যে
১.
দুপুরের দিকে মিডিয়াগুলোই নাটক পুরো জমিয়ে তুলেছিলো। একেকটা খবরের যা শিরোনাম, দেখলেই বার বার পিলে চমকাচ্ছিলো।
রাজধানী থমথমে, মানুষের মনে চাপা উতকণ্ঠা
মহানগরীর রাস্তা যেন ধু ধু মরুভূমি
নগরবাসী ভয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে খাটের কোণায়
রকমারী শিরোনাম। একেকটা রিপোর্টের ক্রেডিট লাইন চার-পাঁচজন করে রিপোর্টারের নাম। ভয় না লাগার কোনো রাস্তাই খোলা রাখে নি বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো। সাধারণ মানুষের জানের পানি এখন যায় কি তখন যায়। এমন অবস্থা!
এত শিরোনামের ভিড়ে আমার চোখে পড়লো দক্ষিণাঞ্চলের কোনো এক জেলায় এক জামাত নেতা মিছিলের সময় হার্ট এ্যাটাকে মারা গেছে। একটা শুয়োরের বাচ্চা মরেছে বলে প্রায় চিৎকারই দিয়ে দিতে হলো। কেননা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ আমি খুব কম সময়ই করতে পারি এবং আজকের মতো টেনসড্ সিচুয়েশনেই তো নয়ই।
সাইকেলে করে দুপুরে যখন রাজপথে টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন কেন যেন সারাটা শরীর জ্বলছিলো। কি হয়েছে বুঝতে পারলাম গ্যারেজে গিয়ে পৌঁছানোর পর। শরীরে নার্ভ উত্তেজক হরমোন এত বেশি পরিমাণে সচল ছিলো যে কোনোকিছু সহজভাবে নিতে পারছিলাম না। বাংলা মাসুম নামে একটা ছেলে আমাদের সঙ্গে এসে প্রায়ই বসতো-টসতো। বোকাচোঁদাদের মতো বসে থাকা আর বাঁশি টানা ছাড়া খুব বেশি কোনো কাজে ওর পার্টিসিপেশন পাওয়া যেতো না। আমাদের সার্কেলে পাতা মাসুম নামের আরেকটা ছেলে আছে। সেও প্রায় একই রকম। ভোন্দা ও ম্যান্দা। একটা কথা বললে এমনভাবে হা করে তাকিয়ে থাকে যেন কোন ভিনগ্রহের ভিন্নস্য ভিন্ন ভাষায় কি যে ভিন্নরকম এক কাজের ফরমায়েশ আমি পেড়ে ফেলেছি, সেটা মহাত্মন বুঝেই উঠতে পারছে না।
এধরনের ছেলেদের ক্ষেত্রে সাধারণত যেমনটা হয় বাংলা মাসুমের ব্যপারেও আমাদের মনোভাব ছিলো প্রায় সেরকম। ছেলেটা কি করে, কই থাকে, কি ভাবে- সেসব নিয়ে কারও আগ্রহ ছিলো না। আজ দুপুরে সে দুম করে ভরা মজলিশে বলে বসলো- সাঈদীকে ফাঁসি দেয়াটা উচিত হয় নাই।
সেদিন মেজাজের পারদ আগে থেকেই চড়ে ছিলো বিপদসীমায়। মাসুমের ওই কথাটায় বিস্ফোরণ ঘটে গেলো। ওর ঠিক কানের ওপর দুইটা রাম থাপ্পড় বসালাম। ঘটনা থেকে উৎপন্ন চটাশ-চটাশ শব্দ শুনে ঠিক যখনই ক্ষ্যান্ত হবো ভাবছি তখন শুনি সে যেন কি একটা যুক্তিতে মিনমিন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। থাপ্পড়গুলো খেতে খেতে বসার সিট ছেড়ে উঠে পড়তে হয়েছিলো বেচারাকে। চলে যেতে হয়েছিলো আমার হাতের নাগালের বেশ কিছুটা বাইরে। তবে পায়ের নাগালের মধ্যেই ছিলো। আমি আবারও মেজাজ হারালাম। এবার সজোরে লাত্থি হাঁকালাম ওর উদ্দেশ্যে। আর সঙ্গে ছিলো পৃথিবীর তীব্রতম গালিগুলোর একটা-
তোর মারে চুদি খানকির বাচ্চা দৌড়া নাইলে পাড়ায়া মাইরালামু
শুনে মাসুম আর কাল বিলম্ব করে নি। কিন্তু আমার মেজাজ খিচড়ে গেলো। তখন দুপুর কেবল দেড়টা বেজেছিলো।
২.
