ভালিটোভা নদীর তীরে
রাত এগারোটার সময় গাড়ির মালিক যখন আমায় জিজকভ টেলিভিশন টাওয়ারের নিচের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল, তখন আশপাশে একটা খোলা দোকান কিংবা মানুষ কোনোকিছুই ছিল না। চারদিকে ভিনদেশি ভাষায় লেখা সাইনবোর্ড দেখে ঠিক কোথায় এসেছি ঠাহর করা যাচ্ছিল না। শুধু জিজকভ-এর লোগোটা পড়া যাচ্ছিল। আগেই জানতাম ওখান থেকে কাছেই আমার দুইদিনের প্রাগ সফরে থাকার জায়গা।
গাড়ি থেকে নেমে চালক সহস্র ধন্যবাদ আর শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোনের রোমিং সার্ভিসটা চালু করলাম। আশপাশে ম্যাকডনাল্ডস্-এর কোনো শাখা আছে কিনা ইতিউতি তাকালাম। নেই। বন্ধ হয়ে গেছে সবকিছুই। হয়তো শহরের কেন্দ্রের দিকে খোলা পাওয়া যাবে দোকান-পাট, হোটেল-রেস্তঁরা, নিদেনপক্ষে ওই ২৪ ঘন্টার ছোট ও ঘিঞ্জি দোকানগুলো। ওইসব দোকানে হালকা খাবার, পানীয় সবই পাওয়া সম্ভব, কিন্তু ফোনে ইন্টারনেট চালু হলে পর জানতে পেলাম, আমার তাৎক্ষণিক অবস্থান থেকে শহরের কেন্দ্রটি ঠিক হেঁটে পাড়ি দেবার দুরত্বে নয়। রাতটি কোনমতে কাটিয়ে কাল সকালে খাদ্যের সন্ধানে বের হওয়া যাবে বলে নিজেকে প্রবোধ দিলাম।
আমার থাকার জায়গাটি ঠিক জিজকভ টাওয়ারের পাশেই ছিল বলে গাড়ির চালক আমায় ওখানে নামিয়েছিল। নাহলে গাড়িতে ভাগাভাগি করে যাতায়াতের এ ব্যবস্থাগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত শহরের কেন্দ্র বা মূল বাস টার্মিনালের কাছাকাছিই কোথাও সহযাত্রীকে বরণ করে নেয়া বা বিদায় জানিয়ে দেয়া হয়। এ ধরনের ভাগাভাগি করে যাতায়াতের ফলে শুধু যে অর্থ সাশ্রয় হয় তা নয়, নতুন নতুন মানুষের সাথে চেনা-জানার জন্যও "লং-ড্রাইভ" একটি দূর্দান্ত বিকল্প, বিশেষ করে যারা তেমন একটা মিশুক প্রকৃতির মানুষ নন, তাদের জন্য।
আমার থাকার জায়গাটি থেকে দুইটা ট্রাম পাল্টে শহরের কেন্দ্রে যেতে হয়, তবে সেটা বড় কোনো অসুবিধা নয়। আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী, প্রাগের ট্রাম চলাচলের সময়সূচি এবং ট্রামের লাইনগুলোর ডিজাইন ইউরোপের সবচেয়ে সহজ ডিজাইনগুলোর একটি। তিনটা লাইন, এ, বি, সি; প্রথমটা শহরের ভেতরে একটা ছোট বৃত্ত, দ্বিতীয়টি শহুরের এলাকার প্রান্ত ঘেঁষে একটি বৃহতাকার বৃত্ত এবং শেষেরটি এবং মহনগরীর শেষপ্আন্ত ঘেঁষে আরও বড় একটি বৃত্ত। এই তিন লাইনে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর একটি করে ট্রাম ঘুরছে। শহরের একদম বাইরে চিড়িয়াখানা বা বিনোদন পার্কের দিকে যেতে চাইলে সর্বশেষ লাইনের ট্রামে অর্থাৎ সি লাইনের কোনো ট্রামে উঠে বসতে হবে, আর বাকি দু'টো লাইন দেখে-শুনে গন্তব্যস্থলের কাছে কোনটি সে বিবেচনায় ব্যবহার করতে হবে। যেমন গন্তব্য যদি হয় শহরের কেন্দ্র, ফ্যাশন স্ট্রীট, ভালিটোভা নদীর ওপরের সেতুগুলো বা অন্যান্য জনপ্রিয় আকর্ষণীয় জায়গাগুলো হয় তাহলে সাধারণত এ বা বি লাইনের কোনো একটায়। যারা প্যারিস, বার্লিন বা লন্ডনের ট্রাম বা সাবওয়ে ব্যবহার করেছেন যাতায়াতের জন্য, তারা জানেন কতো কঠিন বিজ্ঞান এই সহজ বিষয়টিতে ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব।
