একটা সাধারণ, কোনো কিছুতে মন না বসা দিনের গল্প
তাতানো গরম পড়েছে ইউরোপে এবার। তাপমাত্রার কাঁটা সেই যে একবার ৩০ এর উপরে উঠে গেল, তারপর থেকে আর নামার কোনো আগ্রহই যেন ওটার নেই। সিটি সেন্টারে একটা বিশাল থার্মোমিটার আছে। রাস্তার পাশে ভাস্কর্যের বদলে এ শহরে দেখা যায় আতিকায় থার্মোমিটার! সেদিন ব্যাংকে যাওয়ার পথে খানিকক্ষণ আলাপ-চারিতা চালানোর চেষ্টা করেছিলাম ওটার সাথে।
-হেই মিস্টার পারদভর্তি শিশি, খবর কি তোমার? ৩০-এর ঘর থেকে নিচে নামবা কবে?
-সেটার আমি কি জানি? মানুষ-জন গাছপালা সব কেটে সাফ করে ফেলছে, আমি চাইলেই কি আর ৩০-এর ঘর থেকে নেমে আসতে পারি?
-হুম, সেটাও ঠিক। আমার অবশ্য ৩০-এর ঘরের তাপমাত্রায় সমস্যা ছিল না কিন্তু এই শীতের দেশে কোথাও কোনো সিলিং ফ্যান বা এয়ারকুলার নাই, সেইটাই যতো সমস্যা।
-ছোট দেখে একটা টেবিল ফ্যান কিনে নাও।
-সেটা করা যায় কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ঠিক যেদিন আমি টেবিল ফ্যান কিনবো, সেইদিনই আবার হাঁড় কাঁপানো ঠান্ডা পরে যাবে।
কথায় কথায় রাস্তার উল্টাদিকের সিগন্যাল সবুজ হয়ে গেল, তাই ঝুপ করে বিদায় নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। সাবওয়ে'র একটা ফ্রাঞ্চাইজি আছে শহরে। সেখান থেকে ভেসে আসছিল বেশি করে ঝাল দেয়া গরম গরম 'স্টেক অ্যান্ড চীজ' স্যান্ডউইচের সৌরভ। খুব একটা পাত্তা দিলাম না। সাড়ে পাঁচ ইউরোর নিচে কিচ্ছু পাওয়া যায় না ওখানে।
ব্যাংকের ব্যালান্স নামছে দ্রুতগতিতে। এখন আর মন চাইলেই দুম করে টার্কিশ ডোনারের দোকানগুলোতে ঢুকে অতিরিক্ত ঝাল দিয়ে বানানো পুটেনের মাংসের ডোনারের অর্ডার ঠুকে দিতে পারি না। পুটেন হচ্ছে মুরগীর চেয়ে একটু বড় এক ধরনের জীব, যেটার মাংসের স্বাদ মুরগী আর হাঁসের মাঝামাঝি। জার্মানীতে সবচেয়ে রমরমা খাবারের ব্যাবসা করে টার্কিশ ডোনারের দোকানগুলো। অনেকটা আমাদের রাস্তার ধারের হোটেলের মতো।
যাহোক, আমার এখন রাস্তার পাশের ব্রাটভার্স্ট-এর স্ট্যান্ডগুলোই মূল ভরসা। একটা চার ইঞ্চি সাইজের খটখটে রুটির পেট কেটে ফুটখানেক লম্বা সসেজ বসিয়ে, সাহেবরা সেটার নাম দিয়েছে 'ব্রাটভার্স্ট'। রায়েড থাকলে বলতো,
"Too much meat and too little bread
German way of not getting spread"
ছেলেটা বার্লিন চলে যাবার পর অনেকদিন হয়ে গেল। কোনো খোঁজ নেয়া হয় নি। একটা ফোন করা দরকার।
আমার অবশ্য একা একা ব্রাটভার্স্ট খেতে খারাপ লাগে না। লম্বা সসেজটার আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত এক পরত মেয়োনিজ আর এক পরত টমেটো কেচাপ ঢেলে, টিস্যু পেপার দিয়ে রুটিটা ধরে এক ধার থেকে খাওয়া শুরু করা এবং আশপাশটা দেখতে দেখতে স্কেটিং করে দূর থেকে দূরান্তে চলে যাওয়া; ছুটির দিন কাটানোর আদর্শ উপায়গুলোর একটা। কানের হেডফোনে বাজানোর জন্য কখনো থাকে বাফেলো স্প্রিংফিল্ডের 'ফর হোয়াট ইট'স ওয়ার্থ', কখনো থাকে মুঙ্গো জেরীর 'ইন দি সামারটাইম'।
সাবওয়ে পেরিয়ে এগোতে থাকি আর কাঁচের জানালার ভেতর থেকে আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে নিউ ইয়র্কার, সি অ্যান্ড এ, মুয়েলার, নাইকি, অ্যাডিডাসের চোখ ধাঁধানো, মন ভোলানো সব জিনিসগুলো। বড় বড় ছাড় চলছে সব ধরনের শীতের কাপড়ে। কাঁচের বাইরে থেকে তাকিয়ে দেখতেই বেশি ভাল লাগে।