আমি সাধারণত নিরীহ ভাব ধরে থাকি। কারো সাতে-পাঁচে থাকি না বলে প্রচারও চালাই। যে কারণে কেউ সহজে মানতে চায় না যখন আমি হাত-পা চালাই। মনে করে বিষয়টা বুঝি কোনোপ্রকার হোক্স। আমার সাঙ্গপাঙ্গরা মাসুমের এ হাল দেখে প্রথমে সেটাই মনে করেছিলো। কিন্তু এ ধরনের মাত্রাতিরিক্ত তামাশা আমার দ্বারা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে তারা আবার নিজ নিজ কাজে মনোযোগী হলো। আমিও বেশি কথায় না গিয়ে নিজের মতো সময় কাটাচ্ছিলাম।
সেটা চলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। তারপর চারুকলার সামনে গিয়েছিলাম অনিন্দিতার সঙ্গে দেখা করার জন্য। ওকে দেখে মেজাজ খানিকটা ঠান্ডা হয়েছিলো। অনেকক্ষণ পর প্রথমবারের মতো। তারপর অনেকক্ষণ হাঁটাহাটি করলাম। কখনো হাত ধরে, কখনো গলাগলি করে।
আমাদের বন্ধুত্বটা বন্ধুত্বের শুরু থেকেই ছিলো ভিন্নরকম। আমরা পাঁচমিশালী আয়োজনে বিশ্বাস করতাম। বন্ধুর মতো চলাফেরা, আড্ডাবাজি ও স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রেমিক-প্রেমিকার মতো সম্পর্কে আমাদের আপত্তি ছিলো না। যে কারণে কোনো কোনো রোদেলা দুপুরে মেয়েদেরকে চুমু খেতে কেমন লাগে জানার জন্য আমি যখন ওর ঠোঁট দু'টো জোর করে মুখে পুরে অনেকক্ষণ চুষতাম, তখন সে খানিক জবরদস্তি ছাড়া বেশি আপত্তি করতো না।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব অনুধাবনের মতো পরিপক্বতা আমার ছিলো না। তারপরও নিজের সীমাবদ্ধ চিন্তাপন্থায় বিষয়টি নিয়ে সে সময় আমি অনেকই ভেবেছি। মাঝে মাঝে অনিন্দিতাকে জিজ্ঞেসও করেছি, আমাদের মধ্যে যে সম্পর্কটা বিদ্যমান, সেটা আসলে কি ধরনের সম্পর্ক?
অনি হেসেছে আমার কথা শুনে। মজা করে বলেছে, এটা আসলে একটা দুঃসম্পর্ক। অপসম্পর্কও বলা যায়। ওর এসব ঠাট্টায় আমার যখন ভালো লাগতো না তখন আমি আবারও বলতাম, ঠাট্টার বিষয় না। ঠিক করে বলো তোমার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক?
