ছুঁয়ে দেখবার মন মরা আশ ভালবাসে জল হয়ে ঝরতে
১.
সেদিন কাউফল্যান্ড থেকে এক জোড়া জুতা কিনছি। ফিলা ব্র্যান্ডের। সাধারণত ওদের জুতা ৪০ ইউরোর নিচে পাওয়া যায় না। অ্যাডিডাসের শুরু ৫০ থেকে। রিবুক ৫৫। দাম দেখলেই ইচ্ছারা চুপসে যায়। তবে সেদিন এক জোড়া পেয়ে গেলাম নাগালের মধ্যে। বিশেষ অফার চলছিল। সাইজমতো পেয়ে আর দেরি করলাম না। বাডা বিম, বাডা বুম।
রবার্টকে বলে রেখেছিলাম শপিং-এ যাবো। পরে একা একাই জুতা কিনে ফেলেছি শুনে রাগের চোটে একটা বিয়ার একাই টেনে ফেললো। তারপর আরেকটা খুলে খুব হম্বিতম্বি শুরু করলো। প্রিসকা ঘটনা শুনে আমাকে ফোন করে দিলো একটা রামধমক। কেন আমি ওকে নিয়ে শপিং-এ যাবার কথা বলেও একা একা জুতা কিনে ফেলেছি? এখন হ্যাপা সামলাবে কে?
শুনে অবশ্য আমি বেশি বিচলিত হলাম না। এসব ওদের নিত্যদিনের খুনসুটি। ওরা একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করার জন্য খুঁজে খুঁজে এসব উপলক্ষ বের করে। তারপরও যেহেতু আমাকে জড়ানো হচ্ছে, তাই আমিও ভেবে-চিন্তে একটা উপায় বের করলাম। ক'দিন হলো এলাকায় নতুন একটা ছেলে এসেছে। চৌপর দিন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকে। প্রথম কয়েকদিন বোঝানোর চেষ্টা করেছি। দ্যাখো বাপু, মদ ছাড়া চলতে পারো না ভাল কথা কিন্তু হদ্দ মাতাল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে নিজের জীবনটাকে কঠিন বানিয়ো না। এখন বুঝতে পারছো না ঠিকই কিন্তু পরে একদিন বুঝবে এভাবে নিজেকে বারবার মানুষের সামনে এমব্যারাস্ করলে সেল্ফ এস্টীমের বারোটা বেজে যায়। মানুষের কাছে কোনো দাম থাকে না। যতোই বুঝাই, লাভ হয় না। এখন আশা ছেড়ে দিয়েছি।
যাহোক, ওর সাথে পরিচয় ছিল রবার্টেরও। জানতো কি পরিমাণ গণবিরক্তি উৎপাদনে সক্ষম ছেলেটা। ওর কথা তুলেই ভয় দেখালাম রবার্টকে। সেদিন বিকেলে ওদের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। বেড়ানো মানে বিয়ারের ক্রেট, বার্বিকিউয়ের সসেজ, রুটি ইত্যাদি সহযোগে বিকেল থেকে হৈ-হুল্লোড় শুরু করা। তারপর ওদের রান্নাঘরে বিয়ার পং, ফ্লিপ কাপ ইত্যাদি খেলে, বাগানে বার্বিকিউ করে, সন্ধ্যার পর এরফুর্টের কসমোপোলার বা মিউজিক পার্কে গিয়ে নাচ-গান, সুরাপান করে শেষরাতের শেষ ট্রেনে ঘুম ঘুম চোখে বাড়ি ফেরা। ট্রেনে ওঠার আগে এরফুর্ট স্টেশনে দাঁড়িয়ে মাঝে-সাঝে বিগ ম্যাক কিংবা চীজ বার্গার চিবুনোটাও কর্মসূচির মধ্যে পড়ে।
তো, আমি রবার্টকে ফোন করে বললাম, চটজলদি বিয়ারের বোতলটা নামিয়ে না রাখলে বিকেলে ওই ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে তোমার বাসায় যাবো। ব্যাস্, জোঁকের মুখে লবণ পড়লে যেমন সে চুপসে যায়, তেমনি রবার্টও শান্ত হয়ে গেলো, তৎক্ষণাত বিয়ারের বোতলটা প্রিসকার হাতে ফিরিয়েও দিল। প্রিসকাও আমাকে ফোন করে ডাংকে শুন কথাটা বার দু'য়েক শুনিয়ে দিল।
২.
