যেসব দিনে সাগরের তলদেশ থেকে উঠে আসার পথে জ্ঞান হারাই
১.
সেসব দিনের ঘোর ভাঙানোর জন্য চারপাশ থেকে ম্যাকলুহানের মিডিয়াম থিওরী, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, লার্নিং এনভায়রনমেন্টে ফেসবুক ব্যাবহার, সাইবার বুলিং এবং কোয়ানটিটেটিভ রিসার্চ মেথডেরা আমায় ফিসফিস করে ডাকতে থাকে, আর অবচেতনে আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সাঁতরে তীরে ওঠার যুদ্ধ চালাই। হুট করে এক সময় বাস্তবে ফিরে আসি। রবার্টের আমাকে বলা একটা কথা মনে পড়ে যায়, You have the loudest whisper of the world!
রোদ ঝলমলে একটা সবুজ দুপুরকে মাঝে মাঝে গ্রাস করে নেয় কালো মেঘেরা। সে সময় আমার বুকে দামামা বাজে, চোখে প্লাবন ডাকে আর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য। অনেক হাতড়ে একটা সিগারেট বানাই। ওটাকে জ্বালিয়ে বাইরে এমনভাবে তাকিয়ে থাকি যেন আমার কোনো অস্তিত্ব এই মহাবিশ্বের কোথাও কখনো ছিল না।
তারপর এক সময় নিজেই হেসে ফেলি। এত আবোল-তাবোল ভাবনা মানুষ কিভাবে ভাবে?
২.
এসপিএসএস মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ শতাংশ অকুপাই করে রেখেছে আজ ক'দিন হলো। নিজেকে মনে হচ্ছে একটা ল্যাপটপ আর যথারীতি মস্তিষ্কটা তার প্রসেসর। র্যামের ওপর চাপ বাড়ছে কারণ ইদানীং ধূমপানের হার আবার বেড়েছে। তবে সব মিলিয়ে সময়ের সাথে তাল মেলানোটা কখনও সহজ, কখনও কঠিন কিন্তু কখনোই অসাধ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা বলতে আসলে তেমন কোনো জায়গায় ছিল না। একেক সময় একেকটা জায়গা প্রিয় হয়ে দাঁড়াতো। ফার্স্ট ইয়ারের দিকে আইবিএ ক্যান্টিনটা ছিল খুবই প্রিয়। ক্লাসের ফাঁকে সুযোগ পেলেই দলবেঁধে চলে যেতাম সেখানে। বিল্লাল আর জয়নাল ছিল সবসময় আমাদের সেবায় নিয়োজিত। ওদেরকে আমরা পছন্দ করতাম এবং ওরাও আমাদেরকে পছন্দ করতো। গিয়ে বসার আগেই গরম গরম চা-সিঙারা-পুরি হাজির হয়ে যেতো।
একই সময়ে মধুর ক্যান্টিনেও যাওয়া-আসা করা হয়েছে প্রচুর। সম্ভবত ফার্স্ট আর সেকেন্ড ইয়ারের পুরো সময়টাই সকালে ঝালফ্রাই খেয়ে কাটিয়েছিলাম। নিতান্ত বিশেষ বন্দোবস্ত না থাকলে সকাল সকাল মধুতে গিয়ে মোস্তফা, রিয়াজ, ঝন্টুসহ অন্য যারা ছিল তাদেরকে বেশি করে পেঁয়াজ দিয়ে ঝালফ্রাই বানিয়ে দিতে বলাটাই ছিল আমার রেওয়াজ। তবে কানাইকে পারতপক্ষে আমি খাবারের অর্ডার দিতে চাইতাম না। ব্যাটার হাইজিন লেভেল খুবই খারাপ। আমি বলছি না যে আমার খুব বেশি রকমের শুচিবাই আছে, জার্মানীতে ডর্মিটরি লেভেলের হাইজিন মেইনটেইন করেও ভালই দিন চলে যায় তবে কানাই বিশাল ব্যাতিক্রম। ওকে নিয়ে যেসব ডার্টি কৌতুক চালু আছে ছেলেমহলে, তার ১০ শতাংশও যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে জীবনে জীবনে যে মাঝে মাঝে ওর বানানো চা এবং ঝালফ্রাই খেতে হয়েছে সেজন্য এখন আমার দুঃখ পাওয়া উচিত। ঝালফ্রাই বানানো হয় ডিম দিয়ে এটা সম্ভবত বুঝতে বেগ পাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না খুব একটা।
তারপর আইবিএ লনের কামরাঙা গাছটার সাথে একবার খুব সখ্যতা হলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কালজয়ী গানটার মতো। মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলেম...। আমরা দু'জন সারাটা দিন হাতে হাত রেখে কামরাঙা গাছটার নিচে বসে থাকতাম।
তারপর গ্যারেজটা খুব প্রিয় জায়গা হয়ে গেল। তারপর হলের রুমগুলোর প্রতি ভালবাসা জন্মানো শুরু হলো। হট্টমন্দির নামের একটা রুম আছে মহসীন হলে। সেখানকার প্রকৃত বাসিন্দারা আমার এত ভাল বন্ধু যে, ওখানে কখনও নিয়মিত না থেকেও নিজেকে ওখানকার একজন নিয়মিত সভ্য ভাবতে অসস্তি লাগে নি কখনও। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনটা ছিল অসাধারণ। পাওয়া, না পাওয়া, সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, বন্ধু, শত্রু- সবকিছুর এক আদর্শ মিশেল।
৩.
তবে মজার বিষয় হলো, এ জীবনের প্রতিটি পর্যায়কেই আমি অসম্ভব রকমের ভালবাসি। আমাকে যদি জিনি এসে জিজ্ঞেস করে, তোমাকে অতীতের যেকোন একটা সময়ে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব। কোথায় যাবে? তাহলে আমি কোনো উত্তর দিতে পারবো না। কোনটা রেখে কোনটাকে নেবো, এমন একটা সমস্যা সৃষ্টি হবে।
যাহোক, জীবন যখন যেমন। দেখি কোথাকার পানি শেষতক কোথায় গিয়ে গড়ায়।
---





মন্তব্য করুন