রশীদ করীমের প্রবন্ধ পাঠের আনন্দ!
রশীদ করীমের বড় পরিচয় উপন্যাসিক হিসেবেই। উপন্যাস লিখেই তিনি নাম যশ খ্যাতি সব পেয়েছেন। সত্তর আশির দশকে রশীদ করীমের জনপ্রিয়তা তো প্রশ্নতীত। নিজেও তিনি খুব বুর্জোয়া গোছের বিশাল এক চাকরী করতেন তাতে অর্থকড়ির জন্য তাকে কোনোদিন লিখতে হয় নি। মন যখন চেয়েছে তখনই লিখেছেন। কোন এক ইন্টারভিউতে পড়েছিলাম -ছোটবেলায় মধ্যবিত্ত পরিবেশে মানুষ হলেও দারিদ্রকে তিনি ভালোভাবে দেখেন না। তার মত হলো দরিদ্র মানুষ সব কিছুতেই দরিদ্র থাকে। ভালো কবিতা পড়তে পারে না, ভালো গান শোনা হয় না, ভালো সিনেমা বা ক্রিকেট খেলা দেখার সুযোগ পায় না। দরিদ্র মানুষের জীবন কেটে যায় অন্ন বস্ত্র সংস্থানেই। স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন উপভোগ করার সুযোগ তাতে নেই। রশীদ করীমের জীবন সময় উপভোগের জীবন। জীবনের শেষ ১৫-১৬ টা বছর অসুস্থতা ছাড়া গোটা জীবনকে তিনি তুমুল ভাবে অনুভব করেছেন। তার এই অনুভবের সবটুকু গল্প পাওয়া যাবে তাঁর প্রবন্ধ সমগ্রতে! প্রায় পাঁচ শত পেইজের এই বই নিয়ে বলতে গেলে অনেক কথাই বলতে হবে। আমি শুধু বলতে চাই আমার ভালো লাগার জায়গা থেকে কিছু কথা। ২০০৩ সালে বইটা বের হয়েছে সাহিত্য প্রকাশ থেকে। দাম খুব কম মাত্র ৩০০ টাকা। কমিশন বাদ দিলে ২৪০। যে দিনকাল এখন এই বই যদি এখন প্রথমা বের করতো দাম রাখতো আটশো টাকা। গতকাল আজিজে গেলাম প্রথমার একেকটা বই দেখি, আর দাম দেখে আকাশ থেকে পড়ি। চার ঘন্টা দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলেই আমি সেই বই শেষ করতে পারবো তার দাম ৬০০ টাকা!
বইটার শুরু হয়েছে আরেক দৃষ্টিকোণ নামের প্রবন্ধ দিয়ে। শুরুতই স্মৃতিচারণ। প্রথমেই আবু সয়ীদ আইয়ুবকে নিয়ে। কিশোর ও যুবক বয়সে যারা বন্ধু ও বড় ভাই থাকে কাছের, সেরকমই ছিলেন আইয়ুব। উনার কাছ থেকে রশীদ করীম ভালো বই পড়তে শিখেছেন, ভালো গান শুনেছেন কিংবা চমৎকার আড্ডা দিয়েছেন। সেই মুগ্ধতা নিয়েই তাঁর এই স্মৃতিচারণ। পরেরটা বাংলা সাহিত্যে এক বিশাল ব্যাক্তিত্ব সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে। আমি এর আগে উনাকে নিয়ে এত অন্তরঙ্গ কথাবার্তা কোথাও পড়ি নি। এত আন্তরিক সম্পর্ক দুইজনের ভেতরে তার একটা নমুনা দেই। একবার রশীদ করীম অফিস করছেন সৈয়দ মুজতবা আলীর ফোন। পেটে অসুখ তাই যেন কয়েকটা ডাব আনো। স্যুট কোট পড়া রশীদ করীম সদরঘাট থেকে ডাব কাধে ঝুলিয়ে এনেছেন। স্যুটের অবস্থা ধুলাবালি লেগে কাহিল। মুজতবা সাহেব বললেন, করেছো কি? তোমার ড্রাইভার আনতে পারলো না। তারপর শিশুদের মতোই চায়নিজ খাওয়ার আবদার করলেন। এই যে সম্পর্কের হৃদ্যতা তা দারুন ভাবে মনে রেখে লিখছেন রশীদ করীম। স্মৃতিচারণের শেষ প্রবন্ধ হলো সমরেশ বসুকে নিয়ে। সেই খানেও ঘুরে ফিরে একই জিনিস আন্তরিক আড্ডাবাজীর কথাই বলা। ও সমরেশ বসুর অপরিমেয় বিনয়ের ফিরিস্তি