দখিনা নিঝুম বন্দরে বিলুপ্ত নীলের পূর্বপুরুষ উতলা নাওয়ের হাল ধরে
১.
রাজধানীর রাস্তাগুলো অসাধারণ। আর সংখ্যাতেও অনেক। একবার কোনো একটা রাস্তায় হারিয়ে যেতে পারলেই কেল্লা ফতে। হাজারো গলি আর লক্ষ অলিতে নিজেকে নিয়ে মিশে যাওয়াটা কঠিন নয় মোটেও। গভীর শীতের রাতে বিজয় সরণী-তেজগাঁও লিংক রোডের চূড়ায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরানো অনেক কঠিন তারচেয়ে।
দুপুরের কড়া রোদে যখন মানুষের সাথে সাথে মহল্লার দোকানী, দোকানের চাএর স্টোভ, উত্তরের বড় মোড়, মোড়ের বিলবোর্ড- সবাই এক তালে ঝিমায়; তখন আমার সাইকেলে চেপে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে ইচ্ছে করে।
চারপাশে ঝিমুতে থাকা প্রতিটি অনুষঙ্গকে দেখতে ইচ্ছে করে। হঠাৎ কোনো ব্যস্ততায় একা রাস্তাটায় ঝিমুনির জগৎ থেকে বের হয়ে আসা, অপরিচিত এক চোখ টানা সুন্দরীর প্রতি আকৃষ্ট হতে ইচ্ছে করে। তার ইস্ত্রি করা সোজা চুল, রুজ ঘষে লাল করা গাল, কমলা রঙয়ের লিপস্টিকে আঁকা ঠোঁট, শরীর আঁকড়ে থাকা কামিজ, হাঁটুর পর থেকে শেষ হয়ে যাবার হুমকি দিতে থাকা সালোয়ার বা গানের চরিত্র থেকে উঠে আসা নূপুর- সবই আমাকে আকর্ষণ করে। আমার কাছে ওই সব ক'টিকেই একেকটা আলাদা চরিত্র মনে হয়। সবগুলোর অভিনয়ে একটি সুন্দর সিনেমা দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা জন্মায়। সেই মেয়েটিই আমায় একদিন এক বিশাল মিথ্যে বলে দিয়েছিলো!
সেটিও একটি ঝিমুনি ধরা দুপুর ছিলো। আমি তখন কোনো এক নষ্ট শহরের একজন নাম না জানা মাস্তান ছিলাম। আর একদিন ভুল করে তাকে উদ্দেশ্য করে শীষ দিয়ে ফেলেছিলাম। ছুঁড়ে দিয়েছিলাম চিঠিরূপী একশ'টি তরতাজা গোলাপ। সেদিন সকালে আমি পাড়ার রকে বসে খিস্তি-খেউড় করে প্রচুর সংখ্যক রাজা-উজির মেরেছিলাম।
সে চিঠির উত্তর এলো- না। আমি জানি, সেই প্রেমের উপস্থাপন ভদ্র-সভ্য ছিলো না। সেই চিঠির ব্যকরণ ভুলে ভর্তি ছিলো, কেবল মেয়েটির নাম ছাড়া আর কিছুই শুদ্ধ করে লেখা ছিলো না। আমি স্বীকার করি, ঠিক যোগ্য ছিলাম না তার। তবে, প্রেম মিথ্যে ছিলো না আমার।
তারপর ইস্পাতসম এক সময় এসে সবকিছু গুঁড়িয়ে দিয়ে গেলো আর আমাকে মন, প্রাণ, পরিবার, প্রেম, চিন্তা, চেতনা সবকিছু সঁপে দিতে হলো। সেটা ছিলো এক বারুদ-জ্বলা সময়ের ঘানি। সে লড়াইয়ে আমি মরে গিয়েছিলাম, তবে আমরা হারি নি। আর কষ্ট তো সেবার আমাদের কাউকে কোনোকিছুতেই পেতে হয় নি।
সবচে' সুখের কথা হলো বিদায়ের আগে আমি জানতে পারি, ওই মেয়েটি আমায় মিথ্যে বলেছিলো। আমি তাকে বোঝার সময় পাই নি, তখন একটি যুদ্ধে যেতে হয়েছিলো।
মৃত্যুর সময় আমি সুখী ছিলাম। হয়তো প্রিয় সঞ্জীব চৌধুরীর মতোই একটি জীবন আমি কাটাতে চেয়েছিলাম।
২.
অনুপাত বিবেচনায় প্রতিটি মানুষ সমান। বেমক্কা একে অপরকে ভালোবেসে আমরা নিজেদের মধ্যে অসমান একটা ধারা গড়ে তুলি এবং কে কার সমান তা নিয়ে চিন্তা করি। অথচ সবাই কিন্তু আমরা একেকটা লাকি স্পার্ম।
সাধু শব্দটির একটি অর্থ সাঁসাঁধুধু। এর মানে হচ্ছে তাকালে সামনে সবকিছু ধুধু মনে হয়। কান পাতলে শুধু সবকিছু সাঁ সাঁ করে। আর মানুষ তার নিজের জীবন মাত্র ৩০ বছর যাপন করে।
কেননা, ঈশ্বর মানুষকে ৩০ বছরের জীবন দিয়ে জানতে চেয়েছিলো তুমি সুখী কিনা। মানুষ বলেছিলো আমি সুখী নই। আমার আরো বেশি চাই। ঈশ্বর কুকুরকে ৩০ বছর আয়ু দিয়ে জানতে চেয়েছিলো তুমি সুখী কিনা। কুকুর বলেছিলো আমি সুখী নই। আমার মাত্র ১০ বছর হলেই চলবে। বাকিটা চাই না। গাধাও তার বরাদ্দের ২০ বছর পরিত্যাগ করেছিলো। বরাদ্দের ২০ পরিত্যাগ করেছিলো বানরও। তাদের সবার বাড়তি বরাদ্দ যোগ হয়েছিলো মানুষের সঙ্গে। ৩০-এর পর থেকে সেগুলো যাপন করতে হয় তাকে। প্রথমে কাজের খোঁজে ঘুরতে হয় বিভিন্ন দুয়ারে, ঠিক কুকুরের মতো করেই। তারপর দুই কাঁধে দুই ভার নিয়ে ঘুরতে হয় সামাজিক আগাড় ও বাগাড়ে, গাধার ছাল পিঠে চড়িয়ে। সবশেষে সন্তান-সন্ততির সঙ্গে ঝুলে থাকার চেষ্টায় মানুষ তার বরাদ্দকৃত একটা সময়কাল অতিক্রম করে।
গল্পটা সত্যি কিনা কে জানে।
৩.
আর সবশেষে, কে যে কাকে ভালোবাসে তা বোঝার কার্যকর কি উপায়? মাঝে মাঝে মনে হয়, শুধু দিগন্তের অন্ধকারই ভালোবাসে আমাকে। আর সোনালী ধানের একরজোড়া মাঠের পল্লী বিদ্যুতের টাওয়ারগুলো। নির্দিষ্ট দুরত্ব পর পর তারা ভালোবাসার মাইলফলক বসিয়েছে। আমি গুণে যাই, ফিরে যাই শেকড়ে। স্বর্ণকেশি তুমি জীবন নেবে? বিনিময়ে কি দেবে আমায় বলো?
---





মন্তব্য করুন