স্তব্ধ পিনপতন
মিউজিকটা জ্যাজ হবে, অথবা ব্লুজ। স্যাক্সোফোনে একজন ককেশীয় কখনো সুরের মোহনীয়তায়, কখনো একঘেয়েমী টোনে বাজিয়ে যাচ্ছে। স্যাক্সোফোন হাতে আমরা আফ্রিকান কালো লোক দেখে অভ্যাস্ত। বিশাল ভূড়িওয়ালা একজন কালোমানুষ চোখ মুখ গলা ফুলিয়ে মোহনীয় ভঙ্গিতে বাজিয়ে যাচ্ছে এই ছবিটাই যখন মনে গেথে আছে, তখন এরকম একজন লিকলিকে ককেশীয় যুবকের হাতে স্যাক্সোফোন দেখে মনে হচ্ছে, এটা ওর জন্য খুব ভারী। তবে খারাপ বাজাচ্ছে না।
বার আমার কোনো প্রিয় জায়গা নয়, খুব মারকুটে সুরাপ্রেমীও নই। ঘরে একা বসে সময় কাটছে না, প্রতিটা ঘন্টা টেনে অসীম সময়ের মতো লম্বাটে মনে হচ্ছিলো।ওভারকোট টেনে চোখে পড়া প্রথম জ্যাজ বারটাতে ঢুকে গেলাম। সোমবারেও এত মানুষ সব কোনার টেবিলগুলো দখল করে ফেলেছে। সবাই নিজেকে আড়াল করতে চায়, একটু আলো আধারে জ্যাজের সুরে নিজেকে গুলিয়ে ফেলতে চায়।
বাধ্য হয়েই মধ্য টেবিলের ফাকা চেয়ারটা দখল করলাম। মারিস্টড দিয়ে শুরু করলাম, এরপর ফ্যালকন পেরিয়ে একটা স্টার্কওঁল, একটা শট, আবার স্টার্কওঁলে ফিরে এলাম। ঘন্টা খানেক চলে গেলো। চোখের দৃস্টি প্রায় আবছা, পেটে কিছু পড়লে বোধহয় খারাপ হয় না। এগিয়ে গেলাম কাউন্টারে, বিল দেবার জন্য। হঠাৎ পাশের চেয়ারে বসে থাকা এক মহিলা বাংলায় বলে উঠলো,"এরা কিন্তু কাবাব, স্টেকও বিক্রি করে!" চমকে গেলাম এরকম অপরিচিত পরিবেশে বাংলা কন্ঠস্বর।
: ওহো, প্রচন্ড ক্ষিধে পেয়েছে। আপনি বুঝলেন কিভাবে?
: আমি অনেকক্ষন ধরে দেখছিলাম। আপনি বোধহয় রেগুলার ড্রিংক করেননা।
: ঠিক ধরেছেন। আপনাকে দেখে তো সোবার মনে হচ্ছে। কাউকে তো....(আশেপাশে তাকাতে থাকলাম)
: নাহ, আমি সিঙ্গেল।
: ওহো, আমার সময় কাটছিলো না, তাই ভাবলাম ঘুরে যাই। উইল ইউ জয়েন মি?
মহিলার বয়সটা নিটল শরীরের ভাজে ঢেকে গেছে। শ্যামল গায়ের রং এ অ্যাশ কালারের ম্যাকআপ আর ভারতীয় নায়িকাদের চুলের কাট, আমি ঠিক অনুমান করতে পারিনি কত বয়স হবে তার। কাবাব মেড ব্রড নিয়ে আবার পুরোনো টেবিলে ফিরে এলাম তবে এবারআর একা নই, তার হাতে ওয়াইনের গ্লাস। মুখোমুখি বসতেই সে বলে উঠলো,"বাই দ্যা ওয়ে, আমি রেশমা।"
: (আমি তৃপ্তির সুখে কাবাব রুটিতে মুখে পুরে)ওহ, আমি শফিক। এসাইলামসিকার। ওয়ার্ক পারমিটের অপেক্ষায়।
: আপনাকে দেখেতো মনে হয় না এসাইলাম সিকার। পুরোদস্তুর সুইডীশ চালে কথা বলছেন, চালচলন। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট?
