সমসাময়িক ভাবনা, মাস্টার থিসিস রান্নার গল্প এবং আরও কিছু ছাইপাশ
ছোটখাটো ঝুট-ঝামেলার মধ্য দিয়ে সময় কেটে যাচ্ছে। যার মধ্যে হাতের চিকিৎসা, খুব দ্রুত একটা কাজ খুঁজে বের করা, থিসিস শুরু করা ইত্যাদি বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। প্রায় কিছুই করা হচ্ছে না অ্যাজ ইউঝুয়াল। শুয়ে-বসে, রান্না করে, ক্লোন ওয়ার্স-স্টার রেবেল-ইত্যাদি দেখে, আর খুব সামান্য পরিমাণ পড়াশোনা করে সময় কাটছে। দরকার ছাড়া রুম ছেড়ে বের হই না দেখে প্রথম দিকে বন্ধুরা অভিযোগ করার চেষ্টা করছিল। তারপর এক সময় বুঝে ফেললাম এখনকার আমিটাকে যারা অভিযোগ ছাড়াই মেনে নিতে পারছে, তারাই প্রকৃত বন্ধু; এখনকার আমিটার। তাদের মধ্যে যারা অন্যান্য সময়ের আমিদেরকেও অভিযোগ ছাড়া মেনে নিতে পেরেছিল, তারা প্রকৃত বন্ধু; সেই প্রত্যেকটা আমির। এবং এভাবে যারা আমার সর্বোচ্চ সংখ্যক ভার্সনের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছে, তারাই আমার সামগ্রিক অস্তিত্বের প্রকৃত বন্ধু। এরকম বন্ধুর সংখ্যা নগণ্য হওয়াই স্বাভাবিক।
আমি নিজে এমন কয়জনের সামগ্রিক অস্তিত্বের প্রকৃত বন্ধু? বোঝা সহজ না। তবে চেষ্টা করা যেতে পারে। গবেষণা চালানো দরকার। নিজের বন্ধু চক্রের ভেতরে। খুব বেশি মানুষের না হতে পারলেও, অল্প কিছু মানুষের যদি প্রকৃত বন্ধু হওয়া যেতো; খারাপ হতো না। তবে আমার অনেকগুলো, বলা যায় প্রায় সবগুলো, অস্তিত্বই যে বিনা বাক্যব্যয়ে একদা মেনে নিয়েছিল, তার ব্যপারে আমার অভিযোগের অন্ত ছিল না। তাই আমি আসলে নিজেকে নিয়ে খুব একটা আশাবাদীও না। হয়তো খুঁজলে দেখা যাবে আমি কারোই প্রকৃত বন্ধু না।
পৃথিবীতে দুই শ্রেণীর মানুষ থাকে। একদল সবসময় সবার কাছ থেকে সবকিছু নেয়, কিন্তু প্রায় কিছুই দেয় না। আরেকদল শুধু দিয়েই যায়, তাদেরকে সহজে কেউ কিছু সাধারণত দিতে পারে না। পরের দলটির আকার খুবই সীমিত। তাই সেই দলে ঠাঁই পাওয়া সহজ না। অনেক সাধনা ও মনোবল একত্র করতে পারলেই কেবল সম্ভব।
এখানে হয়তো একটি প্রশ্ন মনে আসতে পারে, আমাদের অনেকেই তো কারো কারো ক্ষেত্রে শুধুই দাতা, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে শুধুই গ্রহীতা। খুঁজে দেখতে হবে শুধুই দাতা ব্যক্তির দাতা ভার্সনটা গ্রহীতার কয়টা ভার্সনের সাথে একই রকম আচরণ করে। কিংবা শুধুই গ্রহীতা তার দাতার কয়টা ভার্সনের কাছ থেকে কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই যেকোন কিছু গ্রহণ করার মানসিকতা রাখে। তাহলেই বের হয়ে আসবে চূড়ান্ত ফলাফল। হ্যাঁ, অবশ্যই এক ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট ভার্সনের আরেক ব্যক্তির একটি বা একাধিক নির্দিষ্ট ভার্সনের প্রতি বাড়তি দুর্বলতা কিংবা অবহেলা প্রকাশের ঝোঁক থাকবে। কিন্তু উভয়ের সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রাপ্তিসাধ্য ভার্সনের মধ্যে হিসাব-নিকাশ করে একটা ফাইনাল আউটলাইন ড্র করা সম্ভব।
ভবিষ্যতে সময়-সুযোগ পেলে উল্লিখিত বিষয়টার ওপর একটা হাই-প্রোফাইল সোশ্যাল রিসার্চ করবো। তবে আপাতত প্রযুক্তি নিয়েই থাকি। মাস্টার থিসিসের জন্য যে আইডিয়াটা ভাজছি গত ক'দিন ধরে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহে যেটা পরিবেশন করবো প্রফেসরের টেবিলে; সেটার মূলে রয়েছে প্রযুক্তি। গতানুগতিক অনলাইন শিক্ষা-পরিমণ্ডলকে (লার্নিং এনভায়রনমেন্ট) পুরোপুরি ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে সাঙ্গীকরণের প্রতিবন্ধকতাগুলো খুঁজে বের করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে একটা বাংলা রান্না চুলায় চড়ানো হয়েছে। তিন পদের রান্না। এখন আইডিয়ার কড়াইয়ের নিচটা পুড়ে না গেলেই হয়। আর অন্যান্য পদে লবণ, ঝাল ইত্যাদি ঠিক-ঠাক থাকলে প্লাস সব মিলিয়ে খাবারটা একটু সুস্বাদু হলেই- আমাকে আর পায় কে!