একটা কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি। দূর থেকে দেখতে গ্রামের ছোট্ট কুঁড়েঘরের মতো লাগে। সেই বাড়ির চিলেকোঠায় রয়েছে একটি ঘর। বাড়ির মালিক একজন কাউচ-সার্ফার। নিজের বাড়ির একটা ঘরও ছেড়ে দিয়ে রেখেছেন কাউচ-সার্ফারদের জন্য। সেদিন আমাদের প্ল্যানটা যে মুহূর্তের হয়েছিল, সে মুহূর্তে এই বাড়িটার অ্যাডটাই সর্বপ্রথমে এসে বসেছিল, সার্চরেজাল্টের লিস্টিটায়।
বাড়ির মালিক একাই থাকেন। পয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছরে এক জাঁদরেল বাসচালক। নাম মার্টিন হোরভিচ। তার বাসে করেই ওই এলাকায় যাই নি। তবে তিনিও বাস চালান। ইন্টারনেটের প্রতি ভয়াবহ আসক্ত। বাস চালানো ছাড়া আর যে একটি মাত্র কাজ তিনি করেন তা হলো সারাদিন কম্পিউটারের মনিটরের সামনে বসে থাকা। শুধু বসে থাকা বলা যায় না, রীতিমতো ডুবে থাকা। তবে কাজের সময় কোনো স্মার্ট যন্ত্র সাথে নেন না তিনি। কাজের সময় কাজ, খেলার সময় খেলা। অনেকটা এমনই তার চিন্তার ধারা। আমাদের সাথে অবশ্য বেশ প্রাণ খুলে কথা বলেছিলেন। তবে খুব বেশি সময়ের জন্য নয়।
আমাদের দু'জনের থাকার জায়গা, রান্নাঘর, টয়লেট, সবই ছিল দোতলায়। মার্টিন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়িটা দেখালো। বাড়ির ইতিহাস শুনে দু'জনই অবাক হলাম। সেই ১২৫৭'র বোহেমিয়া-বাভারিয়ান যুদ্ধে পরাজিত হবার পর কিংডম অব বোহেমিয়ার রাণী নির্বাসিত হয়েছিলেন ওই বাড়িটিতে। সে সময় থেকে নানা হাত ঘুরে, নানা ইতিহাসের অংশীদারীত্ব বগলদাবা করে এখনও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট ওই দোতলা বাড়িটি। তার চকচকে খয়েরি রং আর কোণায় কোণায় লালের আভা দেখে কে বলবে বাড়ির বছর প্রায় হাজার হতে চললো।
সেদিন গভীর রাতে ওই বাড়ির দোতলার বারান্দায় পাশাপাশি দু'টি হাতে বোনা বেতের চেয়ারে বসে, আকাশের তারা দেখতে দেখতে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই গভীররাতে প্রাগ শহরের পথে একদম হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা নেয়া হয় নাই। ওটা প্রথমরাতেই করার খুব দরকার ছিল। কেননা পরের দিন রাত হওয়ার আগেই শহরের অনেক কিছুই চেনা, জানা, দেখা হয়ে যাবে জানতাম আমরা। যেই মুহূর্তে প্ল্যানটা হচ্ছিল, সেই মুহূর্তেই কাজটা করার কথা ঠিক করে রেখেছিলাম কিন্তু ঘুমের কারণে সেই পরিকল্পনাটা অসম্পূর্ণই রয়ে গিয়েছিল।





মন্তব্য করুন