দূর আকাশের তারা

ল্যাব এইড হসপিটালের আইসিইউ’র সামনে অনেক মানুষের জটলা। ছোট শিশুদের একটা দল কাঁচের জানালার বাইরে থেকে ভিতরটা দেখছে। রুমের ডান দিকের কর্নারের বেডে শুয়ে আছে আট বছরের শিশু রোদেলা। নিথর হয়ে পড়ে আছে, চোখে পলক পড়ছে না। ছোট শিশু, ব্যাথায় মুখমন্ডল নীল হয়ে আছে। শিশুদের দলটির একজন একজন করে দেখছে আর চোখ মুছতে মুছতে ফিরে আসছে। সবাই রোদেলার ক্লাসের বন্ধু। একটু দূরে সিঁড়ির কাছে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে অহনা। চোখ দুটো ফোলা, দেখেই বুঝা যায় দু’চোখ সারাক্ষণই অশ্রুর বন্যায় ভাসছে। তাকে সান্তনা দিচ্ছে সবাই। কিছুই বলছে না অহনা, নির্বাক; ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থাকা ছাড়া মুখে যেন কোন ভাষা নেই। আজ এক সপ্তাহ হল রোদেলা ল্যাব এইডের আইসিইউ’তে পড়ে আছে। একের পর এক লোকজন আসছে আর চোখ মুছতে মুছতে ফিরে যাচ্ছে। ব্যাপারটা সবার কাছেই অপ্রত্যাশিত, কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না মাত্র কয়েক দিনে অবস্থা এতোটা খারাপ হতে পারে।
বিশ দিন আগেও রোদেলা ছিল প্রানবন্ত ফুটফুটে এক শিশু। সারাক্ষণ ঘরের এ রুম থেকে ও রুমে ছুটে বেড়াত, অনর্গল কথা বলে মা বাবাকে অস্থির করে তুলত। ওর মায়াময় দু’টি চোখ সবার আদর কেড়ে নিত। স্কুলের বন্ধুদেরও অনেক প্রিয় ছিল রোদেলা। লেখাপড়া, গান, আবৃতি, ছবি আঁকা সবকিছুতেই ছিল প্রথম। আত্মীয় স্বজন সবাই বলত- তুই একটা লক্ষ্মী মেয়ে পেয়েছিস। গর্বে বুক ভরে যেত অহনার ।
দিন বিশেক আগে ব্যাপারটা প্রথম ধরা পড়ে। কয়েকদিন ধরেই শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না রোদেলার, অহনা একদিন লক্ষ্য করে রোদেলার শরীরের কয়েক জায়গায় কালচে ছোপ ছোপ দাগ। কিছুই বুঝতে না পেরে অমিতকে ব্যাপারটা দেখাল। পরদিনই অমিত ওকে পরিচিত একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার সাহেব অমিতকে কিছু না জানিয়ে রোদেলাকে তার ক্লিনিকে ভর্তি করাতে বলেন। ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় রোদেলাকে। অনেক টেস্ট করানোর পর জানা যায় রোদেলার অসুখটি লিউকোমিয়া। অমিত-অহনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। ওদের কাছে সারা পৃথিবী অর্থহীন হয়ে যায়। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে অহনা, সেই কান্না আজও শেষ হয়নি!
রোদেলাকে ক্লিনিক থেকে পিজিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এক সপ্তাহ রেখে কোন উন্নতি না হওয়ায় নিয়ে আসা হয় ল্যাব এইডে। আজ দশ দিন হয়ে গেল, উন্নতির কোন লক্ষণই নেই। একবার ভেবেছিল ইন্ডিয়া নিয়ে যাবে কিন্তু সেই সময়টাও পাওয়া গেল না। অবস্থা এত দ্রুত খারাপ হল যে কেমো শুরু করতে হল। আর উঠে বসতেই পারলো না মেয়েটা।
একে একে সবাই চলে গেল। অমিত অহনা বাইরে দাঁড়িয়ে। দুজনেই বাকরুদ্ধ! শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া যেন আর কিছুই করার নেই। অমিত মেয়ের দিকে তাকাতে পারে না। মেয়েটা যখনি জাগে, বার বার শুধু আম্মুর কাছে যাব, বাবার কাছে যাব বলে কান্না করে। রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ওরা শুনতে পায় মেয়ের চিৎকার-বাবা আমাকে কোলে নাও, আম্মু আমাকে নিয়ে যাও বলে মেয়ের কান্না ওদের বুকের ভিতর এসে বিঁধে, বুক ভেঙ্গে যায়, ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে। পারে না। প্রচণ্ড কষ্ট নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না ওদের।
বিকালের দিকে আবার অনেকে এলো দেখতে। অহনা মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। মাগো আমার রোদেলা আর বাঁচবে না, আমি কি নিয়ে বাঁচবো তোমরা আমাকে বলে দাও। আমি কি নিয়ে বাঁচবো! তুমি জান, পিজিতে থাকতে রোদেলা কী বলেছে ?
