নিস্ফলা শ্রেষ্ঠ সময় অংশ চার!
অনেক দিন পর আমি সকালে লিখতে বসলাম। রাতে রাতে লিখতে লিখতে এমন অবস্থা হইছে যে রাত ছাড়া লেখারই ইচ্ছা থাকেনা। কিন্তু সারাদিন এই চেচামেচির পরিবেশে থেকে, মাথা ব্যাথা আর মশার কামড় খেতে খেতে বিরক্ত লাগে। আর না লিখলে মনে হয় হুদেই লেখলাম না। এই জটিল পরিস্থিতিতে আজ সকাল সাড়ে সাতটাতেই ঘুম থেকে উঠলাম। চা বানাতে বানাতে ভাবলাম পোস্ট লিখে ফেলি। ক্লাস টেনে থাকতে আমার বাসার উপর তালায় থাকতো ক্লাস মেট মেধাবী ছাত্রী। আম্মু ফজরে উঠেই তার চেয়ার টানাটানির শব্দ শুনতো। আর আমাকে বলতো শান্ত উইঠা পড়, মেয়ে মানুষ হয়ে কত সকালে ঘুম থেকে উঠে! আমিও উঠে যেতাম। এইসব সকালে আম্মুর কথা খুব মনে পড়ে। এখন আর ভোরে ডাক দেয়ার কেউ নাই মায়ের মতো। যখন যতক্ষন খুশী ঘুমানো যায় বলার কেউ কিছু নাই। কিন্তু নিজেরই ঘুমাতে ভালো লাগে না।
যে ক্রান্তিকালে আমরা পড়ে আছি সময়টাই অনেক অস্থির আর খারাপ সময়ের। দেশে চাকরি বাকরি বড় আকাল চলছে। সব কিছুর ভেতরেই আমি তার গন্ধ পাই। বন্ধু আদনানের ইন্টারভিঊ ছিলো কি এক ফিনান্সিয়াল লোন প্রতিস্টানে। পদ একটা ক্যান্ডিডেটে গোটা তিরিশেক। যে প্রশ্ন জিগেষ করে আদনান তার সবই পারে। তাও তার জবটা হবে না। কারন কর্তা ব্যাক্তিরা এত বেশী জানা ছেলেদের নেয় কম বলে ওর ধারনা। এই গল্প শুনছিলাম গতকাল আর ভাবছিলাম আমাদের কথা। বাপের হোটেলে পুষ্ট আদনান কত আত্মমর্যাদাশীল যুবক। ইস্ট ওয়েস্টে পড়ছে, এফজেড এস চালায় টাকা পয়সার শেষ নাই। কিন্তু এই সামান্য একটা চাকরীর জন্য কত অনুগত, বিনয়ী কাঙ্গালের মত ফরমাল জামা জুতো পড়ে যেতে হয়। আদনানের প্রেশার অনেক। বান্ধবীকে বিয়ে করার প্রেশার, আন্টির হতাশা সব মিলিয়ে পর্যুদস্ত অবস্থা। তার ভেতরে সে আমার সহপাঠি এমবিএর। তার দুঃখ আমি বুঝি না তো বুঝে কোন হালায়? তারপর আদনানকে আমরা সান্তনা দিতেও ভুলি না। তার সানগ্লাস পড়া লুকের সাথে ইয়াং ডিবি অফিসারকে টেনে আনি। তার বাইক চালানোর সাথে পুলক শাহরুখ খানের অমর ছবি দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের এক গানের সিনের মিল পায়। এই সব পারস্পারিক আড্ডাবাজী লইয়া আমরা বেশ আছি!
