তাই চোখের আড়ালে থেকে গেল কতোকিছুই!
পোষ্ট লিখছি যখন ফাগুন তখন শুরু হয়ে এক দিন চলে গেল। বাসন্তী আর হলুদে পুরো ঢাকা শহর একাকার হয়ে- সাদর সম্ভাষন জানালো ফাল্গুন মাসকে। ফাল্গুন আর বৈশাখ হলো অতি বুর্জোয়া মাস, তাদের আগমনে উল্লসিত শহর নগরে ব্যাপক আয়োজন মানুষের, উৎসব চলে এই মাসগুলোর আগমনে। এই দুটো মাস বড়ই কপালওয়ালা, আষাঢ় কিংবা অগ্রহায়নের সেরকম কোনো কপাল নাই, অথচ সেই মাস গুলোও কত অসাধারণ। ক্লাস নাইনে নাকি ইলিভেনে পড়তে হয়েছিল সুফিয়া কামালের 'তাহারেই পড়ে মনে'। ফাল্গুন এসে পড়লেও কবির মনে শীতের জন্য বিরহ। সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষের শোকে তিনি কাতর। আমার ঠিক উল্টো, শীতের চলে যাওয়াতেই আমি যারপরনাই আনন্দিত। কারন লম্বা লম্বা দিন, ঝাঝালো রোদ, ক্লান্তির ঘুম, লোডশেডিংয়ের রাত, বাইরে ঘুরে ঘুরে চামড়ার বারোটা বাজানো এইসব গরমের দিনের আসল সুখ। কাউকে যদি বলি গ্রীস্মকাল আমার প্রিয়, হয়তো হো হো করে হেসেই উড়িয়ে দিবে। কিন্তু আসলেই গরমের দিন আমার ভালো লাগে। গ্রীস্মকে আমার মনে হয় আমাদের আসল বাংলাদেশের চেহারা। কঠোর, ঝাঝালো, সব কিছু পুড়ছে এমন এক অবস্থা। বর্ষাকাল তার তুলনায় মধ্যবিত্তের মতো, সব কিছু লুকিয়ে রাখা ও গ্ল্যামারাস একটা ভাব আনাই তার কাজ।
শরীর ভালো হয়ে গেল, আমারও ব্যস্ততা বেড়ে গেল। ক্লাসে যাওয়া আর বই মেলা ঘিরেই সব সময় চলে যায়। এই ক্রমাগত যাতায়াত ও জ্যামে থাকতে থাকতেই চলে যায় বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সময়। দিনে দেখা যায় ল্যাপটপে বসতে বসতেই সময় শেষ। আগের মতো সকালে উঠতে পারি না এখন, তাই ইচ্ছে করেই দেরীতে ঘুমাই। বুয়া আসলে নাস্তা করি নয়তো বুম মেরে বসে থাকি বাসায়। চায়ের দোকানে আডডা কমিয়ে দিয়েছি, হাতে অনেক গুলা বই তেমন সিরিয়াস ভাবে পড়া হচ্ছে না বলে মন খারাপ হয়। তবে কাল রাতে জেদ করেই জেনারেল মইনুল হোসেনের- এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য' বইটা শেষ করলাম। একদিন আগেই মেলা থেকে বইটা কেনা। মাওলা তে বইটা আগেই অনেকবার দেখছি কিন্তু কেনা হয় নি। শাফায়াত জামিলের বইটা পড়ে তেমন ভালো লাগে নাই, তাই এইসব বই পড়াতে সাময়িক ইস্তফা দিয়ে বসেছিলাম। রক্ষী বাহিনী নিয়ে প্রথমা থেকে প্রকাশিত বইটাও সেই ইস্তফার হেতু পড়া হয় নি কিনে। জেনারেল মইনুলের বইটা খুব সরল ও অসাধারণ। লেখক একজন বীরবিক্রম মুক্তিযোদ্ধা, সেই আমলের বড় র্যাংকের সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা, তিনি রিয়েল হিরোই। কিন্তু তিনি নায়কের হম্বিতম্বি নিয়ে বইটা লিখেন নি। একজন ডিসিপ্লিনড সেনা কর্মকর্তা হয়ে তিনি চারপাশের ঘটনাকে খালি দেখে গেছেন। তার দৃষ্টি স্বচ্ছ ও ভনিতাহীন, ব্যাক্তিগত জীবনেও হয়তো তিনি তাই। নয়তো কামালপুরের যুদ্ধে সাময়িক পরাজয় ও ৩৫ জন শহীদ হবার পরে তিনি জেনারেল মানেকশ কে বলছেন 'আপনাদের ওয়ারলেসগুলো ভালো না'। আরেক ভারতের জেনারেলকে জানাচ্ছেন অকপটে ' সহজ কথা হলো, তোমরা চাও পাকিস্তানকে ভাঙ্গতে, আর আমরা চাচ্ছি একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। তাই