তবে জামা-কাপড় এখনও কেনা হয় নি। অবশ্য প্রচুর পরিমাণ জামা-কাপড় আমার আছে। আর কিনতে চাইও না। কাপড় ধোয়াটা একটা ভাল রকম ঝকমারি। ময়লা কাপড় নিয়ে ওয়াশিং মেশিনের রুমে গিয়ে লাইন দিতে হয়। আবার কাপড় মেশিনে ঢুকিয়ে কমপক্ষে এক ঘন্টা বসে থেকে ভেরেন্ডা ভাজতে হয়। আমার অবশ্য সুবিধা আছে। ওয়াশিং রুম আমার ডর্মেই অবস্থিত, আন্ডারগ্রাউন্ডে। অন্যদেরকে দুর-দুরান্ত থেকে আমার ডর্মে এসে কাপড় ধুতে হয়। আমাকে শুধু একতলা বেয়ে নিচে নেমে গেলেই হয়। আর সেখানে বিশাল লাইন থাকলে, তৎক্ষণাত প্ল্যান-বি'তে সুইচড্ হয়ে কাপড় ধোয়াটা পোস্টপোন করে দিলেই ঝামেলা শেষ। এসব সুবিধা থাকার ফলে কাপড় ধোয়ার যন্ত্রণা কমই পোহানো লাগছে খানিকটা। জীবনের ছোট ছোট সুখের ব্যাপারগুলো মধ্যে এটা একটা। ট্রালালালা..
ছোট ছোট সুখের কথায় মনে পড়লো, আমার একটা ভগ্নপ্রায় স্যান্ডউইচ টোস্টার আছে। ইলমিনাউ শহরে আসার পর প্রথম দিকে পাওয়া উপহার। আমার পাশের রুমে থাকতো ফ্যাজার। ইয়েমেনের ছেলে। যেমন চটপটে, তেমন মিশুক। ওই স্যান্ডউইচ টোস্টারটা আমার খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ পূর্ব ও পরবর্তীকালীন ঝামেলাসমূহকে অর্ধেকে কমিয়ে রেখেছে অনেকদিন ধরে। স্যান্ডউইচ একটা বানিয়ে টিস্যু পেপার দিয়ে ধরে খেয়ে ফেললে এমনকি একটা বাড়তি পিরিচও ময়লা হয় না। একদম হ্যাসল্-ফ্রি বন্দোবস্ত। মেগ রায়ান আর হিউ জ্যাকম্যানের মজার ছবি কেইট অ্যান্ড লিওপোল্ডের কথা মনে আছে? বেচারা লিওপোল্ড জীবনে প্রথমবারের মতো টোস্টারে রুটি গরম করতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল বিরাট বিপদে। সিনেমার কাহিনী বলে স্পয়লার দিতে চাই না, শুধু বলি লিওপোল্ড যখন রাগে-দুঃখে কেইটের কাছে টোস্টার সম্পর্কে অভিযোগ দিচ্ছিল, 'আ'ম টেলিং য়ু মিস, দিস মেশিন ইজ আ ড্যাম হ্যাসল্' বলে; তখন আমার দ্বারা হাসি ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না।
আরেকটা ছোট সুখ জড়িয়ে আছে কফিমেশিনের সাথে। এটা তুরস্কের বন্ধু একিনের কাছ থেকে পাওয়া। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর একটা কফি-কিক নিতে আমার কখনোই খারাপ লাগে না। দেশে থাকতে ছিল সকালবেলা বিছানায় চা পানের বদঅভ্যাস। একসময় ঘুম থেকে চোখ মেলে হাঁক ছাড়তাম, আম্মুউউ চা দেন। আমার রুমের দরজা থেকে দেখা যেতো, আম্মু রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে তরি-তরকারী বা মাছ-মাংস কুটছেন। সামনে কাজের বুয়া বসে হয়তো মশলা বাটছেন বা অন্যকিছুতে হাত লাগাচ্ছেন। দুই মধ্য বয়সীর নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনা সভা চলছে। মাঝে-মধ্যে আমার বিশিষ্ট পাকনা বুড়ি ছোটবোন, ডাইনিং টেবিলের কোনো একটা চেয়ারে বসে, দুইজন বর্ষীয়ান নারীর আলোচনায় তার বিজ্ঞ মতামত সঙ্গে করে নাক গলাতো। এরই মধ্যে দেখতাম, আমার হাঁক শুনে আম্মু হাসি মুখে উঠে রান্নাঘরের ভেতরে গেলেন। চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে আবার নিজের পিঁড়িতে ফিরে এসে বসলেন। আজ বহুদিন হয়ে গেল, ঘুম থেকে উঠেই 'আম্মু' বলে চিৎকার দেয়া হয় না। বহুদিন হয়, ঘুম ভাঙার পরও অমন স্বপ্নের মতো সুন্দর একটা দৃশ্য দেখার সুযোগ হয় না। বন্ধুর দেয়া কফিমেশিনের সুবাদে মাঝে মাঝে পুরোনো দিনের কথাগুলো শুধু মনে পড়ে যায়।
৩.
