সুইট বিষুদবার...
বৃহস্পতিবার এরশাদ পরবর্তী শহুরে মধ্যবিত্তদের জন্য খুব আনন্দে দিন। ডিজুস রেডিও ফুর্তি তার নাম দিছে ফুর্তি দিবস । তবে আমি বুঝি না এতো ফুর্তি কই থেকে আসে? আর শুক্রবার যাদের দিকেই তাকাই দেখি সেই ছুটির সময় কই? সবাই ব্যাস্ত। এই একদিনেই ফ্যামিলী নিয়ে বের হইছে, বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাইতেছে, দাওয়াত খাচ্ছে, কত কাজ। এগুলারে কি ফুর্তি বলা যায়। ফুর্তি বলা যায় তাকেই যে ফুর্তিতে থাকে। নিজের মতো খাওয়া আনন্দ ঘুরাঘুরি করে বেড়ায়, কোনও টেনশন বা ভাবনা নাই। সেরকম আনন্দ কোথায় পাওয়া যায়! ছুটির দিনের সেই ফুর্তি কবেই হারিয়ে গেছে এই শহর থেকে। এখন শুক্রবারের মানেই বাজার করা, কাঠফাটা রোদে মেজাজ খারাপ করা, এক দল মানুষের পায়ের পারা খেয়ে মসজিদে নামাযে যাওয়া, নামায শেষে টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া। উঠে কোথায় যাওয়া রাতে জ্যামে ঘামে বাসায় ফিরে আবার সেই শনিবারের ব্যাস্ততা। যাদের শনিবার বন্ধ তাদের একটু আরাম। তারা শুক্র শনি আর যাই করুক না করুক আপন মনে ঘুমিয়ে নেয়। আমার এক বন্ধু আছে যে বিষুদবারে রাতে ঘুমায় উঠে জুমার আগে। নামায পড়ে খাওয়া শেষে আবার ঘুম দেয় উঠে সন্ধ্যায়। রাতে একটু ঘোরাফেরা করে আবার ঘুম দেয় উঠে শনিবার দুপুরে। এতো ঘুম যে আল্লাহপাক মানুষরে কেমনি দেয় তা বুঝে পাই না। আর বিষুদ বার তার খুব আনন্দের দিন। রাত দুইটা তিনটা পর্যন্ত জেগে সবাইরে ফোন দিয়ে লম্বা লম্বা আলাপ শুরু করবে। ভেবে দেখবে না যে সবার তার মতো অতো ফুর্তি নাই, যে রাতে দুইটায় জিগেষ করবে ভালো হিন্দী ছবি এখন কি চলতেছে তা নিয়ে আলাপ করতেছে কিংবা কোন বন্ধুর সাথে সে এখন কি আচরন পাইতেছে তা নিয়ে আলাপ। কি উত্তেজনা ভাবেন একবার!
আমার কাছে সব দিনই এখন একি। যদি পজেটিভলি বলি সবদিনই ফুর্তি দিবস আবার ধরলে সবদিনই বিষন্নতার দিন। সব দিনই ঘুরে ফিরে একি। সকাল হয় দুপুর আসে তারপর বিকেল পেরিয়ে রাত আমার সব বেলা যায় একি ভাবে। যেদিন ক্লাস থাকে সেইদিন একটু ভিন্ন। ক্লাস থেকে ফিরতে ফিরতে সাড়ে নয়টা দশটা বাজে। রিক্সায় চড়ে যখন আসি মনে হয় চারিপাশেরএই ব্যস্ত শহরটা আমার নয়। আমি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি রিক্সায় চড়ে আর সবাই আমাকে বিদায় বলছে। যেনো আর কোনোদিন রিক্সায় চড়ে এই চেনা পথে থাকবো না। আমি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সবসময় ভাবি। আমি যদি না থাকি কি মুল্য আছে এই খারাপ লাগা ভালো লাগার অনুভুতি গুলার। আমি কোথাও যাই যখন, তখন বারবার মনে হয় আর বুঝি ফিরবো না। কিন্তু ফিরে আসার সময় মনে হয় আবার কবে আসবো সত্যিই কি আসতে পারবো? এইসব যুক্তিহীন ভাবনার কোনো মানে নাই। তাও ভাবি, ভেবে সময় কেটে যায়।
