ইউজার লগইন

বন্ধু আমার

আজ আমি আমার এক বন্ধুর গল্প বলবো। এইচএসসি পরীক্ষার এক মাস আগে তার ইতালীতে ভিসা হয়ে যায়। সেটা ২০০২ এর ঘটনা। ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম তার আগের দিন, ব্যাগ গুছাচ্ছিলো সেদিন। আন্কেল কলেজের শিক্ষক, আমাদেরকে দেখে জিজ্ঞেস করছিলেন প্রস্তুতি কেমন। ওনার কন্ঠে উত্তর পাবার আকুতি ছিলো না, আকুতি ছিলো আমাদের মাঝে নিজের সন্তানের ছায়াকে।

সুমিত ছিলো ওর নাম। তখন ৮ লাখ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নিজেদের বাসাটা বিক্রি করে দেন ওর বাবা। ভাড়া বাসায় থেকেছিলো ওরা। বন্ধুটি আমাদের জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কেদেছিলো। আমরা কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না, তবে এটা বুঝেছিলাম যে পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন ওকে নিয়ে ঘোরা হবে না, ওদের বাসায় মিস্টি খাওয়া হবে না।

ইতালীতে বহুদিন ছিলো, অনেক চড়াই উৎরাই পার করে ওরা। ওর বাবা অবসর নেন, ছেলের টাকায় মেয়ের বিবাহ দেন। আমরা অনেক আনন্দ করি ওকে ছাড়াই। বিয়ের আগে ফোন দিয়ে বলেছিলো,"আমার বোনটা যেন সুখী হয় তোরা দেখিস!"

এটা শুনে আন্কেলকে ছেলের জন্মের ঠিকুজি বের করে দেই। গায়ে হলুদের মন্ঞ্চ থেকে শুরু করে বিয়ের সবকিছু আমরাই করি। একদিন শুনি আন্কেলরা সব ছেড়ে চলে গেলেন ঢাকায়। আমিও তার কিছু দিন পর ঢাকায় চলে আসি। সুমিতের সাথে যোগাযোগ না থাকলেও ২০০৮ এর দিকে ওর বাবা শেয়ারে টাকা লাগায়। প্রচুর টাকা। ২০১০ এ দেশে এসে পড়ে সুমিত। বিয়ে করে, সংসার শুরু করে।

তখন শেয়ার বাজার পড়তির মুখে। তার কিছু দিন পর সেই পড়তিটা হাহাকারে ছড়ায়। আমি দেখতে থাকলাম কিভাবে একটা পরিবার সর্বস্ব খোয়াতে থাকে। শেষটা দেখা হয়নি, তার আগেই আমি জীবন বাচাতে দেশ ছাড়ি।

সুমিতের বাবা মারা গেছেন গতবছর বিনা চিকিৎসায়। খুব কষ্টে আছে ওরা।

আজকে খবরের কাগজে একটা খবর চোখে পড়লো। শেয়ার বাজারে নিঃস্ব হওয়া মানুষেরা ঈদ আসলে পালিয়ে বেড়ায়।

সুমিতকে ফোন দিয়েছিলাম, ভেঙ্গে পড়েছে ও। বললাম ইতালি চলে আসতে আবার। সমস্যা একটাই, মাকে ফেলে একা আসবে কিভাবে। কিছু একটা শুরু করুক, সেটার পুজিও নেই। কোথায় যাবে কি করবে, কোনো দিক খুজে পাচ্ছে না।

আমেরিকায় শেয়ার বাজারে ধ্বস নামলে সারা বিশ্ব কেপে ওঠে, আমাদের শেয়ার বাজার খুব ছোট। তাই এটায় ধ্বস নামলে পুরো বিশ্ব কাপে না। ছোট মানুষের খোজ খবর কেউ রাখে না। বিশ্ব বিধাতা ধরেই নিয়েছেন এরা ন্যায়বিচার ছাড়াও বেচে থাকতে পারে, অনাহারে এদের মৃত্যু হয় না। মৃত্যু হলেও সরকারের পতন হয় না।

সুমিত, বন্ধু আমার....আমরা কার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবো, এই সমাজ না বিশ্ব বিধাতার?

