ক্রনিক্যাল অফ ঢাকা সিটি অথবা ঢাকা শহরের কিচ্ছা
কর্মজীবী বাপ-মা পোলাপাইনের যত্নআত্তির কথা মাথায় রাইখা নানিবাড়ির ৫০ গজের মধ্যে বাড়ি ভাড়া নিয়া থাকতো। আমাগো সেই ভাড়া বাড়িটারে মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি। একটা ট্রাই সাইকেলে কইরা বিশাল লিভিং রুমের এই পার থেইকা ঐ পার পর্যন্ত ঘুইরা বেরাইতেছি প্রায় চল্লিশের আমি। ওল্ড টাউন কইলেই মানুষের কল্পনায় যেই চিপা রাস্তা, নোংরা ডাস্টবিন আর চওড়া ড্রেনের ছবি ভাইসা উঠে বালক আমি সেইটার লগে খুবেকটা তাল মিলাইবার পারি না। পুরান ঢাকা মানেই চকবাজারের ব্যবসায়িগো রাইতে ঘুমানের জায়গা...এরা সকাল হইলেই ভীড় ঠেইলা বাজারে যায়, সকালে ডাইল-ভাজি পরোটা, দুপুরে তেহারী আর রাইতে কাচ্চি বিরিয়ানি খায়। পুরান ঢাকা মানেই সাদা আদ্দির পাঞ্জাবী আর ভুড়িওয়ালা মানুষের আনাগোনা। যখন এমনসব ছবি আঁকতে দেখি আমার পরিচিত অভিবাসী বন্ধুগো তখন আসলেই তালগোল পাকাই। আমার শৈশবের পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ি নাসির ছিলো, মেডিক্যাল কলেজে পড়া চশমা পরা ভদ্রমামুন ভাই ছিলো, পেশাদার ক্রিকেটার কোদাল নাজু ভাই ছিলো, রাইত বাড়তেই চিৎকার কইরা জগত-জীবন-সংসাররে গাইল পাড়তে পাড়তে বাড়ি ফেরা সরকারী চাকরীজীবী বাংলা মদের নেশায় বুদ মাতাল খোকা ভাই ছিলো। আমার শৈশবের লালবাগে হাওয়াই মিঠাই, চটপটি, হালিম, মুড়ি ভর্তা ছিলো। বনালিম লজেন্স ছিলো। বাবুল বিস্কুট ছিলো। আমার শৈশবের ওল টাউনে বিকাল হইলেই ছাদে উইঠা হাততালি দিয়া কবুতর বাজী খেলা মাকসুদ ভাই ছিলো। ঘুড্ডিবাজ হ্যাপাইরা রাহাত ছিলো। মাউরা রাজু ছিলো। নাজির চেয়ারম্যান, মোশাররফ কমিশনার ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের টাইমে নাজির হোসেন চেয়ারম্যান ছিলো লালবাগ থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। আমার মুক্তিযোদ্ধা বড়মামারে যখন মিলিটারীরা কোনো এক ভোরে ধইরা লইয়া গেলো ক্যাম্পে, নাজির হোসেন চেয়ারম্যান তারে ছাড়াইয়া লইয়া আইছিলো নিজে জিম্মাদার হইয়া। বাড়ি ফিরনের পর আবার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওনের আগে মামায় নাকি নাজির হোসেন চেয়ারম্যানের কদমবুসি করছিলো। এই গল্প শুনতাম আমরা নানুর কোলে বইসা বইসা। ১৫ বছর বয়সী নানায় কেমনে তার বাপের সরকারী রিভলবার চুরি কইরা নতুন বিয়া করা ৯ বছরের বৌরে বাইতে একলা থুইয়া পলাইছিলো বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। তিনমাস/ চাইরমাস কখনো ছয়মাস পর কেমনে ছুপাইয়া সদ্য কিশোরী নানুরে দেখতে আইতো। তার হাতে থাকতো লেবেঞ্চুস। সেই গল্প কওনের টাইমে আমরা তিন ভাইবোইনে একই প্রশ্ন করতাম। "নানায় কি বনালিম আনতো নানু?" সেই আমলে নাবিস্কো ছিলো না। বনালিমও ছিলো না। ছিলো তিতাস কোম্পানীর হাতে বানাইন্যা লাঠি লজেন্স।
