চলে যায় বসন্তের দিন!
শেষমেষ ব্লগের শিরোনাম হুমায়ূন আহমেদের এক বইয়ের নাম থেকে মেরে দিলাম- এই বাকী ছিল মনে হয়। বইটা মনে হয় আমার পড়া ছিল আগে। আজ কোন স্টলে গিয়ে জানি দেখলাম বইটা, সাত বছর ধরে হুমায়ুন সাহেবের বই কিনি না মেলায়। আমার এক ক্লাসমেট বন্ধু আছে আবুল খায়েরে স্টিলের ইঞ্জিনিয়ার, সে কঠিন হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত। এখন আমার এইসব নাক সিটকানো দেখলে বলে উঠে নাইন টেনে তো সমানে গিলতি, এখন সমস্যা কি? আমি বলে উঠি জীবন তো আর নাইন টেনের কিশোর কালে থেমে নাই রে রাজু। নাইন টেনে আমি হুমায়ূন আহমেদের সাথে মানিক, তারাশংকর, রবীন্দ্রনাথ পড়ছি সমানে। সেই কথা কেউ মনে রাখে নাই। তখন আমার এক দুরের বন্ধু ছিল সে আমাকে বুদ্ধি দিলো মিলন পড়তে পারিস, মিলনের এমন বই ই দিলো যা পড়তে হয় লুকিয়ে। আমার সব বই ই আম্মু পাতা উল্টায় ও পড়ে হালকা পাতলা, যদি দেখে ফেলে তাহলে বিপদ, সেই যে মিলন পড়া বাদ গেল আর জীবনে পড়াই হয় না। বইমেলায় মিলনের বই দেখলে এখন একটু ইচ্ছা করে পাতা উল্টাই। দেখি আগের মতো কিছু আছে নাকি। হালের জনপ্রিয় লেখক সুমন্ত আসলাম কিংবা মোহিত কামালদের কোনো বইয়ের এক লাইনও পড়া হয় নাই। আজকে বিদ্যা প্রকাশে গিয়েছিলাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাত খন্ড প্রবন্ধের কত দাম তা জেনে আসতে, গিয়ে দেখি মজার কান্ড যারা ডাক্তার মোহিত কামালের অটোগ্রাফ নিবে তাদের খালি বই কিনলেই হবে না, নাম পেশা লিখে স্লিপে জমা দিতে হবে বইয়ের সাথে, তিনি ভেতরে বসে আয়েশে অটোগ্রাফ দিবেন। আমি মনে মনে ভাবলাম শালার কি জামানা আসলো!
আজ বইমেলায় গেলাম খুব আগে ভাগেই। কারন হলো বুয়া ছুটি নিয়েছে আসবে না তাই ভাবলাম চারটাতেই রওনা দেই। বাসা থেকে নামলাম, দেখি ৭০ টাকাতেই এক রিকশাওয়ালা টিএসসি যাবে। আমি তো ভাবলাম ভালোই তো, চায়ের দামে কফি। মঙ্গলবার বইমেলা যাইবার শ্রেষ্ঠ দিন। কারন ধানমন্ডী ও নিউমার্কেট বন্ধ, গেঞ্জাম কম। শা শা করে চলে গেলাম টিএসসি। নেমেই হাটা দেই হন হন করেই, আমি যখন হাটি তখন আশেপাশে খুব একটা খেয়াল করি না কখনো। আজ এক বন্ধু ডাকলো আমি খেয়াল করি নাই, সে মোবাইলে টেক্সট করলো কিরে বিসিএস ক্যাডার না হয়েই এত ভাব, আমি অবাক হয়ে ভাবলাম-- এখন কই গিয়া মরতাম! অবশ্য মিল আছে অঞ্জন দত্তের সাথে আমার। অঞ্জন দত্ত নাকি রাস্তায় চেনা পরিচিত মানুষ দেখলেও- খেয়ালই করে না। আমিও হয়তো তাই। অবশ্য লোকজনের সাথে দেখা করতেও আমার বিরক্ত লাগে ইদানিং তাই বিকেলের দিকেই