ইউজার লগইন

সেই পাহাড় আর নদীর গল্পটি

টিক টিক টিক টিক শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোন শব্দ নেই এই মুর্হূতে। সারা বাড়িটাকে একটা মৃত্যু শীতল নীরবতা ছুঁয়ে আছে। এ বাড়িতে এখনো কিছু বেঁচে আছে, প্রাণপনে সেটা জানান দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছে হাবা কালা এই ঘড়িটি। কোথায় কি হচ্ছে, বাড়িতে কার মনের কি অবস্থা, কিছুই বুঝতে পারে না, বোকার মতো কাটা ঘুরিয়েই যায় সারাবেলা। ভর দুপুর হলেও এঘরটাতে এখন সন্ধ্যা নেমে আছে যেনো,আলোছায়ার খেলায়। এই বসার ঘরটার সামনের জানালায় বসলে বাইরের রাস্তাটা সরাসরি দেখা যায়। আর জানালাটার ঠিক পাশেই গোলাপী বোগেনভিলার ঝাড়। ঝাড়টা বড় হয়ে গেলেই ঝুঁকে এসে জানালাটার অনেকটা ঢেকে দেয়। তখন বসার ঘরটা অনেকটা অন্ধকার দেখায়। এতে একটা সুবিধে হয় রাস্তা থেকে ঘরটাকে আর সরাসরি দেখা যায় না যদিও ঘর থেকে রাস্তাটাকে ভালোই দেখা যায়। জানালার উপর আছে গাঢ়ো মেরুন রঙের ভেলভেটের পর্দা। সকালটা যখন পেকে উঠেছিলো, তখন চোখে অনেক আলো লাগছিলো বলে পর্দাগুলো আধা আধা টেনে দেয়া হয়েছিলো। রিয়ার অবশ্য উজ্জল আলো, অনেক রোদ খুব ভালো লাগে। অরন্য আপত্তি করলেও রিয়া প্রায়ই লোক ডাকিয়ে বোগেনভিলার ঝাড় কাটিয়ে দেয়। অনেকদিন হয়ে গেলো বাড়িঘরের সাজসজ্জার দিকে তাকানোর কথাই মনে পরেনি রিয়ার। অন্য একটা জগতে ছিলো যেনো সে। যা আগে একসময় সারাক্ষণ তার চোখে পড়তো কিংবা চোখে বিঁধতো, সেগুলো তার মনেই পড়েনি। সোফার পাশে একটা ইজি চেয়ার রাখা আছে, তাতে বসে বই পড়তে পড়তে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে অন্য জগতে হারিয়ে যাওয়া ছিলো এক সময় রিয়ার প্রিয় কাজগুলোর একটি। আনমনে রাস্তার লোকজনের ব্যস্ত হাটাচলা দেখতে কতো কি ভাবত সে। কিন্তু মাঝখানের দিনগুলো যেনো অন্যরকম ছিলো। ক্লান্ত হয়ে পরা রিয়ার আজ কেনো যেনো হঠাৎ আলোর চেয়ে ছাঁয়াটাকেই অনেক বেশি আপন লাগছে।