যেই দিন বাপে আমাগো ধানমণ্ডিতে লইয়া গেলো তার নিজের জমিতে টিনের ঘর দেখাইতে, সেইদিনের কথা আমার মনে আহেনা। খালি মনে আছে তখনো বুঝি নাই আমার সেই পরিচিত পুরান ঢাকার বয়স আর বাড়বো না। কোনো দিন আর মাউচ্ছা বাবুলের কোলে কইরা ললি আইসক্রীম খাইতে যাওয়া হইবো না। ১৯৭৫'এ আমার বাপ-মা তিন ছেলেমেয়ে নিয়া নিজেগো সংসার পাততে টিনের ঘর বানাইয়াই নতুন ঢাকার ধানমণ্ডিতে কেনা সরকারী প্লটে গিয়া উঠলো। আশেপাশে তখন অলরেডি আভিজাত্যের ছোঁয়া। আমাগো বাড়ির সামনে তখন বিরাট উঠান। আমরা বর্ষা কালে শ্যাওলা পরা উঠানে খালি পায়ে পিছলা খাইয়া কই স্কেটিং করি। বাল্যকাল অনেক রহস্যময়। স্মৃতিময়তায় ডুবলেও বিরহবোধ থাকে না তেমন। টিনের ঘরে থাইকাই আমরা মেট্রো কালচার শিখতে শুরু করলাম। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করনের লেইগা পাগল হইলো আমার বাংলা মিডিয়ামের মাস্টারনী মা। তয় খরচের কাহিনী খালি পোলারে লইয়াই। আমার দুই বোইনেরে সকালে বাপে গাড়িতে কইরা আজিমপুরের অগ্রনী স্কুলে নামাইয়া দিয়া লালবাগের কারখানায় যায়। আমার বহুতি হিংসা লাগে বোইনেগো। তারা লালবাগে নানির বাড়িতে যায় গা স্কুল ছুটি হইলে। মায় ফিরনের টাইমে তাগো লইয়া আসে।
বাড়িতে যেইদিন টেলিফোন লাগলো ঐ দিন মনে আছে সবাই আমরা উবুৎ হইয়া আছি টেলিফোনরে ঘিরা। আমার দুই বোইনই বন্ধুগো টেলিফোন নাম্বার জমাইছিলো। আমার মায়ে তার বাপ-মায়ের লগে কথা শেষ করনের পর বড় বোইন তারপর ছোটো বোইন বান্ধবীগো লগে কেমন লাজুক লাজুক উত্তেজনায় কথা কয়। আমার কোনো নাম্বার ছিলো না। আমি খালি একবার কালা রঙের রিসিভারটা ধইরা কানে লাগাইয়া পু পু শুনি।
নতুন ঢাকাও ঐ জমানায় এখনকার মতোন আছিলো না। আমাগো নতুন ঢাকায়ও তখন মহল্লা আছিলো। আমরা এই বাড়ি ঐ বাড়ি দাবড়াইয়া টিলোএক্সপ্রেস খেলতাম। আর শনিবার সকালে তিনভাইবোইন রিকশায় উইঠা লালবাগে রওনা দিতাম। ছুটির দিনে বাপে ঘুম থেইকা উঠনের আগেই আমরা বাইর হইয়া যাইতাম। ধানমণ্ডি থেইকা লালবাগের এই রিকসা ভ্রমণ আমরা তিনজনেই অনেক এনজয় করতাম। আমার বড় বইনের বয়স তখন ১১/১২। আমার ৬/৭ আমার ছোটো বইন আমার চে ঠিক ১১ মাস ২০ দিনের ছোটো। তখন এই বয়সী পোলাপাইনও বাপ-মায়রে ছাড়া ঘুরতে বাইর হইতে পারতো শহরে। ছেলেধরা নিয়া মীথ কাজ করলেও, বড়োরা সেই বিষয়ক জুজু দেখাইলেও তা ছিলো নিয়মের মধ্যে রাখনের জন্য। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলি আমরা পুরান ঢাকার হইতাম। রাস্তায় ডাংগুটি, বিকালে কিল্লার মাঠে ফুটবল নাইলে ক্রিকেট। সন্ধ্যার আগে আগে মা-বাপ আসতো। আমরা আন্ধার হইলে বাড়ি ফিরতাম, নতুন ঢাকায়।
