ইউজার লগইন

মাতৃত্বের দায়িত্ব নাকি দায়িত্বের মাতৃত্ব?

শেষ বয়সে আমার সংগ্রামী স্বভাবের নানী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। প্রায় শয্যাশায়ী অবস্থায় একবার তিনি হঠাৎ কইরা নিখোঁজ হন। প্রায় ঘণ্টা তিনেক পরে তার সন্ধান মিলে বাড়ির পেছনের তিড়তিড় করে বহমান বুড়িগঙ্গার ছোট্ট শাখাটার পারে। অর্ধনগ্ন অবস্থায় হাটু গাইড়া সে বেলে মাটি মাখতেছিলো সারা শরীরের। সেইখান থেইকা আবার তারে ঘরে ফিরাইয়া আননের সময় তার তারস্বরে চিৎকার আমার কৈশোর প্রাণে কেমন স্তব্ধতা মাখছিলো...সেই অনুভূতির কথা মনে হইলে আমি আজো শিউড়ে উঠি। বড় মা মানে নানার মা'ও তার মৃত্যুর আগে আগে কেমন উদ্ভট আচরণ করতো! একেবারেই বালকবেলার স্মৃতি হিসাবে একদিন সারাদিন বিছানায় শুইয়া গোঙাইতে থাকা বড় মা'রে দরজার চৌকাঠ ধইরা দাঁড়াইতে দেইখা আমি তব্ধা খাইছিলাম মনে পড়ে। বড় মা'র গায়ে কোনো কাপড় ছিলো না...

আজকে সকালে হাসপাতালের বিছানায় শুইয়া আমার মা'ও যখন এলোমেলো বকতেছিলো। আমারে জড়াইয়া ধইরা বারবার বলতেছিলো আসসালামু আলাইকুম। আমি অস্থির হইয়া উঠি। আমার মনে পড়ে নানু আর বড় মা'র কথা। জেনেটিক্যালি আমার মায়েরও কি শেষ সময়ের অসংলগ্ন আচরনের কাল শুরু হইলো তবে! নানু আর বড় মা ঐ সব ঘটনার পরপরই মৃত্যুবরণ করছিলেন। এই ভাবনার বিস্তারে আমার জ্বরাক্রান্ত গায়ে ঘাম ঝরায়। কি করবো বুইঝা উঠতে পারি না। ঐ সময়টায় ডাক্তার সাহেব না আসলে আমারো হয়তো মাইল্ড স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হইতেছিলো। ডাক্তার সাহেব তার ব্লাড রিপোর্ট অবজার্ভ কইরা বললেন ক্রমাগত ভমিটিঙে পটাশিয়াম ইলেক্ট্রোলাইট বইলা কিছু একটা তার রক্ত থেইকা প্রায় নিঃশেষিত। যেই কারনে তার ব্রেইন ঠিক যথাযথ ভূমিকা পালন করতেছেনা। নার্স আইসা ঢাউশ সাইজের দুইটা স্যালাইন ওয়াটার ব্যাগ ঝুলাইয়া দিলো, যার একটা পটাশিয়াম, অন্যটা নরমাল।

স্যালাইন পথ্যে নিশ্চিত আমি তাৎক্ষণিক কোনো ফল আশা করি নাই, তবু ক্ষীণ আশা তৈরী হইতে থাকে। তবে দুপুরের পর থেইকা মায়ের সেই অসংলগ্ন দোয়াদরুদ-ধর্মীয় বচনগুলিও কেমন ঘোলাটে হইতে শুরু করলো। আর সাথে হাতের ইশারায় দমের ঘাটতির কথা বুঝাইতেছিলো। হাসপাতালে অনভ্যস্ত আমি আবারো তালগোল পাকাইয়া ফেলি। ডিউটি ডক্টর ডাইকা ফিরা আইসা দেখি সে ইতোমধ্যেই স্যালাইনের নল খুইলা ফেলছে। তবে এইবার কেবল আমি না, সেই তরুণী ডাক্তারও খানিকটা অস্থির। রোগীর প্রেশার বাড়তেছে আর অক্সিজেন ঘাটতিও শুরু হইছে। সে সিস্টারদের অক্সিজেন বোতল আর প্রেশারের জন্য একটা ইঞ্জেকশানের কথা বলার পাশাপাশি আরেকজন সিনিয়র ডাক্তাররেও ডাইকা নিয়া আসে। সেই ডাক্তার আইসা কেবল আমারে একা পাইয়া বেশ খানিক্ষণ ঝাইড়া, নিদান দেন এইবার রোগীরে খাওয়ানোর সময় হইছে। প্রায় দেড়দিন পর মা'রে একটা কলা আর এক টুকরা মিল্ক ব্রেড খাওয়াইতে পারলাম জোর কইরা...