: নো, নো ওয়ে। আমি গ্রান্ড হোটেলে, সারভেটে। আপনাকে দেখে মনে হয় না আপনি বাঙ্গালী কালচারে, ইউ নো, আপনার গাউন পড়ার স্টাইল, বডি কার্ভ। চোখ সরানো দায়। তার ওপর এমন বারে কোনো বাঙ্গালী ললনা, জাস্ট নো অফেন্স!
: হুমম, স্মার্ট। আমি এখানে আছি ২০ বছর। ঘর করার চেষ্টা করেছিলাম বেশ কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবার মনে হলো ক্রিতদাসী জীবন আমার পক্ষে সম্ভব না।
: (আমি শেষ কামড়টা বসালাম কাবাবে) উফফ, এদের রেসিপিটা দরকার। দারুন বানিয়েছে। জাস্ট অসাম।
: খুব ক্ষিধে বুঝি।
: আপনি সারাজীবন পস্তাবেন এদেরটা না খেলে। আমি মেয়ে হলে এই কুকের সারাজীবনের ক্রীতদাসী হয়ে যেতাম।
রেশমা হাসি শুরু করলো। সে হাসি থামতে চাইলো না। সংক্রমন করলো আমাকেও। আমি বললাম সোনিয়ার কথা। বিয়ে করার জন্য আংটি নিয়ে ঘুরছিলাম পকেটে কতদিন। গতকাল প্রপোজ করতে গিয়ে গেস্ট রুমে ঝগড়া করে আসলাম। আবার বাবা হচ্ছি শুনে রেশমা আমার হাতে হাত রাখলো। অদ্ভূত এক শিহরন তার হাতের ছোয়ায় ছিলো, তারপর ক্ষনিকের চোখাচোখি।
১১ টার সময় বার বন্ধ হয়ে যায়। ১০:৩০ টা থেকেই ড্রিংক সার্ভ বন্ধ করে দিলো। তখন আমি দাড়াতে পারছিলাম না। কথাও বলতে পারছিলাম না।
: আপনার বাসায় পৌছে দিয়ে আসি? ট্যাক্সি ডেকে দেই?
: না, না, আমি ঠিক আছি।
কথাটা শেষ করতে না করতেই বেহুশ হয়ে দরজায় লুটিয়ে পড়লাম। ঠিক কতটা সময় বেহুশ হয়ে পড়েছিলাম জানি না।খুব একটা মনে নেই, তবে মাঝে মনে পড়ে প্রচন্ড মাথা ব্যাথায় ঘুম ভেঙ্গেছিলো এক অন্ধকার রুমে। যে শার্ট পড়ে বেরিয়েছিলাম, সেটা গায়ে ছিলো না, প্যান্টও না। ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমে চিন্তাভাবনাও কেমন যেনো ভোঁতা হয়ে যায়। শরীরের প্রতিটা লোমের নীচে অজস্র ভর যন্ত্রনা ছড়িয়ে দিয়েছে, চোখের পাতাগুলো আবারও আমার চোখদুটোকে বন্ধ করে দিলো। আমি হারিয়ে গেলাম আবার।স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল খুজে পেলাম না।
আইফোনের এলার্মে ঘুম ভাংলো, প্রতিদিন সকাল ৮ টায় আমার এলার্ম। আইফোনটা শিওরের কাছেই রাখি, কিন্তু কোথাও খুজে পাচ্ছিলাম না। চোখ বন্ধ করেই হাতড়াতে থাকলাম। কোথায় হাতড়াচ্ছি, কি হাতড়াচ্ছি বুঝতে পারছিলাম না। নরম কিছু একটায় হাত আটকে গেলো। বিদ্যুৎ বেগে হাত সরিয়ে উঠে পড়লাম, দেখি পাশে শুয়ে আছে রেশমা, গায়ে ফিনফিনে রং এর একটা নাইটি। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে চোখ গোল গোল করে। আমি খাট থেকে নেমেই বলে উঠলাম,"সরি, আসলে আসলে...." এমন সময় আবিষ্কার করলাম আমি শুধু আন্ডারওয়ারে।
"ও শিট" বলে দাড়িয়ে মাথা চুলকাতে লাগলাম। রেশমা উঠে বসে বললো,"রিলাক্স, মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। আমি গরম কফি করছি। আজকে কি কাজ আছে?"