এই সময়টায় বাপে টিনের ঘর ভাইঙ্গা দালান তুলতে শুরু করলো। ৪ মাসের লেইগা আমরা ভাড়া বাড়িতে উঠলাম, লাবলুগো বাড়ির তিনতলায়। লাবলু আমার ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড। ফিংগার ক্রস কইরা আমরা বন্ধুত্ব করছিলাম। আঙুলের সেই বন্ধন বহুতদিন আছিলো। শবে বরাতের মোররা বাত্তি বানাইবার লেইগা পুরান ঢাকা থেইকা পটাশ-সালফার-ঝিল্লি আর বড়ই গাছের কয়লা নিয়া নতুন ঢাকায় আহনের সমে যখন পুলিশে ধরা খাইয়া হাজতে গেলাম, তার আগ পর্যন্ত আমরা ছিলাম হরিহর আত্মা। অয় পড়তো প্লাসিড টিউটোরিয়ালে, আমি সানবীম। তয় পুলিশে ধরা খাওনের টাইমে আমি বাংলা মিডিয়াম। গভঃ ল্যাবরেটরীতে।
১৯৮১ সালটা আমার জীবনে বেশ স্মরণীয়। এক সকালে সবে ঘুম ভাঙছে। ঘুম ভাইঙ্গা এই ঘর ঐ ঘর করতেছি। ছোট কাক্কু তখন নাস্তা করে। খবরের কাগজ আসছে। আমার বাপে পত্রিকার হেডিং পড়ে। সে কেমন অদ্ভুত চেহারা বানাইলো পড়তে পড়তে। এরমধ্যে কাক্কু উইঠা আসছে। সে বাপের ঘাড়ের উপর দিয়াই হেডিং পইড়া খুশিতে লাফ দিলো। আমরা তখন রাজনীতি বুঝি বেশ। ৭৯তে তো আমাগো সবচাইতে পপ্যুলার খেলা ছিলো ভোট ভোট। আমার মা বেশ চিন্তিত মুখ কইরা বইসা থাকলো। আগের রাইতে প্রেসিডেন্ট জিয়ারে ব্রাশ ফায়ার কইরা মাইরা ফেলছে আর্মিরা। আমার বাপ-মায়ের টেনশন ছিলো অবশ্য অন্য কারনে, প্রেসিডেন্ট জিয়ার চীফ সিকিওরিটি অফিসার ছিলো ফজল মামা।
ফজল মামা'র লাশ সনাক্ত করছিলো বাবা। কিছুই নাকি চেনা যাইতেছিলো না। কপালের পাশে একটা কালো তিল যদিও গুলিতে ঝাঝরা হয় নাই। জিয়া, ফজল মামা আর আরেকজন অফিসারের লাশ মাটির নীচে পুইতা ফেলছিলো বিদ্রোহীরা। সেইখানেও ক্ষতি হইছিলো। ফজল মামার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় সেই প্রথম গেলাম আমি। ঢাকার আরো প্রান্তিক এলাকায়। ঐ এলাকার পরে ডোবার পাশে আরেকটা অভিজাত এলাকা তখন তৈরী হইছে কেবল। গুলশানে অবশ্য আমার যাওয়া হইছে ক্লাস এইটের পর থেইকাই। বন্ধু-বান্ধব মিল্লা তখন টাকা জমাইয়া কিন্তুকিতে যাইতাম বার্গার খাইতে।
