অন্ধকারের আলো
মেয়েটি দরজা খুলতেই ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম ! এ কাকে দেখছি আমি ! আমার মুখের দিকে চোখ পড়তেই যেন নিজেকে লুকাতে রুমের ভিতরের দিকে দৌড়ে পালালো ও। আমিও কিছুটা ইতস্থত বোধ করছিলাম, রুমের ভিতরে ঢুকবো কি ঢুকবো না ভেবে কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশেষে ভিতরে প্রবেশ করলাম। ও তখনও আমার দিকে পিছন ফিরে নিজেকে লুকাতে ব্যস্ত।
আমারও তখন একই অবস্থা। আমরা কেউই ভাবিনি এই পরিবেশে এভাবে আমাদের দেখা হবে ! অনেকক্ষণ পর আমিই মুখ খুললাম। কেমন আছ পরী! পরী আড়ষ্ট ভঙ্গিতে আমার দিকে ঘুরে নীচে তাকিয়ে ছিল, লজ্জা ও সংকোচে আমার দিকে তাকাতে পারছিল না। আমি দেখতে পেলাম ওর চোখ দুটো ভেজা ! অনেকক্ষণ পর ও বলল- আমি তো ভাই কচুরিপানা, স্রোতের তোড়ে এখানে ভেসে এসেছি, আপনাকে এখানে দেখব ভাবি নাই !
আমি কোন জবাব খুঁজে পেলাম না, কি করে বলি প্রায়ই আমার পা পড়ে এ পাড়ায় ! আমাকে প্রায়ই গাড়ির ট্রিপ নিয়ে ঢাকায় আসতে হয়, তখন মাঝে মাঝেই ঢু মারি এখানে ! পরী’কে কেন জানি এ কথা বলতে পারলাম না! আমার কৌতুহল হচ্ছিল ও কিভাবে এখানে এসে পড়ল ! স্বেচ্ছায় নাকি কেউ জোড় করে এখানে এনেছে! ওকে যতটুকু দেখেছি তাতে স্বেচ্ছায় এখানে আসার মেয়ে ও না, কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারলাম না! আমরা দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
পরী’ই নিরবতা ভাঙল। মতিন ভাই, আপনার খুব জানতে ইচ্ছা করে আমি কি করে এখানে এলাম, তাই না ! কি করবো ? মুর্খ মেয়েমানুষ ! আমার ভাগ্যই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে! পোড়া কপাল নিয়ে যার জন্ম তার জন্য সুখতো সোনার হরিণ! সুখের সংসার আমার কপালে সইলো না, তাইতো এখন হাজার মানুষের জন্যে সুখের পসরা সাজাই !
দেখ পরী, আমি জানিনা তুমি কিভাবে এখানে এসে পড়লে কিন্তু আমি এটা বিশ্বাস করি না তুমি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছো! তবে একটা ব্যাপার আমি ঠিক মিলাতে পারছি না, কি এমন হয়েছিল যে তোমাকে বাড়ি ছেঁড়ে চলে আসতে হল ! শুনলাম ফজল ভাই নাকি তোমাকে অনেক জায়গায় খুজেছে ! তুমি ফিরে যাও পরী ! পরী আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে- তা আর হয় না মতিন ভাই, আমি কাউকে ঠকাতে পারবো না, আমার জন্যে অন্য কারো জীবন নষ্ট হোক তা আমি চাই না। ওরা ভাল থাকুক।
কিছুক্ষণ পর পরী নিজে থেকেই বলতে শুরু করে ওর এখানে আসার কাহিনী। মায়ের কথামত অন্তুর বাবা আমাকে ঘর থেকে বের করে দিলে সারারাত ঘরের বাইরের বারান্দায়ই কাটিয়ে দেই। পরদিন আর সেখানেও ঠাঁই হয় না ! তাড়িয়ে দিলে একেবারেই চলে আসতে বাধ্য হই। পা ধরে কত কাঁদলাম! আমার বুকের মানিকরে কেড়ে নিয়ে আমাকে চলে আসতে বাধ্য করল। আমার অপরাধ কি ছিল জানেন ? আমি জানতে চাইলে ও বলল- থাক, আপনার মন খারাপ হয়ে যাবে ! এবার আমার কৌতুহল যেন বেড়ে যায়! আমি বললাম- মন খারাপ হয় হোক, তুমি বল। ও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলে আমার অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে যায় ! “ঐ যে আপনি আমাকে পরী বলে ডাকতেন !” - ও বলল। আমি খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম-মানে ! ওরা ধরে নিয়েছিল আপনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক আছে ! আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে থাকে, আমার জন্য এতকিছু ঘটে গেল আর আমি কিছুই জানলাম না ! শুধু পরী নামে ডাকার জন্য এত সমস্যা হবে জানলে আমি কখনই ওকে এ নামে ডাকতাম না ! নিজেকে প্রচণ্ড অপরাধী মনে হল। কেন আমি ওকে পরী নামে ডাকতে গেলাম ! নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্যে নিজেকে আমি কখনো ক্ষমা করতে পারবো না। নগন্য মানুষ আমি, কি করে বুঝবো এই সামান্য দুষ্টুমিতে কারো এতবড় ক্ষতি হয়ে যাবে ! ফজল ভাইয়ের সাথে ভাল সম্পর্কের কারণে ভাবী হিসেবে মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে ওকে পরী বলে ডাকতাম !
ওর কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। আবার শুরু করল ও- আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো ভেবে পেলাম না, বাবা-মা না থাকায় মামার সংসারে মানুষ, সেখানে গিয়ে তাদের বোঝা আর বাড়াতে চাইলাম না। তাই ষ্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। ষ্টেশনে কয়েক ঘন্টা কাটানোর পর ঢাকামুখী একটি বাসে উঠে বসি। ঢাকার কাছাকাছি আসতেই পাশে বসা এক মহিলা বিভিন্ন প্রসঙ্গে আমার সাথে আলাপ করতে চাইলে প্রথমে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকেছি, কোথায় যাব জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম আমার যাবার কোন জায়গা নেই। তিনি যেচে আমাকে আশ্রয় দিতে চাইলে আমি যেন অনেকটা স্বস্তি খুঁজে পাই। তার সাথে সাথে আশ্রয়ের জন্যে এখানে এসে পড়ি। এখানে আসার পর বুঝতে পারি কত বড় ভুল করে ফেলেছি, কিন্তু ততক্ষণে আমার ফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আমি চিরদিনের মত সমাজ থেকে ছিটকে পড়ি ! আজ চাইলেও আর ফিরে যেতে পারবো না আপনাদের সমাজে !
এই পরিস্থিতিতে আমার ঠিক কি করা উচিৎ বুঝে উঠতে পারিনা, ওকে কিছু বলার মত ভাষা খুঁজে পাই না। কিছু কিছু ভুল হয় যা কখনো শোধরানো যায় না, সারা জীবন সে ভুলের বোঝা বয়ে বড়াতে হয়। আমার সামান্য ভুলে এই নিষ্পাপ মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে গেল ! এর প্রায়শ্চিত্ত কি কোন ভাবে সম্ভব ! আমার হতবিহ্ববল অবস্থা দেখে পরীই পরিস্থিতি সহজ করে তুলল। মতিন ভাই, আপনি কি ভাবছেন আপনার জন্যেই এমন হল ! আমি কাউকেই দোষ দেই না, ধরেই নিয়েছি এটা আমার নিয়তি। আমার অন্তু কেমন আছে জানেন ? ওর জন্যে বুকের ভিতরটা সারাক্ষন পোড়ে ! কাউকে বলতে পারি না, ওর মুখটা সারাক্ষণ চোখে চোখে ভাসে, কতদিন ওকে দেখিনা ! বলে ঢুকরে কেঁদে ওঠে পরী !
