অসমাপ্ত বাস্তবতা... ৪
খেয়াল করে দেখেছি, যখন আমি কোনো বিষয়ে সত্য মতামত প্রকাশ করি, হোক না সেটা অতিতুচ্ছ; কেবল তখনই আমি সেটাকে পছন্দ করি। যেমন কেউ যদি জিজ্ঞেস করে 'কেমন আছো?'; আমি উত্তরটা দেয়ার আগে ভাবার চেষ্টা করি, আসলে কেমন আছি। ভাল থাকলেই কেবল 'ভাল' বলে ভাল বোধ করি। ভাল না থাকলে 'ভাল' বলি না। এমনকি যদি জানিও, যে জিজ্ঞেস করেছে, তার কাছে আমার ভাল থাকা না থাকার গুরুত্ব খুব বেশি না; তারপরও নিজের জন্য আমি সৎ থাকি।
ঠিক তেমনি কনভারসেশনের ক্ষেত্রেও, যতক্ষণ একটা আলোচনা সৎ পথে থাকে, আমরা নিজেদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে মতামত দিই; ততক্ষণ সেটাকে আমার ইন্টারেস্টিং লাগে। যখনই নিজেকে কিংবা অন্য কাউকে মিথ্যা, বানোয়াট বা আরোপিত মতামত দিতে দেখি, তখন আর ইন্টারেস্ট পাই না। আসলে অনেস্ট কনভারসেশনের মতো ইন্টারেস্টিং আর কিছু নেই। তাই একটা আলোচনায় আমি অংশ নেবো কিনা এবং অংশ নিলে আমার ভাল লাগবে কিনা, সেটা নির্ধারণের জন্য সময় নিই। বোঝার চেষ্টা করি কনভারসেশনটা কতোটা অনেস্ট। অন্যদের কাছে সেটা কতটুকু জরুরি আর কতটুকু জরুরি না, তাতে কিছুই আসে-যায় না।
যে জিনিসটা পছন্দ করি, সেটা হচ্ছে সহজে প্রেমে পড়তে পারা। কারও মধ্যে একটা কোনো বিশেষত্ব টের পেলেই হয়েছে। আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। এই প্রেম অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্লেটনিক। এক্ষেত্রে অবশ্য 'প্রেম' শব্দটির ব্যবহারে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থেকে যায়। আসলে আমার সাথে যা ঘটে তা হচ্ছে- মুগ্ধতা গ্রাস করে।
এ দিকটাকে পছন্দ করি কারণ মানবজীবনের দৈর্ঘ্য সীমিত। মন খুলে হাসার, ভালবাসার, এবং মানুষের জন্য সত্যিকারের কিছু করার জন্য খুব বেশি সময় আমাদের বরাদ্দ করা হয় নি। এই সীমিত জীবন আবার পাইও আমরা মাত্র একবারের জন্য। কোন মানে হয় এই জীবনকে রাগ, ক্ষোভ, হতাশা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি দিয়ে ভরিয়ে রাখার? তারচেয়ে মানুষের প্রতি ভালবাসা যতো বেশি চর্চা করা যায় ততোই তো ভাল, তাই না?
যাক এ ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো সংকটেরও জন্ম দেয়। বিশেষ করে মুগ্ধতা যদি কোনমতে কেটে যায়, তখন দেখা দেয় আসল সমস্যা। সম্ভবত আফ্রিকান কিংবা দক্ষিণ আমেরিকান একটি বাগধারা রয়েছে এমন-
কারও প্রতি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দয়ালু হওয়াটা ঠিক না। কেননা একটা সময় আসবে যখন তুমি আর তার প্রতি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দয়া দেখাতে পারবে না। তখন সে ব্যক্তিটি তোমাকে ঘৃণা করবে।
এটা কিন্তু আমি একাধিকবার ঘটতে দেখেছি নিজের সাথে। বাগধারাটির ভেতরেই কিন্তু এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী এবং কি করে এ ধরনের ঘটনা এড়িয়ে বাঁচা সম্ভব- সবকিছুর উপায় বাতলে দেয়া আছে।
