পৈশাচিকানন্দে উইকেন্ড উদযাপন
টানা দুই ওয়ানডে জিতে ভারতের বিপক্ষে যেভাবে সিরিজ নিজেদের করে নিলো বাংলাদেশ, তা দেখে যারপরনাই সুখ আর শান্তি অনুভূত হয়েছে। এ দুই জয়ে হৃদয়ে সৃষ্ট অনেকগুলো ক্ষত পুরোপুরি সেরে উঠলো। বিশ্বকাপের সময় বানানো মওকা মওকা বিজ্ঞাপনটা ছিল ক্ষতগুলোর মধ্যে গভীরতম। বিশেষ করে উল্লেখ করতে চাই বিজ্ঞাপনের সেই মুহূর্তটির কথা, যেখানে আমাদের প্রাণের মুক্তিযুদ্ধকেও হেয় করা হয়েছিল। যদিও আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, অপরকে ছোট করার মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নেই। সেটা বরং নিজের দেউলিয়াত্ব খুব খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করে দেয়। তারপরও আশা করে ছিলাম বিশ্বকাপেই ভারতকে হারিয়ে ওই বিজ্ঞাপনের একটা দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে। হয়তো সেটা হতোও। কিন্তু বাঁধ সাধল পাকিস্তানি আম্পায়ার আলীম দার।
কথায় বলে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। পাকিস্তানের কোনো নাগরিক রোজ কেয়ামতের আগে নিজেকে একজন ভাল মানুষ প্রমাণ করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। ওদের জিনের মধ্যেই বিষয়টা নাই। যতো অসততা, অসুরিকতা আর অমানুষিকতা- সবকিছুর উৎপত্তিস্থল মৌলবাদ, হানাহানি আর সংকীর্ণতাপুষ্ট ওই ভূখন্ডটায় বিদ্যমান। সেখান থেকে বের হয়ে আসা একটা মানুষের নমুনা কেমন হতে পারে, তা জানতে হলে আলীম দারের আম্পায়ারিং দেখাটাই যথেষ্ট। বেশিদূর না গেলেও চলে।
যাই হোক, তৃতীয় ম্যাচে যা হবার হবে কিন্তু তার আগেই যা হয়ে গেল, তা আমাকে পৈশাচিক আনন্দ দিয়েছে। সকালে ঘুম ভাঙার পর ভারতের মিডিয়াগুলোর অনিচ্ছুক বাংলাদেশ-বন্দনা পড়তে পড়তে কফির কাপে চুমুক দেয়ার মতো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার সুখ, জীবনে খুব বেশি এসেছিল বলে মনে পড়ে না। আনন্দবাজার এদিকে এককাঠি বেশি সরেস। এমনিতে ওদের রিপোর্টগুলো হয় খানিকটা ফিচারধর্মী, যাতে বিষয়বস্তুটা একেবারে মূর্খও যেন সহজে বুঝে ফেলতে পারে। সেইসব ফিচারের প্রতিটি লাইন পড়ি আর মনে মনে ভাবি, আহা রিপোর্টার-এডিটরদের কি অসহনীয় যাতনাটাই না সইতে হয়েছে লেখাগুলো তৈরির প্রতিটি ধাপে ধাপে। আজও একটা লেখায় পড়লাম, মাশরাফি নাকি মুস্তাফিজকে নিয়ে ধোনির সঙ্গে আইপিএল সম্পর্কে আলাপ (সুপারিশ) করতে গিয়েছিল। যদি গিয়েও থাকে, তো সেটা কৌতুক করার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিল! অথচ সেটাকে ৬০০ শব্দের একটা কঞ্জুস রিপোর্টে প্রায় অর্ধশত শব্দের বরাদ্দ দিয়ে নিজেদের লো সেন্স অব হিউমার যেভাবে ওরা প্রকাশ করে দিলো, দেখে মায়াই হলো।
যাহোক পৈশাচিকানন্দ উপভোগের একটা সমস্যাও আছে। মনের ভেতর পিশাচ ভাব ভর করে। যার উদাহরণ উপরের প্যারাগুলোতেই দেখা যাচ্ছে। এত নির্মমভাবে কাউকে বা কোনোকিছুকে নিয়ে কথা বলতে আমি কখনোই পছন্দ করি না। তবে শুরুতে যে ক্ষতগুলোর কথা বলেছিলাম, সেগুলোর যন্ত্রণা কিন্তু একেবারেই অকারণে সহ্য করতে হয়েছিল। এক সুন্দর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ভারত এক বিশাল বিজ্ঞাপন বানিয়েছে, "মওকা মওকা"। ওইটা কোনো ভাল ও সুস্থ বিজ্ঞাপন ছিল না।