তোমাদের নিজেদের স্বার্থেই সর্বাত্মক ভাবে সাহায্য করা উচিত আমাদেরকে। জেনারেল গিল হাসতে হাসতে জবাব দিচ্ছেন 'মইন তুম বহুত চাল্লু হ্যায়'। এরকম আরো অসংখ্য উদহরন আছে সমগ্র বইতে যে তিনি নিজের মত করে নিজের অবস্থান পরিস্কার করেছেন। বন্দি জিয়াকে তিনি দেখতে গিয়েছেন অসীম সাহসিকতায়,এরশাদ সমন্ধে দারুণ সব ইনফো আছে বইতে, পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের ষড়যন্ত্র, অবৈধ্য অস্ত্র উদ্ধার, শেখ কামালের বিরুদ্ধে ডাকাতির মিথ্যা অপপ্রচার, মাসকেরানহাসের ভুল ভ্রান্তিময় ইতিহাসের বই লেখার ষড়যন্ত্র, জেনারেল মঞ্জুর সমন্ধে মুল্যায়ন, মীর শওকত ও মঞ্জুরের দ্বন্দ, সেই দুষ্কৃতিকারী মেজরদের নানান কার্যকলাপ পর্যবেক্ষন, জেনারেল ওসমানীর ক্রমাগত অসততা, জিয়া হত্যাকান্ডের সরল মুল্যায়ন ও তারপর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নির্বিচারে ফাসি, নিজের দীর্ঘ রাষ্টদুত জীবন নিয়ে হতাশা, সব মিলিয়ে বইটা অল্পের ভেতরেই অনেক অজানা কিছু জানানোর প্রয়াস। ১৮৮ টাকা দাম। পুরো পয়সা উসুল একটা বই। আড়াই ঘন্টায় বইটা শেষ করে আমি ব্যাপক বিনোদিত হলাম গতকাল। বইটা কিনে দিয়েছিলো এক আপু, আল্লাহ তাকে বেহেশত দুনিয়াতেই দান করুক!
আরেকটা বই আজকে শেষ করলাম টানা পড়ে। 'আধো ঘুম কাস্ট্রোর সাথে' শাহাদুজ্জামানের লেখা, ফিদেল কাস্ট্রোকে নিয়ে ডকু ফিকশন। খ্যাতিমান লেখকের বই, তার বর্ননাভঙ্গির কারনেই বইটা অসাধারণ। এই ধরনের বই বাজারে খুবই কম পাওয়া যায়। সকালে নাস্তা করে ঘরে ফিরেই বইটা শেষ করে ফেলি দুপুর নাগাদ। টানা তিনদিন বইমেলায় যাচ্ছি। বাংলাদেশের খেলা দেখা বাদ দিয়েও বই মেলায় গেলাম কাল; এইটা আমার জন্য বিশাল স্যাক্রিফাইস। কারন আমরা বন্ধুরা এক সাথে বসে খেলা দেখি খুব আড্ডা আর হাউকাউ করতে করতে। এত অসাধারণ সময় উদযাপন বাদ দিয়ে একা একাই চলে গেলাম বই মেলায়। ঘুরলাম আর ভালো ভালো প্রকাশনীর বই দেখলাম। সংগ্রহে আনলাম বদরুদ্দিন ওমরের নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ সমগ্রের দুই খন্ড। টাকা চলে গেল ভালোই। জাফর ইকবাল স্যার সেদিন মেলায় আসলেন, ১০০০ লোক মনে হয় তাকে ঘিরে রেখেছে। অটোগ্রাফ দিয়ে কূল পাচ্ছেন না। আমি ভাবছিলাম দূরে দাঁড়িয়ে, এইজন্যই হুমায়ূন আহমেদ জীবনের শেষ বছর গুলোতে মেলায় আসতেন না। কারন মানুষের হাউকাউয়ের ভিতরে তাদের মেলায় থাকার কোনো অবস্থা নাই। এক সিনিয়র প্রকাশককে দেখলাম টিভিতে ইণ্টারভিউ দিয়ে বলছে এইসব বাজারী লেখকদের তাদের পাবলিশার্স থেকে প্রমোট করেন না। আমি মনে মনে ভাবছিলাম তিনিও তো সেই বাজারেই এসেছেন, তার তথাকথিত সিরিয়াস বই বেচতে। এক মহিলাকে দেখলাম মেলায়, লেখিকা কিংবা চিত্রশিল্পী হবেন, তিনি দেখি শিল্পের কাঙ্গাল; বন্ধুকে আড্ডায় বলছেন' শিল্প ছাড়া তিনি ভাবতেই পারেন না, শিল্পহীন দিন কাটানোর চেয়ে নাকি ঘরে ভাত ভর্তা খাওয়া অনেক ভালো'। আমি হেসে নিলাম মনে মনে, এত শিল্প অনুরাগী বাংলাদেশে তা আমার জানা ছিল না।