আকাশটা ক'দিন ধরে বেশ নিয়ম করে আমায় সারপ্রাইজ দিচ্ছে। সন্ধ্যার ঠিক ঠিক আগে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামে। উষ্ণ নরম পানির ফোঁটা। রাস্তাফারি মুভমেন্টের গ্রুপলিডার নিকোলের গালের মতো তুলতুলে। আমার ধারণা নিকোলা হচ্ছে একমাত্র অবাংলাদেশি হিউম্যান বিইং অ্যালাইভ অন দ্য প্লানেট যে বৃষ্টিতে ভেজার অানন্দটা নিতে জানে। ঝুম বৃষ্টিতে হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসের নিরাপদ নিরিবিলি এলাকা পেরিয়ে গ্রেট থুরিনজিয়ান বনভূমিতে ঢুকে পড়ার মতো গা ছমছমে আনন্দ এখানকার আর কোনকিছুতেই নেই। মাঝে মাঝে খ্যাট খ্যাট শব্দ করে ডান ঝাপটিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে যায় লেজঝোয়া কাকাতুয়ারা। হঠাৎ সে শব্দ কানে ঢুকলে সামান্য না চমকে উপায় থাকে না। আলো-আধাঁরির খেলার মাঝে চলতে থাকে প্যারানর্মাল অ্যাক্টিভিটি। বেশি ভয় লাগলে আমি নিকোলার হাত পুরো বাহুসমেত বগলদাবা করে রাখি। সে গল্পচ্ছলে আমার ভয় দূর করে দেয়ার চেষ্টা চালায়।
বৃষ্টি থামতে না থামতেই, ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। ছোট্ট পাহাড়ী শহরটায় খুব পরিকল্পনা করে সবকিছু বানানো তাই, আমরা বনভূমি থেকে বের হয়ে দেখি চোখের সামনে আলোর সমুদ্র। তাতে হরেক রকম আকার ফুটে থাকে। দূর থেকে দেখতে আকাশের কনস্টেলেশন মনে হয়। আমরা খানিকটা পিচ্ছিল ঢালু পাহাড়ী পথ বেয়ে ধীরে ধীরে শহরে ফিরে আসি। মাঝে মাঝে আকাশ পরিস্কার থাকলে নিকোলকে খুঁজে বের করে কুইন অব ক্যাসিওপিয়া চিনিয়ে দিই। এক পশলা ঝুম বৃষ্টির পর মাঝে মাঝে মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ ঝকঝকে তকতকে হয়ে যায়। সে সময়টা তারা দেখার জন্য সর্বোত্তম। ও যখন মুগ্ধ হয়ে বলে, তোমার এই আকাশের তারাদের প্রতি আগ্রহটা আমার খুব ভাল লাগে, জানো? তখন আমি হেসে ওর ভুল ভাঙ্গাই। আমার আকাশের তারাদের প্রতি আগ্রহ আছে কিন্তু সেটার পেছনে কখনোই আলাদা করে সময় দেয়া হয় নি। গল্প-উপন্যাস-সিনেমা থেকে যা জেনেছি ঠিক ততটুকুই। এই যেমন কুইন অব ক্যাসিওপিয়ার গল্পটা জেনেছিলাম জন কস্যাকের সেরেনডিপিটি সিনেমা থেকে। কথাটা নিকোলকে বলতে বলতে ভাবি, কি দরকার ছিল গুমোরটা ফাঁক করে দেয়ার, তারচেয়ে বরং ও যেটা বিশ্বাস করতে চায়, সেটা বিশ্বাস করতে দিলেই হতো। তারপর অবাক হয়ে খেয়াল করি আমার সরল স্বীকারোক্তি শুনে নিকোল আরও মুগ্ধ হয়েছে। কেন? কে জানে?