গরম বলে পথে সেমি-নেকেড মানুষজনের কোনো অভাব নেই। ওরিয়েন্টাল চোখে প্রথম প্রথম ভালোই লাগতো। এখন আর কোনকিছুই লাগে না। নিজেও মাঝে মাঝে শর্টস আর স্যান্ডো পরে বের হয়ে যাই। এই দেশে এসে অল্প যে কয়টা নতুন জিনিস শিখেছি, তার একটা হচ্ছে- কখনো অন্যের ব্যাপারে কৌতূহলী না হওয়া। আমাদের দেশে অবশ্য মানুষের নিজের চেয়ে অন্যের ব্যাপারে কৌতূহল বেশি। 'প্রথম পক্ষ' কবে 'দ্বিতীয় পক্ষে'র সাথে কোথায় কি করেছিল, সেটা যেচে গিয়ে 'চতুর্থ পক্ষ'কে জানিয়ে আসার মতো 'তৃতীয় পক্ষে'র অভাব আমাদের দেশে কখনো ছিল না, কখনো হবে বলে মনেও হয় না। তবে আমি মনে হয় একটা কথা ভুল বললাম। অন্যের ব্যাপারে কৌতূহল আমার জন্ম থেকেই কেন যেন কম। ওটা এখানে এসে শিখতে হয় নি।
ছেমড়ি পটানোর অনেকগুলো কৌশল অবশ্য এখানে এসে শেখা হয়েছে। বন্ধুমহলে জনপ্রিয়তার দিক থেকে এই টপিকটার স্থান অনেক উপরে। তাই না চাইতেও অনেক কিছু শেখা হয়ে যায়। সেদিন রাতে ক্লাবে কাজ করছিলাম বাউন্সার হিসাবে। বাউন্সারদের কাজ হলো ক্লাবে যারা আসছিল তাদের আইডি চেক করা, বয়স ১৮ পেরিয়েছে কিনা সেটা দেখার জন্য।
সেদিন মানুষের চাপ একটু বেশি থাকায় ক্লাবের দরজার সামনে ছোটখাটো একটা লাইন হয়ে গিয়েছিল। আর আমার জার্মান ভাষা ঠিক ফ্লুয়েন্ট না হওয়ায়, সময়ও একটু বেশি লাগছিল। এরই মধ্যে কানে আসলো একটা ছেলে লাইন দাড়াঁনো সামনের মেয়েকে বলছে, আমি এখনও এক ফোঁটা অ্যালকোহল গলায় ঢালি নি, তারপরও আমার খুবই মাতাল মাতাল লাগছে। কেন জানো? আরেকজন উত্তর করলো, নাতো, কেন? প্রথমজন চটপট বলে দিলো, কারণ তোমার মাদকতাময় সৌন্দর্য্য আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে।
কথাটা শুনে মেয়েটা 'হোয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়াট' টাইপের একটা লুক চোখে-মুখে ফুটিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়েছিল। আমি দিব্যি বুঝতে পারছিলাম, মেয়েটা মনে মনে ভাবছে, এইটা কোনো পাঞ্চ লাইন হইলো মর্কট?
ছেলেটা যখন আইডি নিয়ে আমার সামনে হাজির হলো তখন কানে কানে ওকে বললাম, এরপর কখনো অন্তত নাইটক্লাবের লাইনে দাঁড়িয়ে 'মাদকতাময় সৌন্দর্য' টাইপের ভারিক্কী শব্দ কোনো মেয়ের সামনে উচ্চারণ করো না। আর অ্যালকোহল সংক্রান্ত কৌতুকগুলোও তুলে রেখো ছেলেমহলের জন্য। মেয়েরা দায়িত্ববোধ দেখলে রেসপন্স করে। মদ্যপ্রেমী বুঝতে পারলে পাত্তা দেয় না।
শুনে ছেলেটার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আমি অবশ্য বেশি একটা মাথা ঘামালাম না। এই দেশে ঘাম বেশ দুর্লভ এক জিনিসই বটে। এত যে গরম, তবু কিন্তু খুব বেশি ঘাম হয় না। বাতাসের আর্দ্রতার কারণে এমনটা হয়।
আজ কেন যেন কোনো কিছুতেই মন বসছে না। লাইব্রেরীতে এসেছিলাম কোয়ালিটেটিভ রিসার্চের জন্য সদ্য নেয়া ইন্টারভিউটার ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি করতে। ইচ্ছা ছিল 'সাইবারবুলিং' সম্পর্কে কয়েকটা ইম্পিরিকাল রিসার্চ-পেপারও খুঁজে বের করার। অথচ কিছুই করা হলো না দুই ঘন্টায়। সত্তুরের দশকের একটা প্লে-লিস্ট ইউটিউবে চালিয়ে, কানে হেডফোন গুঁজে এই লেখাটা লিখলাম।
যাহোক, দারুণ একটা রোদ ঝলমলে দিন পার হচ্ছে। কফি মেশিন থেকে এক কাপ লাটে মাখিয়াটো নিয়ে আর একটা সিগারেট বানিয়ে, সানগ্লাসে চোখ ঢেকে লাইব্রেরীর বাইরের বেঞ্চিগুলোর একটায় বসে বসে রোদ পোহাতে মনে হয় ভালোই লাগবে। সেটাই বরং করি গিয়ে কিছুক্ষণ।
ভাল থাকেন সবাই। শুভেচ্ছা।
---





কী সোন্দর করে বর্ণনা দিলেন...
আহারে, বৈদেশ যাইতে মঞ্চায়
আইসা পড়েন ব্রাদার। দুই ভাই মিলে প্রচুর ঘুরে বেড়ানো যাবে
পুরাই লাভার বয় হয়ে গেছে বৈদেশ গিয়ে গুল্টু মার্কা চেহেরা নিয়ে
আপনের চেয়েও বেশি?
মন্তব্য করুন