-না মা, কী বলেছে ?
-বাবা ওকে ডাকছে। বলত বাবার সাথে ও খেলছে। আমাকে বলে- আম্মু আমাকে মাফ করে দিও। আমার এতটুকু মেয়ে আমার কাছে মাফ চায়। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। কাঁদতে কাঁদতে মায়ের বুকে মুখ লুকায় অহনা।
মা শুধু সান্তনা দেয়, বলে- ধৈর্য ধর মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।
-কবে ঠিক হবে মা ? আমার রোদেলা আমার কোলে ফিরে আসবে মা?
কারো মুখে কোন কথা নেই, সবার চোখই অশ্রুসিক্ত।
মা ওকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে, মুখে বললেও মা বোঝে রোদেলার ভাল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু। সে তো মা, অহনার কষ্টটা তার থেকে কেউ ভাল বুঝতে পারবে না। কি পরিশ্রমটাই না করেছে মেয়েটা রোদেলাকে নিয়ে। একটা ভাল স্কুলে ভর্তির জন্য দিন রাত পরিশ্রম করেছে, এই কোচিং সেই কোচিং, নিজে সারা দিন রোদেলাকে নিয়েই পড়ে থাকতো। প্রায়ই অসুস্থ থাকতো রোদেলা, রাতের পর রাত জেগে থাকতে হয়েছে মেয়েটাকে। রোদেলাকে হারালে মেয়েটা কি করে বাঁচবে? ওর জগতটাই তো রোদেলাকে নিয়ে!
বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকে অমিত। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। অহনা তো কাঁদতে পারছে অমিত কাউকে কিছু বলতে পারছে না, কেবল ভিতরে ভিতরে নিঃশ্বেষ হচ্ছে। রুপমের ডাক শুনে পিছনে তাকায় অমিত।
-ভাইয়া ডঃ আবিদ তোমাকে ডক্টর’স রুমে দেখা করতে বলেছে।
অমিত এগিয়ে যায় ডক্তরস রুমের দিকে । ডক্তর’স রুম থেকে ফিরে এলে অহনা ছুটে এসে জানতে চায়- কি বলল ডক্টর?
-আজ রাতে বোর্ড বসবে।
দু’দিন পর অবস্থা আরও খারাপ হল, রোদেলার সারা শরীর ফুলে গেল। শরীরের নানা জায়গায় ইনফেকশন হয়ে গেল, এমনকি ক্যানোলা বসানোর মত অবস্থাও রইল না। আস্তে আস্তে শরীরের বিভিন্ন অর্গান অকেজো হতে শুরু করলো। সবাই বুঝল সব শেষ হতে আর বেশী দেরি নেই! ব্যাথায় মেয়েটি ক্রমাগত আর্তনাদ করতে থাকে, এ আর্তনাদ সহ্য করার নয়।
রোদেলার এই অবস্থা অহনাকে আরও অস্থির করে তুলল, ওকে সামলানো যেন আরও কঠিন হয়ে গেল। ক্রমাগত কান্নাকাটি করতে লাগল, কাঁদতে কাঁদতেই অজ্ঞান হয়ে যায়। সে রাতে অহনাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হল।
কোন রকম রাতটা পার হয়। সকালে অহনাকে হসপিটালে নিয়ে যাবার জন্য তৈরি করছে, এমন সময় রুপমের ফোন এলো। ফোনটা রিসিভ করল ইভা। ওপাশ থেকে একটাই শব্দ - সব শেষ!
ইভা কোন কথা বলতে পারল না, খাটের উপর বসে পড়ল। ইভার দিকে তাকিয়েই মা বুঝে নিল কি ঘটেছে।
অহনা রেডি হয়ে ড্রইং রুমে এসে মাকে তাড়া দিতে লাগল। কেউ কিছু বলছে না দেখে থমকে দাঁড়ায়।
-কেউ কথা বলছ না কেন? আমি আমার মেয়ের কাছে যাব।
ইভার চোখ ভিজা দেখে চিৎকার করে ওঠে বলে- কি হয়েছে ওর, তোমরা সবাই চুপ কেন ? আমার রোদেলার কি হয়েছে ?
