দ্রুতগতিতে চলছে জীবন
"ও ছোটপাখি ছোটপাখি সর্বনাশ হয়ে গেছে
পৃথিবীর পরে আর
তোমার-আমার
ভালোবাসার কেউ নেই, কিছু নেই।
ও ছোটপাখি ছোটপাখি
ভাংচুর হয়ে গেছে
শিশুদের খেলনায়, আমাদের দোলনায়, ডাকবাক্সের ঢাকনায়
রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে আলো নেই।
ও প্রেমপাখি প্রেমপাখি
গানটা হেরে গেছে, নদীটা ফিরে গেছে, পাহাড়টা সরে গেছে, সাগরটা মরে গেছে
আদিবাসী শামুকের কোনো ঘর নেই।
ও নেই নেই কিছু নেই
রাস্তার বাম নেই, শ্রমিকের ঘাম নেই, টাকাদের দাম নেই, চিঠিটার খাম নেই
আমাদের কারো কোনো নাম নেই।
ও ছোটপাখি ছোটপাখি সর্বনাশ হয়ে গেছে
পৃথিবীর পরে আর
তোমার-আমার
ভালোবাসার কেউ নেই, কিছু নেই।"
২০০৪-০৫ সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি খুব বেশি দিন হয় নি। প্রাইভেট টিউটর বা পত্রিকার ইউনিভার্সিটি রিপোর্টার জাতের কিছু হয়ে ওঠার তাগিদ তখনো মনের ভেতর ঢোকার পথ খুজেঁ পায় নি। ইন ফ্যাক্ট, স্কুল-কলেজের বন্ধু-বান্ধবদের তখনো নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে রাখতে ভালো লাগতো। ক্যম্পাসে, ডিপার্টমেন্টের ক্লাসে- কোথাও খুব বেশি মন বসতো না। কিন্তু ক্যম্পাসে গেলে একটা জিনিস ঠিকই টের পেতাম, সেখানে আমার একটা নোঙর পোঁতা আছে। কোথাও না কোথাও।
সে সময় মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় টিএসসি'তে গিয়ে বসতাম। ছাত্র ইউনিয়নের বড় ভাই-বন্ধুদের সঙ্গে। প্রথমদিকে মাঝে মাঝে যাতায়াত দিয়ে শুরু। অল্পদিনের ভেতর সেটা নিয়মিত কর্মকাণ্ডে রূপান্তরিত হলো। জানতাম না কিছুই। মার্কস-লেনিন-মাও সে তুঙের নামই শুধু শুনেছি। মঈন হোসেন রাজু নামের যে ছাত্র ইউনিয়ন নেতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে রাজু ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে, তাকে চিনতাম না মোটেও।
তারপরও কটর কটর করে বড় ভাইদের সঙ্গে সারাদিন তর্কে লিপ্ত হয়ে থাকতে খারাপ লাগতো না একরত্তিও। তর্ক উঠাতাম ইচ্ছা করে। আর একবার শুরু হয়ে গেলেই, নিজে চুপ করে যেতাম। শুনতাম কাহিনী, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ। মধুর কেন্টিন কেড়ে নিতে শুরু করলো দিনের বেশিরভাগ সময়।
২০০৫ সালের ৩০ বা ৩১ মে, শাহবাগ মোড়ে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন হ্যাপী নামের একজন শিক্ষার্থী। আন্দোলন গড়ে উঠলো। ছাত্রদলের ছেলেপিলে বাম সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীসহ প্রতিবাদী সব শিক্ষার্থীর ওপর ঝাপিয়ে পড়লো। চোখের সামনে মার খেয়ে পড়ে যেতে দেখলাম ছাত্র ইউনিয়নে বড় ভাই-আপুদেরকে। মধুর কেন্টিনের ভেতর ঢুকে তাণ্ডব চালালো একদল।
এইসব নিয়েই কাটতো সময়। দিনগুলোর কথা আজকাল খুব বেশি করে মনে পড়ে। ক্লাস, পরীক্ষা, বন্ধু-বান্ধব, হিপোক্রেট, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয়া, অ্যাটেনডেন্স ঠিক-ঠাক রাখা ইত্যাদির মারপ্যাচে পড়ে জীবন অনেক রকম পথে হেঁটেছে।
২০০৭-এর ২০ আগস্ট, দীর্ঘ সেশনজট পেরিয়ে শুরু হয়েছিলো দ্বিতীয় বর্ষ সমাপনী পরীক্ষা। প্রথম পরীক্ষার দিনই, বিকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ থেকে শুরু হয়ে গেলো আন্দোলন। বিকালে যখন সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর সামনে চা খাচ্ছিলাম, তখন খবর পাচ্ছিলাম- এক এক করে ছাত্র মারা যাচ্ছে মিলিটারীর গুলিতে। খবর আসছিলো কখনো ধীরে, কখনো দ্রুতগতিতে। সন্ধ্যায় আসলো মিছিল।
২০১৩ সাল। ইতোমধ্যে পড়াশোনার পাট চুকেছে। চাকুরী-সংসার ইত্যাদিতে ব্যস্ত হয়ে 'সেই বুড়ো পুরোনো গিটার' তুলে রেখেছি আলমিরার ওপরে। কালো কাপড়ের ব্যাগে ভরে। কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরের ঠিক অগ্রভাগে টিভির স্ক্রলে কাদের মোল্লার রায় দেখে, মনটা বিষিয়ে উঠলো।
