ইউজার লগইন

asasasad

মতিঝিলের একটা কোণা দিয়ে হাঁটতেছিলাম। ওই যে, রাজউক আর রাষ্ট্রপতির বাড়ির চিপা দিয়ে একটা রোড চলে গেছে না একদম শাপলা পর্যন্ত? সেই রাস্তাটা দিয়ে। খর দুপুর। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া। রাস্তায় হাঁটছি।

এমনটা সাধারণত ঘটে না। কারণ দুপুরের দিকে অফিসের ব্যস্ততাটাই আমাকে বেশি করে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আজ সেটা নেই। সপ্তাহের মাঝামাঝি এই একটা দিনে আমি অফিসের কল্যাণে ছুটি উপভোগ করি।

হাঁটতে হাঁটতে রাজউক ভবনের প্রায় কাছেই চলে আসলাম। আর একটু সামনেই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষদের কর্মস্থল। রাস্তাটা দিয়ে বের হলেই দেখতে পাবো দুইদিক দিয়ে অবিরাম গতিতে চলাচল করছে অসংখ্য গাড়ি-ঘোড়া। স্যরি ঘোড়া মনে হয় দেখতে পাবো না। ঘোড়ার গাড়িগুলো এদিকে আসে না। ওগুলো গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার থেকে সদরঘাট ওভারব্রীজ পর্যন্ত যায়। একেকজনের কাছ থেকে ১০ টাকা করে নেয়।

ভাবলাম এখনই যন্ত্রণার যন্ত্রনগরীতে না ঢুকে পড়ে বরং আরো খানিকটা সময় গলি-ঘুপচিগুলোতে ঘোরাঘুরি করি। সাধারণত গলি-ঘুপচিতেতো আর খুব বেশি ঘোরাঘুরির সুযোগ মেলে না। চট করে রাস্তার পাশের একটা সিগারেটের দোকানে দাঁড়িয়ে পড়লাম। একটা সিগারেট খাওয়া যায়। খারাপ আইডিয়া না।

দুপুরের দিকে ওই ডাচ-বাংলার চিপায় একটা নীল পলিথিন টাঙানো দোকানে ইলিশ ভাজা দিয়ে ভাত খেয়েছি। ভাজিটা ভালো হয়েছিলো। কিন্তু ইলিশটা টাটকা ছিলো না। তারপরেও তৃপ্তি নিয়েই খেয়েছি। কারণ আজ সকাল থেকেই আসলে এমন হাঁটছি। খিদেটা লেগেছিলো ভালোই।

ভাত খাওয়ার পর পাশের একটা দোকানে দাঁড়িয়ে খেলাম চা। তারপর থেকে মূলত মতিঝিল এলাকার চিপা-চুপাতেই ঘুরছি। কেন কে জানে?

একটা ছোট্ট নির্দয় কারণ অবশ্য আছে। কিন্তু সেটা ভাবতে চাইছি না। অথচ বারবার সেই ভাবনাটা মাথায় এসে উঁকি দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতির বাংলোর বাড়ির দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা টানার সময়ও হুট করে এসে ভাবনাটা মাথায় টোকা দিয়ে গেলো।

রুদমিলাকে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম এই মতিঝিলেরই কোনো এক রাস্তার অলি কিংবা গলিতে।

অথচ ওকে আমার হারানোর কথা ছিলো না। ইন ফ্যক্ট, আমিই বারবার হারিয়ে যেতাম আর ও আমাকে খুঁজে বের করতো। প্রিয় রুদমিলা ম্যাস কমিউনিকেশ এন্ড জার্নালিজমে পড়তো। প্রিয় রুদমিলা কণ্ঠশীলনে আবৃত্তি শেখাতো। প্রিয় রুদমিলা জাগো আর্ট সেন্টারে কত্থক নাচ শিখতো। আমার প্রিয় রুদমিলা আমাকে অঝোর ধারায় ভালোবাসতো। অথচ আমি বারবার তাকে ফেলে ছুটে পালিয়ে যেতাম।