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সামছা আকিদা জাহান's picture


শেয়ার কেনা বেচাটা আমার কাছে গ্রহন যোগ্য নয়। অল্প কিছু শেয়ার এ লাগানো এটা চলতে পারে, কিন্তু সব ছেড়ে সর্বস্ব দিয়ে ঋন করে শেয়ার বাজারে ইনভেস্টমেন্ট আমার কাছে জুয়া খেলার মত মনে হয়।
শেয়ারে ৩গুন ৫গুন লাভ হলে কোন কথা নেই লস হলেই হাহাকার। এই জুয়া খেলতে যাওয়া কেন যদি খেলিই জুয়া তবে কেন নিজেকে ঋংনগ্রস্ত করেই বা করবো।

দূরতম গর্জন's picture


শেয়ার কেনাবেচা দেশের অন্যান্য ব্যবসার মতোই বৈধ একটা উপায় যেখানে লাভ লোকসান থাকবেই। সেটা মেনে নিয়েই সবাই বাজারে যায়, পড়াশোনা করেই অনেকে নামে। কিন্তু যখন কিছু লোক আপন ক্ষমতাবলে এসব গচ্ছিত টাকা মেরে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়ায় আর যাদের টাকা মেরে দেয়া হয় তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যায় তখন এর বিচার চাওয়াটা কি অপরাধ?

আমেরিকার পাওয়ার ইন্ডাস্ট্রি এনরনের কথা কি মনে আছে? পাওয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে এত বড় কোম্পানী আমেরিকাতে একটিও ছিলো না। তারাও ঠিক একই ভাবে এই কুকর্মটি করেছিলো। আমেরিকার সরকার যখন ধরতে পারে যে এই কুলাঙ্গারটির কারনে অর্থনীতির বাজারে ধ্বস নামে তখন তাকে বিচারের কাঠগড়ায় আনে। সিইও সেই লোকলজ্জা সইতে না পেরে গলায় দড়ি দেয়। এনরনকে পুরো ধূলোয় মিশিয়ে দেয় এবং তার সাথে স হযোগী আরও কিছু কোম্পানী আর ব্রোকার হাউজকে আমেরিকান সরকার দিনের আলোয় মাটির সাথে মিইয়ে দেয়।

শেয়ার বাজার বর্তমান অর্থনীতির একটা বড় চালিকা শক্তি হতে পারে। একটা কোম্পানী যখন ফুলে ফেপে বড় হয়ে তার ব্যবসা আর সম্প্রসারন করে তখন তার একার পক্ষে সম্ভব হয় না। তখন তাকে বাইরের অংশীদারিত্বের প্রয়োজন হয়। অনেক গুলো চিন্তাশীল এবং দায়িত্বপ্রবন মাথা একসাথে হলে নিশ্চয়ই চাপটা কমে যায় এবং কাজ খুবই মসৃণ হয়। তখন জন গনের অংশীদারিত্বে কোম্পানীর সেই ফুলে ফেপে হওয়াটা মসৃন হয়, লভ্যাংশ শেয়ার করে যাদের কাছ থেকে মূলধনী জমা নেয়া হয়েছে। এখন কোনো কোম্পানী মিথ্যে কথা বলে, অথবা লভ্যাংশের টাকা মেরে দিয়ে চলে যায় তখন আপনি কাকে দোষ দেবেন?

যারা অর্থল গ্নী করেছে তাদেরকে নাকি যে কোম্পানী মেরে দিয়েছে এবং যারা এই টাকা মারতে সাহায্য করেছে তাদেরকে?
ভেবে দেখুন!