যাই হোক ৮১তে বাপ তার ব্যবসাতে ডাহা লস খাইলো। লোনের টাকা শোধ করতে বাড়ি দিলো বেইচা। আমরা ভাড়া বাড়িতে উঠলাম। ধানমণ্ডিতেই। ঐ বাড়ি ছাড়তে হইলো কয়দিন পরেই। তখন কলাবাগানে বাড়ি ভাড়া কম ছিলো বইলা আমরা সেইখানেই গেলাম। একটা একতলা বাড়ি সামনে মেলানো উঠান। উঠানের সামনে ডোবা আর ডোবার ঐ পারে লেকসার্কাস গার্লস স্কুলের পিছন দিক। আমি তখন ল্যাবরেটরী স্কুলে। বাপে গাড়ি বাইর করে কালেভদ্রে। হিসাবের খাতা লগে লইয়া ঘুরতে হয় তার। চাইলে এক টাকা বাড়তি খরচ গেলে এক টাকা কমানের জন্য দিনভর অঙ্ক করতে থাকে সে। এরমধ্যে এসএসসি পরীক্ষা ঘনাইয়া আসলো। পরীক্ষার আগে বাপের অবস্থা হালুয়া টাইট হইয়া গেলো পুরা। বাড়িতে আতপ চাইল আর অ্যাংকর ডাইল কিনা মজুদ করা হইলো। মায় তিন বেলা পিঠা বানায়, কখনো চিতই, কখনো ছিটরুটি, কখনো চাপটি। আমরা সবাই হলুদ আর মরিচে সিদ্ধ অ্যাংকর ডাইলে ভিজাইয়া পিঠা খাই তিন বেলা। রাইতে জাইগা পড়তে হয় আমার। সারা বছর কিচ্ছু পড়ি নাই, টেস্ট পরীক্ষায় সেকেন্ড ডিভিশন মার্ক্স। ল্যাবরেটরী স্কুলের অপমান। পাশের বাসায় বন্ধু পিকলু আর আমি পাল্লা দিয়া লাইট জ্বালাইয়া রাখি রাইতের বেলা। বিদ্যুৎ বিল বাড়ে। বাড়ে টেনশন।
এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বাপে কার বুদ্ধিতে এক অদ্ভুত নিদান আবিষ্কার করলো। পরীক্ষার দিন সকালে আমারে একটা ডায়াজিপাম দেয়া হইতো। আমি সেইটা এক ঢোকে গিলতাম। প্রতিক্রিয়ায় বাসে কইরা সেন্টারে যাওনের টাইমে আমার থাকতো হাসি হাসি মুখ। পরীক্ষার হলে ঢুইকাও আমার কোনো টেনশন হইতো না। যখন শেষ মুহুর্তের রিভিশন দিতে দিতে পোলাপাইনের কপালে ঘাম ঝড়তাছে, তখন আমার মাথায় শূন্য শূন্য বোধ। ঐ অবস্থায়ই পরীক্ষা শেষ করলাম, সবার সাথে গার্জেন আহে, আমি চলি বাসের ফুটবোর্ডে ঝুলতে ঝুলতে। তয় পরীক্ষার শেষ দিন গেলাম সবাই এক বন্ধুর বাড়ি...সেইখানে মাত্র বয়ঃপ্রাপ্ত কিশোরের মতোন উত্তেজনায় কাটাইলাম রাইত পর্যন্ত, আড্ডায়।
এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট পর্যন্ত কলাবাগানে থাকার সামর্থ্য দেখাইলো বাপে। রেজাল্টের দিন আমি ডরে ডরে স্কুলে গেলাম। রেজাল্টের লিস্টি টাঙ্গাইয়া দিছে বোর্ডে। পোলাপাইনের ভীড়ে ঢুকনের চেষ্টাও করি নাই আমি। শুনতে পাইলাম আমাগো ১৪৯ জনের ৩ জন সেকেন্ড ডিভিশন। বাপ-মা যেই আওয়াজ দিছে রেজাল্টের আগের দুই-আড়াই মাস তাতে আমি ধইরাই নিছি সেকেন্ড ডিভিশন ইনাফ। কেউ ফেল করে নাই জানার পর আমি তো মহা আনন্দিত। ভীড় শেষ হওনের পর গেলাম। নিয়মমতোই শুরু থেইকা শুরু করছি ভাব নিয়া। প্রথম ১৮ জন বোর্ড স্ট্যান্ড। খুব বেশি দূর যাইতে হইলো না। ছিয়ানব্বই জন স্টার পাইছিলো ঐবার। আমি শেষ জন হইয়া কোনমতে ঝুইলা ছিলাম। একটা লেটার পামু ভাবছিলাম। তালিকায় দেখি তিন বিষয়ে লেটার।