: আসলে, আসলে......না। আমি...আমি...
: লজ্জার কিছু নেই। আপনি রেস্ট নিন। নাহলে মাথা ব্যাথাটা আবার বাড়বে।
"মাথা ব্যাথা" শব্দটা শুনেই আমি শান্ত হলাম। আমার প্যান্ট টা মেঝেতে খুজে পেলাম। কিন্তু রাতে যে অবস্হা হয়েছিলো তাতে তো দু'পায়ে দাড়ানোর কথা ছিলো না। সোফায় গা এলিয়ে তীব্র তুষারপাত দেখছিলাম জানালা গলে। একবার খুজে বের করার চেষ্টা করলাম আমি কোথায় আছি। আশেপাশে যতদূর দৃষ্টি যায়, ততদূর বনান্ঞ্চল সাদা তুষারে ঢেকে গেছে। গরম কফি নিয়ে রেশমা পেছনে হাজির। আমি পাশ ফিরে তাকিয়ে একটু ধাক্কা খেলাম, মেকআপ ছাড়া বয়সটা বোঝা যায়, বোঝা যায় অতীতে তার রুপের আভা। মাঝ বয়সী এতসুন্দর মহিলা কখনো দেখিনি। আমি সামনে এগিয়ে কফির কাপটা হাত থেকে নামিয়ে তার ঠোটের ওপর আক্রমন করলাম। সে আক্রমন কতক্ষন চললো, কোন কোন অলিগলিতে হানা দিলো, দখল করে নিলো মুহুর্মুহু স্পর্শে, সে স্পর্শগুলো কতটা গভীর ছিলো এসব নিয়ে ভাবনার সময় ছিলো না।
যখন আক্রমন-পাল্টা আক্রমনের পালা শেষে সন্ধিচুক্তির পর্ব হাজির তখন মনে হলো সময় কত দ্রুত বয়ে যায়।
এই মহাবিশ্বের সবকিছুর নিয়ন্ত্রনটা সময়ের হাতে আটকে আছে। এই সময়ের প্রবাহ রক্তের প্রবাহের মতো গতিশীল, বয়ে চলা স্রোতাস্বিনীর মতোই তীব্র। আমরা খড়কুটো হয়ে কখনো তীরে ফিরি, নোঙ্গর ফেলি কিছুটা ক্ষন। হঠাৎ মনের মাঝে তীব্র আকাঙ্খা উঁকি দেয়, মন ডাকে বয়ে চলার।
ঘরের দেয়ালে দেয়ালে লাগানো ছবি। ছবিগুলো যেনো কথা বলে। ৮০ দশকের শেষের দিকে নতুন কুড়ির পুরস্কার হাতে। সুইডেনের প্রথম নাচের অনুষ্ঠান, গন্যমান্য মানুষের সাথে ছবি। সংসার নামক প্রজেক্ট এর অংশ হিসেবে কিছু অনবদ্য মুহুর্ত। ছবি শেষ করে যখন ঘুমিয়ে থাকা রেশমার দিকে তাকাই, তখন দেখি বড্ড নিঃসঙ্গ, দুঃখী এক মহিলা। যে হাসি, স্বপ্ন বুকে নিয়ে নতুন কুড়ির ক্রেস্ট হাতে নিয়ে ছবি তুলেছিলো, তার ছিটে ফোটা নেই। জানালা দিয়ে দেখলাম এক সুইডীশ এই তীব্র তুষারে জগিং এ বেরিয়েছে, সাথে একটা কুকুর। কুকুরটা তার ছায়া সঙ্গী হয়ে আছে, যেনো পিছু ছাড়তে চায় না। যদি পথ হারায় তাহলে তীব্র ঠান্ডায় মরে পরে থাকবে, কেউ দেখার নেই। যদি সাথে যায় তাহলে জীবনটা ছন্দময় হবে, একটা অর্থ খুজে পাবে।