আমার খুব ইচ্ছা একদিন ভোরে আন্দোলনে যাওয়া। সুর্য উঠা ভোরে যেয়ে বসে থাকবো। দেখি কোনোদিন তা হয়। তবে লোকজন সারা রাত থাকে। আমার সারা রাত থাকার ইচ্ছা থাকে না। এমন না যে বাসা থেকে প্রবলেম তাও কেনো জানি রাত থাকতে ইচ্ছা করে না। এমন কি বন্ধুদের বাসাতেও তুমুল আড্ডা হচ্ছে সেই সময়েও আমি বাসাতেই ফিরতে চাই। নিজের এই মেস বাসায় ফেরার আকুতি হোম সিকনেস কিনা জানি না। তবে যারা বন্ধু বান্ধব নিয়ে থাকে আন্দোলনে সাথে রাত জাগে। তাদের লাল সালাম। কারন জাজিম তোষক ফোমের বিছানা বাদ দিয়ে এখানে রাস্তায় বসে বা চায়ের দোকানে পার করা অনেক কঠিন কাজ। আন্দোলোনে প্রচুর স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা আসে প্রায় প্রতিদিন। ইউনিফর্ম পড়া পোলাপান স্লোগান দিচ্ছে এইটার মতো আনন্দময় সিন খুব কমই আছে। এই কিছুদিন আগেও মানুষের মুখে শুনতাম এই দেশের মানুষ সব পলায়ন পর। কেউ রাস্তায় নামে না, কেউ প্রতিবাদ জানায় না, এই দেশের কি হবে তা নিয়ে আপসোস। সব আপসোসের দিন শেষ। কারন এক কাদের মোল্লার ফাসীর দাবিতেই যে আন্দোলোন অবরোধ তা হলো। আগামী দিন গুলোতে এই জায়গাটাই আশাবাদীতার ভরসা স্থল। পত্রিকায় বুড়ো বুড়ো কলামিস্টরা সব সময় বলতো তারা তরুনদের নিয়ে আশাবাদী। আমি তাদের সেই লেখা পড়ে আশাবাদের চাষ করি নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই কোটি কোটি তরুনরাই ভরসা।
আমাদের এই তরুন দের ভেতরেই আবার আরেক গ্রুপ তরুন আছে যারা এই আন্দোলোনকে ভালো চোখে দেখছে না। এমন না যে তারা শিবির করে। তারা আমার মতোই সাধারন। কিন্ত তাদের কথা হলো দিলীপ বড়ুয়া, মখারাও, সাবেক ধর্ম মন্ত্রী, শেখ হাসিনার বেয়াই রাজাকার ছিলো তাদের কেনো বিচার চাওনা? আমি আর কি বলবো আমি বলি তোমরা আন্দোলোন করো। আমি সর্বশক্তি দিয়ে তোমাদের সাথেও থাকবো। আর জামাত একটা অর্গানাইজড ফোর্স হিসেবে গনহত্যার প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলো। আর কাদের মোল্লা কসাই ছিলো। তাই তাদের বিচার হওয়াটা সবার আগে জরুরী। তাদের আরেক প্রশ্ন এতোদিন কাদের মোল্লা নিয়ে সবাই তোমরা চুপ ছিলা কেন? আমি বলি ধরো অনেক দিন তুমি ভাত খাও নাই টাকার অভাবে। যখন টাকা হলো তখন তুমি ভাত খাও তার মানে এই যে ভাত খাই না বলে কোনোদিন খাবো না। এইসব কথা বলে বাম ট্যাগ পেয়ে গেছি। অথচ সেই কবে তেল গ্যাসের আন্দোলোনে মাঝে মধ্যে যাওয়া ছাড়া আমি অতি সাধারন এক মানুষ। প্র্যাকটিসিং মুসলমান বলে অনেকেই টিটকারী করে। সেই আমরাই নাকি বাম? কত বড় ছাগল বয়ান!
যাই হোক পাবলিক কি বলে তা নিয়ে আমার আগ্রহ নাই। আমি প্রতিদিন যাই আন্দোলোনে। ক্লাস করা হয় না। এমবিএ সব লাটে উঠছে। স্লোগান দেই না। ছবির হাটে গিয়ে বসে চা খাই, হাটি, বড় ভাই আপুদের কথা শুনি, আড্ডা হয় রিক্সা দিয়ে বাসায় ফিরি। তবে রিক্সা ভাড়া দিতে দিতে ফতুর অবস্থা। তাও দিচ্ছি। আমার চায়ের দোকানের পুরা সার্কেল শাহবাগে আসে। প্রতিদিন আসতে আসতে তাদের একটা স্লোগান সার্কেল হয়ে গেছে। তারা ব্যানার মোমবাতি নিয়ে স্লোগান দেয়। আর আমি তাদের থেকে পালিয়ে বাচি। ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যাই। এই যেমন কাল এই ব্লগের অনেকেই এক সাথে ছিলাম। অনেক আড্ডা বাজী হলো। তারা গেলো ভিতরে। এতো মানুষের চাপে হারিয়ে ফেললাম। শেষে ছবির হাটেই ঠাই। তার কারন সবাই ঘুরে ফিরে এদিকেই আসে। বন্ধু জেমসের সাথে দেখা হলো। অনেক কথা বললাম। জেমসও আমার মতো থিউরীর লোক। অনেক বন্ধুকে বাদ দিয়ে সে এই ভীড়ের রাজ্যে একাই একাই চলে। আর প্রচুর হাটে। তার এই হেডফোন হাটা থেরাপীটা দারুন। এক হাটাতে সে মিরপুর ১ চলে যায়। স্কাঊট লীডার তো তাই এদের হাটার অভ্যাস প্রচুর। জেমসকে দেখলেই আমার ক্লাস সিক্সের স্কাউটিংয়ের সেই মোটো টা মনে পড়ে। স্কাউট আত্মমর্যাদায় বিশ্বাস করে। জেমসকে দেখলেই তার পাচ ফুট এগারো উচ্চতার শরীর জুড়ে লেখা থাকে আত্মমর্যাদাশীল যুবক। তবে স্কাউট এই আন্দোলোনে নাই। তারা অরাজনৈতিকতার তকমাটায় আটকে আছে। এই অরাজনৈতিকতার খেতা পুড়ি!
