তারপর একরাশ কালো কালো ধোঁয়া
ঠিক কি কারণে জানি না, মানুষের জীবনে কখনোই স্থিরতা আসে না। কখনো ভালো সময় যায়। কখনো খারাপ সময়। সাধারণত খারাপ সময়গুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়। ভালো সময়গুলো ক্ষণস্থায়ী। হয়তো আপেক্ষিকতা কাজ করে এর পেছনে। যে সময়গুলো আমাদের ভালো লাগে, সেগুলোকে আমরা দ্রুত চলে যেতে দিতে চাই না। সেজন্যই হয়তো সেগুলো দ্রুত চলে যায়। খারাপ সময় দীর্ঘস্থায়ী হোক, তা চাইনা বলেই হয়তো সেগুলো অনেকদিন পর্যন্ত সঙ্গে সঙ্গে থাকে। এভাবেই পার হয় দিন। পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি/ দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
কলেজে পড়ার সময়কার একটা ঈদের সন্ধ্যার স্মৃতি আজ মনে পড়ে গেলো। তখন আমি উত্তরাঞ্চলে ছবির মতো সুন্দর একটা শহরে বাস করি। হলিউডি সিনেমাতেই কেবল অমন সুন্দর শহরের দেখা মেলা সম্ভব। 'রিস্টকাটার্স: আ লাভ স্টোরি' নামের একটা সিনেমা ছিলো। সেখানে মৃত্যুর পর বাস করার উপযোগী একটা শহর দেখানো হয়েছিলো। মৃত্যুর পর যদি অমন একটা শহর মেলে বাস করার জন্য, ইউজিনের মতো একটা নিরেট মেলে ঘোরাফেরার সঙ্গী হিসাবে আর মিকালের মতো একটা ঝকঝকে বান্ধবী ঘুরঘুর করে আশপাশে তাহলে কিন্তু বেঁচে থাকাটাকে যতোটা সম্ভব কার্টেল করার পক্ষেই ভোট দেবো আমি।
যাক সে কথা, এখন যদিও আমার কাছে কলেজে পড়ার সেই সময়টাকে খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়, কিন্তু তখন সময়টাকে এতোটা ভালোবাসতাম না। এখন সেজন্য নিজেকে নির্বোধ মনে হয়। এই মনে হওয়া দেখে বুঝতে পারি, আমার বিচারবুদ্ধি অত্যন্ত স্বল্প। তাই এখনকার জীবনকে নিয়ে যে হতাশাবোধটা আমার ভেতর কাজ করে, সেটাকে আমি ভন্ডামীর খাতায় লিপিবদ্ধ করতে ভুল করি না। আমি জানি, কোনো একদিন আজকের সময়টাকেও আমার কাছে অসাধারণ মনে হবে। কিন্তু আজ মনে হবে না।
সেই ঈদের সন্ধ্যায় বন্ধু-বান্ধবরা মিলে অজস্র মজা করেছিলাম। ছেলে হিসাবে কখনোই ভালো পদের ছিলাম না এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউও তেমন ছিলো না। আমাদের মজাগুলো তাই ঠিক নির্দোষ মজার পর্যায়ে আবদ্ধ থাকতো না কখনোই। সেদিন সবাই সালামির টাকা থেকে চাঁদা দিয়ে কিনে এনেছিলাম প্রচুর পরিমাণ দেশি মদ। মেশানোর জন্য কিনেছিলাম নারী দেহ আকৃতির বোতলে ভরা এক লিটার ভার্জিন কোলা।