অনেকক্ষন চুপ থাকার পর আমি বললাম- এক সপ্তাহ আগে আমি বাড়ি থেকে এসেছি, ফজল ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল। ও তো আমার সাথে স্বাভাবিক আচরনই করল ! বলল- মনটা ভাল নেই ! ছেলেটার নাকি শরীর খারাপ। আমার কথা শুনে অস্থির হয়ে ওঠে পরী। কি হয়েছে আমার অন্তু’র ! বললাম-ঠিক কি হয়েছে ফজল ভাইও জানে না, ঠিকমত চিকিৎসা করাতে পারছে না। মনে হল টাকা পয়সার সমস্যায় আছে!
আমাকে বসিয়ে রেখে পরী রুম থেকে বেড়িয়ে যায় এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই আবার ফিরে আসে। আমার হাতে রুমালে মোড়ানো একটা পুটলি ধরিয়ে দিয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে মতিন ভাই এই টাকাটা অন্তুর বাবাকে দিয়ে অন্তুর চিকিৎসা করাতে বলবেন। দয়া করে শুধু আমার নামটা বলবেন না। ফজল ভাই জানতে চাইলে কি বলব ? বলবেন আপনি ধার হিসেবে দিচ্ছেন, পরে শোধ করে দিলেই হবে। আর কষ্ট করে আমারে ওর অবস্থাটা একটু জানাতে পারবেন ? আমি এক সপ্তাহ পর আবার আসবো বলে সেদিনের মত ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
পরীর ওখান থেকে চলে আসার কয়েক দিন পর আমি গ্রামে ফিরে আসি। ফজল ভাইয়ের উপর প্রচন্ড রাগ হওয়া স্বত্তেও শুধুমাত্র পরীর কথা ভেবেই তার সাথে দেখা করে টাকাটা দিয়ে দ্রুত অন্তুর চিকিৎসা করাতে বললাম। পরীকে দেয়া কথা রাখতে ওর নামটাও গোপন রাখলাম। ফজল ভাই আমার হাত ধরে ঢুকরে কেঁদে উঠলেন। বড় অন্যায় করে ফেলেছি, আজ বুঝতে পারছি- নাজমার কোন দোষ ছিল না ! আমি ওর কথার কোন জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করলাম না তবে আমার ভিতরে অপরাধবোধ থেকে একটি তাড়না অনুভব করলাম আর শুধু সে করণেই সেদিনই ওদের সাথে করে নিয়ে এসে অন্তুকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিলাম। পরদিন ঢাকা ফেরার পথে হাসপাতালে গিয়ে জানলাম ছোট্ট একটা অপারাশন করলেই অন্তু ভাল হয়ে যাবে। অমি কিছুটা স্বস্তি বোধ করলাম এই ভেবে যে, অন্তত পরীকে কিছুটা হলেও মানসিক শান্তি দিতে পারবো !
ঢাকা ফেরার একদিন পর আমি আবার পরীর সাথে দেখা করার জন্যে গেলাম, এই ক’দিনে পরী যেন অনেকটা শুকিয়ে গেছে, চোখের নীচে কালশিটে পড়েছে, ও যেন আমার আশায়ই পথ চেয়ে ছিল ! আমি জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছ নাজমা ভাবী ! ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল- খাচায় বন্দী পাখি, কতটা আর ভাল থাকি বলুন ! আমি ওকে অন্তু’কে হসপিটালে ভর্তির খবর দিলাম। দেখলাম ওর চোখ দুটো চিক চিক করছে। ও বলল- আমার ছেলেটা হসপিটালে ভর্তি আর আমি একটু দেখতেও পারবো না ! এ অবস্থায় কোন মা’কে কিভাবে সান্ত্বনা দিতে হয় আমার জানা নেই, আমি শুধু বললাম- চিন্তা করোনা ভাবী, অন্তু ঠিক হয়ে যাবে।
