ইউজার লগইন

এই প্রশ্নটা প্রশ্ন হিসাবে কেমন?

১.
দেশে একটা সংকটকাল উপস্থিত হয়েছে। চাপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, রংপুর, ঠাকুরগাও, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ৩ পুলিশসহ ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে 'দেইল্যা রাজাকার'কে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর এসব সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ জামায়াত-শিবির-রাজাকার গোষ্ঠীকে ঠেকাবার সর্বোচ্চ চেষ্টাটা চালাচ্ছে এবং বিজিবি তাদের সহযোগিতায় কাজ করছে।

লক্ষণীয় যে, ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে কাদের মোল্রার যাবজ্জীবন রায় ঘোষণার পর দেশের আপামর জনতা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ৫ তারিখ সন্ধ্যার পরের অংশটুকু বাদ দিলে এ আন্দোলনের বয়স ২৩ দিন। আর ওই আগুন লাগানো সন্ধ্যাটিকে ধরে হিসাব করলে ২৪। এতগুলো দিন আমরা কাদের মোল্লাসহ সব রাজাকারের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি, কিন্তু একজন মানুষকেও কুটোর আঁচ পেতে দিই নি। আর আজ দুপুরে ওদের নেতার রায় ঘোষণার পর এখনো একবেলা পুরোপুরি পার হতে পারে নি। তার আগেই মারা যেতে হয়েছে ৪৩টি মানুষকে। এদের অনেকেই আবার ওদেরই দলের সদস্য।

এই আত্মঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে যাবার নেপথ্যের আরেকটি কুরুচিপূর্ণ কারণ হচ্ছে, এতে জামায়াত-শিবিরের নেতাদের কাউকে মরতে হচ্ছে না। কোনো কেন্দ্রীয় নেতা কোথাও মরছে বলে জানা যাচ্ছে না। মরছে তাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মী, মরছে দেশের সাধারণ মানুষ।

তার মানে; আমাদের অহিংস আন্দোলনকে যারা হিংসার লাল রঙে রাঙিয়ে দিতে চায়, তারা নিজেরা মরতে ভয় পায়। অথচ আমরা যারা অহিংসতার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই দেশের প্রতিটি ভালো ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষের কাছে, তারা কেউ মরতে ভয় পাই না। আমরা অহিংস ও প্রাণহরণ না করে ২৪ দিন আন্দোলন করে বিজয়ী হই; ওরা ১ বেলায় ৪৩ জনের প্রাণ নিয়ে কয়দিন আন্দোলন করতে পারে আর আমাদের বিরুদ্ধে কি বিজয় অর্জন করতে পারে; সেটা এখন দেখার বিষয়।

আগামীকাল সবাই দুপুরে জুম্মার নামাজ পড়তে মসজিদে যাবেন। যারা নামাজ পড়েন না, তারাও মসজিদের আশপাশে হাজির হবেন। মহান একাত্তরের সকল শহীদের স্মরণে মসজিদে মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। এ কর্মসূচিকে আমরা সফল করবো। মসজিদ থেকে কোনো অন্যায়, কোনো দাঙ্গা ছড়িয়ে দিতে দেবো না কোনো অপশক্তিকে। কোনো ঘৃণ্য চক্রকে। এরপর চলে আসবেন প্লীজ, প্রজন্ম চত্বরে। একটা হিরন্ময় সমাবেশ উপহার দিতে হবে জাতিকে। যুদ্ধে কিভাবে অংশ নিতে হবে, তাও এখন আমাদের সবার কাছে সুস্পষ্ট।
২.
আজকের দিনটা ছিলো অদ্ভুত। গণজাগরণ সংস্কৃতি মঞ্চ গড়ে উঠতে দেখলাম নিজের চোখের সামনে। টানা দুইদিন পরিশ্রম করে ছেলেপিলে মঞ্চটি গড়ে তুললো। বড় ভাইরা অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। কাজ করেছে ফ্রন্টিয়াররা। ২৮ টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে গড়ে তোলা এ মঞ্চটি ভবিষ্যতে দেশের শিল্প-সাহিত্যের কাণ্ডারী হয়ে উঠবে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দিয়েছিলো অনেক কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, বিদেশী বন্ধু। প্রজন্ম চত্বরও আমাদের জন্য তেমন অনেক সূর্যসন্তান তৈরি করছে।

একটা মজার বিষয় হলো, পাবলিক লাইব্রেরীর গেটের পাশে 'মুক্তিযোদ্ধা-জনতা মঞ্চ' এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মনিটরিং সেলের পাশে 'আমরা একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা' নামে মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়া যোদ্ধারা দু'টি তাঁবু গেড়েছেন। তারা নিয়মিত তাঁবুগুলো চালাচ্ছেনও। কিন্তু তাদের তাঁবুগুলোতে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার পরে থেকে শুরু হয় বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। এছাড়া আর কিছু নেই তাদের কর্মসূচিতে। সেই তুলনায় তরুণদের প্রতিটি সংগঠনের কর্মসূচিতে আছে অনেক বেশি অভিনবত্বের ছোঁয়া এবং প্রতিদিন নতুন কিছু না কিছু করার তাগিদ।

সেক্টর ১৩ প্রতিদিন শাহবাগ থানার সামনে একটা একটা নতুন লাইন লিখে রাস্তার উপরে। ওরাই ব্লগার রাজীব মারা যাবার পর লিখেছিলো ৩০০০০০০+১। এরপরের লেখাগুলোও সুন্দর হয়েছে ওদের। এক্স ক্যাডেটস্ ফোরামের ব্যানারের নিচে একটা জটলা প্রতিদিন ঢোল নিয়ে হাজির হয়। চলতে থাকে ঘুরতে ঘুরতে স্লোগান। রেড ইন্ডিয়ান যোদ্ধাদের মতো লাগে ওদেরকে আমার।

