গল্প : এক খর দুপুরে কঙক্রীটের ঝাড়ে
মতিঝিলের একটা কোণা দিয়ে হাঁটছিলাম।
ওই যে, রাজউক আর রাষ্ট্রপতির বাড়ির চিপা দিয়ে একটা রোড চলে গেছে না একদম শাপলা চত্বর পর্যন্ত? সেই রাস্তাটা দিয়ে। এক খর দুপুরে। কোনো কারণ ছাড়া। হাঁটছি তো হাঁটছিই।
এমনটা সাধারণত ঘটে না। দুপুরের দিকে অফিসের ব্যস্ততাটাই আমাকে বেশি করে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আজ সেটা নেই। কোনো এক বিচিত্র কারণে, হাহা।
হাঁটতে হাঁটতে রাজউক ভবনের কাছে চলে আসলাম। রাস্তাটা দিয়ে বের হলেই দেখতে পাবো দুইপাশ দিয়ে অবিরাম গতিতে চলাচল করছে অসংখ্য গাড়ি-ঘোড়া।
স্যরি, ঘোড়া মনে হয় দেখতে পাবো না। ঘোড়ার গাড়িগুলো এদিকে আসে না। ওগুলো গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার থেকে সদরঘাট ওভারব্রীজ পর্যন্ত যায়।
এখনই যন্ত্রণার যন্ত্রনগরীতে না ঢুকে বরং আরো খানিকটা সময় গলি-ঘুপচিগুলোতে ঘোরাঘুরি করি। গলি-ঘুপচিতেতো আর সবসময় ঘোরাঘুরির সুযোগ মেলে না। একটা সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। একটা সিগারেট খাওয়া যায়।
তখন আমিন কোর্টে ইলিশ ভাজা দিয়ে ভরপেট ভাত খেয়েছি। ইলিশটা টাটকা ছিলো না, কিন্তু ভাজাটা বেশ হয়েছিলো। ভাতের পর পাশের একটা দোকানে দাঁড়িয়ে খেলাম চা।
তারপর থেকে মূলত মতিঝিল এলাকার চিপা-চুপাতেই ঘুরছি। কেন কে জানে?
একটা ছোট্ট নির্দয় কারণ অবশ্য আছে। কিন্তু সেটা ভাবতে চাইছি না। অথচ বারবার সেই ভাবনাটা মাথায় এসে উঁকি দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতির বাংলোবাড়ির দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা টানার সময়ও ওই ভাবনাটা হুট করে এসে টোকা দিয়ে গেলো।
রুদমিলাকে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম এই মতিঝিলেরই কোনো এক রাস্তার অলি কিংবা গলিতে।
অথচ ওকে আমার হারানোর কথা ছিলো না। ইন ফ্যক্ট, আমিই বারবার হারিয়ে যেতাম; আর ও আমাকে খুঁজে বের করতো। প্রিয় রুদমিলা ম্যাস কমিউনিকেশন এন্ড জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে পড়তো। প্রিয় রুদমিলা কণ্ঠশীলনে আবৃত্তি শেখাতো। প্রিয় রুদমিলা জাগো আর্ট সেন্টারে কত্থক শিখতো। প্রিয় রুদমিলার ছিলো অসাধারণ ফিগার। প্রিয় রুদমিলা সবশেষে একটা বিদেশি সংস্থায় দারুণ একটা চাকুরি নিয়েছিলো। আমার প্রিয় রুদমিলা, একসময় আমাকে অঝোর ধারায় ভালোবাসতো। অথচ আমি বারবার তাকে মহানগরীতে একলা ফেলে রেখে পালিয়ে যেতাম।
আর যেখানেই যাই, সেখান থেকেই সে একসময় আমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসতো। নিয়ে আইবিএ লনের ঘাসবাঁধানো ইটের ওপর এনে বসাতো। আর আমার হাত ধরে রাখতো শক্ত করে। মিশিয়ে রাখতো ওর গালের সঙ্গে। চোখ বেয়ে টপটপ করে ঝরতে থাকতো উষ্ণ-কোমল পানির ফোঁটা।
আমি এখন মাঝে মাঝে ভাবি, সেটা খুব একটা খারাপ ব্যপার আসলে ছিলো না। কিন্তু তবুও কেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে আমি অসংখ্য-অগণিত দুষ্টামী করতাম, আল্লাই জানে।
