শুধু ফুরিয়ে যাবার এই ভয়
হাত পা ধুয়ে ব্যালকনিতে বসে একটা সিগারেট জ্বালানোর পর দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনার দৃশ্যগুলো ফিরে আসে।
ঘুম ভেঙ্গেছিলো দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে। অথচ সেই সকাল ৮ টায় লিজা নামের বান্ধবী ফোন করে ডেকে দিয়েছে, আমি বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে ওর সাথে ৫ মিনিট কথা বলেছি। দুপুর দুটোয় পরীক্ষা। বিনিয়োগের কঠিন দুটো চ্যাপ্টার পড়তে হবে। তবুও হেরে গেলাম আলসেমির কাছে।
পরীক্ষাটা খারাপ হল যথারীতি। আরেকজনের খাতার দিকে তাকিয়ে একটা অংক দেখার চেষ্টা করার সময় ম্যাডাম চীৎকার করে উঠলেন- এই যে ঝাঁকড়া চুল, আপনাকে কিন্তু পরীক্ষা দিতে দেবো না।
পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে শেষ বিকেলটায় আমি উদ্ভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পরীক্ষা খারাপ হলে যা হয়। আশেপাশের এলাকায় কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়িয়ে দেখা হল রশিদ মামার সাথে। দিনের শুরুটা হয়ত সেখানেই হল। রশিদ মামাকে দেখে চমকে উঠেছিলাম। ১৪ বছর পর সে আজ চুল কেটেছে। মামা বললেন, কোনও এক বিখ্যাত গায়ক মারা গেছে।
সন্ধ্যাটা হলে গিয়ে আগামি পরীক্ষার পড়াশোনার জন্য বলি দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু রাত ৯টা বাজতেই আড্ডা আর গান আমাকে ডাকতে লাগলো।
ছুটে যেতেই কানে এসে লাগলো গীটারের সুর আর পিট সিগারের গান- ফুলগুলো সব গেলো কোথায়? আমিও গলা মেলালাম- হোয়েন উইল দে এভার লার্ন...
ইট সিমেন্টে ঘেরা আমাদের আড্ডাখানায় তাকিয়ে দেখতে পেলাম আগুন জ্বলছে। মাঘ মাসের শীত তাড়াতে সে আগুনের কোনও জুড়ি নেই। আগুনের আলোয় এক এক করে দেখতে পেলাম সবাইকে। মউদুদ- গাঁজা খেয়ে যে পাগল হয়ে গেছে বলে আমাদের ধারণা- তাকেও দেখা গেলো অনেকদিন পর। কবি- যে প্রায় কয়েক বছর পর চুল কেটেছে বলে আমার মনে হয়- স্বীকার করল যে চুল কাটলে তাকে দেখতে অস্বাভাবিক লাগে। দুর্জয়দার কাছ থেকে জানা গেলো সিঁধ কেটে ব্যাংক থেকে ১৬ কোটি টাকা চুরি করেছিলো যে চোর সে ধরা পড়েছে। অ্যালফ্রেড তোহা বললেন, ছিঁচকে চোর। আমরা সবাই মিলে মূর্খ চোরকে গালমন্দ করলাম খানিক।
তখন মাইকেল সুমন ভাই অন্ধকারে বসে গীটার বাজিয়ে একটা গান গাচ্ছিলো, কেন চলে গেলে দূরে, ভাসায়ে মোরে সুরে। গুহাটা যেন আমাদের কথা আর সুরে জীবন্ত হয়ে গিয়েছিলো। রাতুল ভাই, ইমরান ভাই আর তিতাসের হাতে গীটার গুলো সংগীতে চারপাশের শূন্যতাটুকু পুরন করে রেখেছিল। আমরা সবাই সঙ্গীতপ্রেমী।
আরাফাত ভাই আর আমি একেবারে আগুনের গা ঘেঁষে বসে রইলাম। তিতাস আমার সোনার বাংলা বাজাতে লাগলো গীটারে। মাঘের ঠান্ডা বাতাস গুহাটার ভেতরে একটা চক্কর মেরে গেলো ঠিক তখনই।
এরকম করে প্রতিটি দিনের বাতাস গায়ে মেখেছি আমরা। ভেবেছি পিট সিগারের অথবা বব ডিলানের কথা। কখনো চিন্তা গ্রাস করেছে পিংক ফ্লয়েডের গভীর বেদনা। একদিন হয়ত সুমন, অঞ্জনও চলে যাবে। কিন্তু ওরা প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে আমাদের ভালোবাসায়। আমার পরে যারা জন্মাবে তারাও জন্ম দিতে থাকবে ওদের। ওদের জীবন ফুরোবেনা কোনোদিন।
রাতে খেয়ে দেয়ে হলে চলে এসে খুব লিখতে ইচ্ছা করল। তাই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার চ্যাপ্টার এখনো খোলা হয়নি। এখন হিসেব করছি চারটা চ্যাপ্টার পড়তে রাত কয়টা বাজবে। হয়তো ভোঁর হয়ে যাবে। কোনও এক ভোঁরে এই জীবনটাও ফুরিয়ে যাবে হটাৎ করে। তবু ভেবে ভেবে ব্যথা পেয়ে কি লাভ। মনের ভিতরের জ্বালানী জ্বেলে জ্বেলে রাত পাড়ি দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় জানা নাই আমার।





মন্তব্য করুন