কিছু বিষয় যেগুলো কেবল আমিই জানি
বন্ধু দেবরাজ সেদিন একটা কথা বলেছিল, আমার সম্পর্কে- 'ও বোধহয় মরে গেলেও বলবে না যে আমি মারা যাচ্ছিলাম'। আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন ওই কথাটা ভাল লাগার কোনো কারণ ছিল না। একটা মানুষ মরে গেলে তারপর সে কিভাবেই বা কথা বলবে? তারপরও কথাটা মনের ভেতর তৎক্ষণাত বিঁধে গিয়েছিল তীক্ষ্ণভাবে। আসলেই কি আমি এমন? নিজেকে কখনো বোঝাতেই পারি নি? কারও কাছে?
একজন মানুষের কথা মনে আছে। যে আমাকে সহজ বাংলায় লেখা একটা খোলা বইয়ের মতো পড়ে ফেলতে পারতো। তার সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম দিনগুলোতেই সে একদিন আমাকে চমকে দিয়েছিল 'তুমি পোলাও-মাংস ইত্যাদির চেয়ে ডাল-ভাত বেশি পছন্দ করো তাই না?'- জিজ্ঞেস করে। কথাটা আমি জানতাম কিন্তু পৃথিবীর আর কেউ জানতো না। সে কয়েকদিনের ভাসা ভাসা মেলামেশায় জেনে গিয়েছিল। তার রকম-সকমই খানিকটা অমন ছিল। কোনোকিছুর জন্যই তাকে বেশি কষ্ট করতে হতো না। সে নিজেও জানতো না যে, সে এমনভাবে মানুষকে কাছে টানতে পারে যে, যাকে কাছে টানা হচ্ছে তার সামনে সম্মোহিতের মতো ওর দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া, অার কোনো বিকল্প পথ থাকতো না।
তার কাছেও আমি নিজের কথা খুলে বলতে পারি নি। আমি যে আসলে কি বলতে চাই, সেটাই জানি না বোধহয়। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার ভেতরে আসলে কি আছে? আই মীন, পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষই কিছু না কিছু একটা নিজের মধ্যে করে নিয়ে আসে, তাই না? তারপর সেটা নিয়েই সে জীবন যাপন করে। শিল্পী তার জীবনটা শিল্পের জন্য উৎসর্গ করে। লেখক করে লেখার জন্য, পরিচালক করে সিনেমার জন্য, সাংবাদিকরা জীবন বিলিয়ে দেয় একটা ভাল রিপোর্টের জন্য। বাট হোয়াট আবাউট মী? আমি আসলে কি করার জন্য পৃথিবীতে এসেছি?
ছাত্রজীবনে প্রথম সারির কোনকিছু ছিলাম না কোনকালেই। মাঝারি মানের ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশে যা কিছু করা সম্ভব করেছিলাম। আমার চেয়ে অনেক কম পেয়েও অনেক সুখের জীবন, অনেক মানুষকে আমি যাপন করতে দেখেছি ও দেখছি। অথচ অন্য অনেকের চেয়ে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি পেয়েও কি যেন একটা ভেতরে ভেতরে আমাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে, সবসময়। কেন যেন কোনোকিছুতে আমি তৃপ্ত হতে পারিনি। এটাই সম্ভবত সত্যি। আমি বোধহয় পুরো সৌরজগতটাকে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেলেও, খুব বেশিক্ষণ সেটা নিয়ে মাতামাতি করতে পারবো না। একসময় কিছু একটা হয়ে যাবে। মানে ঠিক বোরিং লাগার কথা বলছি না। আসলে যে কি হবে তা আমি নিজেও জানি না, তবে একসময় যে আমার মন উঠে যাবেই যাবে, সেটা নিশ্চিত জানি। বুঝতে পারি। আমি টের পাই।
পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মানুষটার সঙ্গে জীবনের বেশ কয়েকটা বছর একসাথে কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। সে আমাকে যেভাবে বুঝতো, সেভাবে আর কেউই বুঝতো না। খুব বাজেভাবে তাকে হারিয়ে ফেলার পর অনেক দিন পর্যন্ত ভেবে বের করার চেষ্টা করেছি ব্যাপারটা কি হলো? ইদানীং এসে বিষয়টা আমার কাছে পরিস্কার হচ্ছে। ওস্তাদ আমার ভেতরে 'তৃপ্ত' হওয়ার সফটওয়্যারটা ইন্সটল করতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে কোনোকিছুতেই আমার আঁশ মেটেনি। এ জীবনে কখনো মিটবে বলে মনেও হয় না। সম্ভবত ২৪/৭ কোকেইন বা মরফিনের মতো কোনো ভয়াবহ মাদক আমার ভেতর নিজে নিজে উৎপন্ন হয় এবং আমাকে হাই করে রাখে।
এনিওয়েজ, মধ্য রাতের এতো আবোল-তাবোল বকবকের কারণ যে আসলে কি, জানি না। কালকের দিনটা গিয়েছে আর দশটা দিনের মতোই। সূর্য ওঠার কয়েক ঘন্টা আগে ঘুমিয়েছিলাম। উঠেছি কয়েক ঘন্টা পরে। সামনে ভিসা রিনিউয়ালের ইন্টারভিউ। সেজন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন রকম কাগজ-পত্র জোগাড় করতে হচ্ছে। আব্বুর কাছ থেকে আবার প্রায় আট লাখ টাকা নিতে হলো। বয়স কম হলো না, কিন্তু এখনও আব্বু-আম্মুই আমার একমাত্র ভরসা। আজও নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানো শিখতে পারলাম না। সেজন্য অবশ্য হতাশও লাগে না। একদিন দাঁড়িয়ে যাবোই, জানি। সেটা নিয়ে চিন্তা হয় না। ভয় পাই তারপর যে আমার আবার ভাল লাগবে না, সে বিষয়টাকে।
