আধ্যাত্মিক মন
বছর চারেক আগে মেজচাচা ফোন করে জানালেন যে চাচী সন্তানসম্ভবা। শুনে পরিবারে এক ধরণের খুশী আর উত্তেজনার ঢেউ বয়ে গেল! কারণ বাবা ছিলেন পরিবারের বড ছেলে এবং আমাদের দু'ভাইয়ের জন্মের অনেক বছর পর প্রথমবারের মতো কোন সন্তান আসতে যাচ্ছিল চাচাদের পরিবারে।
সবাই তখন চাচীর ছেলে হবে না মেয়ে হবে সেটা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করতে লাগল। আমি এসব থেকে একটু দূরেই ছিলাম। একদিন খাবার টেবিলে বসে মা ফস করে আমাকে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা তোমার কি মনে হয়, তোমার চাচার ছেলে হবে না মেয়ে?"
আমি এক সেকেন্ডও দ্বিধা না করে বললাম, "মেয়ে ।" বলে আমি নিজেই অবাক! এতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিভাবে বললাম? মা-ও কিছুটা অবাক হল।
যাই হোক, দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল কয়েকটা মাস। চাচীর সন্তান পৃথিবীর আলো দেখতে পেল। সৌভাগ্যবশত সন্তানটা ছিল মেয়ে। আমার ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গেল। তবে এটা নেহায়েতই কাকতালীয় ঘটনা। একজন বলল ছেলে হবে, আরেকজন বলল মেয়ে হবে, দু'জনের একজন তো সঠিক না হয়ে যায় না। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।
অন্য দিনের কথা, ট্রেনে করে ঢাকা যাচ্ছিলাম। ট্রেন ছাড়ার আগমূহুর্তে কয়েকটা উঠতি বয়সের ছেলে খুব হৈ-হুল্লোর করতে করতে ট্রেনে উঠল। একজন এসে ধুপ করে বসে পড়ল পাশে। ঠিক তখনই বিদ্যুত চমকের মতো আমার মনে হল যে ছেলেটার নাম "R" দিয়ে শুরু। ছেলেটাকে জীবনে কখনও দেখিনি, তারপরও কিভাবে এমন একটা কথা মনে হল কে জানে!
আমি খুব বিনীতভাবে ছেলেটাকে বললাম, "এক্সকিউজ মি, আমি কি আপনার জানতে পারি?"
ছেলেটা হেসে বলল, "আমার নাম রনি!"
আমি মোটামুটি একটা ধাক্কা খেলাম। আমার মধ্যে কি তাহলে সুপারন্যাচারাল কোন পাওয়ার এসে ভর করল?
তারপর এই রকম ছোটখাট ঘটনার পুণরাবৃত্তি ঘটতেই থাকল। গুরুত্বহীন সব তথ্য আমার মাথায় ভর করে হঠাৎ হঠাৎ, তথ্যগুলো সত্য হয়ে যায়। মোটামুটি ইগনোর করেই যাচ্ছিলাম।
গতকালের কথা। এক বড়ভাই তার এক কাজিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন আমাকে- "শোনো, এ হল টগর। আমার কাজিন। চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে।"
আমি টগরের দিকে তাকিয়ে বললাম, "টগর ভাই, আপনি কি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ছেন?"
টগর তো অবাকই, আমি তার চেয়েও বেশি অবাক। টগর বলল, "আপনি কিভাবে জানলেন?"
তাই তো! আমি কিভাবে জানলাম? মিলিয়ন ডলার'স কোয়েশ্চন!
শেষের ঘটনাটা ঘটার পর আমি ইন্টারনেটে অনেক্ষণ ধরে সার্চ করলাম এই বিষয়ে। Yahoo Answers এর সাইকোলজি ফোরামেও প্রশ্ন করলাম। অল্প-বিস্তর যা জানতে পারলাম, তাও বিস্ময়কর।
ভবিষ্যতে ঘটে যাওয়া ঘটনার পূর্বাভাস পাওয়াকে বলে Precognition বা Premonition। শুধু আমি একাই যে প্রিমনিশনের শিকার, এমন নয়। পৃথিবীর অনেক মানুষ, অনেক খ্যাতিমান মানুষেরও প্রিমনিশন হয়েছিল। American Psychological Association এমন অনেক ঘটনার রেকর্ড রেখেছে। এই যেমন আব্রাহাম লিংকনের ঘটনা। একবার আব্রাহাম লিংকন স্বপ্ন দেখেন যে তিনি হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেছেন। সেখানে সবাই খুব বিষণ্ণ মুখ করে বসে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- কি হয়েছে এখানে? একজন উত্তর দিল- আমাদের প্রেসিডেন্ট মারা গিয়েছেন। এই স্বপ্ন দেখার ঠিক দশদিন পর, ১৮৬৫ সালের ১৫-ই এপ্রিল তিনি মারা যান।
ইংরেজ কবি টেনিসন একবার স্বপ্ন দেখলেন যে রাণী ভিক্টোরিয়ার স্বামী এলবার্ট তার হাতে চুমু খাচ্ছে! পরদিন তিনি বৃটিশ রাজপরিবার থেকে চিঠি পেলেন, তাকে দেশের সেরা কবি হিসেবে রিকগনিশন দেওয়ার জন্য একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রাজপরিবার, সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তাকে।
আরেক কবি শেলি মারা গিয়েছিলেন খুব অল্পবয়সে, ভূমধ্যসাগরে ডুবে। মৃত্যুর আগে তিনি স্বপ্ন দেখেন যে তার কয়েক বন্ধু রক্তাক্ত অবস্থায় এসে তাকে বলছে, "বাড়িটা তো পানির নিচে ডুবে গেল!"