আজ সুমনদের সঙ্গে মানিকগঞ্জে চলে গেছি তো কাল শাওনদের সঙ্গে দৌলতদিয়ায়। মিজানকে নিয়ে মাওয়া ঘাটে ইলিশ খেতে যাবার নাম করে হারিয়ে গেছি ১০ দিনের জন্য। সময়কালটা আরো বাড়তে পারতো। কিন্তু বাপজান খোঁজ-খবর লাগিয়ে ঠিকই আমাদেরকে রাঙামাটির এক সরকারি রেস্টহাউস থেকে উদ্ধার করে ফেললো। সরকারি রেস্টহাউসে আমাদের মতো অকাট বেসরকারি কয়েকটা পোলাপান কিভাবে জায়গা পেলো, তা নিয়ে ভেবে ভেবে কিছুদিন দুশ্চিন্তা করলো। কিন্তু আমি তাকে কোনো ক্লু দিলাম না।
একবার রুদমিলার সামনেই নিশিতা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম শুরু করে দিলাম। একদিন দুপুরে যখন কলাভবনটা খুব নির্জন, তখন ৪০৩৬ নম্বর রুমে ঢুকে আমি আর নিশিতা একজন-আরেকজনের খুব কাছে চলে গেলাম। আমি ওর ওপরের ঠোঁটের সামান্য ঘষাও অনুভূতিতে টের পাচ্ছিলাম। আলতোভাবে। আর তখনই দেয়ালের ওপাড়ে অর্থাৎ দরজার ওপর শুরু হলো বিরামহীন চড়-চাপড়, ধুমধুম আওয়াজ এবং ধাক্কাধাক্কি। বাইরে রুদমিলার গলা- চিত্র, তুই ভেতর থেকে এক্ষণ বেরিয়ে আয়। এক্ষণ এই মূহুর্তে বেরিয়ে আয় বলছি।
নিশিতা অবশ্য আগে থেকেই জানতো যে একদিন এমনটি ঘটবে। রুদমিলা একদিন ঠিকই আমাকে খুঁজে বের করে নিয়ে যাবে।
যথারীতি সময় কাটছিলো দুইজনের। এরই মধ্যে ভার্সিটি পাশ দেয়া হয়ে গেলো। মারামারি, পার্সেন্টেজ নিয়ে ধাক্কাধাক্কি, ঘোরাঘুরি করতে করতে কখন যে স্বর্ণালী সময়গুলো শেষ হয়ে গেলো; টেরই পেলাম না।
আমরা একবার একসঙ্গে রাতের আঁধারে ঢাকা শহরের ম্যাপ হাতে নিয়ে প্রত্যেকটা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছিলাম। সেইসব কথা যতবার মনে পড়ে ততবারই মনটা হু হু করে ওঠে।
মাস্টার্স শেষ করে ও পড়াশোনার লাইন পাল্টে একটা টাকা-পয়সার হিসাব করার কাজে ঢুকে পড়লো। আমি মিশে গেলাম বারোভূতের মিছিলের ভেতরে। একদম পুরোপুরি মিশে, এখন আমি ইংলিশ রোডের একটা এক রুমের ফ্ল্যাটে ব্যাচেলরের জীবন যাপন করি।
রুদমিলাই সবসময় আমাকে গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া থেকে টেনে-টুনে ধরে রাখতো। ওর জন্যই কখনো একেবারে হারিয়ে যেতে পারি নি।
তারপরও, ওর সঙ্গে কাটানো কয়েকটি বছর আমি ছিলাম পুরোদস্তুর উড়নচন্ডী মোডে। নিশ্চিন্ত, বিন্দাস্। অমন মোডে এ জীবনে আর কখনোই থাকি নি। রুদমিলা না থাকলে জীবনে অমন একটা সময়, কখনো কাটাতেও পারতাম না।
সেই রুদমিলাকে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম এখানেই কোথাও, কাছে পিঠে।
---





প্রিয় লেখকদের লেখায় সবার আগে কমেন্ট করতে পারলে অদ্ভূত একটা ভালো লাগায় মন ভরে থাকে।
এবার গল্প নিয়ে একটু বলি।
শুরুটা শ্রীকান্তকে মনে পড়িয়ে দিয়ে ছিল, 'প্রখর দারুন অতি দীর্ঘ দিন'।
রুদমিলা নামটা ভাল লেগেছে ভীষন। যতবার 'প্রিয় রুদমিলা' পড়েছি তার মাঝে হয়তো অপ্রকাশিত দারুন আবেগটুকু মন ছুঁয়ে গিয়েছে। এরকম রুদমিলা হয়ত সবার জীবনে কেউ একজন থাকে অথবা থাকা উচিত।
গাছের পাতা ছেটে দেওয়ার কেউ থাকলেই হয়তো সে বেড়ে উঠে। আর ফিরিয়ে আনার মত কেউ থাকলেই হয়তো আকাশের ঘুড়ি চাইতে জানে অজানায় হারাতে।
আপনার কাছে প্রত্যাশা যতটুকু এই গল্পটা তার চাইতেও ভাল লেগেছে। প্রিয়তে জমা থাক আপনার স্মৃতি, পাওয়া না পাওয়া যত সুখ।
রুদমিলার জন্য ভালোবাসা.. <3
এতো রীতিমত কবিতা!