৩.
আতংকের ডিপো একটা এটা। ঢাকা শহর। কোনো জনমানুষ নেই রাস্তায়। সবাই ঘরে ঢুকেছে গিয়ে। প্রজন্ম চত্বর শূন্য। রাত তখন মাত্র সাড়ে ১২টা।

পৌনে ২টায় প্রথম গুজবটা ছড়ালো। ক্যম্পাসের ভেতর দিয়ে নাকি দুই মাইক্রো হুজুর গেছে। প্রথম গিয়ে খবরটা দেয়া হলো চারুকলার সামনে দায়িত্বরত পুলিশদের কাছে। এরা সাধারণ জনতার চেয়েও অ্যামেচার। শুনে কে যে কি করবে সেটাই ঠিকঠাকমতো ঠিক করে উঠতে পারলো না। ফলে একজন বড়কর্তামতো লোক খুব ভাবগম্ভীরভাবে হেঁটে হেঁটে থানার দিকে চলে গেলেন আর অন্য সেপাইগুলো মোমের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।

এই পুলিশদের কাছে অভিযোগ করতে এসেছিলো আরো দুই-তিন জন। তাদের একজনের মেসেজ হচ্ছে, জগন্নাথ হলে নাকি শিবির এসেছে। সেটা সে পুলিশকে জানাচ্ছিলো। হঠাৎ অন্য দুইটা ছেলে জটলা থেকে বের হয়ে একটা রিকশা নিয়ে চানখারপুলের দিকে রওনা হলো। যাবার সময় চিৎকার করে জানিয়ে গেলো, ভাই আপনারা সবাই চানখারপুলের দিকে চলেন। ওইখানে শিবিরেরা জমা হচ্ছে। ওরা ক্যম্পাসে অ্যাটাক করবে।

এতক্ষণ যে ছেলেটা জগন্নাথ হলে অ্যাটাকের কথা বলছিলো, সেও দৌড়ে রিকশায় উঠলো। সে চলে যাবার পরই খেয়াল হলো, আরে এই ছেলেটি কে? একে তো কেউ চেনে না। সবাই সবার মুখের দিকে তাকালাম। না কেউ চেনে না। তাহলে? ধরো তাকে।

আবার সঙ্গে সঙ্গে ওই রিকশার পেছনে ছুট। তবে ওকে ধরে যেটা জানতে পারলাম, সে একজন অ্যাকটিভিস্ট। তার কাছে রিয়াল মেসেজ আছে জগন্নাথে অ্যাটাকের। ততক্ষণে সবাই জগন্নাথ হলের গেটে পৌঁছেও গেছি। সাইকেল আর রিকশা আলাপচারিতার সময়টুকুতে সমান্তরালে চলছিলো।

কিন্তু জগন্নাথ হলের সামনে গিয়ে যা দেখলাম, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। হলের সব ছেলে নিচে নেমে এসেছে। গেট ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সবাই সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ছেলেপিলের গেট বন্ধ করে দেয়া দেখে অনেক পুলিশ এসে জড়ো হয়েছিলো। সবমিলিয়ে এক বিশাল সমাবেশ।

পুরো হলে প্যানিক ছড়িয়ে গিয়েছিলো, হলে অ্যাটাক হবে। একজন আন্দোলনকারীকে নাকি হলে ফিরতে নিষেধ করা হয়েছে উপরমহল থেকে। তিনি খবরটা হলে জানিয়ে দিয়েছেন কিংবা খবরটা চেপে রাখতে পারেন নি, নিজের কাছে। যেকোন একটা কিছু ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু হলময় ছড়াতে খবরটা সময় নেয় নি এক মুহূর্তও।

তাড়াতাড়ি এলাকা থেকে সরে পড়লাম। জনারণ্যে এত সময় কাটানোর কোনো মানে হয় না। এবার রওনা হলাম চানখারপুলের দিকে। কি সমস্যা সেখানে এত? দেখেই আসার যাক। সোয়া দুইটায় চানখারপুল মোড় থেকে বকশী বাজার হয়ে পলাশী, রাস্তায় কোথাও কিচ্ছু নাই। সব সুনসান। চানখারপুল পেট্টল পাম্পের সামনে ছেলেরা দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে হল। পুলিশও পাশেই। যদিও পুলিশগুলো আসলে কতটুকু কাজে লাগবে, সে ব্যপারে সন্দেহ আছে। কিন্তু ছেলেগুলো কাজে লাগবে। নিশ্চিতভাবেই বোঝা গেলো।

বুয়েটের চিটাগাং ড্রাই ডকে তৈরি ফুটওভারব্রীজটার নিচে ডিউটি দিচ্ছেন ৩ জন সেপাই। তাদের সামনে দুইটা সাইকেল গিয়ে থামতে দেখে, তারা ভয়ই পেয়ে গেলো খানিকটা। চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। তাদেরকে পুরো সতর্ক থাকার পরামর্শ বিলি করলাম। তারপর এগিয়ে গেলাম পলাশীর দিকে।

৪.
প্যানিকড্ হওয়ার, চিন্তিত হওয়ার, পরাজিত হওয়ার কোনো কারণ নাই। শেষটা হওয়ার সুযোগও নাই আসলে। প্রতিটি মানুষকে আজ-কাল-পরশুর মধ্যেই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যেতে হবে। এটাই গন্তব্য। তাহলে আজই কেন নয়?
---

পোস্টটি ২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!