প্রতারণার গল্প
১.
সেবার মৎস্যকন্যা আর আমি পুরো দক্ষিণ উপকূলটা চষেছিলাম একসাথে। মৎস্যকন্যা আমাকে ৭ দিন পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা করে সময় দিয়েছিলো। আমরা সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে সবচে' বেশি ঘুরেছিলাম। পানি ছেড়ে ডাঙায় উঠলে মেয়েটি দিব্যি আমাদের মতো মানুষ হয়ে যেতো। ওর পুরো শরীর রঙিন মখমলের পোশাকে ঢাকা থাকতো। আর গরম ধোঁয়া ওঠা চাএর ফ্লাস্ক মাঝে মাঝে আমাদের আনন্দ হাজার গুণ বাড়িয়ে দিতো। আমরা দু'জন অরণ্যের নিশ্ছিদ্র টুপ-টাপ শব্দের মধ্যে বসে ধূম্রশলাকা সহযোগে চা পান করতাম। ফেরার দিন অর্ধমানবী সাগরে হারিয়ে যাওয়ার আগে আমায় বলেছিলো, আবার নাকি দেখা হবে!
২.
কিন্তু মহানগরীর প্রতি প্রেম ধীরে ধীরে বাড়ছিলো আমার। কোনোদিন যদি আর মৎস্যকন্যার সঙ্গে দেখা নাও হয়, তাহলে কি হবে জানতাম না কিন্তু নিশ্চিত জানতাম যে, মহানগরীর সঙ্গে দেখা না হলে খুব-ভীষণ মন খারাপ হবে। তাই পাহাড়ের নির্লিপ্ততম কোণের নির্জন কুটির ছেড়ে ছুটে এসেছিলাম দূষিত শব্দের সাথে দূষিত পানি দিয়ে দূষিত বাতাস মেশাতে। ওই কুটিরের দিকে তর্জনী রেখে মৎস্যকন্যা জানতে চেয়েছিলো, থাকবে আমার সাথে এখানে?
৩.
ভেতরে কাজ করছিলো অতিথি পাখিদের ঝাঁকের সঙ্গে মিশে যাবার সাধ। তাদের ঝাঁকে মিশে সুদূর সাইবেরিয়া উড়ে যাবার সাধ। আমি ওখানকার বরফের শীতলতায় পথ হারাতে চাচ্ছিলাম। যাতে শীতকালে আর ফিরে আসতে না পারি। যাতে নিজের অপাঙক্তেয় অস্তিত্বটি দিয়ে আর কাউকে বিরক্ত করতে না পারি।
৪.
মৎস্যকন্যাকেও বলে দিয়েছিলাম, প্রিয় দূরে থেকো। নিজের মতো কাউকে খুঁজে নিও। আমাদের কোনোকিছু অফুরান নয়। ইচ্ছেরাও। অন্তত ওরা যদি অফুরন্ত হতো, তাহলে আমি একটা ইচ্ছে এমনি এমনি নষ্ট হতে দিতাম। নষ্ট হবে জেনেও মনের ভেতরে ইচ্ছেটাকে আমি খুব যত্নসহ লালন করতাম।
৫.
মহানগরী তীব্র বিদ্বেষ সহকারে আমায় উগরে দিলো এবং আমার আবার সেই উপকূলেই ঠাঁই হলো। মৎস্যকন্যার কথা মাঝে মাঝে ভাবতাম ঠিকই কিন্তু ওকে খুঁজতে যেতাম না। ওর সমানে দাঁড়ানোর মতো নির্লজ্জ আমি ছিলাম না। অথচ একদিন ঠিকই চেনা-জানা সুদূর থেকে কানে ভেসে এলো এক সুগভীর বেদনার সুর।
৬.
মৎস্যকন্যার হাতে হাত রেখে সেই যে জীবনের দুয়ার ছেড়ে বের হয়েছি, তারপর আর ফেরা হয় নি। জেনেছি মারা যাওয়া মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তাই জীবন ধারণের গ্লানিতে ভুগি এখন মাঝে মাঝেই। পুড়ি অকারণ সময় ক্ষেপণের আফসোসেও।
---





মন্তব্য করুন