সিগারেট কেনা হয়েছিলো এক প্যাকেট। তখন বন্ধুদের মধ্যে দু'একজনই কেবল বেনসন এন্ড হেজেস টানতো। বাকীরা সবাই গোল্ড লীফ। ভরপুর দেশি মদ পেটে গিয়ে তার প্রতিক্রিয়া দেখানোয় কোনো কমতি রাখলো না। আমরা পুরো রহমান নগর, মালতী নগর, বকশী বাজার এলাকা গরম করে তুললাম। ১৪-১৫ জন মিলে। আস্তে আস্তে খবর চলে গেলো শহরের অন্যান্য এলাকার বন্ধুদের কাছেও। আর যায় কোথায়? ফেসবুকে যেভাবে টুপ-টাপ এক-একটা নোটিফিকেশন আসতে থাকে, সেভাবে ওরা একজন-দুইজন করে উদয় হতে থাকলো। রাত দশটার সময় দেখা গেলো প্রায় ৪০ জনের বিশাল বহর জমে গেছে সাজুর গেমসের সামনে।
আবার টাকা তোলা হলো। দেশি মদ আনা হলো। চিপস-চানাচুর কেনা হলো। কয়েকটা ভার্জিন-কোলা নেয়া হলো। বোতলগুলো হাতে-হাতে ঘুরে বেড়ালো নিয়মতান্ত্রিকভাবে। তবে খুব বেশি সময় লাগলো না সবগুলো শেষ হতে। অল্পবয়সী ছেলেরা আসলে খুব দ্রুত মদ গিলতে পারে। মাতালও হতে পারে দ্রুত। আমরা বারবার মাতাল হয়ে পড়ছিলাম। অস্থিরচিত্তকে কি দিয়ে যে শান্ত করি, তা বুঝতে পারছিলাম না কেউই।
সূত্রাপুরের শুভ্র বুদ্ধি দিলো এসপি ব্রীজে যাবার জন্য। সাজুর গেমস্ থেকে হাঁটা পথের দুরত্ব। তাও দৌড়ে পার হলাম সবাই মিলে। আমাদের এই মাতাল দৌড়ে প্রতিবারই কোনো না কোনো কাণ্ড ঘটতো। একবার এমন দৌড়ের ভেতর লাথি দিযে একটা ভেসপা সাইকেলকে ড্রেনের ভেতর ফেলে দিয়েছিলাম। সেদিন অবশ্য অমন কিছু ঘটাই নি। কেবল চিৎকার করতে করতে দৌড়ুনো ছাড়া। সেদিন কেউ কেউ উসাইন বোল্টের মতো দৌড়াচ্ছিলো, কেউ কেউ মিঃ বিনের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিলো; যার যা ইচ্ছে করছিলো। এমনকি কে যে কি করছিলো, সেদিকে তার নিজের বা অন্য কারো খেয়ালও ছিলো না। খেয়াল ছিলো পথের ধারের অন্য সব ক'টি প্রাণীর।
এসপি ব্রীজে পৌছে শুরু হয়ে গেলো সঙ্গীত সম্মেলন। গানের নামে আর্ত চিৎকার। তোমার জঙলা পাড়ের ঢাকেশ্বরী শাড়ি কিংবা লাল ফিতে সাদা মোজা কিংবা টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইন। ফাঁকে ফাঁকে চলছিলো ভুল লিরিকে ভুল সুরে হিন্দি, ইংরেজি, আরবী নানা ভাষার গান গাওয়ার দুশ্চেষ্টা। এসপি সাহেবের বাসাটা ব্রীজ থেকে আধা কিলোমিটার তফাতে ছিলো। তারপরেও তিনি ঘুম থেকে উঠে সদলবলে চলে এসেছিলেন। এসে বলে গেলেন; বাবারা অনেক রাত হয়েছে, এবার আপনারা ঘুমুতে যান। আমরা তাকে শুনিয়ে জোরে জোরে গাওয়া শুরু করলাম, সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে?
