বিত্তশালী উপহাস
হিটলারের নাম এখন অস্পৃশ্য। ছোটশিশুদের সামনে এই নামটি একসময় উচ্চারন করা হতো না। ভাবতো ইবলিশ বা শুকর প্রানীর নাম যেমন মুসলমানেরা মুখে নিতে পারে না, তেমনি হিটলারের নাম কোনো সভ্য মানুষ মুখে নিতে পারে না।
লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে হিটলারের উন্মাদনা থেকে মুক্তি পায়। হিটলারের ফ্যাসিজম, একনায়কতন্ত্রের নির্যাতনের গুমোট কান্না ইউরোপের দেয়ালে দেয়ালে একসময় গুমড়ে কাঁদতো। এখন সেসব গল্পগুলো অনেকটা রূপকথা হয়ে গেছে। মানুষ দারিদ্র্যতাকে দূর করেছে, মুছে ফেলেছে প্রায় ধনী দরিদ্রের ব্যাবধান। মেধা দিয়ে যে পৃথিবী হাতের মুঠোয় আনা যায় তার দৃষ্টান্ত নতুন করে বলার প্রয়োজনীয়তা রাখে না।
দেশে ভয়ে ফোন দেয়া হয় না। দেশে আজ সবকিছুই আছে: আছে সরকারী সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ, জঙ্গী, মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য। বিস্তৃত এক জনপদ ধুকছে নিজেদের গড়ে তোলা ফ্রান্কেনস্টাইনের আঘাতে। ক্যান্সারের মতো আমরা নিত্য ব্যাথায় ধুকছি। অপরের পিঠে দোষ দিয়ে ক্লান্ত হইনি, তবে যখন ক্লান্ত হবো তখন নিজেদেরকে দোষ দিতে শুরু করবো। এভাবেই একটা সোনালী দেশে আগুন লাগবে, জ্বলতে থাকবে।
খবরের পত্রিকা ঘেটে গতমাসে এক বাল্যবন্ধুকে ফোন দিলাম। বললো ওর ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। জানতে চাইলাম কারা জ্বালালো। কিছু বললো না। শুধু জানতে পারলাম যারা জ্বালিয়েছে তারা আমাদের সাথে একই ক্লাসে পড়তো। বিভিন্ন পূজো পার্বন ঈদে একসাথে পায়েষ ফিন্নি প্রসাদ ভাগাভাগি করতাম। খুব জানতে মন চাইলো বন্ধুটির কাছে কি করবে এখন সে? তার প্রত্যুত্তরগুলো খুব গায়ে লাগে।
যখন মানুষের পশুত্ব জেগে ওঠে তখন সে তার গায়ে লেগে থাকা মুখোশের তোয়াক্কা করে না। তার মুখোশটা যখন খসে পড়ে তখন মনে হয় বিশ্বাস নামক বস্তুটি আসলেই অসাড়, ঈশ্বর হলো শুধুই একটা ফ্যান্টাসী। যখন ধর্ষিত হয় নিজের বোন নিজেরি চোখের সামনে তখন যেন কাউকে কিছু বলার নেই। চোখে পানিগুলো শুকিয়ে যাবে যখন তখন সিলিং ফ্যানে ঝুলে পড়া যায়। মৃত্যুর পর কি হবে, কি আছে সেটা তখন অর্থহীন মনে হয়।
সরকার সন্ত্রাসবাদ কমাতে কঠোর হয়, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে মানুষকে ভোলাতে চেষ্টা করে দেশকে ভালোবাস। ফিরে এসো এমন সহিংসতা থেকে। ফিরে গেলে কি হবে? যে ব্যাংকে আমার আমার বন্ধুর টাকা রক্ষিত আছে সে ব্যাংক লুটে খাবে সে, চর পরা নদীর বুকে বিশাল সেতু বানানোর কথা বলে চুরি করবে দেশের টাকা। তার সন্ত্রাসী বাহিনী আমার বোন স্ত্রীকে ধর্ষন করে ভিডিও করে নিয়ে যাবে। যাতে করে আমি কেস করতে না পারি অথবা যখন আবার জৈবিক চাহিদা দেখা দেবে তখনি যেনো আমার ঘরে এসে আমারি সামনে শুরু করে দেবে তাদের জৈবিক উন্মাদনা।