পেটে এইটুক খাবার পড়তেই মায়ের চেহারায় সেই পুরনো জ্যোতি ফিরা আসতে শুরু করলো। আর ক্যালশিয়াম ইঞ্জেকশান। এই চিকিৎসা দেইখা আমার মনে হইলো তাবৎ বাঙালি মাতৃমূর্তিরাই তো এইরম পটাশিয়াম-ক্যালশিয়াম আর ভিটামিনের অভাবে অসুস্থ্য হয়। এমন অনুমেয় চিকিৎসা তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহ তৈরী করলেও আমার মায়ের তাগদ ফিরাইতে শুরু করে। আমি স্থির দাঁড়াইয়া থাকি তার শিয়রের কাছে। শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে আবার ঘাম ঝড়াইয়া কমতেও থাকে। মা শান্ত-সমাহিত দৃষ্টিতে চোখ খুইলা আমারে দেখে, তারপর স্পষ্ট উচ্চারনে বলে,

তুমি এমন ঘামতেছো ক্যানো?

আমার সব ঘাম যেন নিমেষে মিলায়। আমার মনে হয় আমি এখন এই এগার তলা হাসপাতালের ছাদ থেইকা লাফ দিয়া পাখিদের সাথে সঙ্গত করি। কিন্তু এমন সময় শান্ত থাকতে হয়। আমি চুপচাপ তার গায়ে হাত বুলাইতে থাকি...নিজেরে অপরাধী মনে হয়। মাতৃত্বের রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন এক নারী আমারে সুখে রাখতে নিজেরে তিলেতিলে কেমনে শেষ করছে তার নমূনা দেখি। এমন বেহুদা রোমান্টিকতারে ভালোবাসা'র মাহাত্ম দিয়া আমরা নারী জাতিরে কেমনে দূর্বল কইরা তুলি তার কথা ভাবতে গিয়া চোখ ঘোলাটে হয়। দায়িত্বশীলতা মানে যদি এমন স্যাক্রিফাইস হয়, তারে পাল্টানোটা জরুরী মনে হয়।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শর্মি's picture


কবে বাসায় ফিরবেন আপনার আম্মা? ডাক্তার কিছু বলছে?

ভাস্কর's picture


আরো মনে হয় দিন চারেক থাকতে হবে...ডাক্তার বলছে কিডনী'র ঝামেলাটা নিয়ন্ত্রণ করতে হইবো। যে কোনো বাঙালি নারীর মতোই তারও ক্রিয়েটিনিন রেইট বেশি। আজকে সকালে ছিলো ২.৬৫। স্ট্যান্ডার্ড নাকি ১.২৩।

গ্রিফিন's picture


আপনে আমি হাজার চেষ্টা কইরাও আমাগো তাবত মায়েগো এই স্যাক্রিফাইসিং মনোভাব বদলাইতে পারমু কি না সন্দেহ রৈছে।

দিনশেষে একজন মা আসলে মা'ই, নইলে নিজের শরীলের দিকে না তাকাইয়া আপনের ঘামা লইয়া বিচলিত হওন অন্য কারুর দ্বারাই সম্ভব না।

আশা করি আপনের মা খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হইয়া উঠবেন।

মীর's picture


আসলেই পাল্টানোটা খুব জরুরী। এবং এটাই সবার জন্য ভালো। যেসব জায়গায় পাল্টাইসে, সেসব জায়গায় কোনো খারাপ কিছু ঘটসে বলে শুনি নাই।

ভাস্কর's picture


গতোকাল অবশ্য আমি হাসপাতাল অনভ্যস্ততায় একটু বেশিই ঘাবরানো ছিলাম...সেই ঘাবরানো সময়ে মৃত্যুরে দেখতেছিলাম আমি। একটা কবিতা লিখছি, যেহেতু বিষয়ানুগ তাই এইখানে মন্তব্য হিসাবে রাখি...