-তুই শান্ত হ মা, সব ঠিক আছে আমরা একটু পরেই যাব। উত্তর দেয় মা।
-না আমি এখনই যাব, তুমি আমাকে আমার মেয়ের কাছ থেকে নিয়ে এলে কেন? ওর কিছু হলে আমি তোমাদের ছাড়ব না, বলতে বলতে আবার অজ্ঞান হয়ে যায় অহনা।
অমিত যেন বোবা হয়ে গেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার রোদেলা নেই, তার গানের পাখি হারিয়ে গেছে। আর কোনদিনই তাকে বলবে না বাবা শোন আজ আমি এই গানটা তুলেছি, দেখোতো ঠিক আছে না ? কোনদিনও শোনাবে না ওর সেই প্রিয় গানটা - আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে !
রুপম এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরল। অমিত শুধু একটাই শব্দই করলো- খুব কষ্ট ! রুপম অমিতকে ধরে কেবিনে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে হসপিটালে অনেকেই চলে এসেছে। ডেড বডি বাসায় নেয়ার ব্যাবস্থা করা হচ্ছে।
রোদেলার মৃত্যু সংবাদ শোনার সাথে সাথে দূর দুরান্ত থেকে লোকজন এসে ঘর ভরে যায়। আস্তে আস্তে লোকজন বাড়তে থাকে। সারা বাড়ি যেন কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে। সবাই অহনাকে নিয়েই বেশি চিন্তিত। রোদেলার স্কুলের শিক্ষক ও বন্ধুদের একটি দল এলো রোদেলাকে শেষ বারের মত দেখতে।
জ্ঞান ফিরে এলে অহনা দেখে ঘর লোকে লোকারণ্য। বুঝতে আর বাকি থাকেনা ওর রোদেলা আর নেই।
অহনা আর কাঁদছে না, বাকরুদ্ধ। বাসায় এত লোকজন যেন তার কিছুই আসে যায় না। যেন পাথর হয়ে গেছে!
দুপুরের পর ডেড বডি বাসায় নিয়ে আসা হয়। গোসল, জানাজা সেরে সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি নিয়ে গেল। বাড়িতে গিয়েও অহনা সেই আগের মতই চুপচাপ, কারো সাথে কোন কথা নেই। পাঁচদিন পর সবার সাথে ঢাকায় ফিরে আসে।
আজ দুদিন হল ওরা বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। সারা ঘর যেন এক শোক পুরী। সারা বাড়ি জুড়েই রোদেলার স্মৃতিচিহ্ন। ওর রুমের দেয়ালে টাঙ্গানো রোদেলার আঁকা ছবি, বইখাতা, হরমোনিয়াম, খেলনা, সবকিছু আগের মতই আছে, শুধু প্রাণোচ্ছল হাসিখুশি সেই মেয়েটা নেই!
অহনা সেই আগের মতই কারো সাথে কোন কথা বলে না, সারাক্ষণ গুম মেরে বসে থাকে, যেন অন্য গ্রহের বাসিন্দা। রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ জেগে ওঠে বসে থাকে, ছুটে যায় রোদেলার ঘরে। রোদেলার প্রতিটা জিনিস ধরে নাড়াচড়া করে আর রেখে দেয়। সবাই ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে, অহনা কোন জবাব দেয় না, কেবলই চুপ করে বসে থাকে।
রাত তিনটা। অমিত পাশ ফিরে দেখে অহনা বিছানায় নেই। রোদেলার রুমে খুঁজে না পেয়ে বারান্দায় এসে দেখে অহনা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। অমিতকে দেখে ফিরে তাকায় অহনা। দুজনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর অমিত বলে- চল, ঘুমাতে চল। অহনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অহনা অমিতের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে।
কত কথা মনে পড়ে যায় অহনার! রোদেলার যখন চার বছর, দুষ্টুমি করলে ও বলত এমন করলে আমি মরে যাব, ঐ আকাশের তারা হয়ে যাব। আমাকে আর পাবে না। রোদেলা ছুটে এসে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত, আর বলত তুমি মরে যেওনা আম্মু, আমি আর দুষ্টুমি করবো না। আজ রোদেলাই নেই। ওকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। এরকম আরও কত কথা, কত ভাবনা আসে মনে! আর আসে বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস।
অমিত আর অহনা অন্ধকারে বারান্দায় বসে থাকে। বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগে চোখে মুখে। দুজনের বুকের ভিতর চলে রক্তক্ষরণ, অবিরাম। এ ক্ষরণ যেন শেষ হবার নয়।
নিভৃত স্বপ্নচারী
৫ই মে, ২০১২





সত্যি ঘটনা? কি বলব? বলার ভাষা নেই। বড় করুণ গল্প!!!!!!
সাত বছর আগে নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা তুলে ধরেছি মাত্র। অহনার কান্না এখনও থামেনি।
মন্তব্য করুন