সোনিয়া একবার বলেছিলো আমার ফেসবুক নেই কেন। আমি হেসেছিলাম। দৈনিক সকালে আমার নতুন নতুন ছবি তুলতো আর ওর ফেসবুকে আপলোড করতো। ওর বন্ধু বান্ধবী নানা উপ হাসে জর্জরিত করতো, বলো সোনিয়া ইউ ডিজার্ভ বেটার। ও একে একে আনফ্রেন্ড করতো। একদিন ওর ফেসবুক আইড চেক করলাম। দেখলাম ১৫০০ বন্ধু থেকে হাতে গোনা ১০ জনে নেমে গেছে। জেলে যাবার আগে ওর আইডিটা আমাকে দিয়ে যায়। প্রতিদিন ও ক্রিমিনাল ভার্কেটের ছোট্ট সেল থেকে এসএমএস করে, বলে একটা স্ট্যাটাস দাও। আমি দেই, ও নিজের ল্যাপটপ থেকে সেটা দেখে, আমার নানা ১০ টা আইডি খুলেছে। সেখান থেকে কমেন্ট করে।
আমি ফেসবুক আইডি তবুও খুলবো না। কাদের এড করবো? দেশের সঙ্গি সাথী যারা তারাইতো এড হবে তাইতো? তারা কি বলবে? আজ হিন্দুদের ঘর পোড়াবে। কাল জামাত শিবিরের নামে মানুষ মারবে। কিন্তু কেউ কি দেখেনি যারা ঘর পোড়ায় লুট করে ধর্ষন করে তারা জামাত শিবির লীগ বিএনপি সবাই? দলকানা মানুষ, সরকারী লোকজন পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দিচ্ছে যেসব জায়গায় জামাত শিবির দ্বারা আক্রান্ত সেখানে পাকড়াও করো। জামাত শিবির অবিরাম বলে যাচ্ছে যেসব জায়গায় লীগের লোকজন দ্বারা আক্রান্ত তাদেরকে পাকড়াও করো। আওয়ামী সমর্থক একজনকেও পেলাম যাদের সৎসাহস আছে এটা বলার যে, হ্যা, এই লোকটি, এই সেই লোক, যে একজন আওয়ামী নেতা। তিনিই সরাসরি জড়িত এমন অপকর্মে। অথবা কোনো একজন ইসলামী দলের নেতাকে দেখলাম না বলতে যে এই সেই মুনাফেক যে কিনা রাতের আধাঁরে আল্লাহর নামে মানুষ হত্যা, লুট তরাজ করেছিলো।
গনজাগরন মন্ঞ্চের মুখেও সেগুলো শুনিনি।
৬০, ৭০ এর দশকে আরএএফ দোর্দন্ড প্রতাপে মাথাচাড়া দিয়েছিলো জার্মানীতে। প্রথম দিকে তারা বলা শুরু করলো আমরা হিটলারের ফ্যাসিজম থেকে মুক্তি পেয়ে আমেরিকার সম্রাজ্যবাদের দিকে ঝুকে পড়লাম। ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা দলে দলে ইরানের স্বৈরশাসক রাজা শাহ এর বিরুদ্ধে খোলা রাস্তায় প্লাকার্ড নিয়ে নামে। সেখানে আমেরিকার মদদপুষ্ট শাহের লোকজন রায়টের সূত্রপাত করে। নিহত হয় এক সাধারন ছাত্র। বিক্ষোভ দানা বাধে দেশ জুড়ে ছাত্রদের মধ্যে। ছাত্ররা স হিংস হয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।জার্মান সহ পুরো ইউরোপ জুড়ে দুটো দশক এক সহিংস তান্ডবের সম্মুখীন হয়।