এবার আসার যাক উইকেন্ড উদযাপন পর্বে। জার্মানী হচ্ছে একটা ফেস্টিভ্যালের দেশ। প্রত্যেক মাসেই এখানে কোনো না কোনো ফেস্টিভ্যাল চলে। সবই আসলে বিয়ার পানের বাহানা। শুধু বিয়ার পান বলা যাবে না। সেই সঙ্গে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে বাইরে ঘোরা, ব্রাটভার্স্ট আর বনরুটি চিবিয়ে মুখ ব্যাথা করে ফেলা, শেষরাতে ম্যাকডোনাল্ডসের সামনে বিশাল লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, ভোরবেলা ঢুলতে ঢুলতে ঘরে ফেরা- এইসবেরও বাহানা বলা যায়। এই সবকিছুর মধ্যে লুকিয়ে থাকে তাদের আনন্দদায়ক সময় কাটানোর ফর্মূলা।
শনিবারে তেমনি এক ফেস্টিভ্যালে যোগ দিয়েছিলাম। ক্র্যামার-ব্রুখেন-ফেস্ট। নামটা একটু খটমটে শোনালেও বিষয়টা খটমটে ছিল না। দুপুর থেকেই হিপহপ মিউজিক আর বিয়ারের ফেনায় একটা পুরো শহর আনন্দে মেতে উঠেছিল। হাজার হাজার রং-বেরংয়ের মানুষ আর তাদের জন্য প্রস্তুতকৃত ততোধিক নানামুখী আয়োজন, সব মিলিয়ে ঠিক আমাদের ঈদের দিনের মতো উপলক্ষ্য। পার্থক্য হচ্ছে আমাদের দেশে ঈদ আসে বছরে দুইবার। আর জার্মান দেশে এমন উপলক্ষ্য আসে মাসে দুইবার। কমপক্ষে। ফেস্টিভ্যালের দেশ বলে কথা।
এখানে প্রথম প্রথম আসা সবাই, এইসব ফেস্টিভ্যাল দেখলেই ঝাপিয়ে পড়ে। মনে করে, ভবিষ্যতে আর পাবো কিনা তার তো ঠিক নেই, এইবেলা উপভোগ করে ফেলি। আর এটা করতে গিয়েই বাধিঁয়ে ফেলে ভজঘট। আমার মতে, সবকিছুই একটু ধীরে-সুস্থে এবং দেখে-শুনে করা ভাল। কোনো চিন্তা-ভাবনা না করে ঝুপ করে একদিকে ঝাপ দিয়ে দেয়াটা সবসময়ই যে ভাল ফল বয়ে আনে, এমনটা ভাবার সত্যিকারের কোনো কারণ নেই।
আমার শহর থেকে ফেস্টিভ্যালের শহরের দুরত্ব ছিল এক ঘন্টার ট্রেনের পথ। মাঝে এক বন্ধুর বাসায় বিরতি দিতে হয়েছিল বলে সেটা বেড়ে তিন ঘন্টা হয়ে গিয়েছিল। ট্রেনে চড়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে আমার সবসময়ই দারুণ লাগে। বাইরের দৃশ্যপট প্রতি মুহূর্তে পাল্টাতে থাকে। ঘন ওক গাছের দুর্ভেদ্য সারির দিকে তাকিয়ে যখন মনে মনে ঠিক করে ফেলি একদিন ওই অসূর্যস্পশ্যা ভূমির পরে একটা ছোট্ট কুড়ে উঠিয়ে বসবাস শুরু করবো, তখনই চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ সরষে ফুলের প্রদর্শনী নিয়ে হাজির হয় ধূ ধূ খোলা প্রান্তর। সে প্রান্তরের কোন এক কোণায় দম্ভভরে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়ে চলছে কয়েকশ' বছরের পুরোনো এক ওয়াচ টাওয়ার। হয়তো একসময় ওই রেলপথ, সরষে ক্ষেত বা আর কোনোকিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। পুরো এলাকা ছিল কোনো এক অত্যাচারী শাসকের দখলে। তারই কোনো এক সীমান্তরক্ষী প্রজার দায়িত্ব ছিল ওই ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে চারদিকটার দেখভাল করা। হয়তো কোনো এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কন্ঠনালীতে তীরবিদ্ধ হয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছিল সেই সীমান্তরক্ষীর। এরকম অসংখ্য আগাগোড়াবিহীন ভাবনা এক মুহূর্তে মাথার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খেলে যায়।
