হলপ্রিন্ট (১)
রিসেন্ট টাইমে সানি লিওনের এক সিনেমার উদ্ভট এক গান আছে, নেচে গেয়ে নায়িকা বলে যায় সেখানে যার বঙ্গানুবাদ হলো 'এই দুনিয়া পিতলের', তাই এই পিতলের দুনিয়ায় ক্রিকেটে হার জিতে আর কি হবে! আমি অবশ্য আজ খেলার আগে থেকেই জানতাম কেন জানি বাংলাদেশের জয় হবে না, কারন হংকং এর কাছ থেকে হারের পর থেকে আমার মন কেন জানি উঠে গেছে, টিটুয়েন্টির নাম শুনলেই জিদ উঠে যায়। লোকজনের মুখে গল্প শুনি, কত টানটান ম্যাচ ছিল তার বর্ণনা শুনি, পত্রিকায় টূকটাক দেখি খবর এতটুকুই আমার পার্টিসিপেশন এবারের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ব্যাপারে। আর মাঠে যাওয়া দুরের ব্যাপার, দেড়শো টাকার টিকেট ব্ল্যাকে পুলাপান বিক্রি করছে তিন চার হাজার টাকায়। আমি চিনি এমন অনেক ছেলেকে যারা মাঠে গিয়ে খেলা দেখে স্রেফ গার্লফ্রেন্ডের আবদার মেটাতে,ভাগ্যিস প্রেম পীরিতের বাজারে আমি নাই, থাকলে খেলা দেখাতাম কিভাবে? মানুষকে ঠেক দিয়ে টাকা আনতে হতো! মানি লোকের মান আল্লাহই রাখে!
আজ অবশ্য আমি খেলাধুলা কিংবা খেলার সমর্থক গোষ্ঠী নিয়ে ত্যানা প্যাচাইতে আসি নি। এসেছি গুটিকয় ভারত দেশের বাংলা সিনেমা নিয়ে গপসপ করতে। যা বেশীর ভাগই দেখা আমার বাজে প্রিন্ট কিংবা মোটামুটি চলনসই অবস্থায়। তবে সব গুলো সিনেমাই হল থেকে শুট করা। কোনোটা ভালো ভাবে শুট করছে যা দেখতে বেশী সমস্যা হয় না, কিছু আবার এমন অবস্থা দশ মিনিট দেখলেই মাথা ব্যাথা করে। তাও দেখেছি কারন ভেজাল ডিভিডি কিনে দেখার চেয়ে ইহা লাভজনক, দ্বিতীয়ত সবার আগে সিনেমা দেখা যায়। এই দুই লাভের গুড় পেতেই আমার বারোশো টাকা ত্রিশ জিবি নেই প্যাকেজ, ৫১২ কেবি স্পিডেতে। শেষ আর হয় না। ৬-৭ জিবি থেকে যায়। ২০০৭ সালে যখন নেট চালানো শুরু করি ভাইয়া আর ভাবীর বদান্যতায়, তখন ৮-১০ কেবিপিএস ছিল ১২০০ টাকা। আর এখনো সেই একই কোম্পানী নেট দেয় ১১০০ টাকায় ২ এম্বিপিএস স্পিড, আনলিমিটেড ইউজেস। পাঁচ ছয় বছরেই কত বদলে গেল চেনা জগত। আগে বিমা ভাই গানের পোষ্ট দিতো, ইস্নিপসে তা শুনতে গিয়ে ঘাম ছুটে যেত। আর এখন আমার মতো শান্তরা অনলাইনে সিনেমা দেখে, সারাদিন গোটা সত্তর আশিটা ইউটিউবে গান শুনে। শুকরিয়া জানাই দ্বিধাহীন ভাবে, কারন আমার আগে হায়েস্ট স্বপ্ন ছিল ইউটিউবে ভিডিও দেখবো বাফারিং ছাড়া, এখন এইচডি ভিডিও দেখা যায় চাইলেই!