মৃত্যু বিষয়ক

চোখ চেয়ে মৃত্যুকে দেখেছি,
কেমন ফ্যাকাশে অথচ অস্থির মুখছবি তার।
তার ভয়ে পিছু হটে যাওয়া
হয় নাই, তবু এক শিহরণ খেলে।
মৃত্যু ঘ্রাণে মেলে
হুমকী...

মৃত্যুরে আসলে ভয় পাই নাই
কখনো, কেবল
নিরাপত্তাহীনতা ধরেছে ছেকে...

রাত পেরিয়ে দিনের আলোকে এলেও
কেমন অনিরাপদ আমি মাথা গুজে পড়ে থাকি,
মৃত্যুর আড়ালে যেতে চাই।
আশা করি মৃত্যুর ম্যাজিকে
কোনো অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা থাকে না...

টুটুল's picture


দ্রুত সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরুক...

রাসেল আশরাফ's picture


পোস্টটা পড়ে ৮বছর আগের ঘটনা মনে পড়ে গেল।হুবুহু একই ঘটনা।একদিকে আমি দৌড়াচ্ছি আমার মায়ের জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যদিকে আব্বা দৌড়াচ্ছে তার মায়ের জীবনের জন্য। সেদিন আমার মা কে ফিরে পেলেও আব্বা পায়নি।

আমার মা আপনার মা সবার মা ভালো থাকুক সুস্থ্য থাকুক।

সামছা আকিদা জাহান's picture


আপনার মার সুস্থ্যতা কামনা করি খুব দ্রুত সুস্থ্য হয়ে তিনি যেন বাড়ি ফেরেন।

আমার মাও খুবই আসুস্থ্য। তার সবই নষ্ট। হার্ট, কিডনী, লাং । তার পর ও ভাল ছিলেন হঠাৎ করে ডায়াবেটিকস বেড়ে যাওয়ায় শরীর খুব দূর্বল হয়ে পরেছে। কাল খাত থেকে পড়ে গিয়েছিলেন।

অনেক দিন মাকে দেখি না।

লিজা's picture


আপনার মা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন, এই দোয়া করি । এখন কেমন আছেন আন্টি?

১০

ভাস্কর's picture


মা সম্ভবতঃ সুস্থ্য হওয়ার পথে...এখন সে গুছাইয়া গল্প করতে পারতেছে।

১১

হাসান রায়হান's picture


যাক। ঠিক হয়ে যাবে।

১২

ভাস্কর's picture


ঠিক তো হইয়াই গেছে বলা যায়, এখন আর ২/৩ দিন হসপিটালে রাখতে হইবো ক্লিনিকাল অবজার্ভেশনের জন্য...

১৩

একজন মায়াবতী's picture


খুব দ্রুত সুস্থ্য হয়ে বাসায় ফিরবেন আন্টি।

১৪

কামরুল হাসান রাজন's picture


আন্টির জন্য শুভকামনা রইল।আশা করি খুব দ্রুত সুস্থ্য হয়ে বাসায় ফিরবেন আন্টি।

১৫

নাজনীন খলিল's picture


মায়েদের এই মনোভাব কিছুতেই বদলানো সম্ভব নয়।এই স্যাক্রিফাইস নেহাৎই দায়িত্ববোধ থেকে আসেনা আসে নিখাদ ভালবাসা থেকে।এটাই মাতৃত্ব।

উনার জন্য অনেক শুভকামনা।

১৬

শওকত মাসুম's picture


বাসায় নিছেন?

১৭

ভাস্কর's picture


না এখনো হসপিটালেই আছে। এতোদিনের অসুস্থ্যতায় খানিক রক্তশূন্যতা দেখা দিছে, ঐটা নিয়া আরেকদিন গবেষণা করতে চান ডক্টররা...

১৮

জ্যোতি's picture


দোয়া করি জলদি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরুক খালাম্মা।

১৯

তানবীরা's picture


দ্রুত সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরুক...

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...