বাপ-মা আসলে অদ্ভুত চীজ। রেজাল্ট শুননের পর তারা গজর গজর করতে লাগলো আরেকটু পড়লে আমি স্ট্যান্ডও করতে পারতাম। আর এই দিকে আমি ভাবতাছিলাম কোন হালায় আমার টেব্যুলেশন করছে কে জানে! এই রেজাল্টের কথা জীবনেও ভাবি নাই। আবার পরীক্ষা দিতে না হইলেই আমি সন্তুষ্ট থাকতাম আসলে। থার্ড ডিভিশন ভি অ্যালাউড আছিলো! তয় রেজাল্টের পর ধার দেনা কইরা মিষ্টি বিলানের সীন দেইখা আমার মনে হইতেছিলো এর চাইতে ফেল করাটা ভালো ছিলো।
মিরপুরেরও প্রান্তে। প্রায় শহরের সীমানায় বাসা বদলানো হইলো। এক চাচা'র বাড়ি তখনো নির্মীয়মান। আমরা গেলাম কেয়ারটেকারের মতোন দায়িত্ব নিয়া। ধানমণ্ডি ছাড়নের পর তেমন একটা খারাপ লাগে নাই। তয় কৈশোরক অ্যাডভেঞ্চারের কালে তৈরী হওয়া বন্ধুগো মিস করতে শুরু করলাম প্রায় গাবতলী এলাকায় আইসা। মধ্যবিত্ত লুকোছাপা সংস্কৃতির চর্চায় নতুন এলাকারে সারাজীবন ভাবছি ব্যাকওয়ার্ড। এর আগে ৮৮'র বন্যায় একবার নৌকা নিয়া দিনভর ঘুরছিলাম এক বন্ধুর সাথে। কই কই গেছি মনেও নাই তয় স্বাভাবিক সময় বাংলা কলেজ ক্রস করি নাই আগে। একবার কেবল একবেলা গাবতলীতে কাটাইছিলাম। শুরুর দিকে কোনো কাজকাম ছাড়া একলা একলা ঘুরি। মাঠে ক্রিকেট খেলা চলে এককোনায় দাঁড়াইয়া খেলা দেখি। ৩/৪ দিন না যাইতেই পোলাপাইনের নজরে পড়লাম। সে এক বিপর্যস্ত ঘটনা আমার জীবনে। পুলিশের হাতে ধরা পড়নের পরেও দুই/তিনটা চর থাপ্পর ছাড়া আর কয়টা গালি ছাড়া তেমন কিছু ঘটে নাই। কিন্তু এই মহল্লার পোলাপাইন আমারে লইয়া র্যা গিং শুরু করলো। জামাকাপড় খুলতে কয় নাই খালি আর যতোধরনের অপমান আছে সব করাইলো ঘণ্টাখানেক ধইরা। সবশেষে ধুলামাখা আমি কোনোমতে পলাইছিলাম মনে আছে।
নতুন এলাকার উপর বিরূপ হইতে শুরু করছিতো শুরুতেই, তয় এই প্রথম আমি নিজের ঘর পাইলাম। আগে একলা ঘুমাইতাম বসার ঘরে। ধুলামাখা আমি মা'রে লুকাইয়া নিজের ঘরে গিয়া জামাকাপর পাল্টাইয়া চিৎ হইয়া বিছানায়। আঠারো বছর বয়স আসলেই ভয়ঙ্কর! পৌরুষ চাগার দিয়া উঠলো সেইবেলা।
পরদিন আবারো গেলাম মাঠে। সেই এক কোনায় মাটিতে বসলাম। একে একে মহল্লার পোলাগুলি আইসা আমার পাশে বইসা গেলো। জীবন রহস্যময়! একজন আমারে সিগারেট বাড়াইয়া দিলো। একজন লাইটার বাইর কইরা ধরাইয়া দিলো। তারপর একে একে সবার পরিচয় জানানো শুরু হইলো। কাকতালীয়ভাবে পুরা গ্রুপটাই আমার সমবয়সী। সবাই রেজাল্টের পর কলেজে ভর্তির অপেক্ষায়। সেইদিন দুপুরে আমি বাড়ি ফিরলাম না। ভাত খাইলাম কানা শামীমের বাড়িতে। বিকালের আড্ডা রাইত আটটায় গিয়া ঠেকলো। আমার মনে হইতেছিলো এই মানুষগুলি কতো আপন!