লেখা। তারপরের পার্ট হলো কথা সাহিত্য। রশীদ করীম যে কি পরিমান ভদ্রলোক তার প্রমান এই পার্ট। কারন হুমায়ূন আহমেদ থেকে সৈয়দ ওয়াল্লীউল্লাহ, শওকত ওসমান থেকে মাহমুদুল হক কাউকে তিনি ন্যায্য প্রশংসা থেকে বঞ্চিত করেন নি। এমনকি আহমদ ছফার ওঙ্কার উপন্যাস নিয়েও তার এক প্রবন্ধ আছে, নাম পাঠ করে প্রীত হলাম। হাসান আজিজুল হক কিংবা শহীদুল্লাহ কায়সারও বাদ পড়েন নি লিস্টে। তবে তিনি অনুরক্ত হয়েও সমালোচনা করেছেন যথেষ্ট। তাঁর বন্ধু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী কিংবা ভাই আবু রুশদকে নিয়েও লিখেছেন নির্মোহ ভাবে। আমার কথা সত্যতা পাবেন পড়লেই। তবে কবিতা ও কবি নিয়েও তার প্রবন্ধ গুলো দারুন। বিশেষ করে শামসুর রাহমানকে নিয়ে উনার যে প্রবন্ধ সেই মাপের লেখা রাহমানর সাহেবের কবিতা নিয়ে আর কেউ লিখে নি। শামসুর রাহমান আমারও পছন্দের, সেই প্রবন্ধটা পড়ে পছন্দের মাত্রা আরো বেড়েছে। তিনি একদম হাতে নাতে দেখিয়ে দিয়েছেন শামসুর কেন আধুনিক ও সমসাময়িক বড় কবি!
'অতীত হয় নূতন পুরাতন' প্রবন্ধের খন্ডতেও তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চিত বিষয় গুলো নিয়েই মতামত দিয়েছেন। তার ভেতরে আমার সব চেয়ে প্রিয় দুটো প্রবন্ধ হলো- আমার কিস্যু ভাল্লাগে না ও শ্রীবুদ্ধদেব বসু ও ঢাকা। রাজনীতি নিয়েও তার ধারনা খুব স্বচ্ছ। আজীবন সামরিক শাসন বা ব্রিটিশ পাকিস্তানীদের কু শাসনে থেকেও তিনি ভুলেন না গনতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ ও সেক্যুলারইজমে আস্থা রাখতে। বাংলা ভাষা নিয়েও তিনি ভেবেছেন, অনুবাদ করা ও করানোর প্রতি জোর দিয়েছেন। সংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তো অকল্পনীয়। সন্দীপনের মতোই তিনি রবীন্দ্রনাথের সেরা কাজ তাঁর গানেই রয়েছে বলে মনে করেন। স্মৃতিচারণ করেছেন গ্রামোফোন যুগের। তবে তাঁর অতি প্রিয় শিল্পীর নাম সম্ভত হামিদা হক। আমি উনার গান শুনি নাই। পংকজ কুমার মল্লিক, কানন বালা আরো কত জনের নাম উনার মুখে মুখে ফেরে। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বলতে গেলেই তিনি শান্তিদেব ঘোষের এক বইয়ের রেফারেন্স দেন। বইটা কাল আজিজে খুজলাম পাই নি।
বিবিধ আর মনের গহনে তোমার মুরতিখানি এই দুইটা চ্যাপ্টারের প্রবন্ধ গুলো আমার সব থেকে বেশী প্রিয়। কারন এই দুই অনুচ্ছেদে তিনি সুন্দর করে তাঁর শৈশব ও যুব বেলাকার ভালো লাগার সব গল্প বলেছেন যা পড়লেই শিহরিত বোধ করি। দারিদ্র একটি পশু প্রবন্ধটা তো অসাধারণ। একটুকু ছোয়া লাগের ভেতরে আছে তাঁর বাল্যবয়সের প্রেমের গল্প। তাঁর প্রিয় নায়ক প্রমথেশ চন্দ্র বড়ুয়াকে নিয়ে দারুন ভাবে বর্ননা আছে। কি যে তন্ময় হয়ে তিনি উনার ছবি দেখেছেন তা পড়লেই মুগ্ধ হই। আমি খুজে পাইনি কোথাও এই নায়কের ছবি। চার তারকা প্রবন্ধে আছে তাঁর প্রিয় ক্রিকেটার মুশতাক আলীর বিবরন, সেই