হৈ-হুল্লোড়ের তোড়ে টান পড়লো রাত ১২টা বাজার পর। আস্তে আস্তে মেলা ভাঙলো। ইমন কিছুক্ষণ কাই-কুই করলো তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে হেঁটে হেঁটে তাকে বাসায় দিয়ে আসলাম। আমাদের মহল্লার ৮-১০ জন ছিলাম। শেষতক রয়ে গেলাম আমি আর অভি শুধু।
মফস্বল শহরে ঈদের রাতেও ১২টা অনেক রাত। তার উপরে যদি আবাসিক এলাকা হয় তাহলে তো কথাই নাই। সুনসান গলি ধরে হাঁটছিলাম দুই বন্ধু। নীরবতাটা অভিই ভাঙলো।
চল দোস্ত লাস্ট বিড়িটা ধরায় ফেলি।
-আমার কাছে আছে।
ধরা ধরা।
-দাঁড়া এক সেকেন্ড।
সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে রাস্তার পাশের ড্রেনে জিপার খুলে হালকা হতে শুরু করলাম। অভিও জামাতের সঙ্গে হালকা হওয়ার কাজে যোগ দিলো। বেশ মাদকতাপূর্ণ একটা পরিবেশ ছিলো। দুই মদ্যপ, ঠান্ডা রাত, নির্জন গলি, জলন্ত সিগারেট, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে পেশাব করা- অল্প বয়সী ছেলেদেরকে আমি পছন্দ করি মূলত এসব কারণেই। বয়স বেশি হয়ে গেলে এতগুলো চমৎকার শট এক খেলায় নেয়া কখনোই সম্ভব না।
দুই জনের বাসা মহল্লার দুই প্রান্তে। আমারটাই আগে পড়ে। অভিকে বিদায় দিয়ে আমি বাড়ির গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। অভি ওর বাড়ির দিকে চলে গেলো। আমি যথারীতি কলিং বেলটা টিপে সটান দাঁড়িয়ে পড়লাম। এখুনি মা ওপর থেকে জানতে চাইবে, কে?
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে খানিকটা ঝিমুনি চলে এসেছিলো। সেখান থেকে ঝাকি খেয়ে চেতন ফিরে পেলাম। অন্তত মিনিট পাঁচেক পেরিয়ে গেছে। এখনও কেউ সাড়া দেয় নি। তখনকার দিনে মানুষের চিন্তা বা দুশ্চিন্তার বহর খুব বেশি প্রশস্ত ছিলো না। আজকাল দরজায় কলিং বেল দেয়ার পর একটু দেরি হলেই নানারকম দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়। ভেতরে সবাই ঠিক আছে তো? কোনো ঝামেলা হয় নি তো? কিন্তু তখন সেই রাতে আমার মাথায় প্রথম চিন্তাটা আসলো, বোধহয় আজকে আম্মু ঘরে ঢুকতে দেবে না।
ঘটলোও তাই। আরো দু'বার বেল বাজালাম। খানিকটা অসহিষ্ণু ভাব করেই। আম্মু বারান্দায় এসে ঝাঝালো গলায় জানিয়ে গেলো; যে চুলা থেকে এসেছিস, সেখানেই ফিরে যা। তোর বাপ গেট খুলতে না করে দিয়েছে।
শুনে আমার খুব অভিমানই হয়েছিলো মনে হয়। তাই এক মূহুর্তও আর দাঁড়ালাম না সেখানে। একটু পরে নাকি আব্বু নিজেই এসে গেট খুলেছিলেন। কিন্তু আমি ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছি। অভিমান না হয়ে যদি, অন্য যেকোন কিছু হতো; তাহলে মনে হয় আরো কিছুটা সময় আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
রাস্তায় ফিরে এসে চিন্তা পড়ে গেলাম, কি করবো? উত্তুরে শীতের রাত। যদিও সেদিন ঠান্ডাটা একটু কমই ছিলো। তারপরেও একেবারে ছিলো না যে, তা না। দ্রুত পায়ে অভিদের বাসার দিকেই হাঁটা দিলাম। জিগরি দোস্তদের মধ্যে ওই ছিলো সেইজন, যাকে তখন রিচ করাটা ছিলো সবচে' সহজ।
ওর বাসার সামনে দৌড়ে পৌঁছুলাম। দেখি সেও কলিং বেল টেপার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দূর থেকেই শীস দিলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে কলিং বেলের সামনে থেকে হাত গুটিয়ে নিলো সে। আমি স্পষ্টই সবকিছু দেখতে পেলাম। ওকে গিয়ে বললাম, আমাকে বাসায় ঢুকতে দেয় নাই। ও বললো, আমাকেও ঢুকতে দিচ্ছে না। কয়েকবার বেল টিপেছি, কোনো সাড়া-শব্দ নেই।
-চল আজকে তাহলে আর বাসায় না যাই।
চল। কিন্তু সারারাত কি করবো?