আর যেখানেই যাই, সেখান থেকেই সে একসময় আমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসতো। আইবিএ লনের ঘাসবাঁধানো ইটের ওপর নিয়ে এসে বসাতো। আমার হাত ধরে রাখতো শক্ত করে। মিশিয়ে রাখতো ওর গালের সঙ্গে। আর চোখ বেয়ে টপটপ করে ঝরতো উষ্ণ কোমল পানি।

আমি এখন মাঝে মাঝে ভাবি, ইট ওয়াজ নট ব্যাড অ্যাট অল। কিন্তু তবুও কেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে আমি অসংখ্য অগণিত দুষ্টামী করতাম। আল্লাই জানে। আজ সুমনদের সঙ্গে মানিকগঞ্জে চলে গেছি তো কাল শাওনদের সঙ্গে দৌলতদিয়া। মিজানকে নিয়ে মাওয়া ঘাটে ইলিশ খেতে যাবার নাম করে হারিয়ে গেছি ১০ দিনের জন্য। সময়কালটা আরো বাড়তে পারতো। কিন্তু বাপ খোঁজ-খবর লাগায়ে ঠিকই আমাদেরকে রাঙামাটির এক সরকারি রেস্টহাউস থেকে উদ্ধার করে ফেললেন। সরকারি রেস্টহাউসে আমাদের মতো অকাট বেসরকারি কয়েকটা পোলাপান কিভাবে জায়গা পেলো, তা নিয়ে ভেবে ভেবে তিনি কিছুদিন দুশ্চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু আমি তাকে কোনো ক্লু দিই নি।

একবার রুদমিলার সামনেই নিশিতা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছিলাম। তা আট-দশদিন হবে। তারপরে একদিন দুপুরে যখন কলাভবনটা খুব নির্জন তখন ৪০৩৬ নম্বর রুমে ঢুকে আমি আর নিশিতা দরোজাগুলো লাগিয়ে দিয়ে একজন-আরেকজনের কাছে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করলাম। আর তখনই দরজার ওপর শুরু হলো বিরামহীন চড়-চাপড়, ধাক্কাধাক্কি। বাইরে রুদমিলার গলা, আকাশ ভেতর থেকে এক্ষণ বেরিয়ে আয়। এক্ষণ এই মূহুর্তে বেরিয়ে আয় বলছি।

খুব বিরক্ত মুখে দরজা খুললাম। আর মেয়েটি আবারো আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলো। খুব ভীষণ বিরক্ত লাগছিলো আমার। নিশিতা অবশ্য আগে থেকেই জানতো যে একদিন এমনটি ঘটবে।

যথারীতি সময় কাটছিলো দুইজনের। এরই মধ্যে আমাদের ভার্সিটি পাশ দেয়া হয়ে গেলো। মারামারি, বিচ্ছেদ, ঘোরাঘুরি, পার্সেন্টেজ নিয়ে ধাক্কাধাক্কি এসব করতে করতে কখন যে জীবনের স্বর্ণালী সময়গুলো হারিয়ে গেলো; টেরই পেলাম না। রুদমিলা অবশ্য অনেক আনন্দের আর সুখের স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। আমরা একবার একসঙ্গে রাতের আঁধারে ঢাকা শহরের ম্যাপ হাতে নিয়ে প্রত্যেকটা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছিলাম।

মাস্টার্স শেষ করে ও পড়াশোনার লাইন পাল্টে গিয়ে ঢুকে পড়লো একটা টাকা-পয়সার হিসাব করার কাজে। আর আমি মিশে গেলাম বারোভূতের মিছিলের ভেতর। রুদমিলাই সবসময় আমাকে টেনে টেনে ধরে রাখতো। ওর জন্যই কখনো একেবারে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে হারিয়ে যেতে পারি নি চিরকালের জন্য। তারপরেও আমি ছিলাম পুরোদস্তুর উড়নচন্ডী মোডে।

পোস্টটি ২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!