন ধরবে, সেটাই আমি আশা করি নি। কিন্তু তাও যে কেন সেদিন রাত ৪টা ৫০মিনিটে ওর নাম্বার আনমনে টিপে টিপে লিখলাম সেলফোনের টাচপ্যাডে! জানি না।
লিখে আবার সেটাকে ডায়ালেও পাঠিয়ে দিলাম। আর সঙ্গে সঙ্গেই কলটা চলে গেলো ওর কাছে। অথচ তার আগে কতদিন যে একইভাবে ওর নাম্বার লিখেও বার বার কেটে দিয়েছি, তার হিসেব নেই। কি মনে করে সেদিন ভোরবেলা ওর নাম্বার টিপেছিলাম, আজ আর মনে নেই। চমকে উঠে অনেকক্ষণ ফোনটা কানে ঠেসে ধরে রেখেছিলাম- এটুকু শুধু মনে আছে।
ও চলে যাবার পর সহস্রবার কয়েকটা শেষকথা বলার প্রস্তুতি নিয়ে ওকে ফোন করেছিলাম। ও একবারও ফোন ধরে নি। কথাগুলো ই-মেইলে লিখে দিতে পারতাম। কিন্তু দিই নি। টেক্সট করেও বলা যেতো। আমরা প্রায়ই ১৪০০ শব্দের টেক্সট লিখে পাঠাতাম। কারণ এরচে বড় টেক্সট আমার সেলে লেখা যেতো না। টেক্সটও দিই নি। মুখেই বলতে চেয়েছিলাম। ও সুযোগ দেয় নি। অচেনা নাম্বার থেকে ফোন করে ধরে ফেলতে পারতাম। সেটাও করি নি। আমি আসলে ওভাবে ওর সঙ্গে শেষকথাগুলো বলতে চাই নি। চেয়েছিলাম আমার সঙ্গে কথা বলার আগে ওরও প্রস্তুতি থাকুক। চেয়েছিলাম একবার শুধু কথাগুলো বলে ফেলতে ওর কাছে। বলে নিজেকে একটা মুক্তি দিয়ে দিতে। আজ অনেকদিন হলো, সেসব ভাবনা বাদ দিয়েছি। থাক। কি হবে বলে? কি হবে মুক্তি নিয়ে?
আমি কি মুক্তির আশায় ওকে ভালবেসেছিলাম?
আবারো অপরপ্রান্ত থেকে ওর মিষ্টি কণ্ঠটা জানতে চাইলো, হ্যালো। খুব যত্নসহকারে বলা হ্যালো। যেন ও চাচ্ছে, আমি একটা কিছু উত্তর দিই। নিদেনপক্ষে একটা হ্যালো বলি। কিন্তু আমি পারছিলাম না। একবার চেষ্টা করলাম। এমনকি ঠোঁটটাও নড়লো না। অসাড় হয়ে গেছে ঠোঁট, মস্তিষ্ক আর আমার গ্ল্যান্ডগুলো। হারিয়ে গেছে মন, কোনো এক বৈশাখি দুপুরের স্মৃতির কোঠায়। আমরা দু'জন সেদিনই প্রথম আর শেষবারের মতো দেখা করেছিলাম। আমি জানতাম, ও আমাকে যেমনটা ভাবে- আমি তা নই। তাও অনেক সাহস বুকে ধরে চলে গিয়েছিলাম ওর সামনে। অনেক জোরে হৃৎপিন্ডের ভেতর একটা সাকশন পাম্প চলছিলো তখন। তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিলো সবকিছু।
তারপরও ওর সঙ্গে আমি এক মূহুর্ত সময় কাটিয়েছিলাম। একটা মূহুর্তই। নিমেষে এলো এবং চোখের সামনে দিয়ে নিমেষে গায়েব হয়ে গেলো। শুধু রেখে গেলো একগুচ্ছ নক্ষত্রফুলের সুবাস। তারপরে জানি না কতদিন পর্যন্ত আমি বিভোর হয়েছিলাম। জানি না কতদিন আমার প্রত্যেকটা কাজে ওর উপস্থিতি টের পেতে হয়েছিলো। ফুলে ভরা ঝুড়ির মতো সুন্দর মেয়েটিকে আমি মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছিলাম এক দেখাতেই। একটা ঝলকের মতো ছিলো সেই দু'টি ঘন্টা আমার কাছে। বিদ্যূতের ঝলক না কিন্তু। অমন ঝলক সৃষ্টি হতে পারে কেবল নদীর সঙ্গে নদীর ধাক্কায়।
তারপরে একদিন আমি দেখেছি, ও দূরে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি হাহাকার চেপে জিজ্ঞেস করেছি, কই যাও? আমার গলায় দলাপাকানো কষ্ট এসে জমা হচ্ছিলো। কিন্তু কণ্ঠে সেটাকে বের হতে দিচ্ছিলাম না। ও হেসে বলেছিলো, কোথাও না তো। কিন্তু আমি জানতাম, ও চলে যাচ্ছে আমার কাছ থেকে।
