ছোটগল্প : অযৌক্তিক অসহজ
নওরীণের কথা শুনে শুনেই সেদিনের রিকশা ভ্রমণ শেষ হলো।
এ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে দু'জনে দুপুরের দিকে মোটামুটি খালি পেটে যার যার গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম। যদিও নওরীণকে আমি জোর করে চানখাঁর পুল বা আইবিএ ক্যান্টিনে ধরে নিয়ে যেতে পারতাম এবং ভরপেট খানা-পিনা সারতে পারতাম; কিন্তু সেসবের খুব বেশি ইচ্ছে করছিলো না। বরং বন্ধু-বান্ধবকে আমি আসলে যতটা গুরুত্ব দিই, ততটা গুরুত্ব তাদেরকে দেয়া উচিত কিনা- সে ভাবনায় আমার নিজের এ্যাসাইনমেন্টের পুরো সময়টা আমি ভেবে সেটা নিয়ে আরো ভাবার প্রবল তৃষ্ণা অনুভব করছিলাম বলেই মেয়েটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোহরাওয়ার্দী পার্কের দিকে চলে গেলাম। নওরীণ আমার দিকে একটা অবিশ্বাসের চাউনি দিয়ে চলে গেলো ওর কাওরান বাজারের প্রথম স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাটির অফিসের দিকে। আমি ওর অফিসটা নিয়েও শঙ্কিত ছিলাম। বড় বড় চোখের মেয়েটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পত্রিকার একজন উঠতি সাংবাদিক ছিলো। যার সঙ্গে মেলামেশা করা আমার মতো একটা আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার কাব রিপোর্টারের জন্য খানিকটা সংকটের বিষয় ছিলো বৈকি। কিন্তু এ কথাটাও আমি নওরীণকে না বলে স্বভাবতই প্রাণের বন্ধু মিজের সঙ্গে শেয়ার করলাম। যার সব কিছু শোনার পরেও মূল কথা ছিলো একটাই; ছেড়ে দে দোস্ত, এইটাই শেষ সুযোগ।
আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না মিজের ব্যপারটা। কিন্তু সেটা নিয়ে বেশি প্রশ্নও তুললাম না। কেন জানি না, মিজের প্রতি আমার নারী-পুরুষের সম্পর্কঘটিত বিষয়াদি সম্পর্কে অগাধ বিশ্বাস। হয়তো আমার চেয়ে পাঁচ বছর আগে থেকে নিয়মিত যৌনজীবনে ঢুকে পড়ার কারণে। ওকে আমার এ বিষয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ একজন মনে হয়, আমার নিজের চেয়ে। এটাই ছিলো ওর পরামর্শগুলোকে শিরোধার্য মনে করার একমাত্র কারণ। আমি নওরীণের ব্যপারে পুরোপুরি রিজিড হয়ে যাওয়ার একটা মানসিক সিদ্ধান্ত মনে মনে নিয়ে ফেললাম।
কিন্তু সেটা এ্যাপ্লাই করাটা সহজ ছিলো না। প্রতিনিয়ত আমার নওরীণকে দেখে হারিয়ে যেতে হতো। একদিন নওরীণকে আমি দেখেছিলাম মাথার চুলে ব্যান্ড লাগানোর সময়। এমন করে আগে কখনো দেখি নি। মেয়েটি নিজের কাঁধ ছড়ানো চুলগুলো সবগুলো খুঁজে খুঁজে দুই হাতের মুঠোর মধ্যে আনলো। তারপরে সেগুলোকে একসঙ্গে এক মুঠোর ভেতর নিয়ে একটা সাপের পেটের মতো প্যাঁচ দিয়ে মাথার পেছন দিকে সব জড়ো করলো এবং তারপরে ব্যান্ড দিয়ে সবগুলো চুল এক জায়গায় আটকে দিলো। আমি শুধু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, এই একটা নিত্যদিনের ছোট্ট কাজ করতে গিয়ে মেয়েরা যে একটা ছেলেকে কতটা জাগিয়ে তুলতে পারে, সে সম্পর্কে হয়তো তাদের কারো কোনো ধারণা নেই। থাকলে এত খোলাখুলি কোনো মেয়ে চুল বাঁধতো না। আমি পুরো দৃশ্যটা দেখে ফেলার পর এক ধরনের আকুলতা অনুভব করা শুরু করলাম নিজের ভেতর। দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়তে হয়েছিলো আমাকে। সেদিন আমরা কলাভবনে গিয়েছিলাম একটা জরুরি কাজে। কাজটা ছিলো নওরীণের। আমি ওকে বললাম, তুমি কাজটা করো আমি আসছি। বলে কলাভবনের নিচে নেমে একটা গোল্ড লীফ ধরানো পর্যন্ত আমার ভেতরটা উত্তেজনায় টগবগ করছিলো।
নওরীণ ছিলো অসাধারণ মতো দেখতে একটি মেয়ে। ওর সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয় বলে সে চেষ্টায় যাচ্ছি না। শুধু বলতে পারি, ওর শরীরের চামড়াটা ছিলো উজ্জল শাদা রংয়ের এবং টানটান। ওর মুখের দিকে তাকালে আমার সবসময় মনে হতো, কি যেন অসংখ্য অনুচ্চারিত কথা এখনি বের হয়ে আসবে এই মেয়েটির মুখ থেকে আর আমি শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে যাবো। পার হয়ে যাবে দিন, পার হয়ে যাবে রাত। মানুষের মুখের বর্ণনা তো আসলে দেয়া সম্ভব না, কিন্তু নওরীণের মুখ আমাকে আমার ছেলেবেলার সঙ্গীদের কথা মনে করিয়ে দিতো। তাদের সঙ্গে আমি ঘন্টার পর ঘন্ট কি যে গল্প করতাম বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনী স্কুলের লম্বা করিডোরটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, আমার আজ সবকিছু স্পষ্ট মনে নেই।





মন্তব্য করুন