বগুড়ার গালাপট্টিতে আমার নানাবাড়ি। বাড়ির সামনে এক বিশাল মার্কেট। মূলত সোনা কেনা-বেচা, গলানো, নতুন গয়না তৈরি- ইত্যাদি হয় সেখানে। সোনার গয়না যখন এসিডে ছেড়ে খাদমুক্ত করা হয়, তখন সেটা দেখার মধ্যে আলাদা মজা আছে। না পুড়িয়ে সোনাকে খাঁটি করা সম্ভব না। আমরা মানুষেরাও কি একই রকম? যতই পুড়ি, ততই খাঁটি হই? আমারতো তাই মনে হয়।
আমি যখন আজ থেকে সাত-আট কিংবা তারও বেশি বছর আগে বাংলা ব্লগে লেখা-লেখি শুরু করি তখন মনে হতো, ৩৫ বছর সাহিত্যচর্চা করলে একটা বই লেখার যোগ্যতা আমার হবে। আজকাল মনে হয়, অতোদিন লাগবে না। যে গতিতে জীবন চলছে, আর আমার অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে, তাতে আর কিছুদিন পরই একটা বই লিখে ফেলা সম্ভব হবে।
সমস্যাটা হলো, প্রতি বছর বাংলা ভাষায় প্রচুর বই লেখা হচ্ছে। যার অধিকাংশের নামই মানুষের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অর্থাৎ অধিকাংশেরই তেমন কোনো উপযোগ নেই। নিজেও একটা বই লিখে সেই উপযোগহীন বইয়ের ডিপোকে ভারী করতে চাই না। সে কারণেই মনে হয় আমায় আরও অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।
তবে ব্লগে কিংবা ফেসবুকে (সম্প্রতি পেন্সিলে) কেন লিখি সে ব্যাপারে এখন আমি বোধহয় আরেকটু পরিস্কার ধারণা রাখি। এটা মূলত জীবনের সাথে যা ঘটছে তার ট্র্যাক রাখার একটা প্রাইভেট কৌশল। এখানে আমার অভিজ্ঞতাগুলো জমছে ভালোভাবেই। বাকি যেটা দরকার, সেটা হলো একটা এমন কিছুর অপেক্ষা যেটা প্রত্যক্ষ করার পর বিস্ময়ে আমার মাথার খুলি উড়ে যাবে। অন্ধ হয়ে যাবে দু'চোখ। অনুভূতিহীন হয়ে পড়বে ইন্দ্রিয়গুলো এবং অসাড় হয়ে যাবে পুরো শরীর। তখন ঘটনাটা নিয়ে অবশ্যই আমি একটা বই লিখবো। আমার ছোট্ট জীবনে অতোবড় কোনকিছু আসলে এখনো ঘটে নি।
বইটা কোনদিন লেখা হলে সেটিকে উৎসর্গ করা হবে পৃথিবীকে। এই অসামান্য গ্রহটা তার বুকে আমায় একটা জীবন যাপনের সুযোগ দিয়েছিল। দুঃখ-আনন্দে ভরা, হাসি-কান্নায় ঠাসা, অসমতল কিন্তু উর্বর একটা মানবজীবন। মিথ্যে বলবো না, কখনো কখনো এই জীবনকে এতোটা কষ্টকর লেগেছে যে হতাশারা মাত্র এক সেন্টিমিটার দূরে ছিল তাদের গন্তব্যের। আমাকে সবসময়ই অনেক কষ্ট করতে হয়েছে সেখান থেকে ফিরে আসার। তবে সত্যি বলতে কি, এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হই নি। সামনে কোনো একদিন হয়ে যাওয়ার আগে যা কিছু করে যেতে চাই তার মধ্যে অবশ্যই একটা বই লিখে যাওয়ার বিষয়টা থাকবে।
তবে যদি নাও পারি, আমার ব্লগটাতো থাকছেই। সেখানে খুঁজলে অবশ্যই আমাকে পাওয়া যাবে। আমার জীবনটা কেমন ছিল, আমি কিভাবে ভাবতাম, কি করতাম, কি করতে চাইতাম- ইত্যাদি থেকে নিয়ে খাদ্যাভ্যাস, জীবন ধারণের ছোট-খাটো কৌশল সবই লিপিবদ্ধ আছে সেখানে। সেসব লেখায় যদিও ভুল বানান আর ব্যাকরণগত ত্রুটি রয়েছে। ছেলেবেলায় বাংলা দ্বিতীয় পত্রে কখনোই খুব বেশি ভাল ছিলাম না কিনা।
তবে আমি অখুশি না। মানুষের জীবন তো সঠিক আর ভুলেরই সংমিশ্রণ। ঠিকঠাকভাবে নিজের সংকটগুলোকে তো এখন পর্যন্ত চিহ্নিত করতে পারছি। সেসব থেকে উত্তরণের পথ চিন্তা-ভাবনা করে বের করতে পারছি। মাথার ওপর একটি ছাদ রয়েছে। ঘরের কলে ঠান্ডা পানি রয়েছে। এরচেয়ে বেশি আর চাওয়ারই বা কি আছে?
---





মন্তব্য করুন