আমি পা টিপে টিপে জামা কাপড় গায়ে চড়িয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।মিউজিকটা জ্যাজ হবে, অথবা ব্লুজ। স্যাক্সোফোনে একজন ককেশীয় কখনো সুরের মোহনীয়তায়, কখনো একঘেয়েমী টোনে বাজিয়ে যাচ্ছে। স্যাক্সোফোন হাতে আমরা আফ্রিকান কালো লোক দেখে অভ্যাস্ত। বিশাল ভূড়িওয়ালা একজন কালোমানুষ চোখ মুখ গলা ফুলিয়ে মোহনীয় ভঙ্গিতে বাজিয়ে যাচ্ছে এই ছবিটাই যখন মনে গেছে, তখন এরকম একজন ককেশীয় লিকলিকে যুবকের হাতে স্যাক্সোফোন দেখে মনে হচ্ছে, এটা খুব ভারী। তবে খারাপ বাজাচ্ছে না। বার আমার কোনো প্রিয় জায়গা নয়, খুব মারকুটে সুরাপ্রেমীও নই। ঘরে একা বসে সময় কাটছে না, প্রতিটা ঘন্টা টেনে অসীম সময়ের মতো লম্বাটে মনে হচ্ছিলো।ওভারকোট টেনে একটা জ্যাজ বারে ঢুকে গেলাম। মঙ্গলবারেও এত মানুষ সব কোনার টেবিলগুলো দখল করে ফেলেছে। সবাই নিজেকে আড়াল করতে চায়, একটু আলো আধারে জ্যাজের সুরে নিজেকে গুলিয়ে ফেলতে চায়।
বাধ্য হয়েই মধ্য টেবিলের ফাকা চেয়ারটা দখল করলাম। মারিস্টড দিয়ে শুরু করলাম, এরপর ফ্যালকন পেরিয়ে একটা স্টার্কওঁল, একটা শট, আবার স্টার্কওঁলে ফিরে এলাম। ঘন্টা খানেক চলে গেলো। চোখের দৃস্টি প্রায় আবছা, পেটে কিছু পড়লে বোধহয় খারাপ হয় না। এগিয়ে গেলাম কাউন্টারে, বিল দেবার জন্য। হঠাৎ পাশের চেয়ারে বসে থাকা এক মহিলা বাংলায় বলে উঠলো,"এরা কিন্তু কাবাব, স্টেকও বিক্রি করে!" চমকে গেলাম এরকম অপরিচিত পরিবেশে বাংলা কন্ঠস্বর।
: ওহো, প্রচন্ড ক্ষিধে পেয়েছে। আপনি বুঝলেন কিভাবে?
: আমি অনেকক্ষন ধরে দেখছিলাম। আপনি বোধহয় রেগুলার ড্রিংক করেননা।
: ঠিক ধরেছেন। আপনাকে দেখে তো সোবার মনে হচ্ছে। কাউকে তো....(আশেপাশে তাকাতে থাকলাম)
: নাহ, আমি সিঙ্গেল।
: ওহো, আমার সময় কাটছিলো না, তাই ভাবলাম ঘুরে যাই। উইল ইউ জয়েন উইথ মি?
মহিলার বয়সটা নিটল শরীরের ভাজে ঢেকে গেছে। শ্যামল গায়ের রং এ অ্যাশ কালারের ম্যাকআপ আর ভারতীয় নায়িকাদের চুলের কাট, আমি ঠিক অনুমান করতে পারিনি কত বয়স হবে তার। কাবাব মেড ব্রড নিয়ে আবার পুরোনো টেবিলে ফিরে এলাম তবে এবার সাথে ঐ মহিল. তার হাতে ওয়াইনের গ্লাস। মুখোমুখি বসতেই সে বলে উঠলো,"বাই দ্যা ওয়ে, আমি রেশমা।"
: (আমি তৃপ্তির সুখে কাবাব রুটিতে মুখে পুরে)ওহ, আমি শফিক। এসাইলামসিকার। ওয়ার্ক পারমিটের অপেক্ষায়।
: আপনাকে দেখেতো মনে হয় না এসাইলাম সিকার। পুরোদস্তুর সুইডীশ চালে কথা বলছেন, চালচলন। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট?