যাপিত জীবনে আমরা সবাই নানান ব্যাক্তিগত, পারিবারিক, ফিনান্সিয়াল প্রবলেম নিয়ে বড় হই। তা নিয়েই দিন পার করা। যেগুলা আমাদেরকে স্বার্থপরতার দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এই আন্দোলোনে যখন এতো মানুষ দেখি স্লোগান দিচ্ছে। তখন আশস্ত হই যে সব আমার মতো ছোটোলোক না। সব সমস্যাকে সাথে নিয়েই তারা ন্যায্য আন্দোলোনে পা বাড়াচ্ছে। এই যেমন এক রোগীর সাথে আসছে এক চাচা। রোগীকে হাসপাতালে দিয়ে এসে তিনি দিব্বি বাদাম চাবাচ্ছে আর বলতেছে 'আমগোর দেশে বিএনপি আওয়ামীলীগ কত লোক করে তাও এতো মানুষ আমি কোনোদিন দেখি নাই"। তার নাতনীকে সে বারবার বলছে চল ভিতরে যাই। তার নাতনী ছোটো মানুষ ঠোটে লাল লিপস্টিক ঘসতে ঘসতে বলে উঠে না দাদা হারায় যামু গা, থাউক। প্রতিদিন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা আসে, অনেক বুড়ো মানুষেরা আসে, কত মধ্যবয়স্ক মানুষেরা এসে বসে থাকে তাও দুর্মুখেরা বলে এইটা নাকি ছাত্রলীগের আন্দোলোন। আমি তাদেরকে বলি তাহলে এইটা শিবিরেরও আন্দোলোন। কারন আমি প্রচুর শিবিরের পোলাপানকে দেখি তারা হয়তো আমারে চিনে না কিন্তু আমি তাদের চিনি। শিবিরের মতো শত্রুরা যদি থাকতে পারে, তাহলে ছাত্রলীগের মতো বাটপার গোস্টীও থাকবে। প্রাইমিনিস্টার বলেছেন শাহবাগে তার যেতে মন চায়। মাননীয় প্রাইমিনিস্টার এই সব আদিখ্যেতা দেখাবেন না। আপনাদের কাজ যেগুলা সেগুলা করেন। আর ট্রাইবুনালের যত বাধা আছে সামনে সব দুরে সরান। দয়া করে মুলা ঝুলাবেন না। এই চার বছর বাদ দিলে বিএনপির প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী বিচারের মুলার সাথে আপনাদের মুলার খুব একটা অমিল নাই। যে আতাতের গন্ধ মানুষ পাচ্ছে তা থেকে আগে মুক্ত হোন।
টিভি নাই চার মাস ধরে। ডিশের লাইন পাবো না আর তাই। তাই জানি না টিভিতে কি দেখাচ্ছে, এই আন্দোলোন নিয়ে কিসব আলোচনা চলছে তা জানার খুব ইচ্ছে করে। চোখের সামনে আরিফ জেবতিক ভাইরা টিভি স্টার হয়ে গেলো তা ভাবতেই সুখ। গতকাল শুনলাম বিবিসি সংলাপে জেবতিক ভাইয়ের হালকা কিছু কথা কিন্তু সবার চেয়ে ভিন্ন। এই যে ভিন্ন মতামত পোষন করা আর তা দিতে পারার শক্তি এইটাই ব্লগারদের সেরা অর্জন। আমাদের সমাজে কিছু তত্ব খাড়া আছে যে এরশাদ নাকি ভালো ছিলো। অনেক কাজ করছে। অনেক কিছু উদ্ধার করছে। এমনকি সমবয়সী ছেলেদের মুখেও তা শুনি। আমি হতবাক হই এরশাদের মতো একটা লম্পট, দুর্নীতি পরায়ন, অত্যাচারী শাসক যদি এতো উন্নয়নের সার্টিফিকেট পায় তাহলে তো বিপদই আছে। কিন্তু যত লুন্ঠন আর অত্যাচার গুম