লেট নাইট কুকিং
দরজা জানালা বন্ধ করা। তারপরও মনে হচ্ছে বেড়ার ফুটো দিয়ে শির শির করে বাতাস ঢুকছে ঘরে। রাত প্রায় শেষ। একটু পরেই মাইকে আজান দেবে। ঘণ্টা কয়েক ধরে ইন্টারনেটে বার্তাচালাচালি করে যখন খুব খিদে লেগেছে তখন একটু ফেসবুকে ঢুকে পড়লাম। আর দেখি একটু আগেই সুফিয়া কামাল হলের একটি রুমে "লেট নাইট কুকিং'' শেষে খাবার দাবারগুলো সযত্নে পরিবেশন করে রাখা হয়েছে।
থালার মাঝখানে একবাটি ভাত উল্টো করে রাখা, চাইনিজদের মত করে। তার পাশে চিংড়ি মাছের কি একটা তরকারি। ভাতের উপরে একটু ধনে পাতা। আর গোলাপ ফুলের মত করে কাঁটা একটা টমেটো। ছবির ক্যাপশনে লিখেছে ''লেট নাইট কুকিং। শ্রিম্প উইথ সবজি, আর কি চাই? কার কার খিদে পেয়েছে??''
আমার খিদেটা একেবারেই চড়ে গেছে। এরকম পরিস্থিতিতে সবাই বলে খেতে চাইলে চলে এস। পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব জানার পরও। পরে একদিন নিমন্ত্রণ দিলেও তো পারে। কিন্তু কোন একটা উপায়ে যদি এই মুহূর্তে ওই রুমে গিয়ে হাজির হতে পারতাম তাহলে বেশ হোতো।
আমার কাছে অবশ্য নুদুলস আছে। এইটা একটা কাজের জিনিস। কত রাতে নুদুলস আমাকে শক্তি আর সান্ত্বনা দিয়েছে, ভরসা দিয়ে বলেছে খিদে পেলে আমি আছি। এই প্যাকেটটা অন্তত দুই মাস ধরে সেই ভরসা হয়ে আছে, ধুলো জমে গেছে, এখনো খাওয়া হয় নি।
করিডোর হেঁটে বাথরুম এলাকায় যেতে আসতে সারা গায় জাড়কাটা দেয়। ঠাণ্ডাটা এমন বুনো। গরমের রাত হলে বেরিয়ে পড়তাম। হাল্কা কাপড়ে বিছানায় বসে থাকা থেকে ভারী ভারী কাপড় জুতো গায়ে চাপিয়ে বাইরে যাওয়ার বিশাল পরিবর্তনটার ভিতর দিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। এর চেয়ে টেট্রা হাইড্রো ক্যানাবিনোলের মহান খিদেটা বেঁচে থাক আর একটু।
আজকে রেডিওতেও ভালো ভালো সব গান বাজাচ্ছে। একটু আগেও বাজছিল সেই গানটা। কালো? তা সে যতই কালো হোক। মেঘলা দিনে দেখেছিলাম, কালো মেয়ের কালো হরিন চোখ। এইমাত্র শুরু হল রুবি রায়ের গানটা।
লেট নাইট ডিনার সেরেছে যে মেয়েটা এইমাত্র তার মনে পড়ে কি না জানি না সেই মেঘলা বিকেলের কথা। যে বিকেলে শহরের নির্জন প্রান্তে একটা লাল প্রাসাদের সিঁড়িতে বসে আমি স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছিলাম। আমি নিশ্চিত ভাবে ওর দিকে ধাবিত হচ্ছিলাম। জানলাম ওর সমস্যাগুলোকে। তবু আমার স্বপ্নের কথা বলেছিলাম। জীবনটা নিজের মত কাটানোর স্বপ্ন, পৃথিবীটা মুঠোবন্দী করার স্বপ্ন।
আমিও রান্না করতে পারি। বন্ধু বা বড় ভাইয়ের বাসার শহুরে রান্নাঘরটা পেলে শচীন কর্তা কিংবা কোহেন সাহেবের গান হাই ভলুমে চড়িয়ে, শাদা ধোঁয়া ছেঁড়ে, মর্তে নামাতে পারি স্বর্গের স্বাদ। কিন্তু মেয়েটার কি কারণে এ রকম রাতে রান্না করে খাবার সাজিয়ে পৃথিবীকে আহ্বান করতে হয় তাও কি অজানা থাকে?
পৃথিবীটার সিস্টেমে বিশাল ঘাপলা রয়ে গেছে এখনো। আমাদের মত ছেলেমেয়েরা এই সিস্টেমে পড়ে শুধুই বিষাদ আর ব্যর্থতা খুঁজে মরে। পাওয়া যায় না দরকারি সাহস। আমি বলি, বোঝানোর চেষ্টা করি - ভুল মাপকাঠিতে কখনোই নিজেকে যাচাই করা উচিত নয়, মেশিনে গলদ থাকলে ওজন তো কম আসবেই।





এরকম একটা ভুল সামাজিক মাপকাঠিতে কখনোই নিজেকে যাচাই করা উচিত নয়, মেশিনে গলদ থাকলে ওজন তো কম আসবেই।
একদম ঠিক কথা!
খাঁটি কথা।
আর তাই রাতগুলো কেটে যায় অন্ধকারের উপাসনায়, আর দিনে পড়ে পড়ে ঘুমায় মগজ, অলস চেতনায় ।
ঠিক কথা

শেষ প্যারাটা অসাধারন।
মন্তব্য করুন