-দেখা যাক কি করা যায়।
হ সেটাই সর্বোত্তম। দেখা যাক কি করা যায়।
মফস্বল শহরের একমাত্র যে জায়গাটি রাতের নিস্তব্ধতাতেও জেগে থাকে, সেটি হচ্ছে বাসস্ট্যান্ড। সারারাত দুরপাল্লার বাসের আসা-যাওয়া লেগে থাকার কারণেই হয়তো জায়গাটি জেগে থাকে। মানুষের পদচারণা, চায়ের কাপের টুং-টাং, বড় বাসের বড় হর্ণ; রাতে যেনো শতগুণ বৃদ্ধি পেয়ে কানে এসে ধাক্কা দেয়। আমরা শহরের সবচেয়ে বড় বাসস্ট্যান্ডটিতে গিয়ে পৌঁছুলাম। পকেটে টাকা-পয়সা যা ছিলো, তা দিয়ে সারলাম পেটপুজো। বেশি কিছু অবশ্য না। পরোটা আর ডাল। সে সময় পরোটার দাম ছিলো দুই টাকা আর ডাল ছিলো ফ্রি। ব্যপক আয়েশ করে আমরা দু'জন রাতের খাবারের পালা চুকোলাম। হোটেল থেকে বের হতেই দেখি পানের দোকান। দু'টো শাহী পান মুখে ফেলে চিবুতে চিবুতে দু'জনে দু'টো গোল্ড লীফ ধরালাম। সিগারেটগুলোও ওই পানের দোকান থেকেই কেনা হয়েছিলো। মিষ্টি জর্দা দেয়া পানের রসে একসময় মুখ-গলা ভরে আসলো। তখন আরামে আমার চোখ বারবার বুজে আসছিলো। অভিরও চলছিলো একই দশা।
আমরা বাসস্ট্যান্ডের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে আমাদেরই বয়সী একটি মেয়ের দেখা পেলাম। সে সম্ভবত কোনো বাসের যাত্রী ছিলো। আমরা হাঁটছিলাম এমনিই, এমনকি ওর কাছাকাছিও যাই নি; দূর থেকে সে আমাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, এক্সকিউজ মী।
আমি আর অভি খুব অবাক হলাম। একটি আপাদমস্তক মেয়ে, চেনা নাই-জানা নাই, হুট করে আমাদেরকে কেন 'এক্সকিউজ মী' বলে? দু'জনে একসঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে মেয়েটির দিকে তাকালাম। সে একটা ইতস্তত ধরনের হাসি দিলো এবং বড় আকারের একটা লাগেজ দেখিয়ে বললো, একটু ব্যাগটা ধরতে সাহায্য করবে?
আমরা দু'জনে সম্মত ছিলাম। ব্যাগটা বস্তুত আড়াই মন ওজনের অশুভ একটা পদার্থ ছিলো। তিনজনে মিলে সেটাকে ধরে ধরে এসআর ট্রাভেলস নামের একটা বাসের কাউন্টার পর্যন্ত নিয়ে আসতে কাল ঘাম ছুটে যাচ্ছিলো আমাদের। কোনমতে কাউন্টারে এনে সেটা ফেলার পর তিনজনই তিনটা সিট দেখে বসে পড়লাম এবং মিনিট তিনেক কোনো কথা না বলে হাপালাম।
নীরবতা ভাঙলো কাউন্টারে বসা লোকটা। জানতে চাইলো, আপনাদের পরিচয়?
মেয়েটিই উত্তর দিলো। আমার সকালের বাসের টিকেট আছে। কুড়িগ্রাম যাবো।
আমি আর অভি বুঝতে পারছিলাম না, সকালে বাসের টিকেট থাকলে এখন এই রাত দুইটায় এই মেয়েটা বাসস্ট্যান্ডে এসেছে কেন? তাও আবার আড়াইমুনি এক বস্তা নিয়ে!