যাই হোক, অনলাইন লার্নিং এনভায়রনমেন্ট বিশ্বব্যপী মুকস্-এর (এমওওসিএস) হাত ধরে এখন এগিয়েছে অনেকদূর। স্ট্যানফোর্ডের ভার্চুয়াল ল্যাব সেটাকে নিয়ে গেছে আরও উচুঁতে। এখন এই সবকিছুর ওপরে ছোট্ট পুচকে আমি কন্ট্রিবিউট করার মতো কোনো একটা সলিড জায়গা খুঁজে বের করতে পারবো এবং আমার যা কিছু সাধ্য আছে তা ব্যবহার করে আসলেই তা করে ফেলবো, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। উপরি হিসেবে আমার নড়বড়ে মন তো আছেই। একটা গান ভাল লেগে গেলেও যার সেখান থেকে বের হতে একটা সপ্তাহ সময় লাগে, আর অন্য কিছু ভাল লেগে গেলে তো হলোই!
থিসিস লেখার সময়ও যদি এমন সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে বাক্স-পেটরা গুছিয়ে দেশের ফ্লাইট ধরা ছাড়া আর যে কোন উপায় থাকবে না, তা বিলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। এর মধ্যে আরও আছে যৎকিঞ্চিত অর্থনৈতিক সংকট এবং থিসিস শেষের পরের পর্বটা ট্রাই করার জন্য ভাষাশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ঝঞ্ঝাট। সব মিলিয়ে বিশাল এক ঝড়। দানা পাকছে। খুব দ্রুতই এই ঝড়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং ঝড় শেষে কতদূর সামাল দেয়া গেল সেটা নিয়ে বসতে হবে। আমার একমাত্র ভরসার কথাটা একটুখানি বলেছি একটু আগে, ঝড়টা যে আমি পুরোপুরি পাড়ি দিতে পারবো তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট হলেও টেনেটুনে বিশ্বাস করতে পারছি- এটাই হলো সেই সবেধন নীলমনি। জ্ঞানীগুণী অনেকেই একবাক্যে মেনেছেন যে, নিজের ওপর একটা কিছু নিয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারলে, অন্যকেও সেটাতে বিশ্বাস করানো যায়।
যাই হোক, আসলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই প্রতিনিয়ত ছোট-বড় ঝড়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সবারই সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা চলে নিজের সাথে। এরপর পারিপার্শ্বিকতাসহ অন্যান্য অনুষঙ্গ তো আছেই। একেকটা মানবজীবনের মতো জটিল গল্প আর কোথাও বলা হয় নি। এত জটিলতা সামলানোর পরও যদি আমাদের কেউ সত্যিকার অর্থেই কারও "প্রকৃত বন্ধু" হতে পারে, যেমন প্রকৃত বন্ধুর কথা এ লেখার শুরুর দিকে বলা হয়েছে, তাহলে তাকে মহামানুষ বলাটাই বোধহয় উত্তম হবে। অমন কোনো মহামানুষ যদি আপনি নিজের জীবনে খুঁজে পান, যেকোন চেহারায়- বন্ধু, স্ত্রী, স্বামী; তাহলে তাকে অবশ্যই ধরে রাখার চেষ্টা চালাবেন। বাবা-মা, ভাই-বোন এই তালিকার বাইরে থাকে সাধারণত। রক্তের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মহামানুষ হওয়াটা কঠিন না। যদিও সবাই হয় না বা হতে চায় না। সেটা তাদের ব্যাপার। তবে রক্তের সম্পর্কের বাইরের যারা রক্তের সম্পর্কের মতো বা তার চেয়েও বেশি সম্পর্কিত হয়ে পড়তে পারে, তাদেরকে মূল্যায়নে যেন আমাদের কারও ভুল না হয়ে যায় সেই কামনায়-
বিনীত,
মীর
---





মন্তব্য করুন