বন্ধু আড্ডা বই আর বাক্সোর জীবন!
যদি অনেস্টলি জিগেষ করেন আমি কেমন আছি? দেশ জাতির যাপিত দিনকালের টেনশন বাদ দিলে আমি বলবো দারুন আছি। খাচ্ছি, দাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি নেটে বসছি বই পড়ছি দিন কাটছে। দেশ জাতি যে অশান্তিতে আছে তা টের পাই না সেইভাবে কারন আমার টিভি নাই, পত্রিকাও সেইভাবে পড়ি না এখন। খালি মন চাইলে বিবিসি শুনি। রেডিওতে শুনার কারনে বিবিসির ভয়ানক সংবাদ গুলোকেও কেনো জানি হালকা মনে হয়। অল্প সময়ের জন্য শুনতে হয় তাই খুব বেশী মাথায় থাকে না। আর বিবিসি বাংলায় নানান টাইপের বিশ্ব সংবাদ শুনে মনে হয় দুনিয়ার চারিদিকে অজস্র গেঞ্জাম আর খুন জখমে মুখরিত। তারপরেও অনেকেই বলে দুনিয়াটা খুব সুন্দর জায়গা। কিন্তু আমার কাছে এই দুনিয়া ভালো লাগে না। এই দুনিয়ার বুকে যেদিকেই তাকানো যাবে সেইদিকেই খালি অভাব নিপীড়িত হতাশ দু;খী মানুষের মুখের মিছিল। তারপরেও সব বাদ দিয়ে বলতে পারি আমি তো ভালোই আছি। গা বাচিয়ে চলছি, ভালোই আছি। এই শুনশান হরতালেও রাস্তা দিয়ে পাঞ্জাবী পড়ে অবিরত হাটছি, একা রিক্সায় ঘুরছি, চায়ের দোকানে বসছি আড্ডা মারছি দিন যাচ্ছে হালকা চালে। বাসায় বসে বই পড়ি, নেট চালাই, ভালো মন্দ খাই দিন চলে যায়। এইটাকে স্বার্থপরতার জীবন বলা যেতে পারে তবে আমি আমার মতো ভালো আছি!
এই অস্থির সময়ের ভীড়েও আমার দুই বন্ধু আসছে আমার বাসায়। তাই সময়টা যাচ্ছে আরো দারুন। চিটাগাং থেকে আমার যেকোনো বন্ধু যেকাজেই আসুক ঠিকানা তাদের একটাই আমার বাসা। এমন না যে বাসায় তাদের খুব ভালো ভাবে রাখি, অনেক ভালো মন্দ খাওয়াই। কিন্তু তাও তারা আসে কারন নাকি একটাই আমার আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের মাত্রার জন্য। বন্ধুরা ঢাকায় আসলে দিনগুলোকে মনে হয় কেনো শুধু চব্বিশ ঘন্টার? কেনো তা ত্রিশ ঘন্টার না তাতে আরেকটু আড্ডা মারা যেতো। কতো কথা কতো গল্পের ভিতরে হাসতে হাসতে সময় চলে যায়। কে কি করছে, নতুন করে কে কেমন হচ্ছে সব কিছুর আপডেট পেয়ে যাই। চিটাগাংয়ে বড় হওয়া যেকোনো ছেলেমেয়েদের জীবনেই গালি গালাজ খিস্তি শুনতে শুনতে বড় হওয়া। ওরা যখন এসে সেই ভংগিতেই কথা বলে তখন খুব মজা লাগে। মনে হয় আমি সেই আগের দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছি বয়স পচিশ থেকে ধুম করে ১৭-১৮ তে দিন গুলোতে চলে গেছে। সেই দিন গুলো কি অসাধারন ছিলো। আমরা সকাল দুপুর কাঠগড় সীবিচে পড়ে থাকতাম। একদম নির্জন একটা জায়গা। জেলে সম্প্রদায় বাদে সেখানে কোনো ভদ্রলোক আসতো না। সেখানে বসে