খুব আস্তে আস্তে, প্রায় ফিসফিসিয়ে, যাতে কাউন্টারম্যান একদমই শুনতে না পায় সেইভাবে; মেয়েটির কাছে প্রশ্নটার উত্তর জানতে চাইলাম।
মেয়েটি অবশ্য ফিসফিসানির ধার ধারলো না। প্রথমেই গোটা পঞ্চাশেক গালির বগিসমেত একটা মেল-ট্রেন সে পাঠিয়ে দিলো তার মামাদের উদ্দেশ্যে। তার মূর্খ মামারা নাকি তাকে বলেছেন, ঢাকা থেকে আমাদের মফস্বল শহরে বাসে করে আসতে সারারাত লাগে। সেই হিসাব করে তাকে টিকেটও কেটে দিয়েছে ওরা। আর এদিকে ঢাকার বাস রাত দুইটায় অচেনা এ শহরে ওকে নামিয়ে চম্পট দিয়েছে। পথে যে একটা যাত্রাবিরতি আছে, সেটা ও জানতো। কিন্তু মূর্খ মামারা বলেছিলো, সেটা সকালবেলা এবং এক বাস থেকে নেমে শুধু আরেক বাসে ওঠা- এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর এখন দেখা যাচ্ছে, মোটেই তার মামাদের কথা ঠিক হয় নি। মধ্যরাতে মেয়েটিকে পড়তে হয়েছে দুর্যোগের মধ্যে।
কথাগুলো শুনে আমরা যত না অবাক হয়েছিলাম, তারচে' বেশি অবাক হয়েছিলো কাউন্টারম্যান। গোল গোল চোখে আপাদমস্তক মাপার চেষ্টা করছিলো মেয়েটিকে আর আমাদেরকে। টের পেয়েই অভি স্থানীয় ভাষায় হুংকার করে কাউন্টারম্যানকে তার কাউন্টারে মাথা ঢুকিয়ে বসে থাকার নির্দেশ দিলো। আমরা স্থানীয় ছেলে টের পেয়ে কাউন্টারম্যানটাও কেমন যেন চুপসে গেলো।
মেয়েটি অবশ্য অভির হুংকারের অর্ধেক বুঝলো, অর্ধেক বুঝলো না। আমার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, আমাদেরকে অন্য কোনো জেলার আগন্তুক ভেবে সে নানাবিধ কু-ভাবনা মনে প্রশ্রয় দেয়ার চেষ্টা করছিলো। অভি ধমকে সেসব ভাবনাগুলো হটিয়ে দিয়েছে।
মেয়েটি ভ্র-উচিয়ে সপ্রশংস একটি এক্সপ্রেশন দিলো। বিজ্ঞের মতো মাথা উপর-নিচ করতে করতে বললো, তা অবশ্য ঠিকই করেছো অভি। আমি নিজেও খুব ভয় পেয়েছিলাম যখন ঢাকার বাসটা আমার লাগেজটা মাটিতে ফেলে কোনো কথা না বলে চলে গেলো। এতরাতে একা এই বাসস্ট্যান্ডে কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।
প্রসঙ্গত গল্পটা একটু মান্ধাতা আমলের। তখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন নামক বস্তুটির চল শুরু হয় নি। বড় আকৃতির এক ধরনের মোবাইল ফোন পাওয়া যেতো। যেগুলো পকেটে ঢুকতো না। সেগুলোর দামও অনেক বেশি ছিলো। আমাদের মহল্লার বন্ধু প্যাদার দুলাভাইয়ের অমন একটা মোবাইল ছিলো। সেটা নাকি উনি বিরানব্বুই হাজার টাকায় কিনেছিলেন। সে সময় মূলত ল্যান্ডফোনের যুগ ছিলো। আমাদের বাসাতেও একটা ল্যান্ডফোন ছিলো। আব্বু সেটার এনডব্লিউডি কল সবসময় লক করে রাখতেন, যাতে আমি চিটাগাংয়ে থাকা আমার কিছু জিগরি দোস্তের সঙ্গে কথা বলে ফোনের বিল না বাড়িয়ে তুলতে পারি।
মেয়েটি অবশ্য একটু পরপরই বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে উঠছিলো। আমাদেরও কথার উত্তর দেয়ায় কোনো আপত্তি ছিলো না। এরই মধ্যে মেয়েটি হঠাৎ জানতে চাইলো, আশপাশে কোথাও চা পাওয়া যাবে কিনা?- ওর ধারণা আড্ডাটা তাহলে আরো জমে উঠবে।