প্রথমেই ভারত দেশের বাংলা ছবিতে আসি, 'চাদের পাহাড়' যে প্রিন্টটায় আমি সিনেমাটা হজম করেছি অনলাইনে, তা এইচডি না হলেও খারাপ না। সমস্যা খালি ইন্ডিয়ান হারবালের আজাইরা অশ্লীল আব্দারের এ্যাড, অনলাইনে বাংলা সিনেমা দেখতে বসলে তা আসবেই। কিচ্ছু করার নাই তাতে। 'চাঁদের পাহাড়' সিনেমাটা খুবই ভালো লাগছে আমার। পুরো সিনেমায় নায়ক দেব বাদে সবই মাইন্ডব্লোয়িং, আমাদের কথা ভেবেই পরিচালক দেবের মুখে ডায়লগ রেখেছেন কম। তবে দেবের অভিনয় তার সারাজীবনের সেরা হয়ে থাকবে। সিনেমাটার গল্প তো বিভুতিভুষন থেকে নেয়া, আমি পড়ি নি এইটা। এত বিভুতিভুষন পড়লাম জীবনে তাও এই জিনিস পড়া হলো না। আনন্দলোক ম্যাগাজিন মারফত জেনেছিলাম তিন দফায় সাউথ আফ্রিকার জংগলে এর শুটিং চলেছে, উইকি বলছে শুটিং চলাকালীন সময়ে কোনো প্রকার চিপস, সিগারেট, প্লাস্টিক দ্রব্যাদি এলাউড ছিল না, প্রানীদের বসতি থেকে মেলা দূরে সব লোকেশন সেট করতে হবে। দেবের এই সিনেমা উপলক্ষে প্রায় কোটি দশেকের লাইফ ইন্স্যুরেন্স ছিল, সিনেমারও বাজেট ১৫ কোটি। কলকাতায় ব্যাপক ব্যাবসা করছে সিনেমাটা। টানা সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলেছে, আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে ইংরেজী ভার্সন মুক্তি দিয়েছিল। সেখানেও ভালো চলেছে। কত হিন্দি সিনেমার সাথে টক্কর দিয়ে পশ্চিম বাংলায় এই সিনেমাই ছিল টপে। কমলেশ্বর মুখার্জীকে 'মেঘে ঢাকা তারা' থেকেই ভালো লাগে। এই সিনেমার তার ডিরেকশন অনবদ্য। হিন্দি সিনেমা ফেইল। পুরোই হলিউড মানের। দেখতে বসলে থ্রিল এসে যায় মনে।
চাঁদের পাহাড়ের মত না হলেও সৃজিতের 'জাতিস্মর' মুভিটাকেও ফেলে দেয়া যাবে না। এন্টনি ফিরিঙ্গির সাথে এই সময়ের এক গল্প মিলিয়ে দারুন এক মুভি। আমি বাজে প্রিন্টে এই সিনেমা হজম করেছি, তাও আমাকে সব ভুলিয়ে দিয়েছে এর স্টোরি লাইন। এই সিনেমার গান তো কবীর সুমনের মিউজিক ডিরেকশনে, অসাধারণ এই গান গুলো ভালো লাগার শীর্ষে ছিল আগেই। সিনেমাটাও মনে ধরেছে। এই সিনেমার জন্য আমি প্রসেনজিতকে ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড দিতেও কার্পণ্য করবো না। সেটা গত জন্মের এন্টনি ফিরিঙ্গির চরিত্রের জন্য না। এই জন্মের কুশল হাজরা, সিনেমায় যে সামান্য লাইব্রেরীয়ান সেই চরিত্রে সে বিষ্ময়কর অভিনয় করেছেন সেই জন্য। নিজেকে একজন কমার্শিয়াল নায়ক- চাইলে কিভাবে ভাঙ্গতে পারে তার সাক্ষাৎ প্রমান এই সিনেমা। আমি প্রসেনজিতের ডেডিকেশন দেখে খুব অবাক। যিশু, স্বস্তিকা, আবীর এদের অভিনয়ও খারাপ হয় নি। এই সিনেমা অলরেডী রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রদর্শন করেছেন প্রযোজকেরা, ব্যাবসাও করেছে ভালো,সমালোচকদের দৃষ্টিতেও প্রশংসিত। তবে এর জন্য অবদান তিন জনেরই, প্রসেনজিত, সৃজিত আর কবীর সুমন। জাতিস্মর গানটাই তো খুব বিখ্যাত গান, সেই গানের আলোকেই দুই সময়কে এক সাথে বেঁধে ভালো একটা সিনেমা। বিশেষ করে কবির লড়াইয়ে্র গান গুলোতে কবীর সুমন দেখিয়েছেন কেন তিনি এত অসাধারণ। এই সিনেমার প্রমোশনে সৃজিত একটা চ্যানেলে বলেছিল ' যে কবীর সুমন সকাল বেলা দাত ব্রাশ করার ফাকে যে লাইন গুলো লিখে বিনে ফালান, তা অন্য কোনো মানুষ এক জীবনেও লিখে না'।