আজকের দিনটা খুব আমার আনন্দে কাটলো। কারন রাত পোহালেই বাড়ীতে ফেরার আনন্দ। এমন না যে বাড়ীতে রসগোল্লা সন্দেশ। কিছুদিন বাড়ীতে থাকলেই ঢাকায় আসার জন্য মন ছটফট করে। তাও আমার বাড়ী ভালো লাগে কারন বাড়ীতে আমার একান্ত আপন বাবা মা আছে। বিশেষ করে মা আছে। আম্মুকে নিয়ে ব্লগে অনেক লিখছি আর লিখতে ইচ্ছা করে না। অনেকেই আমার এই আম্মুপ্রীতির কারন খুজতে জিগেষ করে তোমরা কয় ভাই বোন? কিন্তু এইটা ন্যাচারাল। এই গরীব একটা দেশে আমাদের বসবাস সেখানে ছেলেদের মায়ের চেয়ে আপন কে? মেয়েরা মায়ের নিরীহ আচরনে বিরক্ত হয়ে তাই বাবাকে বেশী আপন করে তুলে। আমার এক বান্ধবী ছিলো যার মুখে আমি শুধু তার বাবার গল্প শুনতাম। এরকম বাবা প্রীতি আমাকে খুব অবাক করছিলো। সেই মেয়েটা শয়নে স্বপনে তার বাবার মতো হতে চাইতো। আমিও আব্বুকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু সেই ভালোবাসা কেনো জানি মায়ের ভালোবাসার তুলনায় কিছুই না বলে মনে হয়। তাও আব্বুর কথাও খুব মনে পড়ে বারবার। জানি বাড়িতে গেলে আমার অযথা রিমোট টেপাতে বিরক্ত হয়ে ঝারি দিবেন তাতে আমার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হবে। চাকরী বাকরী পাচ্ছি না তেমন খুজছিও না তা বলে বারবার হতাশ হবেন। তারপরেও আব্বু তো আব্বুই। টাকা চাইলে অনেক টাকা দিবে আর বলবে হিসেব করে খরচ করিস। মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম নিয়েও এই জিনিসটাই শিখলাম না। জামালপুরের মতো শহরে আমি যা খরচ করি এমনিতেই তা কোটিপতিরাও করে না। আব্বুর একটা ডায়লগ খুব দারুন লাগে। সমস্যা নাই ঘুসের চাকরী হলেও তোকে ডুকায় দিবো তোর বড় ভাইরে নিয়া তো আর চিন্তা নাই। জামালপুর ময়মনসিনংয়ের মানুষের মনোজগতে ঘুষ একটা বিশাল ফ্যাক্টর। যেই চাকরী করেন আপনি প্রশ্নবানে জর্জরিত হবেন যে উপরি কত? সাইড ইনকাম চালানোর পথ আছে তো। আমি জানি না এর কি কারন। একটা কারন হতে পারে যে জামালপুরে ময়মনসিংহের এদিকে অনেক সরকারী চাকুরেরা ব্যাপক দালানকোঠা, সম্পত্তি, প্রভাবশালী হয়। সেই যুক্তিতে হয়তো। বাড়ীতে গেলে অবধারিত ভাবে আব্বু বলবে সারাদিন টিভি নিয়ে আছোস তোর চোখ ক্লান্ত হয় না? নিজে ট্রেনের টিকেট কেটে এনে বলবে তোর জন্য কতো কষ্ট করতে হয়, ফেরার দিন ব্যাগ গুছিয়ে দিতে দিতে বলবে জামা কাপড়টাও ভালো ভাবে ভাজ করতে শিখলি না, যখনি ট্রেন হোক আমাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে ট্রেন ছাড়লে বলবে শান্ত সাবধানে যা, কারোর কিছু খাইস না, মোবাইল সাবধানে রাখিস। এই ভালোবাসা স্নেহের আধিক্যে মনে হয় এরকম দারুন জীবন শুধুমাত্র আমার মতো বেকুব ভাগ্যবানেরাই পায়।
আজ সারাদিন কি করলাম, কিছুই করি নাই। সকালে আটটায় ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় পিসিতে বসেই বেড়িয়ে পড়লাম। একা একাই অনেক হাটলাম রোদে যখন ক্লান্ত লাগছিলো তখন চায়ের দোকানের দিকে ফিরলাম। তার আগে হোটেলে নাস্তা। অতি সাধারন ডালভাজি আর রুটি। পকেটে ছিলো ২৯ টাকা ভাংতি। একটা নতুন ওয়েটার আসছে। সে আমারে বস বস ডাকতে অস্থির। টাকা নাই পকেটে তাই রুটি একটা কম খেয়ে সেই পাচটাকা তারে বখশিশ দিলাম। তখন সে মহাখুশী। আমি