শুধু শোবার ঘরের পালংকটা নিজের গড়া নয়
তারপর বহুদিন কেটে গেল। বসফরাসের জলে জাহাজে করে সে ভাসে নি একেবারেই আর। জেলি ফিশেরা যেসব জাহাজকে তাড়া করে ফিরতো আর গাঙচিলেরা উড়ে বেড়াতো পাশ দিয়ে যেসব জাহাজের- সেসবে চড়ে সুলতান মেহমেত সেতুর নিচে দিয়ে কৃষ্ণসাগরের মোহনা পর্যন্ত চলে যাবে, প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে নিজেকে একদিন। জীবননানন্দের মতো করে বলেছিল, আবার আসিবো ফিরে। কিন্তু ফেরা হয় নাই কখনো আর। সন্ধ্যার মায়াবী আলোয় জাদুকরী সেই প্রণালীটির পাশে বসে গরম ধোঁয়া ওঠা টাটকা বাকলাভার স্বাদ নেবে আরও একবার- এমনটা যেদিন ভেবেছিল ছেলেটা, সেদিন জানতোও না সে একদিন চিনি কিংবা চিনি দিয়ে তৈরি সবরকমের খাবার বর্জন করবে চিরতরে।
মাঝে মাঝে অবশ্য সে এখনও বসে ভাবে; কি করে পাড়ি দিয়ে ফেলল এই জীবনরুপী দুর্গম গিরি কান্তার মরুর সমাহার? রবীঠাকুর, জীবনানন্দ, নজরুল, সুনীল, শক্তি, শীর্ষেন্দু, সমরেশ, হুমায়ুন আজাদ, আহমেদ, ছফা আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বদান্যতায় পড়া ক'টা বিদেশি ক্লাসিক, ক'টা সেবা প্রকাশনীর অনুবাদ আর ছায়াসাহিত্য, টিনটিন, চাচা চৌধুরী কমিকস্- এর বাইরে বকলম চিরবৃদ্ধ এক বিচূর্ণ কিশোর কোনদিন হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারলো না তার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের স্বপ্নের কুড়েঁঘর। পারলো না কারও জন্য অকিঞ্চিৎকর এ জীবনটা বিলিয়ে দিতেও। নিতেই চায় নি কেউ কখনো। শেষতক একা একা মাথা নিচু করে পৃথিবীর সীমানা পাড়ি দিতে হয়েছিল তাকে।
দুঃখটা তার সেখানে ছিল না। যাদেরকে সে ভালবেসেছিল, তাদের কাছে খুব কিছু আশা না করলেও, নিজের কাছে নিজের জন্য খানিকটা সম্মান আর ভালবাসা আশা করেছিল সে। সেটুকুই পাওয়া হয় নি কখনো। কি করে কি করে যেন, নিজেই সবচেয়ে দুরের মানুষ হয়ে উঠছিল সে তার।
একটা সময় দিনটা ছিল দু'খের
একটা সময় দিনটা ছিল স্যাড
একটা সময় দিনটা ছিল কষ্টের
একটা সময় দিনটা ছিল ব্যাড।
সেই সময়ে একটা প্রজাপতি
রোজ সকালে ভাঙলে পরে ঘুম
ফিকফিকিয়ে হেসেই হতো খুন
ঘুমের মাঝে শান্তি ছিল অতি।
ঘুম ভেঙে আজ সুখী প্রজাপতি
হাতড়ে পালংক, বালিশ দেখে ঠিকই
দেখে না আর চড়ুই পাখির জোড়া
দেখে না আর ডালিম গাছে
রোজ সকালের সূর্যালোকিত বাতি।
চড়ুই জোড়া আছে আজও চড়ুই জোড়ার মতোই
সূর্যিমামাও শুদ্ধ পথে ঘুরছে তা থৈ তা থৈ
একমাত্র প্রজাপতিটাই এখনও গভীর রাতে
বালিশগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাতে।
বুকের মাঝে হালকা হালকা ঢাকের শব্দ হয়
ঘুমের আগে খানিকটা ক্ষন জড়িয়ে রাখে ভয়।
একটা সময় দিনটা ছিল দু'খের
এখন আর সে দিনটা দু'খের নয়
একটা সময় দিনটা ছিল কষ্টের
এখন আর তা নয় যে কষ্টকর।
প্রজাপতির সবই এখন
নিজের হাতে গড়া,
শুধু শোবার ঘরের পালংকটা
নিজের গড়া নয়।
---





মন্তব্য করুন