থেকে সমুদ্র দেখা, কত অজস্র গল্প শুনা, কত কুতর্ক কত কিছু নিয়ে দিন যাপন। সব গল্পই হারিয়ে যেতো সমুদ্র দেখতে দেখতে। তার সাথে দেখা হয়ে যেতো জেলে জীবন মাছ বেচার ব্যবসা আরো কত কি! বিশেষ করে ২০০৪,০৫,০৬ এই তিনটা বছর প্রতিদিন আমাদের একটাই কাজ কলেজের নাম দিয়ে বের হওয়া তারপর আরাফাত হোটেলে নাস্তা করে ব্যাগের জামা কাপড় গুলো পড়ে বসে থাকা। সংঘবন্ধ হয়ে ৮-১০ জন মিলে কলেজে না গিয়ে একটা নির্জন সমুদ্রের পাড়ে বসে থাকার যে সুখ তা অবিশ্বাস্য। তবে আমরা এখকার ছেলেদের মতো ফাউল ছিলাম নে অন্য ধরনের কিছু খাবো, নারী সংক্রান্ত কোনো কেইসে জড়াবো। আমরা ছিলাম খুব সাধারন। যারা সিগারেট খেতো তারাও অতি সাবধানে খেতো যেনো কেউই না দেখে। এতো নির্জনতার ভীড়েও আমাদের এই সংস্কার আমার পরবর্তি জীবনে খুব কাজে লাগছে। কলেজ জীবন শেষ হয়ে গেলো ভর্তি কোচিংয়ের নাম করে সেই সমুদ্রের পাড়েই থাকা। তখন আমাদের খুব কাজ ছিলো কড়া রোদে ফুটবল খেলা। ফুটবল খেলে বন্ধুর বাসায় গোসল টোসল করে বাসায় ফেরা। কি দারুন দিন। সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকা নিষেধ ছিলো অনেক কিন্তু কোনো কথাই আমাদেরকে মানানো যেতো না। নিজেরা যেমন ছিলাম তেমনই থাকতাম। সবাই বুয়েট চুয়েট রুয়েট ডিইউতে চান্স পাওয়া শুরু করলো। আমরা কোথাও পেলাম না। কেউ ইন্ডিপেন্ডেন্টে, কেউ ইসলামিক ইউনিতে, কেউ প্রিমিয়ার কেউবা কলেজে ভর্তি হলো। আমি কোথাও ভর্তি হই নি তখনো। তখন আর সমুদ্রে যাওয়ার লোকজন ছিলো না। শুধু আমি কামরুল, সোহেল, মিশু, আবীর বসে থাকতাম। সকাল আটটায় বের হতাম বিকেল ছটায় বাসায় যেতাম। খাওয়া নাই নাওয়া নাই শুধু চা খেয়ে আর সমুদ্র দেখে দেখে দিন পার। আমার যে এখন এতো চা খাওয়ার প্রীতি তা শুরু হয় সেই আমল থেকেই। তখন আমার মনে হতো একটা সমুদ্র দেখতে দেখতে একটা জীবন খুব সহজ়ে কাটিয়ে দেয়া যায়।
সেইদিন গুলো সব চলে গেছে। মধ্যে চলে গেছে পাচটা ছয়টা বছর। সবাই যার যার মতো অনেক ব্যস্ত। কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে আমার যারা বন্ধু ছিলো রিয়েল তারা এখনো ওতো শতো ব্যস্ততার ভারে নাই। তাদের জীবন আড্ডা এখনো আগের মতো না হলেও দারুন। এখনো আমি চিটাগাংয়ে গেলে আমরা বীচে গিয়ে বসে থাকি দলবেধে। পুরানো দিনের জাবর কেটেই দিন যায় তখন। তাই বন্ধুরা যখন ঢাকায় আসে মনে হয় সেইদিন গুলোতেই আছি। পারস্পারিক পচানী, আওয়ামী-বিএনপি-বাম নিয়ে ঝগড়া, কার গার্লফ্রেন্ডের কি অবস্থা, কে কবে কি ভাব নিছিলো তার প্যাচাল এই সব পুরোনো একিই প্যাচাল আমরা বারবার করি এবং