417427425
শহরের পথগুলো হঠাৎ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আজকাল কোনো গন্তব্যে ঠিকমতো পৌঁছুতে পারি না। বারিধারায় এলাকায় যাবার জন্য রওনা দিয়ে বসিলা ব্রীজে পৌঁছে যাই। ব্রীজের রেলিংয়ে বসে নদী দেখি। নদীর পানি দেখি, নৌকা দেখি, নৌকার বাদাম দেখি। উকিল মুনশির গান আছে,
পূবালী বাতাসে
বাদাম দেইখা চাইয়া থাকি
আমার নি কেউ আসে...
গানটার কথা ভাবি। উকিল মুনশির দুঃখভারাক্রান্ত জীবনবোধ আমাকে স্পর্শ করে। তারপর নিজের ভেতর টেনে নিয়ে যায়। এক সময় আশপাশের সব রকমের নয়েজ আমার কানে প্রবেশের ক্ষমতা হারায়। আমি নিজেকে একটি সুক্ষ্ণ সুঁচের ডগায় প্রতিস্থাপন করি। আশপাশের ঘটনাপ্রবাহ থেকে রূপকার্থে, সত্যিই অনেক দূরে সরে যাই। দীর্ঘসময় পর হয়তো কোনো শাদা বকপাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ আমার কানে প্রবেশ করে। আমি চোখ মেলে তাকাই এবং বুঝতে পারি এখনও জীবিতদের পৃথিবী ছেড়ে কোথাও চলে যাই নি। নিচের খরস্রোতা নদীকে দেখে তখন প্রথমবারের মতো খানিকটা আঁতকেও উঠি। প্রথমে ভেবে পাই না, আমি কেন সেখানে গিয়েছিলাম। পকেটে একটা যন্ত্র অবিরাম নড়ছিলো। বের করে দেখি যন্ত্রের পর্দায় ভেসে বারিধারা এলাকার কোড নাম্বার। তখন আমার মনে পড়ে, আমি বারিধারা যাচ্ছিলাম। টের পাই, পথ হারিয়েছি।
যন্ত্রটা বন্ধ করে পকেটে রেখে দিই। কারও সাথে কথা বলতে আজকাল একেবারেই ইচ্ছে করে না। পকেটে একটা লাল-শাদা রংয়ের ধূম্রশলাকার প্যাকেট ছিলো। আর ছিলো একটা সবুজ রংয়ের গ্যাস ভরা লাইটার। আজকাল অনেক রংয়ের গ্যাসভরা লাইটার বের হয়েছে। আমার কাছেই দু'টো আছে, যার একটায় সবুজ রংয়ের গ্যাস এবং আরেকটায় আছে হলুদ রংয়ের গ্যাস। আমি ধূম্রশলাকায় সন্তপর্ণে অগ্নিসংযোগ করি। ফুসফুসকে দিই তার প্রিয় বায়বীয় উপাদান। বিনিময়ে ফুসফুস আমাকে আরও খানিকটা স্থবির করে দেয়, যা আমি হতে পছন্দ করি। মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রচুর ধূম্রশলাকায় একসাথে অগ্নিসংযোগ করে ফুসফুসকে এতটাই খুশি করে দেবো যে, সে আমাকে চিরস্থায়ী স্থবিরতা উপহার দেবে। আমি পথের পাশে কিংবা নদীর ধারে সেভাবেই সবার চোখের অন্তরালে রয়ে যাবো। বিদায় হবে আলোড়নহীন।
আর আছে দু'টো চোখ। তারা ইদানীং ঝাপসাভাবে সবকিছু দেখায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। জল নেই তাও সবকিছু ঝাপসাই লাগে। হৃৎপিন্ডটা কে যেন মুচড়ে ধরে আছে। তারই বহিঃপ্রকাশ শরীরের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গে। ব্রীজটার রেলিং থেকে নেমে একসময় আবারও ফিরে আসি শহরের ভেতরে। অচেনা পথ অচেনাই রয়ে যায়। আমিও আর তাদের চেনার চেষ্টা করি না। শরীরের শিরা-ধমনী ভরে থাকে নোনাজলে কিন্তু চোখ খুবই শুকনা।
আমি পথ চলি। বিদ্ধ হই। তারপরও চলতে থাকি এবং তারপর আবারও বিদ্ধ হই। বাড়ির কাছাকাছি যতক্ষণে পৌঁছাই ততক্ষণে আমার হাঁটু ভেঙ্গে এসেছে। কোনমতে হাতড়িয়ে তালা খুলি এবং ভেতরে ঢুকে তালাটা লাগিয়ে দিই। তারপর সেখানেই নিশ্চল পড়ে থাকি। ফুসফুসকে খানিকটা নিকোটিন মেশানো ধোঁয়া উপহার দিই একবার এবং তারপর ফুসফুস আমাকে বেশ কয়েকঘন্টার জন্য নিশ্ছিদ্র অচলাবস্থায় ঢুকিয়ে দেয়।
শুধু বুঝতে পারি না, চিরস্থায়ী অচলাবস্থায় কেন আমায় ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে না?
---





মন্তব্য করুন