বিজ্ঞানীরা একেকজন একেকভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রিমনিশনের। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত যেটা আছে,সেটা হল অনেকটা এরকম-
আমাদের প্রত্যেকের মস্তিস্কের স্বতন্ত্র কাজ করার ধরণকে বলে কগনিটিভ বায়াস,কোন ঘটনা বা সম্ভাবনা বাছাই করাটা হল সিলেকশন বায়াস। আমাদের আশেপাশের ঘটনাগুলোর একটা প্যাটার্ন খুঁজে বের করে মস্তিস্ক। তারপর সেই প্যাটার্ন অনুসারে বিভিন্ন সম্ভাবনাকে বাছাই করে।যেমন-আপনার মনে হল আজ আপনার মা আপনাকে ফোন করবেন,দেখা গেল সত্যই করেছেন। আরেকটু ইনভেস্টিগেইট করে দেখতে পেলেন যে,মাসের প্রথম রবিবারগুলোতে আপনাকে আপনার মা ফোন করে। আপনার অজান্তেই মস্তিস্কে প্যাটার্ন তৈরি হয়ে আছে!
এভাবেই বিভিন্ন ঘটনার Prediction করতে করতে মস্তিস্কের দক্ষতা বেড়ে যায়,ছোটখাট সিম্পটম দেখেই মস্তিস্ক ধরতে পারে কি হতে চলেছে। আমাদের কাছে এ বিষয়টাই প্রিকগনিশন হয়ে ধরা দেয়। পুরো ব্যাপারটা হল যুক্তি এবং গাণিতিক হিসেবের জটিল খেলা। আধ্যাত্মিক কিছু নেই এখানে।
এই ব্যাখ্যাটা পাওয়ার পর আমি নিজেই আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে ফেলি। এই যেমন প্রথম ঘটনাটায় আমি চাচীর সন্তানের জেন্ডার ধরে ফেললাম। ব্যাখ্যাটা হল- Theory of Probability, সম্ভাব্যতার সূত্র। পর পর দু'টো ছেলে এসেছে আমাদের বংশে, চাচীরটা তিন নম্বর। সুতরাং সম্ভাব্যতার সূত্রানুসারে তিন নম্বর সন্তানটা মেয়ে-ই হওয়ার কথা।
ট্রেনে যে ছেলেটার নাম R দিয়ে শুরু, সে ছেলেটা বেশ হৈ-হুল্লোর করতে করতে আসছিল। তার বন্ধুরা হয়তো তার নাম ধরে ডেকেছিল দুয়েকবার, অবচেতন মন নামটা শুনেছে, তারপর চেতন মনে পুরো নামটা না পাঠিয়ে নামের প্রথম অক্ষরটা পাঠিয়েছে শুধু।
আর চিটাগাং ইউনিভার্সিটির ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তখন হয়তো ঐ সিনিয়র ভাইয়ের ছবি সাবকনশাস মাইন্ড টুকে রেখেছিল, তাই সহজেই চিনতে পেরেছিলাম ওনাকে।
যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি,পৃথিবীতে যুক্তি ছাড়া কিছু ঘটে না। তারপরও যখন এই ধরণের ঘটনাগুলো ঘটে, তখন একটু ভয়-ই লাগে। বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার ভয়, বড্ড বড় ভয়!
শেষ কথা হল, আমি অতি আগ্রহের সাথে পরবর্তী প্রিমনিশনের অপেক্ষায় আছি। প্রিমনিশন হবে আর আমি একটা ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে ফেলব। Logic and nothing more....





সিম্পলী অথচ স্মার্ট একটা ব্লগ পোস্ট পড়লাম!
লেখা অব্যহত রাখেন!
ধন্যবাদ, রাখব ইনশাল্লাহ!
সিম্পলী অথচ স্মার্ট একটা ব্লগ পোস্ট পড়লাম!
আপনিও?

মন্তব্য করুন