মেলায় যাই। যেন কেউ খুব একটা দেখে না। গেলাম শুদ্ধস্বরে, তানবীরা আপুর বই তখনো আসে নি। বাসায় এসে জানলাম রাতে আসছে। আরেক বইয়ের খোজ নিলাম তাও নাই, কে জানি এসে ৫ কপি নিয়ে গেছে। আমি বললাম মাত্র ৫ কপি ই আনছেন? বলে ভাই মাঝে মধ্যে পাঁচ কপি বইও দুই দিনে একটাও সেল হয় না। আমি কি আর করার, নসীবে নাই তাই ফেরত আসলাম। জাকির তালুকদারের গল্প সমগ্র কিনলাম কারন দেখলাম দাম খুব একটা বেশী না কিন্তু চেনাজানা কিছু ভালো গল্প আছে। আনোয়ারা সৈয়দা হকেরও একটা বই কিনলাম এক বন্ধুর জন্যে। কথা প্রকাশ ভর্তি নানান জাতের লেখকের শ্রেষ্ট প্রবন্ধে। এইসব একটা বইও যত্ন নিয়ে করা না। তাও হয়তো এই বইগুলো কিনে কোনো লেখক সমন্ধে আগ্রহ বাড়তে পারে পাঠকের। প্রথমায় গেলাম ব্যাপক ভীড়। সবাই বলে ব্যাবসা করছে অন্য প্রকাশ। আমার দেখে মনে হয় প্রথমা। কারন এত অফট্রাক সব বই নিমিষে এত দাম দিয়ে কিনছে মানুষ, অবাক করা। আমিও কিনলাম পুলকের জন্য শুভ্রর লেখা টেন্ডুলকারকে নিয়ে লেখা বইটা আর এটিএম শামসুল হুদা আত্মজীবনীটা। এক পেইজ পড়লাম সেই আত্মজীবনীর খুব একটা ভালো লাগলো না। তবে ভালো লাগলো এক লোককে দেখে। পচাত্তরের উপর বয়স হবে, বুড়ো মানুষ। টেবিল স্ট্যান্ডের মত পায়া ওয়ালা লাঠি দিয়ে হাঁটে। তিনি লিস্ট এনেছেন তাঁর হাতের লেখাই। খালি মিলিয়ে মিলিয়ে খুজেন। আমাকে দেখতে দিয়ে বলে উঠলেন দেখো তো বাবা এই দোকানে নাকি? ভদ্রলোকের লেখা মুক্তার মত ঝকঝকে, আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম লেখার দিকে। প্রথমার এক সেলসম্যানকে। প্রথমার সেলসের ছেলে গুলো খুব ভালো। কেউ লেখক ধরে খুজতে আসলে প্রকাশনীর নাম বলে দেয়, জানা থাকলে স্টলে যাবার পথও দেখিয়ে দেয়। আমি আরো কিছুক্ষণ মেলায় ঘুরলাম,সেরকম আকর্ষনীয় বইয়ের বড় অভাব। তবে নওরোজ কিতবিস্তানে কাকাবাবু সমগ্র কিংবা শিব্রাম সমগ্র দেখে কিনতে মনে চাইলো। কিন্তু কেনা হলো না কারন একে সেমি পাইরেটেডে, দুইয়ে পড়ার সময় পাবো কিনা জানা নাই। অযথা কিশোর বয়সের আবেগে কিনে তো লাভ নাই। আদর্শ নামের এক প্রকাশনী তে এক লোক বসছে দাড়িওয়ালা, সে রীতিমত কাস্টমারদের চাপাচাপি করছে বই কিনতে। আমার পাশের এক মেয়েকে তো প্রায় বাধ্য করলো কিনতে কি এক কবির কবিতার বই। আমি অপেক্ষায় ছিলাম আমাকে কেন বলে না, বললো আমি পাল্টা ডায়লগ দিলাম-- 'আমি ভুষিখোর পাঠক না যে যা দেখাবেন তাই কিনবো। আপনে আপনার কাজ করেন। পছন্দ হলে আমি কিনবো আপনার ওকালতির দরকার নাই,' অনেকদিন পর ঝাড়ি দিয়ে বড়ই শান্তি পেলাম!