সেই খেলা শেষ হওয়ার আগেই আবারও দৃশ্যপট বদলায়। ট্রেন ফিরে আসে কোনো এক নাম না জানা ছোট্ট এক বেঞ্চির স্টেশনে। দু'মিনিট দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে যাত্রীদের ওঠা-নামার। এরই মধ্যে চোখে পড়ে- বেঞ্চিতে বসা দুই তরুণ-তরুণী হঠাৎ চোখ বুজে ডুবে গেল নিজেদের ঠোঁটের উষ্ণ গহীনে। দু'জন মানুষ চোখ বন্ধ করে একে অপরকে চুমু দিলে নাকি ওরা অদৃশ্য হয়ে যায়, অন্যরা ওদেরকে আর দেখতে পায় না। কথাটা হয়তো সত্যি।
চুম্বনরত মানবযুগলদের পেছনে ফেলে আমার ট্রেন এগিয়ে যায়। একসময় উৎসবের নগরীতেও রাত নেমে আসে। দূর থেকে ভেসে আসে মাতাল তরুণীর উচ্চকিত হাসির শব্দ, তরুণের প্রশ্রয়মিশ্রিত পরিহাস। এসবের মধ্যেই একসময় ই-ক্লাস ট্রাম নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়ায়। সব বন্ধুদের ট্রামে উঠা নিশ্চিত করতে গিয়ে এক সময় আমারই আর ওঠা হয় না। একা পেছনে পড়ে রই।
একাকীত্ব সবসময়ই আমার অত্যন্ত প্রিয়। ধূম্রশলাকারা সে সময়টায় সঙ্গ দিতে কখনো কার্পণ্য করে না। বাতাসে খানিকটা নিকোটিন উড়িয়ে আমি পথের পানে পা বাড়াই। জীবনে একাই চলতে হবে, এ সত্য কখনো অজানা ছিল না।
---





১। লাইফ ইজ বিউটিফুল।
অফটপিক - আমার কাছে রবি আর মোজোর বিজ্ঞাপন দুইটাও
ব্যাপক বিরক্তিকর লাগছে। জবাবটা মাঠে দেওয়াই ক্রিকেট।
২। আনন্দম।
ছবিগুলা এখানে দিলেই বেশি ভালো হইত।
আরেকটা কথা,
আপ্নেরে নিয়মিত লেখতে দেখে ভাল্লাগে অনেক। থ্যাঙ্কুস। ভালো থাকেন।
ধন্যবাদ বাউন্ডুলে। আপনাদের ভাল লাগাটাই আমার এই ব্লগ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।
মোজো-রবির বিজ্ঞাপনগুলো আমার কাছেও ভাল লাগে নাই। তবে আমার মনে হয়, মওকা মওকা তৈরি না হলে ওইগুলাও তৈরি হতো না। বিজ্ঞাপনের স্বাভাবিক নিয়ম এইটা।
আর ছবিগুলার সাথে সম্পৃক্ত মানুষেরা এইখানে নাই বলে, ওগুলোকেও এইখানে দিই নাই। এখানে দেয়ার জন্য একটা ছবির অ্যালবাম বানানোর চেষ্টায় আছি। দেখা যাক কতদূর কি হয়। একটা ভিডিও আপলোড করার চেষ্টা করছিলাম অবশ্য। কিন্তু এবিতে ভিডিও আপলোডের অপশন নাই
মোজোর বিজ্ঞাপন... বাজে হইছে... মানুষের মাঝে আরো উগ্র সৃষ্টি করছে। ঠিক তেমনি রবি'র রুবেলকে দিয়ে করা বিজ্ঞাপনটাও যা-তা রকমের বাজে হইছে।
শতভাগ সহমত। কিন্তু এইটা বলেন, মওকা মওকা তৈরির আগে কি আমাদের দেশে ওইরকম উগ্র বিজ্ঞাপন তৈরি হইসে? কোম্পানীগুলো তো বিজ্ঞাপন বানায়ই অন্যদেরকে দেখে দেখে। সেইখানে চেষ্টা থাকে অন্যদেরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। মওকা মওকা দেখে মোজোও কি সেই একই চেষ্টাটাই করে নাই?