খুন ক্রস ফায়ারই অনাচার হোক না কেনো এই ২৩ বছরেই বাংলাদেশের ভালো সময় যাচ্ছে। অন্তত কথা বলার একটা জায়গা আছে। মতামত দেয়ার একটা ব্যাপার আছে। আর গত ৫-৬ বছরে অনলাইনে নানান এক্টিভিজমে লোকজনের কাছে অনেক কিছুই ক্লিয়ার। সেই এক্টিভিজমে কেউ সত্য জানছে, কেউ আরো বেশী অন্ধ হইছে। অন্ধরা একদিন জানবে এই আশাবাদ নিয়েই চলতে হবে। আন্দোলোন চলছে। কিন্তু সবাইকে কেয়ারফুল থাকতে হবে যে কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো যাবে না আর বেফাস কথা বলা হলেই বিপদ। তাই যারা মিডিয়ায় মতামত দিবেন একটু ভেবে চিন্তে দিয়েন। কারন বিভেদের চেয়ে বড় শত্রু আর নাই। তা গত ৪১ বছর ধরে আমরা ছাড়া আর কারা বুঝছে? আর অর্থবান, বিত্তবান, পেশীশক্তির কাছে কেউ হেরে যাবেন না এইটাই শপথ।
অনেক অনেক বক বক করলাম। যাই চায়ের দোকানে। বিকেলে হয়তো আবার শাহবাগ। ইচ্ছা করেই দিনলিপি কমিয়ে লিখছি। কারন দিনলিপি নাকি অনেকের তেমন ভালো লাগছে না তবে আমি ঘুরে ফিরে সেই দিনলিপিতেই ফিরবো। এর বাইরে আমার কিছু করার নাই!





আপনের দিনলিপি লিখবেন না মানে? প্রত্যেকদিন দুইটা করে লিখবেন। আপনারে না বলসি, এই লেখাগুলোর আকার, সংখ্যা ইত্যাদি বাড়ায় দিতে। কথা কি মাথায় ঢুকে না নাকি? এই লেখাগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই আন্দোলনটা তৈরি হতো না, যদি না এই লেখালেখিগুলো গত ৭ বছরে করা না হইতো। আন্দোলন যতদিন চলবে ততদিন প্রতিদিন লম্বা লম্বা দিনলিপি চাই, দ্যাটস্ ইট।
আপনার কথায় ভরসা পাই ভাই। থ্যাঙ্কস। সেই অনেক কাল আগে সামুতে আমরা অজস্র মন্তব্য করে গেছি এই চেতনায়। এখন যখন সেই চেতনার বাস্তবায়ন দেখি তখন মনে হয় লিখতে হবে আরো!
দেখা হবে রাজপথে
কথা হবে স্লোগানে
দেখা হবে বিজয়ে!
রিক্সা ভাড়া দিয়া ফতুর হয়ে আজ খুব সকালে আজ গেলাম । তুমি যেতে চাও আগে জানলে তোমাকে নিতাম । রোজ লিখো দিনলিপি । রোজ যাও শাহবাগ । প্রত্যেকের অংশগ্রহণ জরুরী । লিখো আরো । জানাও সবাইকে ।
থ্যাঙ্কু আপু। লিখবো আশা করতেছি!
আপনেরে দিনলিপি কমায় লেখতে বলছে কে?!একটা মাইর দিমু!
আপ্নের দিনলিপি যেমন থাকে থাকবে
সাথে এটার মত কনটেন্ট বাড়বে।
আপনের লেখায় আপনের সিগনেচার টাচটাই যদি কমায় দেন তাইলে ক্যাম্নে কি!

দিনলিপি লিখবো। এইটা ছাড়া আর পারি কি?
আপনার দিনলিপি চমৎকার লাগে!
দিনলিপিই চলুক, ক্ষতি কি?
ধন্যবাদ আপ্নাকেও।
দিনলিপিতেই ভরসা আর কিছু পারি নি!
এই পার্টটা একেবারে মনের মতো হয়েছে। দারুণ!
ধন্যবাদ ১ বস্তা। আপনাদের অনুপ্রেরনায় মুগ্ধ হই!
মন্তব্য করুন