সরকারকে গালি দেবো, নাকি ট্রাইব্যুনালের বাপ-মা তুলবো বুঝতে পারছিলাম না। অথচ কাদের মোল্লা সম্পর্কেও যে আমার খুব জানাশোনা ছিলো, তাও না। এমনকি সে যে 'কসাই কাদের' সেটাও আমি জানতাম না। তারপরেও একটা রাজাকারের যুদ্ধাপরাধের রায় ফাঁসি ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে, কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। পার্কের একটা গুড়ের চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে দেখছিলাম, একদল ছেলে মশাল হাতে শাহবাগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেদিন রাত থেকে খবর পেতে শুরু করলাম, আবার নাকি সবাই মিলে জেগে উঠছে।
একদিন পর, অফিসে বসে কিসের যেন ড্রফট লিখছি। হঠাৎ টেলিভিশনের স্পীকার হয়ে কানে একটা স্লোগান এসে বাড়ি দিলো। জ্বালো জ্বালো জ্বালো রে জ্বালো। স্লোগানটার মধ্যে একটা দ্যোতনা ছিলো। শরীরের মধ্যে হঠাৎ করেই খানিকটা আগুন ধরে গেলো। সেই স্লোগানটি দিয়েছিলেন লাকী আক্তার।
প্রজন্ম চত্বর জীবনের শ্রেষ্ঠতর কিছু সময়কে সামনে এনে দিয়েছিলো। নিজেকে সত্যি সত্যি মুক্তিযোদ্ধা বলে ভাবতে শুরু করেছিলাম। আজো ভাবি। ভাবনায় পরিবর্তন আসে নি। প্রয়োজনে বন্দুক হাতে নতুন লড়াইয়ে নেমে যাবার জন্যও নিজেকে প্রস্তুত দাবি করতে দ্বিধা করি না।
এমনকি এদেশের জন্য মারা যেতেও একবিন্দু দ্বিধা করি না আমি। এখনো সে সুযোগ আসে নি। তাই অপেক্ষায় কাটছে সময়।
পোস্টের শুরুর গানটা সহজিয়া ব্যান্ডের রাজু ভাইয়ের গাওয়া। রাজু ভাই যখন গানটার কথা এক লাইন-দুই লাইন লিখছিলেন আর সুর করছিলেন, সেই ২০০৪-০৫ সালের সময়টা চোখের সামনে ভেসে ওঠে গানটা শুনলেই। টিএসসি'র সড়কদ্বীপে বসে কাটানো সন্ধ্যাগুলো, আড্ডায় আড্ডায় পার করা রাতগুলো এবং বড় ভাই-আপুদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির মাধ্যমে রিকশাভাড়া জোগাড় করে বাড়ি ফেরার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়।
দ্রুতগতিতে চলছে জীবন। আর দশটা দেশপ্রেমিকের মতো আমিও যেটাকে উৎসর্গ করেছি বাংলাদেশের নামে। দেখা যাক, সেটা কতদূর যায়।
---





গানটার লিংক দিতে পারবেন কোন?
পোস্টে ভাবনাদের অনেক কাটছাট করে লিখেছেন মনে হল।
গানটার লিংক আমি এর আগের জলে যায় জলের পোকা লেখাতে দিয়েছি
আর হ্যাঁ। ভাবনারা কাটছাট হয়ে গেছে। কেন কে জানে! গানটাতেও দেখেন, একই কথা- ছোটপাখি ছোটপাখি ভাংচুর হয়ে গেছে শিশুদের খেলনায়, আমাদের দোলনায়...
তরুণদের নিয়ে গর্ব বোধ করি এই জন্যই। তবে এইদেশ আমার। আমরাই থাকবো, ওরা থাকবে না। এটাই ফাইনাল।
দেখা যাক। আশায় আছি সবাই ।
ইদানীং ব্লগে কম দেখা যায় আপনাকে । আছেন কেমন ? সংসার নিয়ে ব্যস্ত হলেন ভালো কথা, সংসার শুরু হলো কবে ? কি আশয়-বিষয়?
অভিনন্দন!
অভিনন্দন
আরে দুর ! এই সংসার সেই সংসার না, অন্তত আমি তাই বিশ্বাস করি। আমাদের না জানিয়ে মীর কীসের সংসার করবে...
সে যাকগে, লেখা পড়ে অনেক কিছু মনে হলো... সবার আগে মনে হলো মীরতো পিচ্ছি পোলা... লাভ য়্যু...
লেখা সেরাম
মীর তো আসলেই পিচ্চি!!! ইয়ে মানে একটু বড় আর কি
দ্রুত কাটুক দুঃসময়। ভালো থাকেন।
ছাত্রজীবন! আহ, কত কিছু মনে পড়ে যায়!
সবাই পারে না, কেউ কেউ পারে। যারা পারে তাদের জন্য শুভকামনা!
অভিনন্দন!
onekdin pore apnar lekha porlam.. shomoi druto chole jai.. aamr jibon thekeo khub druto kichu shomoi chole geche haat er muthoi dhorte parini.mone prane chai onnai er bichar hok. shobai nai er sporsho pak...
মন্তব্য করুন