চায়ের দোকানে আসলাম। মামীর দোকান বন্ধ, ভালো হইছে আমার জন্য। আরেক দোকানে বসলাম। সেখানে আম গাছের নিচে ছায়া। বাতাসে দারুন লাগছিলো। সাইফ আসলো। তার লম্বু এখন আরেকজনের গার্লফ্রেন্ড এইটা নিয়ে সে প্যারা খায়। তার প্যারাগ্রাফ শুনলাম। সাইফরে বললাম বাদ দেও। লম্বু মাম্মি ড্যাডীওয়ালা চকলেটরে নিয়ে ভালো থাকুক। তোমার ওতো ভেবে কাজ নাই। পড়ো আর ফুটবল খেলো লাইফ ইজ ওসাম। সবাই ব্যাস্ত তাই আমি আর সাইফ দুইজন অনেক গল্প করলাম। সাইফ ছেলেটাকে আমি অসম্ভব স্নেহ করি। কারন আমার মতোই ওর আবেগের কমতি নাই। আর ওকে এতো পচাই আমরা তাও ও বিন্দুমাত্র রাগ করে না। আমি শিউর এই ছেলেটা একদিন অনেক নাম করবে। পুলক আসলো, অনিক আসলো সাথে নিয়ে আসলো অনিকের এক বন্ধু। ছেলেটা এসিটেন্ট ডিরেক্টর ছিলো বাংলাদেশ আইডলের এডের। তার মুখে এক্সপিরিয়েন্স শুনলাম। পুরান ঢাকায় জেনারেটর দিয়ে শুটিং করা কতো কষ্টের তা জানলাম। নায়িকার মায়ের চরিত্রে অভিনেত্রী কেনো গ্লিসারিন দিয়েও কাদতে পারে না তাও জানলাম। বয়স্ক অভিনেতা নায়িকারে নিয়ে বসে থাকে রুমে তারও গসিপ শুনলাম। চুল কাটাতে হবে তাই গেলাম সস্তা সেলুনে। কোনোরকমে দিলো কেটে। জানি ওতো ভালো হয় নাই। চুল দাড়ি চেহারা নিয়ে আমার কোনো আদিখ্যেতা নাই। লোক সমাজে চলতে পারলেই হলো। বাসায় আসলাম দেরীতে ভাত খেয়ে বই পড়ছিলাম। ঘুম আসছিলো কিন্তু ঘুমাই নি। ক্লাস ছিলো কিন্তু ফোন দিলাম রাষ্ট্রপতির শোকে তারা পাথর তাই ক্লাস হবে না। এই সেমিস্টারে পড়াশুনা সব গোল্লায় গেলো। ক্লাস নাই আমি কি করি? গেলাম এক আপনজনের বাসায়। তার আন্তরিকতার পারদে আসমানে উঠলাম। কিছুসময় টিভি দেখলাম। টিভি্তে খালি খবর, খবরে শুধু রাষ্ট্রপতি। সময় টিভিতে মহিলা ডাক্তারদের নিয়ে অনুষ্ঠান সেইখানে এক মহিলা উপদেশ দিচ্ছে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে নিজেকে ভাবতে। যেদেশে মানুষই বাচে না সেই দেশে এতো নিরাপত্তা নিয়ে ভেবে ফায়দা কি? সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী দেখি বয়ান দেয় একাত্তরে। দেখতে ইচ্ছা করলো না। তার চেয়ে গল্প করলাম উনার সাথে। আমাকে যে কি পরিমান স্নেহ উনি করে তাতে বারবার মুগ্ধ হই। মনে হচ্ছিলো আরো অনেক সময় নিয়ে উনার সাথে জমিয়ে গল্প করি। সেই মুগ্ধতা নিয়ে বাসায় ফিরলাম রিক্সায়। বাসায় আগে ঢূকি নাই। গেলাম চায়ের দোকানে দেখি সোসাইটীতে কারেন্ট নাই। মামীর দোকানে ১ কাপ চা খেলাম। আদনান বাদে কেউ নাই। আদনানের সাথে চাকরী বাকরী নিয়ে কিছু সময় হতাশা বিনিময় করলাম। তারপর আর কি বাসায় ফেরা। মামা অনেক যত্নে ব্যাগ গুছিয়ে দিলো। বাড়ীতে প্রতিবার অনেক বই নিয়ে যাই, না পড়েই ফেরত আনি। এবার পড়বো। কারেন্ট গেলো বাসায়। আজ ইলেকট্রিসিটির খুব প্রবলেম। ভাবলাম ঘুমায়া পড়ি কাল সকালে ট্রেন। তার আগে মনে হলো পিসিতে লিখে দেই। কী আর আছে জীবনে। লোকজন তো ফেসবুকরে জান প্রান দিয়ে আপন করে নেয়। আমি না হয় এই ঝিমানো ব্লগটারে ভালোবেসে আপন করলাম!