সাজগোজে, হাটা, চলা বলায় সারাক্ষন অনেক সর্তক থাকা রিয়া এখন আলুথালুভাবে সোফার এককোণে চোখ বুঁজে পরে আছে। লম্বা চুলগুলো আজ আর কোন বিশেষ ভঙ্গীমায় বাধা নেই, কোন রকমে জমিয়ে একসাথে হাত খোঁপায় বন্দী। এক এক সময় মনে হচ্ছে ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারলে হয়তো কিছুটা আরাম হতো কিন্তু কান্নাও পাচ্ছে না। শুধু বুকটা মুচড়ে মুচড়ে উঠছে ব্যথায়, মাঝে মাঝে এমন ব্যথা হচ্ছে যে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না রিয়া। গলা শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে আছে। এসময় স্বপ্নটাও কাছে আসছে না। কোথায় লুকিয়ে আছে কে জানে? বাচ্চা হলেও ঠিক টের পেয়েছে আজকের দিনটা, অন্যসব দিনের মতো আলো ঝলমলে দেখালেও কোথাও কিছু ঠিক প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক নয়। আজ ছন্দহীন, সুরহীন একটা দিন। কাছে থাকলে স্বপ্নকে বলতো রিয়া, এক গ্লাস পানি এনে দিতে। ছোট হলেও এসব খুঁটিনাটি কাজ স্বপ্ন ভালোই পারে। আর মা তাকে কোন কাজের কথা বললে, সে খুব খুশী হয়, মা তাকে বড় ভাবছে, কাজের ভাবছে। সত্যিই বড় হচ্ছে সে। অথচ এই বড় হওয়ার জন্যই মা - বাবা যতো সাঙ্কেতিক ভাষায় কথা বলুক না কেনো, যতো নিজেদেরকে স্বপ্নের সামনে চেপে রাখুক না কেনো, স্বপ্ন ঠিক টের পেয়ে যায়, কখন তাদের কাছে থাকতে হবে আর কখন নিজের ঘরে কার্টুন চালিয়ে, ছবি আঁকতে হবে। কখন মা ভাত দিলে, চুপ করে গিলে গিলে খেয়ে নিতে হয় আর কখন মায়ের কোমড় জড়িয়ে লাজানিয়ার বায়না করতে হয়।

কলেজের ডাক সাইটে সুন্দরী রিয়া, পড়াশোনায় ফার্ষ্ট - সেকেন্ড না হলেও ভালো ছাত্রদের কাতারেই পরে। ভালো গান করে, কলেজের ছেলেরাতো বটেই, তরুন শিক্ষকরাও রিয়াকে দেখে মনে মনে অনেক কল্পনার জাল বুনেন। গোলাপের পাপড়ির মতো ফিকে রঙের মসৃন ত্বক, ছিপছিপে গড়নের, বাঙ্গালী মেয়েদের চেয়ে বেশ অনেকটা লম্বা রিয়া এই তাকে করা বিশেষ খাতিরটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে যদিও মুখে কখনো কিছু বলে না। ঘন কালো চোখের তারায় সব সময় একটা হাসির ঝিলিক লেগেই থাকে। সে সুন্দরী, লোকে তাকে সুন্দরী বলে এটা নতুন কি? তারুন্যের আনন্দে ভরপুর তার প্রতিটি মুহূর্ত। বাবা মা অবশ্য অনেক দিন থেকেই একটা ভালো ছেলের সন্ধানে ছিলেন। রিয়ার মতো মেয়ের জন্যতো আর সুপাত্রের অভাব নেই তবুও বাবা মা যতোটুকু সম্ভব জেনে বুঝে আগাতে চান। পরে যেনো আফশোস করতে না হয়, আর একটু দেখে কিংবা দেরী করে দিলেই ভালো হতো। একদিন এক আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রবাসী পাত্র অরন্যের জন্যে প্রস্তাব এলো, মেধাবী অরন্য যে শুধু ভালো চাকুরীই করছে তাই নয়, দেখতেও দারুন ভালো। মেধা, উজ্জল পৌরুষদৃপ্ত চেহারা, পারিবারিক আভিজাত্য সব মিলিয়ে অরন্যের মধ্যে অন্য একটা দ্যুতি খেলে সারাক্ষণ। অরন্যের সাথে দেখা হতে শুধু বাবা মাই নয়, রিয়াও মনে মনে বুঝতে পারলো এই সেই, যার জন্য দিনরাত তার এতো সাজসজ্জা, এতো ধ্যান।

শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে এক শুভক্ষণে দুই পরিবারের সবার আর্শীবাদ নিয়ে বিয়ে হয়ে গেলো রিয়া আর অরন্যের। পাড়া প্রতিবেশী থেকে আত্মীয় স্বজন সবাই চোখ ট্যারা করে দোয়া করলেন আর ঘটা করে আয়োজন করা বিয়ের ভালো ভালো খাবার দাবারও পেট ভরে খেলেন। কেউ মুখে না বললেও মনে মনে স্বীকার করলেন, জুটি হয়েছে বটে একটা, যাকে বলে রাজযোটক। যেমন বর তেমনি কনে। রূপকথার গল্পের মতো। সত্যিই তাই ছিল। কোথা দিয়ে সময় উড়তে লাগল অরন্য আর রিয়া বুঝতেও পারল না। আজকে এখানে ঘুরতে যাচ্ছেতো কালকে ওখানে। শ্বশুর - শাশুড়ি, গুরুজন কেউ কাছে নেই, নেই কোন বাধা নিষেধ, উদ্দাম আনন্দে কাটছে দিন। দুজন দুজনকে আবিস্কারের নেশায় ব্যস্ত। প্রথম শারীরিক ভালোবাসার স্বাদে উন্মাতাল দুজনেই। রিয়া যা রান্না করছে তাই অরন্যের মনে হচ্ছে, এমন ভালো রান্না সে আগে আর কখনো খায়নি। অরন্য অফিস থেকে এসে রিয়াকে জড়িয়ে ধরলেই রিয়ার মনে হয়, এমন ভালো রিয়াকে কেউ আর এ জীবনে বাসেনি। জীবন কানায় কানায় পরিপূর্ণ। এরমধ্যেই দুবছর গড়িয়ে গিয়ে স্বপ্ন এলো রিয়ার কোল জুড়ে। নতুন আনন্দে ভরপুর রিয়া বসে গেলো ছেলে নিয়ে তারা আলাদা পৃথিবী সাজাতে। ছেলে কি খাবে, কখন ঘুমাবে, তাকে গোসল দেয়া, ঘুম পাড়ানো এই করে এখন রিয়ার বেশিরভাগ সময় কাটে।

অত্যন্ত মাত্রায় ক্যারিয়ার সচেতেন অরন্য জানে অনেকদিন এক জায়গায় কাজ করাটা, তার ক্যারিয়ারের জন্যে ততোটা সুবিধাজনক নয়। চাকরী বদলে নতুন কোম্পানী আর সাথে নতুন শহরে চলে এলো সবাইকে নিয়ে। নতুন শহরে অরন্য এবার বাড়ি কিনে নিলো। পরে আবার শিফট করলে বেঁচে দিবে এই ভেবে। আগে অফিসের ফার্নিশড ফ্ল্যাটে থেকেছে। আর এ হলো রিয়ার নিজের সংসার। সংসার পাওয়ার আনন্দে আর অন্য দশটি মেয়ের মতো সেও আজ মাতোয়ারা। কোন পর্দার সাথে কোন কালারের ফার্নিচার ম্যাচ করবে, বাগানে কোন কোন রঙের ফুলের গাছ লাগাবে সব নিয়েই সে রীতিমতো দিনরাত ছবি এঁকে যাচ্ছে। অফিসের বাইরের অনেকটা সময়ই অরন্যকে আজকাল পড়াশোনার পেছনে দিতে হয়। চাকুরীতে উন্নতি করতে হলে, অধঃনস্তদের উপর অধিকার ফলাতে হলে, অনেক পড়াশোনা করতে হয় আজকাল। ঘন ঘন ট্যুর থাকে। রিয়ার অবশ্য তা নিয়ে তেমন অভিযোগ নেই, সবইতো অরন্য তার আর স্বপ্নের জন্যে করছে। নতুন শহরে নতুন নতুন লোকের সাথে বন্ধুত্ব করে সময় কাটতে লাগলো রিয়ার। বাড়িটাও খুব সুন্দর। মনের মাধুরী ঢেলে প্রতিটি সেন্টিমিটার সাজাচ্ছে, সযতনে। অরন্য খরচে কোন বাধা দেয় না। বরং রিয়ার এই নিপুনতায় মুগ্ধ সে।

(চলবে)

২০১২ সালের বইমেলাতে "ভালবাসার গল্প" পেজের প্রথম প্রকাশনা "ভালবাসার গল্প"তে এ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে।

গল্পটির প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক

পোস্টটি ১৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


শিরোনামটা পছন্দ হয়েছে।
গল্প পড়তে পড়তে থেমে গেলাম Sad তাড়াতড়ি বাকীটুকু পোস্ট করো।

২০১২ সালের বইমেলাতে "ভালবাসার গল্প" পেজের প্রথম প্রকাশনা "ভালবাসার গল্প"তে এ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে।

