খরার পরে বৃষ্টি (পর্ব-১)
উৎসর্গ –অনিমেষ রহমানকে, আমাদের নাগরিক জীবনের চারপাশের জটিল চাল চিত্র সাবলীল ভাবে উঠে আসে যার লেখনিতে।
সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। অমিয় বাসা থেকে বের হয়ে অনেকক্ষণ রিকশার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় দু-একটা রিকশা দেখা গেলেও একটাও যেতে রাজি হচ্ছে না। আজকাল রিকশাওয়ালাদের যে কি হয়েছ! কোথাও যেতে চায়না। বৃষ্টি না থাকলে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হেঁটেই যাওয়া যেত, কিন্তু এই বৃষ্টিতে হেঁটে গেলে ভিজতে হবে। রাস্তায় কয়েক জায়গায় পানি জমে আছে। প্রায় ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করার পর অবশেষে একটা রিকশা পাওয়া গেল।
বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখে লোকে লকারণ্য। বাস, ট্যাক্সি বা সিএনজি কিছুই নেই। মেজাজটা আরও খারাপ গেল। এমনিতেই সারাদিনই শহর জুড়ে যানজট লেগে থাকে, তার ওপর আজ বৃষ্টি হওয়াতে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। দিন দিন আমাদের শহরটা যেন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে !
দুই ঘণ্টা যুদ্ধ করে অমিয় অফিসে পৌছাল।
অফিসে এক গাদা কাজ জমে আছে, লাঞ্চের আগেই শেষ করতে হবে। বিকাল দুইটায় এমডি সহ বনানীতে একটা মিটিং আছে। কিছুক্ষন পর চা এসে যায়। অমিয় চায়ে চুমুক দিতে দিতে কাজে ডুবে যায়। হঠাৎ এমডি’র রুমে ডাক পড়ে-
-শোন, আজকের মিটিং এর সময়টা পিছিয়েছে। বিকাল পাঁচটায়। প্রয়োজনীয় পেপারস সহ তৈরি থেকো।
-জি স্যার।
নিজের টেবিলে এসে বসে পড়ে অমিয়, মনটা আবারও খারাপ হয়ে গেল। আজ ঠিক করে রেখেছিল রূপার সাথে দেখা করতে যাবে, হল না। পাঁচটায় মটিং শুরু হলে কখন যে শেষ হবে কে জানে ! আজ এক সপ্তাহ হল রূপা বাসা ছেঁড়ে চলে গেছে। মোবাইল বন্ধ, বাসার ল্যান্ড ফোনে ফোন করলে রিসিভ করে না। ভীষণ ক্ষেপেছে। এবার চাকরি না ছাড়লে রূপাকে হারাতে হবে, ভাবল অমিয়। বাসায় গিয়ে যে দেখা করবে তারও উপায় নেই। পুরা সপ্তাহ জুড়ে অফিসে এত কাজ যে রাত এগারোটার আগে অফিস থেকে বেরুতেই পারেনি অমিয়। চাকরিটা সত্যিই ছাড়তে হবে দেখছি! আগে সংসার বাঁচাও, পরে চাকরি।
এমনিতে খুব শান্ত মেয়ে রূপা কিন্তু রেগে গেলে ওকে সামলানো বেশ মুশকিল। এই যে বাসা ছেঁড়ে চলে গেছে, অমিয় জানে নিজে থেকে না আসলে ওকে ফেরানো সম্ভব নয়। যে করেই হোক রূপার মান ভাঙ্গাতে হবে। অমিয় এও জানে যে রূপা ওর উপর রাগ করে বেশী দিন থাকতে পারবে না। ভার্সিটি জীবনে ছয় বছর সম্পর্কের পর অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা পেড়িয়ে রূপাদের পরিবারের অসম্মতিতে ওদের এই বিয়ে। অনেকদিন থেকেই এই চাকরির ছাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে রূপা, কিন্তু এই ট্রেডে যেখানেই চাকরি করুক না কেন কাজের চাপ থাকবেই। অমিয় অনেক বোঝালেও রূপা কখনই এই ব্যাপার গুলো বুঝতে চায়না।
বনানীতে মিটিং শেষ হতে রাত আটটা বেজে গেল। এখন আবার অফিসে ফিরে দুবাইতে পুরা মিটিং এর আপডেট জানিয়ে রিপোর্ট করে তবে বাসায় ফিরতে হবে, রাত কয়টা বাজবে কে জানে ! রাস্তায় বেড়িয়েই পড়ল জ্যামের মুখে। বনানী থেকে মহাখালী ফ্লাই ওভার দিয়ে ফার্মগেট হয়ে ধানমণ্ডি আসতে একঘণ্টা লেগে গেল। সব কাজ শেষ করে রাত এগারটায় অফিস থেকে বের হল। বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত বারটা।
একা বাসায় ফিরে কিছুই ভাল লাগে না অমিয়র। ভিতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আজ এক সপ্তাহ ধরে মেয়েটাকে দেখে না। অমিয়র তিন বছরের মেয়ে আদৃতা। যত রাতই হোক, বাবা না ফেরা পর্যন্ত তার জেগে থাকা চাই। অমিয় বাসায় ঢুকতেই কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সারাদিন মায়ের সাথে থাকেলেও ঘুমের সময়টাতে যেন বাবাকে না হলে তার চলেই না। এ ক’দিন ধরে মেয়েটাকে না দেখে অমিয়র খুব খারাপ লাগছে। বিছানায় শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুম থেক উঠে দেখে সকাল এগারোটা বেজে গেছে, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। আজ রূপার ওখানে যেতে হবে, যে করেই হোক বুঝিয়ে শুনিয়ে ওকে নিয়ে আসতে হবে। বসকে বলে ছুটি নিয়েছে আজ। গোসল করে রেডি হয়ে বের হতে হতে প্রায় বারটা বেজে যায়। এই সময় রাস্তায় তেমন জ্যাম থাকে না। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে ওর ভুল ভেঙ্গে গেল। প্রচুর লোকের ভিড়, সেই তুলনায় বাসের সংখ্যা কম। পিড়াপিড়ি করে বাসে ওঠার চেয়ে একটা রিকশায় উঠে পড়ে অমিয়। রিকশায় চড়তেই ওর বেশী ভাল লাগে। একটা স্বাধীন স্বাধীন ভাব, বাতাস খেতে খেতে যেদিকে খুশি যাও, নিজের মত করে। আসাদ গেট এসে রিকশা ছেঁড়ে দিতে হল, এই রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ। একটা খালি সিএনজি অটোরিকশা দেখে এগিয়ে গেল-
-শান্তিনগর যাবে?
-যামু, দুইশ টাকা লাগবো
-দুইশ টাকা কেন, তোমার মিটার নাই ?
-মিটারে যাই না বলে অমিয়কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল সিএনজিওয়ালা, যেন মিটারের কথা বলে সে মহা অন্যায় করে ফেলেছে।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আরেকটা সিএনজি দেড়শ টাকা চাইলে আমিয় কোন কিছু না বলেই উঠে পড়ে। শান্তিনগর মোড়ে এসে মিষ্টি ও কিছু ফলমূল কিনে এগিয়ে যায় শশুরালয়ের দিকে। দশ তলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় জামিল সাহেবের ফ্ল্যাট। অমিয়র অবশ্য খুব একটা আসা হয় না এখানে। বিয়ের পাঁচ বছর হলেও জামিল সাহেব এখনো মন থেকে মেনে নিতে পারেননি অমিয়কে, অমিয়ও অবশ্য প্রয়োজন ছাড়া পা মাড়ায় না এদিকটায়।
-এক্সকিউজ মি! কার বাসায় যাবেন? গেটের ভিতরে ঢুকতেই সিকিউরিটির লোকটা জিজ্ঞেস করল। আগেরবার অমিয় এই লোকটিকে দেখেনি, সম্ভবত নতুন এসেছে।
-বি-৬
-আপানার নাম ?
-অমিয়
-একটু দাঁড়ান প্লিজ। বলে সিকিউরিটি রুমে চলে গেল লোকটি। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল- যান। সম্ভবত ফোনে কথা বলে উপর থেকে সম্মতি নিয়ে এসেছে।
অমিয় লিফটে চলে আসে। এই ব্যাপারগুলো ওর কাছে খুব বিরক্তিকর লাগে। শ্বশুর বাড়ি আসতে যদি এত ফরমালিটিজ পালন করতে হয় তাহলে তো বিরক্তি আসারই কথা ! ষষ্ঠ তলায় এসে কলিং বেল দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর অল্প বয়সী ছেলে দরজা খুলে দিল। অমিয় ড্রয়িং রুমে অনেকক্ষণ বসে থাকার পর রূপা আসে, কোন কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে-
-কেমন আছ ?
-ভাল। কেন এসেছ? কথা শুনে মনে হচ্ছে রূপা এখনো রেগে আছে।
-অমিয় হাসে। আসবো না ! আমার বউ বাচ্চা যেখানে আছে, সেখানে ইচ্ছে না থাকলেও তো আসতে হবে।
-বউ বাচ্চা দিয়ে তোমার কি হবে ? আমাদের নিয়ে কোন ভাবনা আছে তোমার ?
-কি বলছ! তোমাদের নিয়ে আমি ভাবি না ! তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে ?
-না, আমাদের নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না, তুমি তোমার অফিস নিয়েই থাক।
-তোমার ফোনটা অফ করে রেখেছ কেন?
-ফোন ব্যবহার করতে আমার ভাল লাগে না।
-আমি প্রতিদিন কতবার তোমাকে ফোন করেছি! বন্ধ পেয়েছি। তোমাদের ল্যান্ড ফোনও ধরনি।
-বলেছি না ফোনে কথা বলতে ভাল লাগে না, তুমি কেন এসেছ বল।
-আদৃতা কোথায় ?
-আদৃতা নিপার সাথে বাইরে গেছে।
-রূপা, বাসায় চল।
-না, আমি যাব না, তুমি চলে যাও বলে ভিতরে চলে যায় রূপা। অনেকক্ষণ একা ড্রয়িং রুমে বসে থাকার পর বের হয়ে আসে অমিয়।
একটু পরে রূপা ড্রয়িং রুমে এসে দেখে অমিয় চলে গেছে। এতক্ষন রূঢ় ব্যবহার করার জন্যে মনটা খারাপ হয়ে যায়। এই দুপুর বেলা ও না খেয়েই চলে গেল! এই বাসায় ওর কোনদিনই ঠিকমত আদর যত্ন হয়নি। এই কারণেই অমিয়ও পারতপক্ষে এদিকটায় আসতে চায় না। যতই রাগ দেখাক, রূপা জানে অমিয়কে ও কতটুকু ভালবাসে!
(চলবে)





লেখা ভাল পাইলাম।
ধন্যবাদ তানিম ভাই।
চলুক সাথে আছি।
দুই জনের লেখার কমেন্ট করলেন, "সাথে আছি।"

ভাই কি আমাগো সাথে নাই!!!! !
সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ, অনি’দা

সুন্দর লাগছে...
বেশ ভালো লাগলো... স্বপ্নচারী

ধন্যবাদ নিকোলাস, ভাল থাকুন।
ভালো লাগছে। পরের পর্বের অপেক্ষায়।
ধন্যবাদ
চলুক...
দুই একটা বানান ভুল বাদে অনেক ভাল লেগেছে।
মন্তব্য করুন