: নো, নো ওয়ে। আমি গ্রান্ড হোটেলে, সারভেটে। আপনাকে দেখে মনে হয় না আপনি বাঙ্গালী কালচারে, ইউ নো, আপনার গাউন পড়ার স্টাইল, বডি কার্ভ। চোখ সরানো দায়। তার ওপর এমন বারে কোনো বাঙ্গালী ললনা, জাস্ট নো অফেন্স।
: হুমম, স্মার্ট। আমি এখানে আছি ২০ বছর। ঘর করার চেষ্টা করেছিলাম বেশ কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবার মনে হলো ক্রিতদাসী জীবন আমার পক্ষে সম্ভব না।
: (আমি শেষ কামড়টা বসালাম কাবাবে) উফফ, এদের রেসিপিটা দরকার। দারুন বানিয়েছে। জাস্ট অসাম।
: খুব ক্ষিধে বুঝি।
: আপনি সারাজীবন পস্তাবেন এদেরটা না খেলে। আমি মেয়ে হলে এই কুকের সারাজীবনের ক্রীতদাস হয়ে যেতাম।
রেশমা হাসি শুরু করলো। সে হাসি থামতে চাইলো না। সংক্রমন করলো আমাকেও। আমি বললাম সোনিয়ার কথা। বিয়ে করার জন্য আংটি নিয়ে ঘুরছিলাম পকেটে কতদিন। গতকাল প্রপোজ করতে গিয়ে গেস্ট রুমে ঝগড়া করে আসলাম। আবার বাবা হচ্ছি শুনে রেশমা পিঠ চাপড়ে দিলো। ১১ টার সময় বার বন্ধ হয়ে যায়। ১০:৩০ টা থেকেই ড্রিংক সার্ভ বন্ধ করে দিলো। তখন আমি দাড়াতে পারছিলাম না। কথাও বলতে পারছিলাম না।
: আপনার বাসায় পৌছে দিয়ে আসি? ট্যাক্সি ডেকে দেই?
: না, না, আমি ঠিক আছি।
কথাটা শেষ করতে না করতেই বেহুশ হয়ে দরজায় লুটিয়ে পড়লাম। ঠিক কতটা সময় বেহুশ হয়ে পড়েছিলাম জানি না। প্রচন্ড মাথা ব্যাথায় ঘুম ভাঙ্গে এক অন্ধকার রুমে। যে শার্ট পড়ে বেরিয়েছিলাম, সেটা গায়ে ছিলো না, প্যান্টও না। ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমে চিন্তাভাবনাও কেমন যেনো ভোঁতা হয়ে যায়। শরীরের প্রতিটা লোমের নীচে অজস্র ভর যন্ত্রনা ছড়িয়ে দিয়েছে, চোখের পাতাগুলো আবারও আমার চোখদুটোকে বন্ধ করে দিলো। আমি হারিয়ে গেলাম আবার।
আইফোনের এলার্মে ঘুম ভাংলো, প্রতিদিন সকাল ৮ টায় আমার এলার্ম। আইফোনটা শিওরের কাছেই রাখি, কিন্তু কোথাও খুজে পাচ্ছি না। চোখ বন্ধ করেই হাতড়াতে থাকলাম। কোথায় হাতড়াচ্ছি, কি হাতড়াচ্ছি বুঝতে পারছিলাম না। নরম কিছু একটায় হাত আটকে গেলো। বিদ্যুৎ বেগে হাত সরিয়ে উঠে পড়লাম, দেখি নাইটি পড়া রেশমা। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে চোখ গোল গোল করে। আমি খাট থেকে নেমেই বলে উঠলাম,"সরি, আসলে আসলে...." এমন সময় দেখলাম আমি শুধু আন্ডারওয়ারে।
"ও শিট" বলে দাড়িয়ে মাথা চুলকাতে লাগলাম। রেশমা উঠে বসে বললো,"রিলাক্স, মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। আমি গরম কফি করছি। আজকে কি কাজ আছে?"
: আসলে, আসলে......না। আমি...আমি...