জার্মান একটা সময় ভাবতে থাকে এত শত তরুন মেধাবী যুবকেরা কেনো সহিংসতার পথে পা বাড়াচ্ছে, কীই বা তার কারন! তারা ঘেটে দেখে দারিদ্র্য বা বেকারত্বের কারনে এসব ঘটছে না। মেধাবী ছাত্রগুলো ইচ্ছে করলে আরেকটা প্রযুক্তির উৎকর্ষময় রেঁনেসার আবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম। তাহলে কি জন্যে তারা বনের খেয়ে মোষ তাড়ায়? তারা মোষ তাড়ায় এই জন্য যে তারা তাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে কখনোই ফ্যাসিজমের আখড়া হতে দিতে চায় না। তারা হিটলার দেখেছে, মুসোলিনী দেখেছে, তবে তারা আরেকটা বুশ দেখতে চায়নি। তারা তাদের প্রিয় মাতৃভূমির গায়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কালিমা লাগাতে চায়নি। যদিও আরএএফের বিরুদ্ধে সাধারন মানুষ হত্যার অনেক অভিযোগ ছিলো, কিন্তু সেগুলোর জন্য তারা মূল্যও দিয়েছে। আর তাই সরকার নিজের পলিসি বদলায়, এমন একটা জার্মানী গড়ে তোলে যেখানে এখন সবচেয়ে বেশী মুসলমানদের এসাইলাম দেয়া হয়েছে, নিরাপদতম আবাসস্হল দিতে সমর্থ হয়েছে। পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নকে টেনে তোলার জন্য আপ্রান প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ যেখানে নিজেদেরকে আদর্শ জাতী হিসেবে তৈরী করার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে সেখানে দেশে চলছে ফ্যাসিজমের এক অদ্ভূত চর্চা। সরকার সন্ত্রাসী কাজে অংশ নেয়, বিরোধী দল আন্দোলনের নামে মানুষ পোড়ায়। আমরা সেই মানুষ পোড়ার নৃশংস ছবি দেখে ঘুম থেকে উঠি, অফিসে যাই। ছুটির দিন পিজ্জা হাটে যাই অথবা মালয়েশিয়ার কোনো এক মনোরম বীচে শুয়ে থাকি। একদিন দুঃসময় শেষ হবে, এই ভেবে দিনাতিপাত করছি। অথচ ভাবছি না আমরা জন্মের আদি সময় থেকে এখন থেকে এখনও মুক্তি পাইনি।
২০০ বছরের নির্মম ব্রিটিশ শাসন থেকে বর্বর পাকিস্তানী শাসনামল পাই। ২৪ পর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাই নিজেদের একটা দেশ। কখনো উর্দি পরা জেনারেল, কখনো গনতন্ত্রের মুখোশে স্বৈরশাসকেরা আমাদের লুটে যায়। আমাদেরকে ধর্ষন করে, আমাদের হত্যা করে, আমাদের কষ্টের টাকা লুটে খায়। আমরা মুক্তির জন্য পথ চেয়ে থাকি মাহাথীরের খোজে। কোনো মাহাথীর আসে না, আসে ভালো মানুষের মুখোশে আরেক লুসিফার। বুক চিড়ে ছিড়ে ফেলে জীবন্ত হ্রৎপিন্ড আমার। আমার আবছা হতে থাকা চোখ দুটো দেখতে থাকে আমরা স্পন্দিত হ্রৎপিন্ড আর লুসিফারের লোভাতুর চোখ। সে এখনি খুবলে খাবলে সেটা। ওদিকে আমার প্রিয় মানুষের ওপর হামলে পড়ে শকুনের দল। আমার দেশটা এভাবেই লুন্ঠিত হয়েছিলো, এখনও হচ্ছে সামনেও হবে। যেদিন মৃত্যু হবে সেদিন শান্তিতে এক ফোটা ঘুম হবে আমার, আমার এই দেশটার।





অকপট লেখা!
ভাল লিখেছেন। সাবলীল।
জীবনটা কেমন যেন একঘেয়েমীতে ঘুরপাক খাচ্ছে
দারুন
ধন্যবাদ
ভাল লিখেছেন। সাবলীল।
ধন্যবাদ
মন্তব্য করুন