শহরের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ জলে ধোয়া বাতাসে যেই আমি প্রথম চারপাশ দেখতে শিখছিলাম। ১৮ বছর পার হইতে না হইতেই উত্তরে তুরাগের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলাম। ঐ বয়সেই এই শহরের সকল প্রান্তরে আমি হাটছি। এই শহরের ধুলায় ঢাকা পথে পায়ে পায়ে সূর্য ডুবতে দেখছি কতো শত দিন। কতো সূর্যোদয়ে শহরের সাথে ছিলাম পলকহীন। রৌদ্রতাপে উত্তাল দুপুর শহর আর আমি হাটছি এইপ্রান্ত-ঐপ্রান্ত। রক্তপাতে, চোখের জলে, আগুনশিখায় এই শহর আর শহরের বেশিরভাগ মানুষ চলে সংগ্রামে, স্বপ্নরেখায়।
২০০৮ সালে নতুন কইরা রাজনৈতিক চর্চার শুরু হইলে সাধারণ মানুষ আবার উন্নয়ণ অভিমুখে যাত্রা শুরু করতে চাইছে। আওয়ামী লীগের প্রতি নিরংকুশ সমর্থনে ছিলো দৃপ্ত আকাঙ্খা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাহাত্তরের সংবিধান ফিরাইয়া নিয়া আসা আর ১৯৭১'এর মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধীগো বিচার। এর আগে বিএনপি সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ হয়তো যূগান্তকারী সিদ্ধান্ত হইতে পারে এমন সম্ভাবনাও ছিলো। কিন্তু দুর্নীতির ভাইরাস সংক্রমিত আজ ক্ষমতা প্রক্রিয়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চারদলীয় জোটের শাসনামলে যুবরাজ তারেক জিম্মি কইরা টাকা নিছে। আর এখন রক্তের সম্পর্ক বেইচা চলে একাধিক যুবরাজের হম্বিতম্বি। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। যার সাথে এই শহরের সম্পর্ক নাই, কারণ এই শহরে তার ভোট ব্যাংক নিয়া সংশয় আছে। জনগণের সিদ্ধান্ত, প্রয়োজনীয়তা, প্রত্যাশা, নির্দেশনা কোনো কিছুর পরোয়া না কইরা আমার প্রাণের চাইতেও প্রিয় শহরটারে কাইটা দুইভাগ কইরা ফেললো। জনগণের কষ্টার্জিত সাদা টাকা নিয়া সে খেলতেছে ক্ষমতার বলী খেলা।
কয়দিন আগে নরসিংদীর জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেফতার করা হইলো বিএনপি নেতা খায়রুল কবীর খোকনরে। নিহতের পরিবার থেইকা ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হইছে। পুলিশ সেই তালিকা এড়াইয়া যাওয়ার সকল কৌশল প্রয়োগ শুরু করছে। একজন মন্ত্রীর ভাই যেহেতু নিহতের পরিবারের চোখে হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামী অতএব ঘটনারে অন্যখাতে ঘোরাও! জনগণ আওয়ামী লীগরে ভোট দিছে তাগোর অধিকারের পথে যদি এক ধাপ আগানো যায় এই ভাইবা। শেখ হাসিনা জনগণের টাকায় গইড়া তোলা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেইকা টাকা বাইর করতে চায়। ঢাকা ভাগ করার পর আমি জনগণের চোখে ক্ষোভের ভাষা দেখছি। আওয়ামী সরকার ভোটের ভারে দিশা হারাইয়া ফেলছে। দিশা হারাইয়া তারা এখন উদ্দেশ্যবিহীন...