আরেকটা সিনেমা দেখলাম দুদিন আগে, 'যদি লাভ দিলে না প্রানে'। অত্যন্ত বাজে প্রিন্ট, বেশীর ভাগ ডায়লগই আন্দাজ করে করে শুনেছি। ভালো লাগে নাই সিনেমাটা। সম্ভাবনা ছিল ভালো হবার, কিন্তু পরিচালকের বেশী ড্রামায় তা মাঠে মারা গেছে। যদিও অনন্যা আবীরের অভিনয় সবসময়ই ভালো হয়, এই যাত্রায় তাতে আর রক্ষে হলো না। আরেকটা সিনেমা দেখলাম রোমান্টিক কমেডি ধাচের, নাম 'বিয়ে নট আউট'। অনেকটা বিটিভির শনিবারের নাটকের মতো। যে নায়ক নায়িকা বিবাহিত, সারা নাটকের শুরুতেই সমস্যা, নাটক জুড়ে ছাড়াছাড়ি, শেষে মধুর মিলন। টোটা রায় আর ঋতুপর্না অভিনীত। কিছুটা 'সাদী কা সাইড এফেক্ট' স্টাইলেই, কিন্তু সেরকম না। সারা সিনেমায় ভালো অভিনয় করেছে মুলত টোটা রায় আর তার মেয়ের ভুমিকায় যে বাচ্চাটা অভিনয় করেছে সে। গল্পের ভেতরে তেমন আকর্ষন নাই, কিন্তু ডায়লগে কিছু হাসি আসে। তবে সুদেষ্ণা রায় আর অভিজিৎ গুহ আরো ভালো মেকার, শেষের দিকে কমেডি ঢুকাতে গিয়ে আরো বেশী লেভেন্ডিস হয়েছে সিনেমাটা। শেষ সিনেমা কিছু অংশ দেখেছিলাম আল মাহমুদের গল্প 'জলবেশ্যা' নিয়ে বানানো বলে। তবে সেই সিনেমা যার নাম 'টান' তা আমাকে টানে নি। আর ইদানিং ঋতুপর্নাকে সহ্যই হয় না সিনেমায়। নামেই আল মাহমুদ কামে আজাইরা একটা মুভি। আমার ধারনা এই সিনেমার নাচ গান কিছু সিন দেখলে আল মাহমুদের জামাতি মন এখনই হার্ট এটাক করবে। আরেকটা সিনেমা নাম 'ফড়িং' তা দেখা হয় নাই সময়ের অভাবে। আর ভারত দেশের হিন্দি সিনেমা সাম্প্রতিক দেখা হলপ্রিন্ট নিয়ে আরেকদিন বসবো।





টি টুয়েন্টি মন হৈতাসে আসলেই আমাদের জিনিস না, এটার হুজুগে পইড়া ওয়ানডেটা যেন শেষ না হৈয়া যায় সেই দোয়াই করি।
চাঁদের পাহাড় আর জাতিস্বর দেখবো ভালো প্রিন্ট পেলে। নেক্সট পার্টের অপেক্ষায় থাকলাম। ভালো থাকেন।
ওকে
"এই সিনেমার জন্য আমি প্রসেনজিতকে ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড দিতেও কার্পণ্য করবো না। সেটা গত জন্মের এন্টনি ফিরিঙ্গির চরিত্রের জন্য না। এই জন্মের কুশল হাজরা, সিনেমায় যে সামান্য লাইব্রেরীয়ান সেই চরিত্রে সে বিষ্ময়কর অভিনয় করেছেন সেই জন্য" ..................
পুরা একমত, আমি যতই দেখছিলাম, ততই ভাবছিলাম অবাক হয়ে যে এমন দুর্দান্ত অভিনয় মানুষ করে কীভাবে ...... ২২ শে শ্রাবণেও প্রসেনজিত দুর্দান্ত ছিলো, কিন্তু এখানে উনি নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন ...... অবাক হয়ে দেখা ছাড়া কোনই উপায় নাই!
হল-প্রিন্ট দেখার মতও ঝামেলা আর কিছুই নাই, আমি মোটামুটি তা বাতিলের খাতায় ফেলে দিছি , হল-প্রিন্ট এর উপর ডিভিডি প্রিন্ট মারার পর তাও কিছুটা দেখার যোগ্য হয় এবং তখনই কেবল আমি দেখার সাহস করি , নাহলে না!
হলপ্রিন্ট মানে আসলে সেই মাস্টার প্রিন্টই যা ডিভিডি বলে চালিয়ে দেয়। আমি তো ডাউনলোড করে দেখি না, অনলাইনে যা পাই কম বেশী তাই দেখি সময় করে।
থ্যাঙ্কস ভাইয়া। বেষ্ট অফ লাক!
!



চাঁদের পাহাড় ,জাতিস্বর দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে, কিন্তু আমার যে নেট লাইন!!! গরীবের ডিভিডি কিনেই দেখা লাগে
কি দারুণ করে লিখো দেখা সিনেমাগুলির কথা! তুমি সত্যি গ্রেট
দেখি কারো কাছে ভালো প্রিন্ট পেলে পেনড্রাইভে দিবো নি আপনাকে!
কি আছে জীবনে? আজ না হয় সিনেমাই দেখব। প্রথমেই ফড়িং।
বাহ ভালো তো!
ঘুষের পয়সা কী ঠ্যাকের পয়সা নয়
অসাধারণ লেখা হয়েছে। সিনেমার নামগুলো নোট করে রাখলাম। মুচমুচে লেখাটা পড়ে সকাল সকাল মনটা তাজা হয়ে গেলো
প্রশংসায় ভেসে গেলাম!
মন্তব্য করুন