ইউজার লগইন

অসমাপ্ত বাস্তবতা... ২

-অ্যাই গাধা, আমি তোকে ভালবাসি, বুঝলি?
-উমম, আই লাভ ইউ ঠু।
-আই লাভ ইউ থ্রি।
-আই লাভ ইউ প্লাস ওয়ান। তুই যে সংখ্যাই বসাবি তার সাথে প্লাস ওয়ান।
-আই লাভ ইউ প্লাস ওয়ান টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি।
-যার মানে হলো শুধু আই লাভ ইউ। হাহাহা।

এটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় দ্বন্দের বিষয়। কে কাকে বেশি ভালবাসে? বছরের পর বছর ধরে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলাম। আজকাল কতো উদ্ভট আজগুবি প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। যেমন; কাক না জোঁক- কে বেশি স্টুপিড, শহরের অধিবাসীদের মধ্যে কার চেহারা ভাল আর কার চেহারা আগলি, কেন সবাইকেই সুন্দর বলে ঘোষণা দেয়া হবে না ইত্যাদি। কিন্তু ওই প্রশ্নটার মতো আর কোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয় না।

আমার ভাগনিটা বড় হচ্ছে প্রতিদিন। ওর সম্পর্কে গভীরভাবে প্রায় কিছুই জানি না। মেসেঞ্জারের দুই প্রান্তে আমাদের দু'জনের বসবাস। ওর গভীর বিস্ময়ভরা চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় বিশাল পৃথিবীর প্রত্যেকটা ছোট-বড় জিনিস ওর কাছে সমান রকম আকর্ষণীয়। সে শুধু দেখছে আর তথ্য সংগ্রহ করছে। ছোট্ট একটা প্রাণ, টিকে থাকার লড়াইয়ে এসে পড়েছে। মা-বাবা, নানা-নানীরা সবসময় সাহায্যের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু লড়াইটা চলাতে হচ্ছে ওর নিজেকেই। বিবর্তনের অনেক সূত্রের প্রমাণ মেলে শিশুদের বেড়ে ওঠা দেখলে।

প্রত্যেকটা দিন পার হয় আশায় আশায়। পরের দিনটায় নিশ্চই কোনো এক জাদুবলে সবকিছু পাল্টে যাবে। কিন্তু পাল্টায় না। সেই প্রতিদিনকার রুটিনমতো সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে কফি আর সিগারেট, কোনো কোনো দিন তার আগে স্পীকারে চালিয়ে দেয়া হয় হিপহপ কিংবা রাগ ভৈরবী কিংবা গার্ডিয়ান্স অফ দি গ্যালাক্সি ভল্যূম দুইয়ের সাউন্ডট্র্যাক। এগুলোই শোনা হয় আজকাল বেশি বেশি। এর বাইরে তেমন কিছু না। মাঝে মাঝে শুনি- মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?

গেল সেমিস্টারের মাঝামাঝি সময় ওই মেয়েটি বলেছিল- সেমিস্টারের শেষে সে এক মাসের জন্য নিজের দেশে যাবে। আমরা সে দিনগুলোতে খুব সময় কাটাচ্ছিলাম, একসাথে। সেই সন্ধ্যায় বিআই ক্লাব থেকে নেয়া হাফ-লিটারের মগ ভর্তি বিয়ার হাতে নিয়ে আমরা দু'জন ফিরছিলাম রুমে। হয়তো বিয়ারের জন্যই, কিংবা জানি না কেন, হঠাৎ আশ্চর্যবোধক কণ্ঠে বলেছিলাম,

পুরা একটা মাস তোমার সাথে দেখা হবে না! কি করে বাঁচবো?

শুনেই সে প্রত্যুত্তরে বলেছিল, আমরা প্রতিদিন কথা বলবো। তখন আমার কেমন যেন খালি খালি লাগছিল বিধায় বলেছিলাম, আমি প্রতিদিন কথা বলতে চাই না।

সেই একটা কনভারসেশনে বোনা ছিল এক বিশাল সম্ভাবনার বীজ। সম্ভাবনা সংকটের। যথারীতি আমাদের দু'জনকে সেই সংকটের মধ্য দিয়ে যেতেও হয়েছিল ভীষণভাবে। দুইটি কুড়ির একসাথে ফুটে ওঠা এবং একসাথে ঝরে পড়া দেখা গিয়েছিল সে সময়। সবশেষে যখন সবকিছু ঠান্ডা হয়ে এসেছিল, তখন আমরা আবার পরিচয়ের প্রথম দিককার মতো বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। মাঝে হাতে গোণা ক'টা মাস যে কেন পাগলের মতো একে অপরকে আমরা আকর্ষণ করেছিলাম, আবার সে আকর্ষণের টান কাটিয়ে ওঠার সংকটের ভেতর দিয়ে গিয়েছিলাম- তাও ভুলে গিয়েছিলাম যখন সবকিছু ঠান্ডা হয়ে এসেছিল।