ও সত্যিই একদিন চলে গেলো। আমি আর ওকে ফোন করে পেলাম না। ওর অফিসে গিয়ে পেলাম না। বাসায় গিয়ে পেলাম না। ওর বন্ধুদের কাছে গিয়ে পেলাম না। অন্তর্জালে আঁতিপাতি করে খুঁজে পেলাম না। সবকিছু থেকে যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেলো নির্জন সকালের মতো সুন্দর মেয়েটি। আমি একটিবারের জন্য ওকে বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেলাম না।
অপরপ্রান্ত থেকে লাইন কেটে দেয়ার যান্ত্রিক বিপ ভেসে আসার ঠিক আগমূহুর্তেই আমার গলা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেলো- আমি তোমাকে ভালবাসি মিভ। আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিলাম, ও কান থেকে ফোনটা নামিয়ে ফেলেছে। হয়তো ভেবেছে ভুল করে চাপ লেগে কল চলে গেছে ওর কাছে। বেচারী হ্যাং আপ করার আগেই আমি ওই কথাটি বলেছিলাম, মনে আছে। ও আবার ফোনটা কানে তুলে আমায় বলেছিলো, আমি জানি তুমি আমায় ভালোবাসো রিপ।
কিন্তু আমি জানতাম না, আর কি বলতে হবে। আমার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিলো না। পরের কথাতেই যে সে বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দেবে না, সেই আত্মবিশ্বাস ছিলো না। এমনকি অমন জবাব পাওয়ার পরও যে আমার প্রথম কথাটিতে ও বিরক্ত হয় নি, তাও বিশ্বাস হচ্ছিলো না। সত্যিকার ভালবাসা সবসময় মানুষকে ভীত করে তোলে। আমি কণ্ঠস্বর একটু নামিয়ে আবারো একই কথা বললাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি মিভ।
মিভ তারপর ফোনটা রেখে দিলো।
আমি অনেকক্ষণ ওটা কানে ধরে রাখলাম। লাইন কেটে যাওয়ার যান্ত্রিক টুট টুট গুলো শুনলাম। ঘরের সিলিংয়ে ঘূর্ণায়মান ফ্যানের শোঁ শোঁ আওয়াজ শুনলাম। বাইরে ততক্ষণে চড়ুই পাখিদের কিচিরমিচির খুব ছোট ভলিউমে শুরু হয়েছে। সেগুলো শুনলাম। সূর্যের আলো ফোটার শৃঙ্গার কানে আসলো। পূর্বসাগরে একটা পালতোলা জাহাজ নোঙর তুললো। তার ভেঁপুর আওয়াজে আমার দুই চোখে নেমে আসলো একটা কালো রঙয়ের মদির ঘুমের কার্টেন। রক্ত চলাচল সীমিত হয়ে পড়লো শরীরের শিরা-উপশিরাগুলোতে। আমি মিভের স্মৃতিতে জেগে উঠলাম। নিজের স্মৃতিতে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরে, অনেকদিন পরে জেনেছিলাম, মিভ চায় নি আমাকে কষ্ট দিতে। তাই আমার কাছ থেকে নিজেকে সযতনে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলো সে। সেটা জেনেও অনেকদিন ভেবেছি ফোন করবো। আর ফোন করা হয় নি। ফোন করে হয়তো বলতে পারতাম, আমার কষ্ট পেতে আপত্তি ছিলো না। কিন্তু বলা হয় নি।
আমার আপত্তি না থাকলে যে অন্যকারো আপত্তি থাকতে পারবে না, এমন তো কোনো কথা ছিলো না।
আমি সেই অনিশ্চয়তা বুকে ধরে আজ অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। স্বাভাবিক নিয়মেই ওর প্রতি আমার ভালোবাসা রয়ে গেছে আগের মতো। একবিন্দুও কমে নি। ওক পাওয়ার আশা একটা কাঠুরে লতার মতো আমায় আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। বাঁধনের জোর দিনে দিনে বেড়েছে। আমি সংকুচিত হতে হতে একটা জীবন্মৃত অস্তিত্বে রূপান্তরিত হয়েছি। আমার শরীরি অবয়বটা একটা নিঃস্বার্থ চেহারা পেলেও আমি জানি, ভেতরে ভেতরে আমি কত স্বার্থপরের মতো করে ওকে আজো চাই। মনে মনে গান গাই, আজ কাল বা পরশু যদি সে এসে দাঁড়ায়...
যদিও জানি ও আর কখনো আমার জীবনে ফিরে আসবে না।
---





মন্তব্য করুন