করেই যাচ্ছি। মাঝে মধ্যেই নানান কথায় একটু বিরক্ত লাগে, অভিমান হয় কিন্তু তখনি মনে হয় এরা তো আমার স্কুল বন্ধু। যুগের পর যুগ ধরে হয়তো আমরা এমনি থাকবো। আমাদের এই সাত আট জনের সার্কেল যখন চিটাগাংয়ে সেই আগের মতো কাধে হাত দিয়ে আড্ডা দেই তখন আমাদের অন্য বন্ধুরা যারা কেউ লেফটেনেন্ট, কেউ বড় কর্মকর্তা, ভার্সিটি শিক্ষক বন্ধুরা বলে উঠে তোরা আর বড় হলি না? আমি তখন একটাই ডায়লগ দেই ভারিক্কি মুখোশধারী মন খারাপ নিয়ে সিরিয়াস জীবনের চেয়ে আমরা বড় না হয়েই অনেক ভালো আছি।
তবে সবারই প্রেশার। চাকরী করতে হবে। বান্ধবীকে বিয়ে করতে হবে জলদি এইরকম অনেক তাড়া। তাই ভালো চাকরী খোজার ব্যস্ততা। যেই নেভীর জীবনকে আমরা এতো পচাইতাম। সেই নেভীর অফিসার শর্টকোর্সেই এক্সাম দিতে তাদের ঢাকায় আসা। আমার ধারনা হয়ে যাবে। কারন নেভী যেই ধরনের ছেলেদের সাপ্লাই এক্সিকিউটিভ বানায় এরা তাদের চেয়ে ওভার কোয়ালিফাইড। শুধু মাত্র চাকরী নাই বিধায় তাদের এই নেভীতে ট্রাই মারা। তবে নেভীতে যদি হয়েও যায় তাও তারা আশা করি আমার অন্যবন্ধুদের মতো এরা বড় হয়ে যাবে না। তার নমুনা হলো এই হরতালের দিনে কড়া রোদে এতো বালু ধুলায় গতকাল সোনালী মাঠে ক্রিকেট খেলা এবং গোহারা হেরে বিরিয়ানী ভক্ষন। তাই বলা যায় এই সংকটের দিনেও বন্ধু আড্ডা দিয়ে হেভভী আছি!
ইদানিং কেনো জানি খুব ভোরে উঠি। কিন্তু নামায মিস হয়ে যায়। উঠেই বই পড়া শুরু করি। মেলা থেকে কেনা ও প্রাপ্ত বই গুলান। এর মধ্যে পড়লাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসে ডায়রী, যাও উত্তরের হাওয়া, কত আকাশ কত মৃত্যু, টয় হাউজ থেকে ১৯৭১ মৃত্যু ছায়া সংগী, নাম নিয়ে যত কথা, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ, সাক্ষাৎকার চতুষ্টয় এগুলোই। আর এখন পড়ছি মাহমুদুল হক অগ্রন্থিত গল্প আর কালি ও কলমের বর্ষপুর্তি সংখ্যা। বন্ধু আসার কারনে সময় কম পাই। কিন্তু আগের মতোই দেখলাম আমার দ্রুত পাঠের ফুল ফর্ম এখনো আছে। বই এখনো আমার কাছে অতি মুল্যবান বন্ধু। যার কোনো তুলনাই হয় নাই। আসলে যেই মানুষরাই বই পড়ে তারা অনেকেই খারাপ হতে পারে কিন্তু তাদের ভেতরে আমি একধরনের শুদ্ধতা দেখি। যারা বই পড়ে না তারা কোনো দিন সেই শুদ্ধতা স্পর্শ করতে পারবেনা।





এই লেখাটা দারুন হইছে...বেশ কয়েকটা মূল্যবান কথায় বলিষ্ঠ হ্য়ে উঠেছে এই লেখাটা .. বই নিয়ে যে কথাগুলো বলছেন সে কথা আমারও ... বই পড়ার যে তৃপ্তি, বই পড়ার আনন্দে আনন্দে যে জ্ঞান আহরণ করা যায় তা এক কথায় অতুলনীয় ও দুষ্প্রাপ্যই বৈকি !!