আমি মনে মনে আজ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছিলাম। পরীকে এখান থেকে উদ্ধার করে নতুন জীবন দানে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতবদ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু অন্তুর জন্যে ওর মনের অবস্থা দেখে আজকের মত ও প্রসঙ্গ আর তুলতে পারলাম না। তাই ওখান থেকে বেরুনোর জন্য ওকে বললাম-সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, আমাকে আজ রাতেই আবার ট্রিপ নিয়ে ফিরতে হবে। আজ আর সময় নাই নাজমা ভাবী, আগামী সপ্তাহে আমি আবার আসবো। পারলে সদর হাসপাতালে গিয়ে একবার তোমার অন্তুকে দেখে এসো। বেড়িয়ে আসার আগে লক্ষ্য করলাম ওর চোখ দুটো তখনও টলমল করছে ! ও শুধু বলল- মতিন ভাই, নাজমা মরে গেছে, এখানে আমি পরী নামেই পরিচিত।
আমার আর কিছুই বলার থাকে না, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ি। বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি, আমি সেই বৃষ্টির মধ্যেই ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকি। কখন যে নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে বুঝতে পারি না। বৃষ্টি থাকাতে অবশ্য অশ্রু লুকানোর কোন প্রয়োজন পড়ে না। বৃষ্টির মধ্যেই আমি হাঁটি আর দেখি শহর জুড়ে ব্যস্ত মানুষের পদচারণা, সবাই ছুটছে যে যার গন্তব্যে। এদের মধ্যেই কেউ হয়ত আমারই মত ছন্নছাড়া আবার কারো বুকে হয়ত জমে আছে অনেক অব্যক্ত ব্যথা, তাদের মধ্যেই কেউ কেউ হয়ত একেকজন-নাজমা ! আমি ফিরতে থাকি আমার গন্তব্যের দিকে আর মনে ভাসতে থাকে পরীর শেষ কথাগুলো। মনে মনে ভাবি- পরী নামের আড়ালেই হারিয়ে গেল গ্রামের সহজ সরল গৃহবধু-নাজমা !
একটানা কয়েকদিন হসপিটালে কাটানোর পর আজ বাড়ি ফিরছে অন্তু। এই ক’দিন শুধু বাবা ছাড়া আর কাউকেই কাছে পায়নি সে। বাবার সাথে হসপিটালের গেটে দাঁড়ানো একটা রিক্সায় উঠলো সে। গেট থেকে কিছুটা পথ এগিয়ে মোড় ঘুরলেই বাড়ির দিকের রাস্তা। সেই মোড়েই ওদের অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি নারীমুর্তি, তার দৃষ্টি রিক্সাটির দিকেই নিবদ্ধ। কালো বোরখার আড়ালে নারীমুর্তিটির ভিতরে তখন চলে শুধুই রক্তক্ষরণ ! পাশ দিয়ে মোড় ঘুরবার সময় রিক্সাটি তার এত কাছে চলে আসে যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারে! বুকে পাথর চেপে অনেক কষ্টে দমন করে তার সেই ইচ্ছা ! বাবার কোলে চড়ে অন্তু এগিয়ে যেতে থাকে বাড়ির পথে, সে জানতেও পারে না- পিছনে তারই জন্যে অশ্রুর বন্যায় ভাসছে এক মমতাময়ী ! রিক্সাটি চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত নারীমুর্তিটি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে স্টেশনের দিকে, একসময় মিলিয়ে যায় পথচারীদের ভিড়ে !





ভালো লেগেছে...
ধন্যবাদ
ভাল থাকুন।
ভালো লেগেছে...
দমবন্ধ করা লেখা।
দমটা আছে, না গেছে...
দূর্দান্ত....
থ্যাঙ্কু টুটুল ভাই।
ভয়াবহ ভাল, কবিতা থেকে গলপ ভাল লিখেন আপনি
আরো চাইইই
ধন্যবাদ কমেন্টের জন্যে।
খুব মন দিয়ে পড়লাম।
ধন্যবাদ স্বপ্ন ভাই।
কষ্ট করে পড়ার জন্যে আবারো ধন্যবাদ অনি’দা।
দারুন লেখা!
খুব ভাল হয়েছে।
লেখাটা বেশ ভাল। আপনার লেখায় প্রবাহমানতাটা চরম। আরো নতুন নতুন বিষয়বস্তু উঠে আসবে, এ আশাই রাখি। শুভেচ্ছা।
ধন্যবাদ শামান সাত্ত্বিক।
ভাল থাকুন।
মন্তব্য করুন