আজ মেলায় যাওয়ার কোনো পরিবেশ ছিল না তাও জোর করেই গেলাম। গিয়ে দেখি মানুষ আর মানুষ আর চারিদিকে ধুলার রাজ্য। তার ভেতরে শাড়ী পড়া সব তন্বী তরুনীর দল দেখে বিমোহিত, কিছু সময়ের জন্য হাহাকার করে। পরে মনে হয় ঠিকই আছে, আমার জীবন আমার মতোই অসাধারণ। সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানানোর এক ময়দান বই মেলা। দোকানদার অনেকেই মাস্ক পড়া, মেয়েরা মুখে ওড়না চাপা দিচ্ছে। আমার চাপা দেয়ার কিছু নাই। হাতটাকে নিয়ে মুখের কাছে আটকে রাখলাম। অ্যাডর্নে গেলাম, ধারনা ছিল মোস্তাক শরীফের বই আসবে। আসে নি। মেলায় টেকাই দায় তাও হাটলাম কিছুক্ষণ। বই দেখলাম। পুলকের জন্য উৎপল শুভ্রর শচীনকে নিয়ে বইটা কিনলাম, সিমন ভাইরে দেখলাম হুইলচেয়ারে, দেখে শান্তি পেলাম। বেচারার উপর দিয়ে কি ঝড়টাই না গেল। বের হয়ে গেলাম ছবির হাটে, সেখানে পুলক ও রাজীবদের আড্ডায় জয়েন। দুইটা ঘন্টা চলে গেলো এইসব নিম্ন মানের আড্ডায়। নয়টায় শাহবাগে এসে দেখি বাস রিকশা কিচ্ছু নাই। মনের দুঃখে তিনজনে হাটা দিলাম আল্লাহর নামে। হাঁটছি তো হাঁটছি পথ আর শেষ হয় না। পাক্কা এক ঘন্টা হেটে মোহাম্মদপুর আসলাম। রাস্তায় আমাদের মত অজস্র মানুষ হাটছে। সারাদিন বাসন্তী শাড়ি পড়া মেয়ে, যে হয়তো কতো আনন্দময় দিন কাটালো সেও বেকুবের মত হাটছে, কারন উপায় নাই বাসায় তো ফিরতে হবে। হাটতে হাটতে আমি কানে ধরলাম যে আর এই জীবনে কোন পাবলিকের গেঞ্জামের দিবসে মেলায় আসবো না। ভয়াবহ এক যন্ত্রনা~!





গত বছর এই পহেলা ফাল্গুনে বইমেলায় গেছিলাম। পারভীন আপা, মাসুম ভাই, আরো অনেকের সাথেই দেখা হলো । আর এই বছর পথে ভীড় দেখে মনে হয়েছে বড়জোর রিক্সায় ঘুরা যায়, লোকজনের ভীড় এমন কোথাও গেলে শুধু বিড়ম্বনাই বাড়বে ।

যা হোক, তরুণীদের সাথে দেখা হলো তাও ভালো ।
বইটা আমিও পড়া শুরু করব ।
জানি তো, আমি আবার সেদিন মেলায় যাই নাই!
শুরু করে দেন!
সুফিয়া কামালের কবিতাটা উচ্চ মাধ্যমিকে !।। আর বিরক্তি নিয়ে হাটার মধ্য একটা অসাধারণ অনুভূতি পাওয়া যায় ।
থ্যাঙ্কস আসল তথ্য জানানোর জন্য, বিরক্ত নিয়ে হাটতেও মজা আবার হাটা ছাড়া আর কিছু করার নেই এই মনে করেও হাটতে ভালো লাগে!
তোমার লেখা পড়তে ভাল লাগার একটা কারণ হইলো খুব সাবলীলভাবে অনেক কিছু তুলে ধর। কত কিছু উঠে আসে লেখায়!
আগের দিনগুলো মনে পড়লে খুব কষ্ট লাগে। সপ্তাহে অন্তত ৪ দিন কাটতো বইমেলা আর তার আশেপাশে, আর এখন সেই সুযোগ কোথায়!
কাল মেলা থেকে কয়েকটা বই কিনলাম কিন্তু পড়ার সুযোগ এখনো পাইনি।
থ্যাঙ্কস ভাইয়া, আমারও আপনার লেখা পড়তে ভালো লাগে!
অনন্ত জলিলের বইটা কিনে আইনেন
টেকা দেও রিকশা ভাড়া সহ কিনে দেই

থ্যাঙ্ক ইউ শান্ত। ছায়ামানুষের গানটা শুনেছি। খুব সুন্দর।
থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ
মোস্ট ওয়েলকাম ।। সুখে শান্তিতে থাকেন প্রিয়!
কর্পোরেট উৎপাদন ব্যবস্থায়, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, কর্পোরেট উৎপাদন সম্পর্কে একদিকে বুর্জোয়া মাস, অন্যদিকে ‘প্রলেতারিয়েত’ মাস, মাসভিত্তিক কাঠামোব্যবস্থার এ ব্যাখ্যাটা্ও অসাধারণ।
শুভেচ্ছা।
এইসব লেখালেখি ছাড়া তো কিছুই করার নাই!
থ্যাঙ্কস ভাইয়া, ভালো থাকেন
মন্তব্য করুন