ফেরার পথে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ানো হয় ফলের দোকানে। এক প্যাকেট স্ট্রবেরী আর এক গুচ্ছ চেরীফল কিনে ব্যাকপ্যাকে পুরে হাঁটা দিই আবার। ঘরে ফিরে প্রথমে নিই একটা লম্বা ও ঠান্ডা শাওয়ার। তারপর যখন নিজেকে দিনের সবচেয়ে ঝরঝরে অবস্থায় আবিস্কার করি, তখন ঘরের সব আলো নিভিয়ে জ্বালিয়ে দিই কয়েকটা মোমবাতি। কম্পিউটারে খুব লো ভল্যুয়মে চলতে থাকে, বিটলসের হেই জুড কিংবা মিনার রহমানের আহারে কিংবা ওরকম গানেদের একটা।
৪.
রাত বাড়ে, অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা বাড়ে, সবকিছুর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ঠান্ডা। পৃথিবীর সবগুলো অবাঞ্ছিত ভাবনা একে একে ফিরে আসে। যেন ওরা দিনের শুরুতে কাজে বেরিয়েছিল। কাজে শেষে একে একে ঘরে ফিরছে। আমি সবাইকে পাশে সরিয়ে উডি অ্যালেনের কোনো একটা মুভি চালিয়ে দিই। মাইটি অাফ্রোডাইটিটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। আর হলিউড এন্ডিং। অবশ্য উডি অ্যালেনের জোয়ান বয়সের সিনেমাগুলোও খারাপ না। ম্যানহাটন আর অ্যানি হল যে আমি কতবার দেখেছি, গোণা হয় নি। সত্তর আর আশির দশকে উডি অ্যালেনের ছবিতে কোনো আরোপিত এন্ডিং থাকতো না। যা স্বাভাবিক, ন্যাচারাল; তাই দেখানো হতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নায়িকারা নায়কদের ছেড়ে চলে যেতো। আমি এ ধরনের ন্যাচারাল এন্ডিং-গুলোর সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারি বেশি। হ্যাপী এন্ডিং দেখলে বরং বিরক্তি লাগে। আর উডি অ্যালেনের ট্রেডমার্ক সাইনগুলোও আমার অনেক পছন্দের। নিজের চেয়ে অন্তত এক ফুট লম্বা নায়িকা বেছে নেয়া, প্রায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেসব নায়িকার কন্ঠস্বরে কোনো না কোনো অস্বাভাবকিতা থাকা- এইসব কেন যেন আমাকেও খুব টানে।
সিনেমা শেষ হবার পর মনে মনে ভাবি, ওই দূরের কমলা রঙা ভবনটার ছাদ থেকে পা পিছলে যদি একটা চড়াই একদিন পড়েই যায়, তাহলে কি সে ডানা ঝাপটিয়ে উড়াল দেবে নাকি টুপ করে মাটিতে পড়ে মরে যাবে? মনে হয়, পড়তে পড়তে চড়াই পাখিটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশ ফিরে আনমনে বলবে, হায়, আরেকবার যদি ছুঁয়ে আসা যেতো ওকে, কোনোভাবে!
৫.
বহুদিন লিখি না আপনারে
আপনেও লেখেন না বহুদিন,
ধুলা জমে সময়ের আস্তরে
বেড়ে চলে দুরত্ব সীমাহীন।
গোলাপের কুঁড়িগুলো এখনও
স্বপ্নের জাল বোনে বাগানে,
ফিরে যদি আসে কেউ তবে যেন
ফিরে যেতে নাহি হয় ভাঙামনে।
তারপর একরাশ নিঃশ্বাস
উড়ে যায় মেঘেদের ধরতে
ছুঁয়ে দেখবার মন মরা আশ
ভালবাসে জল হয়ে ঝরতে।
বহুদিন লিখি নাই আপনারে
আপনেও লেখেন নি বহুদিন,
ধুলা জমে সময়ের আস্তরে
দুরত্ব হয়ে গেছে সীমাহীন।
---





মন্তব্য করুন