অসমাপ্ত বাস্তবতা... ১০
রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে এ ক'দিনে অসংখ্য লেখা পড়া হলো। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে অনেক খবরই দেখলাম। বিচার-বিশ্লেষণে যেতে চাচ্ছি না, কিন্তু বিষয়টিকে আর পাঁচ-দশটা স্বাভাবিক ইস্যূর মতোই নিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। কোনো কোনো দিন রোহিঙ্গা গণহত্যার খবর বিবিসির লিড হচ্ছে, আবার খানিক পরেই ওটা নেমে যাচ্ছে। উঠে আসছে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোনো খবর। সিএনএন, আল-জাজিরারও একই অবস্থা। মানুষের প্রাণের মূল্য কতোটা কমে গেলে গণহত্যার মতো একটা বিষয়কে পাশে সরিয়ে রেখে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংবাদ নিয়ে অধিক মাতামাতি হতে পারে?
দেশিয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রথম পাতায় রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে খবর ছাপা হচ্ছে প্রতিদিন। আমি কল্পনায় দেখতে পারি, নিউজরুমগুলোতে সন্ধ্যার ব্যস্ততায় হয়তো কোনো ভারিক্কি বার্তা সম্পাদক বা সিনিয়র সাব-এডিটর হাঁক দিচ্ছেন "আজ রোহিঙ্গাটা কে করছে"? কোনো এক জুনিয়র হয়তো কম্পিউটারের মনিটর থেকে মাথা তুলে উত্তর দিচ্ছে, আমি ভাই কিংবা আমি আপা। নিউজরুমের এমন বেশ কিছু সর্বজনীন হাঁক-ডাক আছে। যেমন দেশের ধর্ষণের ঘটনাগুলো সাধারণ একজন সাব-এডিটর দেখে- যাতে একই খবর দুইবার প্রকাশিত না হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা মেট্টোপলিটন এলাকার বাইরের ধর্ষণের খবরগুলো। সে কারণে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়ই নিউজ রুমে কোন না কোন রসিক বার্তা সম্পাদক বা সিনিয়র সাব-এডিটর "অ্যাই, আজ ধর্ষণ কে করছে রে?" বলে হাঁক দিয়ে থাকেন।
আমাদের গণমাধ্যমগুলো চলে কিছু ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্য দিয়ে। ক'বছর কাজ করলে সেসব কাজ সম্পর্কে কাজ চালানোর মতো জ্ঞানার্জন কঠিন কিছু নয়। এমনকি একটা মিডিয়া চালিয়ে নেয়ার মতো জ্ঞানার্জনও সম্ভব। শুধু চোখ-কান খোলা রাখলেই সম্ভব। কিন্তু আমার মনে হয়, যাদের চোখ-কান খোলা রাখা সবচেয়ে বেশি দরকার সেই সংবাদিকদের চোখ-কানই সবচেয়ে বেশি বন্ধ আজ। তাই গণহত্যা, ক্রিকেট খেলা, সিনেমার নায়িকারা কে কোথায় সেলফি তুললো আর গরুর মাংস কিভাবে ভুনা করলে খেতে কেমন লাগবে- এই সব নিয়েই আজকালকার পত্রপত্রিকা ভরা হচ্ছে দেদার। পত্রিকায় সরকারি দলের লোকদের মধ্যে থাকছেন ওবায়দুল কাদের এবং বিরোধী দলের লোকদের মধ্যে ফখা ইবনে চখা- প্রায় প্রতিদিন। এই ফর্মূলায় দেশে প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে শত শত প্লেট। মুদ্রণযন্ত্রের ভেতর দিয়ে সেই প্লেট থেকে প্রিন্ট হয়ে আসছে লক্ষ লক্ষ ব্র্রডশীট। কানাকড়িও মূল্য নেই সেই কোটি টাকার বিনিয়োগের। প্রতিদিন দেশের সংবাদিক সমাজ উৎপাদন করছেন কোটি কোটি শব্দ। কিন্তু বিশাল এই সমাজের উৎপাদন কোনো কাজেই লাগছে না দেশের।
গণমাধ্যমে আমরা লগ্নিও করছি প্রচুর। কিন্তু কি কাজ হচ্ছে? আমাদের দেশে কি গণমাধ্যম আসলেই কোনো কার্যকর ভূমিকায় আছে? কোনো সামাজিক উন্নতি ঘটিয়েছে? মানুষকে কোনোকিছুতে সচেতন করতে পেরেছে? জনমত গড়ে তোলায় কখনো গঠনমূলক কিছু করতে পেরেছে? একটা সময় গণমাধ্যমের একটি রিপোর্ট প্রকাশ না হলে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের টনত নড়তো না বলে, ভুক্তভোগীরা ঘুরতেন পত্রিকা অফিস আর টিভি চ্যানেলের দুয়ারে দুয়ারে। সেটা ছিল শূন্য দশকের ঘটনা। বিগত দশকে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক প্রসার দেখেছি। আজকাল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল না হতে পারলে কর্তাব্যাক্তিদের টনক নড়ে না। কিন্তু আসল কাজের বেলায় সবই ঠন-ঠনা-ঠন। এমন না যে একটা ইস্যু একবার ভাইরাল হলে বা পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হলে, সেটি দেশ থেকে দুর হয়ে যায়। কখনোই না। দুই দিন পর আবারও ঘুরে ফিরে 'যেই লাউ সেই কদু'। মানুষের মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন বলতে কিছু আসে না।