উদ্দেশ্যহীনতা কখনো কোথাও যায় না। তারা এখন গন্তব্যহীন। গন্তব্যহীনতার দায় নিতে হইবো আমাদেরই। এই শহর আমার অস্তিত্বের বোধ, তারে ভাগ কইরা আওয়ামী সরকার তার সংগঠনের টেন্ডারবাজীরেই উৎসাহিত করতেছে প্রকারান্তরে। কালো টাকার নজরদারী বন্ধ কইরা দেশে একটা বেখেয়ালের অর্থনীতি চালু করতেছে তারা। তারই প্রক্রিয়ায় সরকারী আমলাতন্ত্রের দুর্নীতির ধারারে এখন শহরে একপ্রান্ত থেইকা সরাইয়া পুরা শহরের চৌহদ্দিতে পৌছাইয়া দিতেছে এই শোষকেরা।
ঢাকার বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না কইরা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত কখনোই কোনো যৌক্তিকতা রাখে না। এই যুক্তিহীন, ধান্দাবাজ, টেন্ডারবাজ, চান্দাবাজ সরকাররে রুইখা দাঁড়ানো ছাড়া আদতেই কোনো বিকল্প নাই এখন। চারদলীয় জোট আর মহাজোটের বানান আর উচ্চারণে পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু ৱতারা দুইজনেই গণবিরোধী; জনগণের অধিকার হরণ কইরা দুঃশাসনের বিস্তারে নিয়োজিত একই দলের প্রতিনিধি।





বস লেখা...
ভাই, ভাল আছেন তো?
আপ্নেরে মিসাই!!
লেখাটা খুবই ভাল লেগেছে। ধারাবহিকতা আসুক, ঢাকার এর পরের কিচ্ছাগুলোও লেখেন।
বস, ঢাকার স্মৃতি নিয়া আরো পর্ব ছাড়েন।
চারদলীয় জোটও তখন ২/৩ মেজরিটি পাইয়া তাগো তালুক ভাবছিল দেশটাকে, এই মহাজোট একই পথেই হাঁটছে।
এরা সব একই । এদের হাত থেকে বাঁচার পথ বের করা দরকার এখন।
ঢাকার এর পরের কিচ্ছাগুলোও লেখেন।
আমার দেখা পান্থপথ ছিল টঙ্গের দোকানে ভরা।
ভাল হইসে লেখা।
আপনার জীবনের বড় একটা অংশের কথা এত অল্প করে বললেন? আরো বিস্তারিত জানতে ইচ্ছা করতেছে । ঢাকার ভাষাতেই আরো আকর্ষনীয় হইছে লেখাটা ।
দারুন একটা লেখা হইছে ভাস্কর'দা!
বেশ ভালো লেগেছে কিচ্ছা!
শান্তি পাইলাম পড়ে!
জব্বর লেখা দাদা। চলুক আরো কয়েকটি পর্ব।
---- ঠিক কইসেন ।।
দারুণ একটা লেখা পড়লাম।
দারুণ
~
ভাস্করদা, এটার পর্ব হবে। আপনি এস।এস।সি থেকে মাষ্টার্স ফাইন্যাল দিয়ে ফেলছেন। মাঝের সময় টুকু গিলে ফেললে হবে?
তাও শাওনের মতো বলে নাই, পিস্তল নিয়ে খেলতে খেলতে লোকমান মারা গেছে। ঐটা সিনেমা সিনেমা খেলা হচ্ছিল, কইতেওতো পারতো, কি কন?
মন্তব্য করুন