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

মীর's picture


আমাদের অর্থনীতি কোর্স ছিলো সেকেন্ড ইয়ারে। আবু আহমেদ স্যার নিতেন। তার একটা কমন লেকচার মনে পড়ে গেলো। তিনি বলতেন, "প্রচুর মানুষ প্রতিদিন আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে কোন শেয়ার কিনলে লাভ হবে, কোন শেয়ারে ঠকবো ইত্যাদি। আমি তাদেরকে একটা কথাই বলি। বাজারে আমার একটা বই আছে যার নাম- শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ জেতার কৌশল। সেটি কিনে পড়ে তারপরে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে।"

অবশ্য বাংলাদেশে এবারের শেয়ার বাজার কেলেংকারীর পেছনে একটি পরিচিত চক্র জড়িত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাদেরকে আসলে এনরনের মতো শাস্তির মুখোমুখি করা সম্ভব না। কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব না এবং কোনো সরকারেরই সেই সদিচ্ছা নেই। ক্ষতিগ্রস্থ বিনিয়োগকারীরা যদি বলেন যে তারা বিনিয়োগের সময় এ কথাটি জানতেন না (কিংবা দরবেশ বাবাকে চিনতেন না!!!), তাহলে বুঝতে হবে এটা তারা আত্মস্বান্তনা পাবার জন্য বলছেন। আসলে শেয়ার বাজারের বুলিশ ভাব দেখে তারা প্রথমত ঝুঁকি বিচারের কথা কানেই তোলেন নি এবং দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর লেখা যেকোন বই (ইন্টারনেটেও প্রচুর কার্যকরী লেখা আছে এ বিষয়ে, খুঁজলেই পাওয়া সম্ভব) পড়ে এবং সেইমতো হিসাব-নিকাশ করে অর্থ বিনিয়োগের আগ্রহ পান নি। সবাই খাচ্ছে-আমিও খাই টাইপ চিন্তা করে ওই জিনিসটা খেয়ে ফেলেছিলেন। আজ সেই মাশুলই দিতে হচ্ছে তাদেরকে।

যাই হোক, আপনার বন্ধুর জন্য শুভকামনা রইলো। আবার সুদিন ফিরবে নিশ্চই।

দূরতম গর্জন's picture


দারুন বলেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আমার অনেক বন্ধুই শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে আজ সর্বশান্ত। লেখাটা তাদের দীর্ঘশ্বাসকে আবারও মনে করিয়ে দিল। আপনার বন্ধুর জন্য শুভকামনা।

দূরতম গর্জন's picture


ঈশ্বরের বোধ হয় গরীবের দোয়ায় কাজ হচ্ছে না। তার দরকার বড় লোক মানুষে দোয়া প্রার্থনা। আর তাই ধনীরা আজ অন্যায় শোষনের পথ বেছে নিয়ে সুখে আছে আর এসব নিরীহ জন গন আছে দুঃখের অতল পাথারে

তানবীরা's picture


বড় মাছরা সবসময় ছোটমাছ খেয়ে বাচে। পানিতে খেলতে গেলে ছোটমাছদের বড় মাছের হাত থেকে বেচে থাকার কৌশল জানা থাকতে হবে।

দূরতম গর্জন's picture


ডারউইনের তত্ব: সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট

ভালো বলেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


Sad

১০

দূরতম গর্জন's picture


Puzzled

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

দূরতম গর্জন's picture

নিজের সম্পর্কে

মহাশূন্যের গুন গুন শুনতে চাই, কান পেতে রই তারাদের আহ্বানে। দূরতম গর্জন যখন সৈকতে আছড়ে পড়ে, আমি পা ফেলে উপভোগ করি সাগরের কূর্ণিশ। মানুষ হয়ে জন্মাবার অহংকারই শুধু বিদ্যমান, অথচ নিত্য বেচে আছি তেলাপোকার শৌর্য্যে!