পুলক আসলো কোর্ট থেকে বই উপহার দিলাম। খুব খুশী সে, বলে ভাই আপনার বই কবে আসবে আমি একাই ৫০০ কপি কিনবো। আমি বলে উঠলাম লেখক হইবার খায়েশ এই জনমে নাই। সারাজীবন বই পাঠক হবার যে অন্তহীন সুখ, তা যারা হারায় তাঁরা বোকা শ্রেনীর লোক। ব্যাচেলর্স কোয়ার্টারের ওখানে কিছু এসিডিটির ফ্যাক্টরি খেলাম দুই বন্ধু মিলে। রাজীব আসলো, ছবির হাটে বসলাম কিছুক্ষণ। গুড় দিয়ে বানানো হিন্দি চুলের চা গিললাম। আমার তাড়াহুরায় ছবির হাট পর্ব তখনি শেষ হলো। রিকশা নিয়ে এক ঘন্টায় তিনজনে আসলাম মোহাম্মদপুরে। রিকশাওয়ালাটা দুর্দান্ত। মাগুরায় মামলা খেয়ে ঢাকায়, মাগুরা থাকতে টেম্পো চালাতো এখন ঢাকাতে রিকশা চালায়। মধ্যবয়স্ক পায়ে দারুণ শক্তি। সাই সাই করে চললো। চায়ের দোকানে বসেই আমাদের আজকের দাওয়াতে চলে গেলাম। আমি আবীর আর পুলক। সাবেক চায়ের দোকানদার নান্নুর প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। নান্নুর রান্না হাত সাঙ্ঘাতিক রকমের ভালো। খেলাম ব্যাপক। নান্নুর এক রুমের ঘরে বসেই। কি ঘর, এর চেয়ে আমাদের বাড়ীর রান্না ঘরও আরো বড়। তাও নাকি ভাড়া ৩০০০। নিম্নবিত্ত মানুষের আবাস সারি সারি রুমে। দেখে মায়াই লাগলো। তবে নান্নু এইসবরে থোরাই কেয়ার করে,যে খানাদানার আয়োজন করলো আমি শিউর ফ্ল্যাট বাড়ীর মালিকেরাও এত আইটেম দাওয়াতে করে না। ফেরার সময় নান্নুর হাতে ৫০০ টাকা গুজে দিলাম, পুলক দিলো ১০০০, আবীর ৫০০। কিছুতেই নিবে না। আমি বললাম চালান তো অটোরিকশা, সামনে হবে বন্ধ। রেখে দেন কাজে দিবে। তাও নাননুর ডায়লগ চলতে থাকে সমানে, মামা আপনারা তো বেকার মানুষ, আপনাদেরকে ভালোবাইসা খাওয়াই। আর আপনারা টাকা পয়সা আনেন অন্য লোকদের মত। আমি বলি মামা ওতো ভালোবাসা আমাদের জন্য না, আমরা সব ভন্ডের দল!





একটা কথা চরম সত্যি... আমাদের মত যারা নিম্ন বিত্তের লোক আছে তাদের পুরা ঘরই আপনাদের রান্না ঘরের সমান।
তেমার বই আসুক, ৫০০ কপি না কিনি, আশেপাশের লোকজনের জন্য কিনবো, দিয়ে বলবো .. আমাদের শান্তর বই

আর একটা কথা সবসময়ই বলি, এমনই থেকো । বিবাহবার্ষিকীতে গিয়ে কি দিলা সেটা বড় কথা না, গিয়ে লোকটাকে যে আনন্দ দিলা তার মূল্য হয় না
কথার কথা বললাম, আমার লেখক হবার কোনো খায়েশ নাই!
দোয়া করবেন আপু, সুস্থ থাকেন আপনিও!
খায়েস না থালেও তুমি তো লেখক। বড় হয়ে তোমার একটা বই আসুক এটা তো চাই। কারণ তোমার লেখা তো পছন্দ করি।
তানবীরা আপুর বইয়ের একটা রিভিউ দিয়ো।
চেষ্টা করবো ভাইয়া!
ভালো আছেন তো?
মন্তব্য করুন