এই কথা শুনে আমরা দু'জনে ইতস্তত করা শুরু করে দিলাম। কারণ আমাদের কাছে টাকা নেই। যা আছে তা দিয়ে তিনজনের চা হওয়ার কথা না। তখন কলেজে পড়ি। হাতে কতই বা আর টাকা থাকে? তারপরেও সন্ধ্যা থেকে উড়নচণ্ডী মোডে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
কিন্তু অভিটা সবসময়ই খানিকটা নিরেট। তাই বলে উঠলো সাতমাথার ওইদিকেই চায়ের দোকান খোলা আছে। সেদ্ধ ডিমও নাকি পাওয়া যাবে।
শুনে আমার পিত্তি জ্বলে উঠলো দপ করে। সেদ্ধ ডিম পাওয়া যাবে নাকি যাবে না সেটি কি মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছে? আগ বাড়িয়ে কথা বলার দরকার কি? কথাগুলো চললো মাথার ভেতরে। অভি কিংবা মেয়েটি সেসব শুনতে পেল না। শুনতে পেল, আমি কাউন্টারম্যানকে স্থানীয় ভাষায় জানতে চাইছি, সে ব্যাগটার দায়িত্ব নিতে রাজি কিনা। ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছিল আশপাশের কোনো গ্রামের মাদ্রাসাগামী কিশোর হবে হয়তো। কিংবা চাষীর ঘরের ছেলে। ধান কাটার মৌসুম পেরিয়ে যাবার পর হাতে কটা মাস খালি সময় পেয়েছে বলে একটা সাইড জব নিয়েছে। এসআর বাসের কাউন্টারে রাতে ডিউটি দেয়া। বাসস্ট্যান্ডে সারারাত দুরপাল্লার বাসের চলাচল লেগেই থাকে। এ ধরনের কাজগুলো স্থানীয় কিশোরদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে যারা নিম্ন কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত কিন্তু বখাটেপনা না করে কিছু করার চেষ্টা করে তাদের মধ্যে।
আমার কথা সত্য প্রমাণ করে ছেলেটি সরল গলায় জবাব দিল, কোনো অসুবিধা নাই ভাইয়া। আমি আছি সারারাত। সকাল আটটা পর্যন্ত ডিউটি।
মেয়েটির ব্যাগের একটা হিল্লে হয়ে যাওয়াতে আমরা কাউন্টার থেকে বের হয়ে সাতমাথার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। সপ্তপদী মার্কেটের সামনে আসতেই চায়ের দোকানের দেখা মিললো। গরম দুধের চা। দুধ জ্বাল দেয়া হচ্ছে পেল্লায় কেতলিতে। সেখান থেকে ডালের হাতার মতো স্টিলের একটি চামচ দিয়ে দুধ উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে কাপে। তারপর দেয়া হচ্ছে খানিকটা কড়কড়ে লিকার। সাথে চিনি। দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে। অভি বললো দোস্ত ভেতরে মেরিনা সিনেমা হলের সামনে একটা দোকান আছে মালাই চা পাওয়া যায়। ওইখানে যাই চল।
আমি সপ্তপদী মার্কেটের সামনেই চা খেতে চাইছিলাম কিন্তু মেয়েটিরও দেখলাম ঘোরাঘুরির দিকে বেশি ইচ্ছে। সে বললো, মালাই চা! কোনোদিন খাই নি। ওয়াও কি মজা!
শুনে আর কি করার, হাসিমুখে সায় দিলাম। যদিও ভেতরে ভেতরে অভিটার ওপর খুব রাগ লাগছিল। মেয়েটির সাথে তোর অতো কি? হতচ্ছাড়া যাচ্ছিলি তো বাসায় ঢুকেই। শুধু আমি না পেছন থেকে ডাক দিলাম দেখে আজ এই সব কিছু পেলি। এক নারী পেয়ে সব ভুলে গেলি? ছ্যাহ ছ্যাহ ছ্যাহ...।
এইবার মনে হয় একটু সজোরেই চিন্তা-ভাবনা করছিলাম আমি। আর নিজের ভেতর হারিয়েও গিয়েছিলাম খানিকটা। সম্বিত ফিরলো মেয়েটির ঝাকুনি খেয়ে। কি রবিন মিলফোর্ড? তুমি কি সবসময় এমনই চুপচাপ?