যাহোক কাগজপত্র জোগাড়যন্ত্রের এক ফাঁকে মেনসায় লাঞ্চ করেছিলাম। সেখানে কথা হচ্ছিল সিলভিয়া আর ওলিভিয়ার সাথে। আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই স্টুডেন্ট, তবে ওদের মাস্টার্স থিসিস শেষ হয়ে যাবে কয়েক মাসের মধ্যে। তারপর ছোট্ট ইলমিনাউ ছেড়ে পাড়ি জমাবে বড় শহরের পানে। ছাত্রজীবনের এই ছোট্ট গন্ডি পার হয়ে পা দেবে প্রকৃত জীবনের অনন্ত পরিসরে। সে কারণে দু'জনকেই অনেক এক্সাইটেড মনে হচ্ছিল, কিন্তু আমি জানি, জীবন সেখানে এমন কোনো মন্ডা-মিঠাই নিয়ে ওদের জন্য বসে নেই। কারও জন্যই থাকে না। মন্ডা-মিঠাই সব মানুষের ভাল লাগে বলেও মনে হয় না। আবার তার উল্টোটাও কেউ চায় না।
আমি আসলে, মানুষের মূল কাজটা কি, মানে কেন তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে, সেটাই বুঝতে পারছি না। আরও উইয়ার্ড ব্যাপার হলো, আশপাশের মানুষদের দেখলে মনে হয় তারা সবাই জিনিসটা জানে ও বুঝে। আমিই একমাত্র বেক্কল, যে খুব সহজ একটা ইকুয়েশনের শেষ প্রান্তে এসে লক খেয়ে গেছি। একেবারে চায়না লক। কোনোভাবেই খোলা যাচ্ছে না। অদ্ভুত অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখছি ক'দিন ধরে। সেদিন দেখলাম নব্বুই ডিগ্রী কোণে নিচের দিকে নেমে গেছে- এমন একটা রাস্তায় পেনি বোর্ডিং করছি। ভয়ে হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে এবং গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। কারও কাছ থেকে সাহায্যও চাইতে পারছি না। এত ভীষণ বেগে আমি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছি যে, শেষ পর্যন্ত যেখানে গিয়ে বাড়ি খাবো সেখানেই আমার ভবলীলা সাঙ্গ হবে, সে ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে আছি। তবে সেজন্য আমি ভীত নই; বাড়ি খাওয়ার মুহূর্তে যে ব্যাথাটা আমার কপাল, মুখ, নাক, হাত, পা'সহ পুরো শরীরকে সহ্য করতে হবে, সেটা আমাকে বেশি ভীত করে তুলেছে।
এই দেখতে দেখতেই এক সময় গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লাম। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, ঘামে সারা শরীর ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে। এটা এইচআইভি পজিটিভ সমস্যার অনেকগুলো প্রাথমিক লক্ষণের একটা। কথাটা মনে হওয়ায় বেশ খানিকক্ষণ ওই অবস্থাতেই একা একা হেসেছিলাম। মানসিক অবস্থা কেমন থাকলে এবং কোথায় থাকলে, মধ্যরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠার পর একটা মানুষের এই কথাটা সবার আগে মনে পড়ে?
আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়, বাদ দিই। তারচে' বরং ফিরে যাই এমন কোনো সেপ্টেম্বরে, যখন ওর সাথে আমার দেখা হয় নি। ফিরে যাই এমন কোনো শহরে, যেখানে ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা হয় নি। ফিরে যাই এমন কোনো দিনে, যেদিন ওর কথা একবারও ভাবা হয় নি। ফিরে যাই এমন কোথাও, যেখানে গেলে ভুলে যাবো সবকিছু। আর নাহয় এক লাফে পুরো জীবনটা পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাই এর শেষপ্রান্ত, যেখান থেকে ওই নিম্নমুখী সমকোণী রাস্তাটা শুরু হয়েছে।
সেই কৈশোরের মতো করে আজকাল পেপার রাইমের 'অন্ধকার ঘরে' শুনি আর নিজের ওপর নিজেই বিরক্ত হই। এটা আমার কোন অচেনা ভার্সন? কবে আপডেট হলো? কে করলো? কোনো উত্তরই খুঁজে পাই না। প্রায়ই উত্তরের খোঁজে রাত পার হয়ে ভোর নেমে আসে। আমি নিশ্চল, স্থির দৃষ্টিতে শূন্যের পানের চেয়ে থাকি।
একবার কেঁদে ফেলতে পারলে বোধহয় হালকা লাগতো। অনেক ভাল বোধ করতাম। সমস্যা হচ্ছে এই একটা কাজই আছে পৃথিবীতে, যেটা আমি চেষ্টা করেও করতে পারি নি। ভেতরটা কি পরিমাণ ভারী হয়ে আছে, সেটা কাউকে বলে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। দেবরাজের কথাটা যে কি পরিমাণ সত্য, এবং বিষয়টা যে কি ভীষণ কষ্টের, সেটা কেবল আমিই জানি।
---





কমন পড়ছে।
আপনেও পেনি বোর্ডের ফ্যান নাকি বস্?
কেউ কেউ মনে করে জানে, আসলে কেউই জানে না। সবাই দিব্যি অভিনয় কইরা যাইতাছে, কেউ কম আর কেউ বেশি।
অনেকদিন পর পুরোনো ব্লগ পড়তে গিয়ে আমারও একই কথাই মনে হইসে প্রথমে। পরে ভেবে দেখলাম, আসলে তা না। বেশিরভাগ মানুষই জানে ও বোঝে সে কি চায়।
মন্তব্য করুন