সময়ের মোহামেডান ক্লাবের লেফট-ইন রাহমাত ও হাফেজের কথা। ত্রিশ চল্লিশ দশকের এইসব তারকার গল্প তিনি আশ্চর্য সুন্দর ভাবে লিখেছেন। বিশেষ করে মুশতাক আলীর বিবরন। পুরাই দুর্দান্ত। শংকরীপ্রসাদ নামের লেখকের রেফার দিয়ে তাঁর লেখাটা মনে হবে পড়তে পড়তে যে সাক্ষাৎ ব্যাটিং দেখছি। সৈয়দ মুশতাক আলীর কোনো ভিডিও কোথাও খুজে পাই নি। তবে এখন ভারতে যে ঘরোয়া জাতীয় টি টোয়েন্টি লীগ হয় তাঁর নাম উনার নামে। উনার আরেক প্রিয় অভিনেতা ছিল গ্যারি কুপার। গ্যারি কুপারকে নিয়ে তাঁর যে বিবরন সিনেমা থেকে লোভ সামলানো দায়। আমি দুইটা সিনেমা পাইছি সংগ্রহ করে, দেখি নাই এখনো। 'মনের গহনে তোমার মুরতিখানি' ভেতরে- রাজনীতি ও ক্রিকেট ও আরো কিছু প্রবন্ধ আছে তা আমার পড়তে খুব মজা লাগছে। বইটা আমি টানা দুইবার পড়েছি এমাথা থেকে ওমাথা। এত আধুনিক একজন লেখক ও মানুষের মুখে তাঁর সময়, তাঁর সাহিত্য ভাবনা, তা চিন্তা চেতনার কিছুটা জেনে খালি মুগ্ধ হয়েছি বারবার। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি উনার বিনয়, এত বিখ্যাত লেখক উনি, বিখ্যাত সব মানুষদের যার উঠা বসা তিনি মোটেও নিজেকে তাদের মত বড় কেউ ভাবেন নি। আর আমাদের দেশে সবাই না গুটিকয় রহিমুদ্দিন কলিমুদ্দিনরা দু একটা বই বের করে একটু মানুষ চিনলেই তাদেরপা আর মাটিতে পড়ে না!





রশীদ করীমের পুরো পরিবার গুনী। ওনার ছোটবোন থাকতেন বেলজিয়ামে। বাংলাদেশ দূতাবাসের ক`মক`তা ছিলেন তার স্বামী। পুরো পরিবার কালাচারাল আয়োজন, লেখালেখিতে জড়িয়ে আছেন। সবাই বেশ ভাল সরকারী চাকরি করতেন।
কড়া শোনালেও কথা কিনতু সত্য।
আমি গতবার ওনার উপন্যাস সমগ্র কিনে এনেছি। এখনো হাত দেইনি। কোন একদিন।
তোমার এই লেখাগুলো আসলেই ইউনিক। বইপড়ুয়াতেও শেয়ার করতে পারো।
তাই নাকি? অবশ্য হবারই কথা। বইপড়ুয়াতে দেয়ার ইচ্ছা নাই। ব্লগেই ভালো লাগে!
রশিদ করিম আমার প্রিয় লেখকদের একজন। দূর্ভাগ্যজনক হল এই মূহুর্তে তার একয়াতি বইয়ের ও নাম মনে করতে পারছি না। আচ্ছা " আমার যত গ্লানি ""ও "প্রেম একটি লাল গোলাপ" কি ওনার লেখা মনে হচ্ছে।মেমরী বলে আর কিছু নাই মস্তিস্কে।
ঠিক লাইনেই আছেন। স্মরন শক্তিও ঠিকই আছে
চমত্কার গ্রন্থালোচনা।
থ্যাঙ্কস বর্ণ
এমন রিভিউ মুগ্ধ হয়ে পড়ি, সেই মুগ্ধতা বই পড়তে উৎসাহিত করে। কিন্তু কেন যেন বই পড়ার তাল হারিয়ে ফেলছি দিন দিন। মাঝে কিছুদিন পড়ি, আবার পড়ি না। আগে তো এমন ছিলাম না!!! তোমাকে হিংসা হয় শান্ত। লেখা চালিয়ে যাও পড়ার সাথে সাথে।
বেশি বেশি করে বললেন আপু!
নামটা প্রথম শুনলাম
নিশ্চই ভালো লেখেন
দেশে কিনবো তার বই
ঠিক আছে ভাই
রশীদ করীমের কয়েকটা বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে যার মধ্যে দুইটা আমার সংগ্রহে আছে। অসাধারণ লেখা।
তোমার রিভিউর ব্যাপারে নতুন করে কিছুই বলার নাই, চ্রম!!!
থ্যাঙ্কস ভাইয়া!~
মন্তব্য করুন