কিন্তু অভিটা সবসময়ই খানিকটা নিরেট। তাই বলে উঠলো সাতমাথার ওইদিকেই চায়ের দোকান খোলা আছে। সেদ্ধ ডিমও নাকি পাওয়া যাবে।
শুনে আমার পিত্তি জ্বলে উঠলো দপ করে। সেদ্ধ ডিম পাওয়া যাবে নাকি যাবে না সেটি কি মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছে? আগ বাড়িয়ে কথা বলার দরকার কি? কথাগুলো চললো মাথার ভেতরে। অভি কিংবা মেয়েটি সেসব শুনতে পেল না। শুনতে পেল, আমি কাউন্টারম্যানকে স্থানীয় ভাষায় জানতে চাইছি, সে ব্যাগটার দায়িত্ব নিতে রাজি কিনা। ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছিল আশপাশের কোনো গ্রামের মাদ্রাসাগামী কিশোর হবে হয়তো। কিংবা চাষীর ঘরের ছেলে। ধান কাটার মৌসুম পেরিয়ে যাবার পর হাতে কটা মাস খালি সময় পেয়েছে বলে একটা সাইড জব নিয়েছে। এসআর বাসের কাউন্টারে রাতে ডিউটি দেয়া। বাসস্ট্যান্ডে সারারাত দুরপাল্লার বাসের চলাচল লেগেই থাকে। এ ধরনের কাজগুলো স্থানীয় কিশোরদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে যারা নিম্ন কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত কিন্তু বখাটেপনা না করে কিছু করার চেষ্টা করে তাদের মধ্যে।
আমার কথা সত্য প্রমাণ করে ছেলেটি সরল গলায় জবাব দিল, কোনো অসুবিধা নাই ভাইয়া। আমি আছি সারারাত। সকাল আটটা পর্যন্ত ডিউটি।
মেয়েটির ব্যাগের একটা হিল্লে হয়ে যাওয়াতে আমরা কাউন্টার থেকে বের হয়ে সাতমাথার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। সপ্তপদী মার্কেটের সামনে আসতেই চায়ের দোকানের দেখা মিললো। গরম দুধের চা। দুধ জ্বাল দেয়া হচ্ছে পেল্লায় কেতলিতে। সেখান থেকে ডালের হাতার মতো স্টিলের একটি চামচ দিয়ে দুধ উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে কাপে। তারপর দেয়া হচ্ছে খানিকটা কড়কড়ে লিকার। সাথে চিনি। দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে। অভি বললো দোস্ত ভেতরে মেরিনা সিনেমা হলের সামনে একটা দোকান আছে মালাই চা পাওয়া যায়। ওইখানে যাই চল।
আমি সপ্তপদী মার্কেটের সামনেই চা খেতে চাইছিলাম কিন্তু মেয়েটিরও দেখলাম ঘোরাঘুরির দিকে বেশি ইচ্ছে। সে বললো, মালাই চা! কোনোদিন খাই নি। ওয়াও কি মজা!
শুনে আর কি করার, হাসিমুখে সায় দিলাম। যদিও ভেতরে ভেতরে অভিটার ওপর খুব রাগ লাগছিল। মেয়েটির সাথে তোর অতো কি? হতচ্ছাড়া যাচ্ছিলি তো বাসায় ঢুকেই। শুধু আমি না পেছন থেকে ডাক দিলাম দেখে আজ এই সব কিছু পেলি। এক নারী পেয়ে সব ভুলে গেলি? ছ্যাহ ছ্যাহ ছ্যাহ...।
এইবার মনে হয় একটু সজোরেই চিন্তা-ভাবনা করছিলাম আমি। আর নিজের ভেতর হারিয়েও গিয়েছিলাম খানিকটা। সম্বিত ফিরলো মেয়েটির ঝাকুনি খেয়ে। কি রবিন মিলফোর্ড? তুমি কি সবসময় এমনই চুপচাপ?
মন্তব্য করুন