তখন সে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলতো, বন্ধুত্ব বুঝিস? কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করে, কোনো স্বার্থ উদ্ধারের চিন্তা না করে, জীবনে কখনো একফোঁটা সুখ মিলবে না জেনেও মানুষ কখনো-সখনো আরেকজন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। বন্ধুত্বের জন্য সে নিজের জীবন পুরোটাই বিলিয়ে দেয়। নিজের ভবিষ্যতের কোনো চিন্তা করে না। নিজের পরিবার-পরিজনের কোনো চিন্তা করে না। শুধু বন্ধুত্বটা নিয়ে ভাবে।
এইটুকু বলে অনিন্দিতা চুপ হয়ে যায়। আমিও চুপ করে অঘ্রাণের অলস বিকালে বসে চড়ুই পাখিদের ডাক অথবা ঝগড়া শুনি। আমাদের চারপাশে ছাতিমের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সেই গন্ধে বিভোর হয়ে যাই। এক ধরনের অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আমি হাত বাড়িয়ে অনিন্দিতার যে আঙ্গুলটা আমার সবচেয়ে কাছে থাকে সেটাকে ধরি। তারপর এক মুহূর্তের একটা বিলম্ব এসে ভর করে আমাদের দু'জনের হাতে। সে সময় অনেক চেষ্টা করেও আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি নি। কেন পারি নি সেটা জানি না। মুহূর্তের বিলম্ব কেটে যাওয়ার পর আমি ওর শাপলা ফুলের মতো হাতটাকে আমার মুঠোয় পুরে নিই। আমাদের উভয়ের চামড়ার নিচে বয়ে চলা অনুচক্রিকায় কাঁপন ওঠে। আমি আমার বুকের ভেতর সে কাঁপনের অস্তিত্ব টের পাই। মস্তিষ্কের নিউরণে টের পাই শিহরন। বুঁদ হয়ে থাকি সুখের ছোঁয়ায়। চোখ মুদে বসে থাকি একটানা এক ঘন্টা। এ সময় আমরা কেউ কারো সঙ্গে কথা বলি না কিন্তু আমাদের হাতেরা একে অপরের সঙ্গে অসংখ্য বিষয়ে আলাপ সেরে নেয়। নানাবিধ উপভোগ্য খেলায় অংশ নেয়। আমরা বাইরে তাদের ছিটেফোঁটা নড়াচড়াও দেখতে পাই না কিন্তু বুঝতে পারি আমাদের আড়ালে তারা নিজেদের নিয়ে সুনীল খেলায় মেতে উঠেছে।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে আসে। সেদিনের মতো সম্পর্কের রূপ উদঘাটনে বিরতি টেনে আমরা উঠে পড়ি। হাত দু'টো ততক্ষণে আটকে গেছে একটা আরেকটার সঙ্গে। সেভাবেই আমরা হেঁটে হেঁটে রোকেয়া হল পর্যন্ত যাই। পথিমধ্যে বহু পরিচিত বন্ধু-বান্ধব-ছোটবড় ভাইবোন আমাদের দেখে। রোকেয়া হলের গেট থেকে ফিরে আসার পর তারা আমাকে অভিনন্দন জানাতে চায়। আমি কারও অভিবাদন গ্রহণ করি না। আমি জানতাম আমাদের ভেতর নারী-পুরুষের প্রেম চলে না।
অথচ তারপরও অনিন্দিতা আর আমি একে অপরের প্রতি দুর্নিবার রকমের আকর্ষণ অনুভব করতাম। আমাদের এ আকর্ষণের রসায়নটাও ছিলো উপভোগ্য। হয়তো একই সময়ে আমরা দু'জনেই দু'জনের প্রতি ভীষণ রকম ব্যকুলতা অনুভব করছি কিন্তু কেউ কাউকে বলছি না। ভরদুপুরে টই টই করে ঘুরছি, পার্কে বসে চা খাচ্ছি, এপি'র সামনে গিয়ে সোহেলের দোকানে বসে আড্ডা আর গুলতানি মারছি কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলছি না।
এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ মিলে যাওয়া যেকোন আড়ালে অনি আর আমি একই সময়ে আমাদের দু'জনের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছি। আমাদের কোনো পূর্ব ইশারার দরকার পড়ে নি। পূর্ব পরিকল্পনাও ছিলো না। ঠোঁটেরা নিজ উদ্যোগে নিজেদের খুঁজে নিয়েছে। আমরা দু'জন শুধু সময়কে তার মতো করে বয়ে যেতে দিয়েছি। তারপর দীর্ঘ চুম্বন এবং আমাকে প্রায় পিষে ফেলা আলিঙ্গনের মধ্যেই অনিই নীরবতা ভেঙ্গেছে, 'আজ দুপুরে তোমাকে দেখার পর থেকে আমার শরীরটা শিরশির করছিলো।' বলতে বলতে সে আরও জোরে আমাকে জড়িয়ে ধরছিলো এবং আমি তারও জোরে অনিকে জাপটে ধরছিলাম। ওর পিঠকে দুই হাতে পিষে ফেলতে চাচ্ছিলাম। ওর গলা আর বুকের উন্মুক্ত অংশগুলোতে দংশন করছিলাম, যে দংশনে বিষ নির্গত হয় না কিন্তু নীল তার জায়গা ঠিকই খুঁজে নেয়। জ্বলজ্বল করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে থাকে।
সেই সব নীল নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছিলো অনিকে। অনেকে নাকি জানতে চেয়েছিলো সেখানে কি হয়েছে। অনি তাদের যাকে যা মনে হয়েছে উত্তর দিয়েছে কিন্তু কাউকে আমার কথা বলে নি। আমার গলায় একটা গোল সুস্পষ্ট নীল ভেসে উঠেছিলো। আমি সবাইকে বলেছিলাম, ওটা অনির কাজ কিন্তু কেউ বিশ্বাস করতে চায় নি। বন্ধুরা হেসেই বাঁচে নি। তাদের মনে ছিলো কিছুদিন আগে আমি নিজেই সে সম্ভাবনা নাকচ করে ওদের অভিবাদন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
৩.
সেদিন সন্ধ্যায় আমরা পাশে পাশে হেঁটে শেষ করি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। বিকাল থেকে ক্রমাগত হাঁটতে থাকি। ফুলার রোডের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই শহীদ মিনার, আনন্দবাজার, বঙ্গবাজার এবং তারপর আবার বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া পথে পা বাড়াই। ফজলুল হক হলের ফুটপাথ ধরে ধরে হাইকোর্ট মোড়ে, তারপর দোয়েল চত্বরে, টিএসসিতে, ভিসিচত্বরে, নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটে, আজিমপুরের বাসস্ট্যান্ডে, পলাশীর কাঁচাবাজারে সর্বত্র আমাদের পায়ের ছাপ পড়ে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর বুয়েটের খেলার মাঠ আর স্টাফ কোয়ার্টারের মাঝের নির্জন শুনশান রাস্তাটায় আমরা একে অপরের হাত ধরে হাঁটি কিন্তু একে অপরের ব্যপারে কোনো বক্তব্য দিই না। করি না কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও। সেদিন সন্ধ্যার মতো সন্ধ্যা ও বিকেল আমাদের জীবনে ফিরে ফিরে আসে এবং ফিরে ফিরে সেই সব দিনরাত্রি উপভোগ করি। মাঝে মাঝে চুম্বনের আকুলতায় আক্রান্ত হই। শারীরিক স্পর্শের জন্য শরীর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে শরীর থেকে সে উত্তাপ লবণাক্ত পানি হয়ে বের হতে শুরু করে। অনিন্দিতা তার হাতের তালু দিয়ে আমার কপালের কোণে জমে থাকা ঘাম মুছে দেয়। নাকের ডগা এবং নাকের ঢালগুলোকে ভেজা অবস্থা থেকে উদ্ধার করে। দুই হাতে আমার মুখ তুলে ধরে এবং চোখের ভেতর ডুবে গিয়ে সম্ভবত বুঝে নিতে চায় কেন আমি অস্থির হয়ে আছি। যখন সে আমার কামনা বুঝতে পারে তখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং আমি তখনই আরও অস্থির ও বিচলিত হয়ে পড়ি।
ওর কাছে বারবার জানতে চাই কিন্তু ও আমাকে কান্নার কারণ বলে না।





মন্তব্য করুন