২০১৩ সালে ফেব্রুয়ারিতে যখন দেশ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত 'রাজাকারদের' সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে উত্তাল, সে সময়ও গণমাধ্যমের
মূল ভূমিকা ছিল দ্বিধা ছড়ানো। এক পত্রিকায় খবর আসছে "শাহবাগে গণজোয়ার দানা বাঁধছে" তো আরেক পত্রিকায় খবর আসছে "শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি"। সব পত্রিকা আবার স্ট্যান্ডে সাজানো থাকছে পাশাপাশি। মানুষ যারা স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বা চলার পথে এক পলক পত্রিকাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে, তারা জানেও না কত গোপনে তার মনটা টুইস্ট হয়ে গেল। দু'টো পরস্পরবিরোধী শিরোনাম তার মাথায় ঢুকে গেল, এখন তাকেই সিদ্ধান্তটা নিতে হবে যে আসলেই কি হচ্ছে শাহবাগে! অথচ পত্রিকাগুলোর দায়িত্ব ছিল সত্যটাকে কোনো দুধ-চিনি না মিশিয়ে কাঁচা সত্য হিসেবেই তুলে আনা। টিভি চ্যানেলগুলোর দায়িত্ব ছিল একদল টক-শো পেশাধারী বুদ্ধিজীবী না গড়ে, নিজেদের কন্টেন্ট আর কোনদিকে ডেভেলপ করা যায় সেদিকে মন দেয়া। কিছুতেই কিছু হয় নাই। আমরা পড়ে রয়েছি অন্ধকূপেই।
তাই আজও রাজধানীতে খোলা হাওয়ায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীর চর্চা করতে পারি না আমরা। গার্হস্থ্য অর্থনীতির বইয়ে মেয়েদের বলা হয়, মেয়ে তুমি আরও বেশি মেয়ে হয়ে নিজের মেয়ে জন্মকে ঘেন্না করো। নিজের আত্মসম্মানকে বাড়তে দিও না আর। আমরা ভাল কোনোকিছুই গ্রহণ করতে পারি না। রোহিঙ্গারা আসছে তাদের সর্বস্ব হারিয়ে, আর আমাদের লোকজন তাদের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিচ্ছে অবলীলায়। যেন কিছুতেই ওদের কিছু যায় আসে না। নিজের মা-বাবার সাথে একই ঘটনা ঘটলেও ওদের নিষ্ঠুর চোখের পলক পড়বে না।
আসলে আমার একান্তই ব্যক্তিগত একটা মত হচ্ছে, আমরা জাতিগতভাবে ভীষণ অপরাধপ্রবণ এবং ধূর্ত। সুযোগের অভাবে আমাদের অনেকেই হয়তো ভাল মানুষ, কিন্তু সত্যিকারের পরীক্ষায় আমাদের খুব কম লোকই পাশ করবে। এর পেছনে অবশ্যই অনেক কারণ আছে। দারিদ্র, বেকারত্ব, অশিক্ষার মতো প্রকৃত সমস্যা যেমন আছে, তেমনি ঈর্ষা, লোভ, কাম- ইত্যাদির মতো চিরকালীন মানবিক সংকটও আছে। এই সব নিয়েই আমরা টিকে আছি। যদিও সময়ে সময়ে বোঝা যায়, এই টিকে থাকা অনেকাংশেই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক মোড়ল গোষ্ঠীর ওপর।
মোড়ল গোষ্ঠীকে সিরিয়া কিংবা ইরাক ধ্বংস করতে যে কষ্টটুকু করতে হয়েছে, আমাদেরকে ধ্বংস করতে তার কিছুই করতে হবে না। সামান্য মিয়ানমার চাইলেই যে আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তাকে কতোখানি কাঁচকলা দেখাতে পারে, সেটা এখন সবার চোখের সামনে। ওদের দেশের সংকটকে চাইলো তো আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিলো। বাংলাদেশ চাইলে কি পারতো নিজেদের কোনো সমস্যাকে এভাবে সীমানাছাড়া করতে?
আমরা খুব খারাপ আছি। এই খারাপ থাকাকে ফ্র্যাব্রিকেটেড করে ফুটানি করছি। এরকম চলতে পারে না। কিছু একটা করা জরুরি। ভীষণ জরুরি বুঝছেন? বুঝতে পারলে শুরু করে দেন কিছু একটা করা। নাহলে সবাইকে নিয়ে ডুবতে হবে অবধারিতভাবে।
---





মন্তব্য করুন