বইমেলা শেষে এমন তথ্য দিলে চলে? Steve

তানবীরা's picture


ফেসবুকে লোকে কি করে? স্ট্যাটাসটাও কি খেয়াল করে না Sad(

সুমি হোসেন's picture


আগেই পড়েছি, Love

তানবীরা's picture


উদ্ধার করছেন Tongue

বইয়ে দাগাইস না Big smile

সুমি হোসেন's picture


Tongue আমি কি পারিসা? Tongue

উচ্ছল's picture


এমন জায়গায় আইসা আপনি ব্রকে করতে পারেন না।। Tongue , তাড়াতাড়ি স্টাট নেন।।

তানবীরা's picture


আর স্টার্ট। মানুষের উৎসাহ দেখছেন? Sad(

শওকত মাসুম's picture


ভালবাসার গল্পের কথা আগে তো জানলাম না, বাজি! তীব্র ধিক্কার

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আমার ব্লগ থেকে প্রকাশিত ভালোবাসার গল্প শিরোনমের কোনো একটি বইতে দেখেছিলাম গল্পটি Big smile

১০

তানবীরা's picture


অ খালি দেখছেন, পড়েন নাই Sad(

১১

তানবীরা's picture


কোন খোঁজ রাখেন আমার? আপনারে মহা সুতীব্র ধিক্কার। ফেসবুকে আমাদের গরীবেরও মাঝে সাঝে স্ট্যাটাস থাকে Sad(

১২

শওকত মাসুম's picture


তোমার বেশিরভাগ গল্পের চরিত্রগুলোর নাম একটু ভাবের হয়, তখন একটু কৃত্তিম কৃত্তিম লাগে, ঠিক সাধারণ মানুষের সঙ্গে রিলেট করা যায় না। আমার একান্তই ব্যক্তিগত মত এইটা। Smile

১৩

তানবীরা's picture


গল্পটির প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক

এটা কেন বললাম!!! বাস্তবের সাথে রিলেট করার জন্যে!!!

বুঝলাম না, নাকি পরবর্তী গল্পের জন্যে বাস্তবধর্মী নায়কের "মাসুম" নাম সাজেষ্ট করলেন Tongue

একটা কাজ করেন, আমার লেখার স্টাইল নিয়ে আপনি একটা স্যাটায়ার দেন Big smile

১৪

সুমি হোসেন's picture


পরবরতি গলপের নায়কের নাম "মাসুমভাই" নায়িকা "পপি"! Wink

১৫

রায়েহাত শুভ's picture


সাসপেন্স সাসপেন্স...

১৬

তানবীরা's picture


Beer

১৭

নিকোলাস's picture


আপা, আগে পড়ি নাই।
সম্পূর্ণ করেন তাড়াতাড়ি।
মনে হইতাসে, খাওয়া অর্ধেক শেষ কইরা বয়া রইসি.....................

১৮

তানবীরা's picture


কেউ না পড়লে দিয়ে কি হবে? Sad

১৯

নিকোলাস's picture


আগে শেষ করেন। তারপর পড়া ধরুমনে। দেহুম কে কে পড়ে নাই... হুক্কা

২০

তানবীরা's picture


Big smile

২১

আরাফাত শান্ত's picture


পর্বের আশায় পড়ে থাকতে আর ভালো লাগে না!

২২

তানবীরা's picture


আশায় মিলায় গল্প, নিরাশায় বহুদূর Laughing out loud

২৩

ফাহমিদা's picture


অনেক আশায় থাকলাম আপু...

২৪

তানবীরা's picture


যাও আশা পূরন করে দিলাম Big smile

২৫

জ্যোতি's picture


তাত্তাড়ি পরের পর্ব দেন। আমি আগে পড়ি নাই। এখন জলদি পড়তে হপে।

২৬

তানবীরা's picture


Stare Stare Stare

২৭

নিঝুম অরণ্য's picture


এই পর্বটা পড়লাম। অসাধারণ!! পরের পর্ব পড়তে যাচ্ছি।

২৮

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


বইটা এখনও পাইনাই! Sad

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

তানবীরা's picture

নিজের সম্পর্কে

It is not the cloth I’m wearing …………it is the style I’m carrying

http://ratjagapakhi.blogspot.com/