তারপর কিছুদিন আগে সে আবার সেই আলোচনাটা তুললো- এই সেমিস্টারের শেষেও নাকি কয়েক দিনের জন্য নিজের দেশে যাবে। আমি অবশ্য এবার কিছুই বললাম না। শুধু 'মাত্র না তিন দিন আগে দেশ থেকে এলে' বলে জোক করার চেষ্টা চালালাম। প্রতি সেমিস্টারে একবার করে দেশে যেতে চাইলে তাকে কিইবা আর বলা যায়?

তবে জানতাম এ বিষয়টিতে সে বেশ সংবেদনশীল। দেশে ওর পরিবার-পরিজন তো আছেই। আছে গুচ্ছের বন্ধু-বান্ধব। সমবয়সী। আমার মতো দশের বেশি নয় বয়সের পার্থক্য। ইলমিনাউয়ের মতো অতিমাত্রার শিক্ষামূলক পরিবেশ থেকে বের হয়ে ওখানে গিয়ে সময় কাটানো অবশ্যই অনেক উপভোগ্য। তাই বোধহয় ও-ও তিন দিন আগে দেশ থেকে আসার কৌতুকটা উপভোগ করতে চাইলো না। তবে একটা "স্লীপ-খাওয়া" ধরনের কনভারসেশনকে যে জন্ম নেয়া থেকে বিরত রাখা গেছে তাতেই খুশি হয়েছিলাম আমি।

এই টাইপের কনভারসেশনগুলো জন্ম নিতে মুখিয়েই থাকে সবসময়। তারপর, জাস্ট কয়েকদিনের ভাললাগা, যাকে অনুসরণ করে আসে অবধারিত এক বহুমাত্রিক সংকটের জাল; যেখানে ধরা পড়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না।

যাহোক ইসভি ইন্টারন্যাশনাল উইক পার হলো মাত্রই। গত তিন বছরে সব মিলিয়ে যতোজন বাংলাদেশি দেখেছি, এই এক সপ্তাহে তারচেয়ে বেশি বঙ্গবাসীর দেখা মিলেছে। ভাগ্যক্রমে একদিন সবার সাথে বসে ডিনারও করার সৌভাগ্য হয়েছিল। ভাল লেগেছে অনেক।

ওই একটা সপ্তাহকে কেন্দ্র করে ইলমিনাউ পাল্টে গিয়েছিল পুরোপুরি। সবসময়ই হয়। আর তারপর সপ্তাহটা পেরিয়ে গেলেই, আমরা ফিরে যাই নির্ঝর নৈঃশব্দের নির্জন অরণ্যে। এখানে নতুন কোনো রবিন হুড ফিল্মের শুটিং হলে খুব ভাল হবে। শেরউড অরণ্যটাকে আমি যেভাবে কল্পনায় এঁকেছিলাম, এখানে ঠিক সেভাবেই সেটা গড়ে উঠেছে।

তবে আমি চিরকাল এখানে থাকতে চাই না। খুঁজে পেতে চাই আজন্ম হাতছানি দেয়া সমুদ্রটাকে। অপেক্ষমান জাহাজের মাস্তুলগুলোকে। সত্যি কোনো এক তুমুল ঝড়ের রাতে তোমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব নিরাপদ ভাবতে চাই। দিগন্তছোঁয়া নীল জলরাশি যতোই দুরুদুরু কাঁপন তুলুক বুকে, সেখানে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকতে চাই তোমাকে।

কে কাকে কতোটা ভালবাসি, সেটা নিয়ে দ্বন্দের মতোই আমাদের আরেকটা খুব প্রিয় নিত্যদিনের দ্বন্দের বিষয় ছিল- আমরা কোথায় লাঞ্চ করতে যাবো। সেটা নিয়ে আগেও অনেক জায়গায় কথা হয়েছে, সামনে আরও কথা হবে। আজ বরং বিছানাটা ছাড়া যাক। খুঁজে নেয়া যাক প্রিয় কফির মগটাকে। শুভেচ্ছা সবাইকে।

---

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!