: লজ্জার কিছু নেই। আপনি রেস্ট নিন। নাহলে মাথা ব্যাথাটা আবার বাড়বে।
"মাথা ব্যাথা" শব্দটা শুনেই আমি শান্ত হলাম। আমার প্যান্ট টা মেঝেতে খুজে পেলাম। কিন্তু রাতে যে অবস্হা হয়েছিলো তাতে তো দু'পায়ে দাড়ানোর কথা ছিলো না। সোফায় গা এলিয়ে তীব্র তুষারপাত দেখছিলাম জানালা গলে। একবার খুজে বের করার চেষ্টা করলাম আমি কোথায় আছি। আশেপাশে যতদূর দৃষ্টি যায়, ততদূর বনান্ঞ্চল সাদা তুষারে ঢেকে গেছে। গরম কফি নিয়ে রেশমা পেছনে হাজির। আমি পাশ ফিরে তাকিয়ে একটু ধাক্কা খেলাম, মেকআপ ছাড়া বয়সটা বোঝা যায়, বোঝা যায় অতীতে তার রুপের আভা। মাঝ বয়সী এতসুন্দর মহিলা কখনো দেখিনি। আমি সামনে এগিয়ে কফির কাপটা হাত থেকে নামিয়ে তার ঠোটের ওপর আক্রমন করলাম। সে আক্রমন কতক্ষন চললো, কোন কোন অলিগলিতে হানা দিলো, দখল করে নিলো মুহুর্মুহু স্পর্শে, সে স্পর্শগুলো কতটা গভীর ছিলো এসব নিয়ে ভাবনার সময় ছিলো না।
যখন আক্রমন-পাল্টা আক্রমনের পালা শেষে সন্ধিচুক্তির পর্ব হাজির তখন মনে হলো সময় কত দ্রুত বয়ে যায়।
এই মহাবিশ্বের সবকিছুর নিয়ন্ত্রনটা সময়ের হাতে আটকে আছে। এই সময়ের প্রবাহ রক্তের প্রবাহের মতো গতিশীল, বয়ে চলা স্রোতাস্বিনীর মতোই তীব্র। আমরা খড়কুটো হয়ে কখনো তীরে ফিরি, নোঙ্গর ফেলি কিছুটা ক্ষন। হঠাৎ মনের মাঝে তীব্র আকাঙ্খা উঁকি দেয়, মন ডাকে বয়ে চলার।
ঘরের দেয়ালে দেয়ালে লাগানো ছবি। ছবিগুলো যেনো কথা বলে। ৮০ দশকের শেষের দিকে নতুন কুড়ির পুরস্কার হাতে। সুইডেনের প্রথম নাচের অনুষ্ঠান, গন্যমান্য মানুষের সাথে ছবি। সংসার নামক প্রজেক্ট এর অংশ হিসেবে কিছু অনবদ্য মুহুর্ত। ছবি শেষ করে যখন ঘুমিয়ে থাকা রেশমার দিকে তাকাই, তখন দেখি বড্ড নিঃসঙ্গ, দুঃখী এক মহিলা। যে হাসি, স্বপ্ন বুকে নিয়ে নতুন কুড়ির ক্রেস্ট হাতে নিয়ে ছবি তুলেছিলো, তার ছিটে ফোটা নেই। জানালা দিয়ে দেখলাম এক সুইডীশ এই তীব্র তুষারে জগিং এ বেরিয়েছে, সাথে একটা কুকুর। কুকুরটা তার ছায়া সঙ্গী হয়ে আছে, যেনো পিছু ছাড়তে চায় না। যদি পথ হারায় তাহলে তীব্র ঠান্ডায় মরে পরে থাকবে, কেউ দেখার নেই। যদি সাথে যায় তাহলে জীবনটা ছন্দময় হবে, একটা অর্থ খুজে পাবে।
আমি পা টিপে টিপে জামা কাপড় গায়ে চড়িয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।





সেইম হিয়ার ম্যান...
অলওয়েজ অফকোর্স
চমৎকার
ধন্যবাদ
ভাল লাগলো
ধন্যবাদ
নতুন লেখা কই?
আপনিও তো লেখেন না তেমন!
চমৎকার ।
এতদিন পর? সময় হলো বুঝি!
নামটা চমৎকার!
ধন্যবাদ।
আপনাকে কি বলে ডাকবো? বিষন্ন না বাউন্ডুলে?
মন্তব্য করুন