দারুন!
রুদমিলা নামটা দেখে চমকে উঠেছিলাম... মিলাতে চেষ্টা করেছি... মিলাতে পেরেছি কিনা, সেটা নাহয় অব্যক্তই থাক। রুদমিলার আর আপনার জন্য অনেক ভালোবাসা... অনেকদিন পর !
আপনি আগের মতই আছেন। সেই চেনা সুর, সেই চেনা বিরহ... হাহাকার... পারেনও আপনি। আপনারে সেলাম
আপনার কাছে সব সময় এক্সপেকটেশন এইটু বেশীই থাকে ! বরাবরের মতই চমৎকার লেখা পেলাম। রুদমিলার জন্যে ভালবাসা !
ভাল থাকুন সবসময় !
হাই রুদমীলা...
তুমারে মাইর
গল্প পড়তে পড়তে কৈ জানি হারায় গেসিলাম! অদ্ভুত একটা টান থাকে আপনার লেখা গুলোর মধ্যে! মেসবাহ ভাই-এর মত বলতে হয়, আপনি পারেনও!
বর্ণ'র মতো আমিও যতবার "প্রিয় রুদমিলা" পড়ছিলাম, ভালো লাগাটা বেড়েই যাচ্ছিল।
গল্পটা ভালো লাগার কারন আরেকটা আছে, দেখিনি কেবল শুনেই এসেছি যে, প্রায় এমনি করে একজনকে দারুন ছন্নছাড়া জীবনযাপনের সুযোগ দিয়েছিলো এক মেয়ে, হ্যাঁ অম্নেই হেলাফেলায়তেই ওকে হারিয়ে ছেলেটা এখন থিতু হবার জোর প্রচেষ্টায় আছে।
গতকালই শাতিলের সাথে কথা হচ্ছিল যে মীর লিখছে না বেশক'দিন, আমরা দু'জনেই কেন জানি মনে করলাম যে ২/১দিনের মধ্যেই মীরের লেখা পাবো! আজ এসে দেখি আপনার লেখা!.।। তাও আবার এমনি চমৎকার ভালো লাগা ওলা।
মীরের কাছে সব্বারই প্রত্যাশা বরাবরই বেশি।
চমৎকার গল্প।

রুদমিলাকে খুঁজে বের করুন।
জীবনে এমন রুদমিলা না থাকলে সব কিছু পানসে হয়ে যায়।
আমি এক রুদমিলা রে চিনি.. বাড়ী সার্বিয়া.. সবই ভালু তবে দিনে ৩ প্যাকেট সাগারেট খায়
~
পরেরবার আমার সাথে দেখা হলে এক কাপ চা খেয়ে নিয়েন... সুন্দর লেখার জন্য
অসাধারণ!
মীর অসাধারন বল্লেও কম বলা হবে।
এক নিঃশ্বাসে পড়লাম।
খুব ভালো লাগলো।
ভাল লাগল । চমৎকার ।
প্রিয় রুদমিলাকে খূজে বের করেন। দারুণ অনুভূতি।
মন্তব্য করুন