তারপরও এটা ঠিক যে, কুকুরকে কামড়ানো মানুষের শোভা পায় না। যে কারণে আমি ওই বিজ্ঞাপনগুলোকে সমর্থন করি না।
আজকে শুনলাম মওকা মওকা নাকি প্রথম পাকিস্থান তৈরী করে। কারণ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে পাকিরা কখনো ইন্ডিয়ার কাছে জিতে নাই। তাই সেই উপলক্ষ্যে মওকা (সুযোগ) মওকা (সুযোগ) এর এড তৈরী করে। সেইটার রিভার্স তৈরী করে ইন্ডিয়া।
আমার কথা হইলো কেউ খারাপ কাজ করলে সেটাকে খারাপ হিসেবেই বিবেচনা করবো। কারণ খারাপকে কপি করলে সেটার খারাপ প্রভাব আমার মধ্যেই পরবে
তাহলে বলেন, ইন্ডিয়া পাকিস্তানের রিভার্স তৈরি করতে গিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ওই বিজ্ঞাপনটা বানাইছিল কেন? সেটাতে আবার মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা হইছিল কেন?
এরপরও কি তাদের মোজোর বিজ্ঞাপনটা প্রাপ্য ছিল না? ভাল হওয়া অবশ্যই ভাল কিন্তু সেটা যখন দুবর্লতা নির্দেশ করে তখন কতোটা ভাল?
হাহাহাহাহাহা
ই্ন্ডিয়া বদ বইলা আমরা ক্যান বদ হমু?
হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কাফেরদের পাথরের আঘাতে জর্জরিত হইয়াও দোয়া করছে.. "মাবুদ ওদের জ্ঞান দাও"।
চৌদ্দশ' বছর আগের বুদ্ধি, এই যুগে পুরাই অচল। আজকাল বদ লুকজনের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করলে ওরা মনে করে, ওরাই সঠিক। এনিওয়ে আমি অবশ্য আপনের দলের লোক। এতকিছুর পরও সেই আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করি, তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন? সেই কারণেই মোজো বা রবির বিজ্ঞাপন এবং সুধীর গৌতমকে হালকা নাড়ানি দেয়া সমর্থন করি না একদম। আমাদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, সদ্ব্যবহার ইত্যাদি শিখতে হবে আরও ভাল করে।
মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা (বিশেষ করে বাংলাদেশিদের) ভারতবাসীর একটা মজ্জাগত সমস্যা। জাতীগত এই সমস্যা থেকে বের হতে ওদের আরো ১০০ বছর লাগবে। ততদিকে .... মারা খাইতে খাইতে সারা...
আপনের লেখা পইড়াতো পুরাই আউলা। ফেস্টিভ্যালের শহরে যাইতে মন চায়।
ভারতের সমস্যা নিয়ে ভারত থাকুক। আমি আমাদের নিজস্ব সমস্যাগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে এবং সে জায়গাগুলোতে উন্নতি করতে চাই। আমাদেরকে আরও বেশি করে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ শিখতে হবে এবং সহনশীলতার চর্চা করতে হবে।
আর ফেস্টিভ্যালের শহর বছরের ৩৬৫ দিন খোলা। সময়-সুযোগ বুঝে এসে পড়েন। দুই ভাই মিলে অনেক মজা করা যাবে
অনেকদিন ট্রেন ভ্রমন করি না। লেখাটা পড়েই ট্রেনে চড়তে মন চাইলো।
একটা ট্রেনভ্রমণ করে এসে আমাদেরকে গল্প বলেন
মন্তব্য করুন