শেষের কথাগুলা বেশি ভাল্লাগছে।
হাসিখুশি বাড়ি ঘুইড়া আসেন। ভাল থাইকেন সুপ্রিয় শান্ত ভাই।
সুইট বিষুদবার সুইট হয়েছে।
আমাদের আদরের দিনগুলো হারিয়ে যাওয়ায় আপনার বর্ণনায় নস্টালজিক হলাম।
নিরাপদে বাড়ি থেকে ঘুরে আসুন।
ভাগ্যবান শান্ত ভাল থাকুক...
~
ভাল অবজার্ভেশন।
প্যারাগ্রাফ শব্দটা ভাল গড়েছেন কিন্তু।
আমার ধারণা এমন 'বেকুব ভাগ্যবান' দুনিয়ায় অল্প নয়। এদের বাবা-মায়েরা ভাল থাকুন।
আপনার 'সাপ্তাহিকী' পড়তে ভাল লাগছে।
একমত
ঝিমানো ব্লগেই লেখেন। আমরা ঠিকই পড়ি, মুগ্ধ হই।
আগে বিষুদবারে অফিস থেকে বেরুবার সময় গাইতাম- আহা! কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে।
"আমার কাছে সব দিনই এখন একি। যদি পজেটিভলি বলি সবদিনই ফুর্তি দিবস আবার ধরলে সবদিনই বিষন্নতার দিন। সব দিনই ঘুরে ফিরে একি। সকাল হয় দুপুর আসে তারপর বিকেল পেরিয়ে রাত আমার সব বেলা যায় একি ভাবে। যেদিন ক্লাস থাকে সেইদিন একটু ভিন্ন। ক্লাস থেকে ফিরতে ফিরতে সাড়ে নয়টা দশটা বাজে। রিক্সায় চড়ে যখন আসি মনে হয় চারিপাশেরএই ব্যস্ত শহরটা আমার নয়। আমি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি রিক্সায় চড়ে আর সবাই আমাকে বিদায় বলছে। যেনো আর কোনোদিন রিক্সায় চড়ে এই চেনা পথে থাকবো না। আমি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সবসময় ভাবি। আমি যদি না থাকি কি মুল্য আছে এই খারাপ লাগা ভালো লাগার অনুভুতি গুলার। আমি কোথাও যাই যখন, তখন বারবার মনে হয় আর বুঝি ফিরবো না। কিন্তু ফিরে আসার সময় মনে হয় আবার কবে আসবো সত্যিই কি আসতে পারবো? এইসব যুক্তিহীন ভাবনার কোনো মানে নাই। তাও ভাবি, ভেবে সময় কেটে যায়। "
বেশ লাগছে উপরের লাইনগুলো, সাথে শিরোনামটাও....
লেখার ধার ভাড়ছে, সাথে শাণিত হচ্ছে মনের একান্ত ছোট ছোট ভাবনাগুলোকে লেখায় রুপ দেয়ার ক্ষমতাটাও যা আমার কাছে মনে হয় একজন লেখকের জন্য ও তার লেখার জন্য অতি মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ।
আরামে থাকেন।
বিষুদবার রাত মানে চাঁন রাত!

বাড়ি যাবার কথা মনে হলেই মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার অনেক মজা। শুভ হোক তোমার ভ্রমন।
কি খবর শান্ত? বই কি ব্যাগ থেকে বের করেছ? পড়ছ? ব্যপক খাওয়া আর ঘুরাঘুরি চলতেছে?
এতদিনের সব জমিয়ে জম্পেস পোষ্ট দিও। পড়ার অপক্ষোয় ------
শাবাস, দ্যাটস দ্যা ইসপিরিট

মন্তব্য করুন