থ্যাঙ্কস ভাইয়া। কষ্ট করে পড়ে যান তাই আপনাকে মেসেজ দিয়া জানাই! শুভকামনা!
আহা ! যদি পারতেম !
মাহমুদুল হক-এর অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে বিস্তারিত চাই। কি কি পড়ছো-এর সাথে সেই বই সংক্রান্ত এক-আধটু ধারণা দিলে উপকার হয়। বইপড়ার মতো অতি চমৎকার একটি অভ্যেস তুমি ধরে রেখেছো, এজন্য লেখায় সাততারা

লেখবো আপু। বন্ধুরা আছে তো তাই পড়াশুনা একটা কম কমে আছি এখন। আপনারে থ্যাঙ্কস আপু। বই নিয়ে টুকটাক লেখার যে ইন্সপিরেশন তা আপনার থেকেই পাওয়া। ভালো থাকবেন!
আমার তো ব্যপক খারাপ সময় কাটছে। কিছুই করি না, কি যে করি! ভালো সময় কাটাচ্ছ, কাটাও। সাবধানে থেকো।
বই পড়, সিনেমা দেখ। বই পড়ে কেউ শুদ্দ হতে পারে কিনা আমার জানা নেই তবে বই পড়ার প্রভাব তো থাকবেই। বই নিয়ে লিখো। ভালো থাক, বারবার বলি।
কাইল্কা হরতাল সাবধানে থাইকেন অফিসে যায়েন না টিভি কম দেইখেন। টিভি দেখা এক পেইন!
আমারো ব্যাপক ভাল সময় কাটতেছে
। লিখি না পড়িও না, রাধি খাই টিভি দেখি একদম আদরশ নারী যাকে বলে 
পোস্ট টোস্ট লিখেন এখন। অনেকদিন আপনার লেখা পড়ি না!
পড়ার খুব ইচ্ছে থাকা স্বত্তেও সময়ের অভাবে হয়ে ওঠে না, বাসায় এলে বউ-মেয়ের জন্য অনেকটা সময় বরাদ্ধ। অফিসে কাজের ফাঁকে ফেবু ও ব্লগে মাঝে মাঝে ঢু মারি।
লেখা ভাল লেগেছে।
ভালো আছো, আরও ভালো থাকো। সবার এত ভালো বন্ধু ভাগ্য হয় না, তোমার আছে। হিংসা না হয় নাই করলাম
এপ্রিলের পর থেকে তুমিও অনেক ভালো থাকবা বন্ধু। শুভকামনা!
লেখার শেষের দিকের কথাগুলো চমত্কার।
যাদের বই পড়ার অভ্যাস আছে তাদের মাঝে মোটা দাগে অনেক পার্থক্য থাকলেও কিছু মৌলিক মিল থাকে, কথা বললে বা একসাথে চললে টের পাওয়া যায়। ব্যাপারটা বেশ ভাল লাগে।
থ্যাঙ্কু ভাইয়া!
বন্ধু এবং বন্ধুত্ব এই নিটোল গল্প পড়তে পড়তে মনটা আদ্র হয়ে এল।
অনেক ভালো লেগেছে লেখাটা শান্ত।
ধন্যবাদ আপু। ভালো থাকেন অনেক!
বই আর সিনেমা-এ দুটো না থাকলে সবচেয়ে খুশী হতো আমার বউ। অসাধারণ কিছু বই পড়ি, অসাধারণ কিছু সিনেমা দেখি। চমৎকার কিছু গান শুনি। জীবনে আর কি দরকার?
থ্যাঙ্কস ভাইয়া। সিনেমা দেখা হয়তেছে না এই কয়দিন!
মন্তব্য করুন