দ্রুতগামী সময়, মায়ার খেলা!
অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু লিখবো লিখবো করেও আর হয়ে উঠে না। আর যখন লেখার জন্য বসি তখন মনে হয় জমে থাক কথা, সব লিখে লাভ কি। কিন্তু আজ আমি লিখবোই। একটা বিশাল পোষ্ট লেখার ইচ্ছে। কারন আমার কত বন্ধু আছে যারা এক লেখাই সাতদিন ধরে লিখে, ড্রাফট করে, শেষে আর লেখাটা ব্লগে তো থাক কোথাও আলোর মুখ দেখে না। আমি অবশ্য সেরকম না। আমি তাৎক্ষনিক স্বকীয়তায় বিশ্বাসী। যা যখন ভাবি, তাই নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করে। সেই ভাবনা শেষ, লেখার তেমন ইচ্ছেও থাকে না। তবে এখন সেই অবস্থার সামান্য চেঞ্জ আনার চেষ্টায় আছি, কিছু লেখার বিষয় জমিয়ে রেখে, এক সাথে এক পোষ্টে তা লিখে দেয়া। দেখা যাক কত দূর কি হয়!
অভি চলে গেল। আমি বিদায় দিতে যাই নি এয়ারপোর্ট, খুব ধরেছিল যেন- যাই। আমি আমার একমাত্র ভাইয়া ভাবীকেই বিদায় দিতে যাই না কখনো আর অভিকে তো আরো না। মুহুর্মুহু অনুরোধ, আবির আর পুলক যাবে, তন্ময় গাড়ী নিবে। কোনো সমস্যা নাই চলেন, শান্ত ভাই। আমি গেলাম না। আমি গেলাম পারভীন আপুর বাসায়, আড্ডা মারলাম, জ্যোতি আপু আসলো, অদিতি আপু আসলো, আড্ডার আনন্দে কিছু সময় মন ভালো ছিল, যখন রিকশা খুজছি তখন মনে হলো হেঁটে যাই, আর হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো ইশ! আমার আড্ডার ছোটভাই কুয়ালালামপুর চলে যাচ্ছে আজ একটুপর। দুপুরেই বিদায় নিতে আসছিলো অভি। বিদায় দিলাম, শেষ হ্যান্ডশেক করার সময় চোখটা ছলছল করে উঠলো। পরিস্থিতি দ্রুত সামলে উঠতে আমি রিকশায় তাড়াতাড়ি বিদায় নিলাম। কারন খামাখা কেঁদে কেটে ছেলেটাকে কষ্ট দেয়ার মানে নাই। আবির, পুলকরা এয়ারপোর্টে গিয়েছে- তাঁদেরও কি কান্না, বিদায় দিয়ে এসে সবার মন খারাপ। মায়া লাগে ছেলেটার জন্য। এরকম ছেলে লাখে পাওয়া যায় না। আমার চেয়ে বছর তিনেক ছোট, কিন্তু জীবনকে সে দেখে আমার চেয়েও অনেক অন্য ভাবে। একটা ভালো প্রাইভেট ইউনিতে পড়তো, প্রায় শেষ যখন তখন ওর মনে হলো পড়াশুনা করে কি হবে, বিয়ে করি, নিজের বাসায় প্রেশার দিয়ে বিয়ে করে ফেললো, বান্ধবীকে। বিয়ে করার পরে মানুষ নাকি সিরিয়াস হয়, অভি আরো নির্ভার হয়েছে। সমানে ফুটবল খেলা, রাত জেগে খেলা দেখা, আড্ডাবাজি, সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়ানো কি না করলো এই সময়ে। অভির সাথে আমার পরিচয় সেই বিয়ের সময়ই, অনিকের বন্ধু হিসেবে। তবে আমার অভিকে ভালো লাগলো, আমাদের হয়ে এক ক্রিকেট ম্যাচে নেমেই দুটো ছক্কা মেরে ম্যাচ জিতিয়ে দিলো। আর ডায়লগ দিলো, 'খেলনে কি লিয়ে দাম চাহিয়ে'। আর অভির ফুটবল খেলা তো আরো মনমুগ্ধকর। মাঠে ডাইভ দেয়, সারা মাঠজুড়ে দৌড়ে বেড়ায়, জান প্রান সব দিয়ে খেলে, একটা গোল যদি দিতে পারে সেই খুশিতে কত কি যে করে। খেলার জন্য ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, সাভার কত জায়গায় চলে যায়। আর ব্যাডমিন্টনে নিয়ে ওর ওতো উচ্ছাস নাই, তাও যতটুকু খেলা আমার মনে হয় মোহাম্মদপুরে এমেচারদের ভিতরে তাঁর চেয়ে ভালো খেলে এমন লোক খুব বেশি নাই। এইসব তো গেল খেলাধুলা। আড্ডায় ওর কথা শোনা কত আনন্দের তা খুব কম লোকই জানে। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও মজার গল্প ওর মুখ থেকে শোনা তা যে কাউকেই যখন বলি, হাসতে হাসতে লুটিয়ে যায়। মানুষকে আপন করার যে ক্ষমতা তাঁর তা মারাত্মক। যেইসব সন্ধ্যায় অভি আসবে, আমাদের হাসতে হাসতে চাপা ব্যাথা করবে। অভি জার্মানীর জন্য ট্রাই করছিলো উচ্চশিক্ষায়, ভিসা পায় নাই। মালোশিয়াতেই তাই একরকম নিশ্চিত ছিল। তবে আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, বিশ্বাসই হয় নাই যে অভি কোনোদিন বিদেশ যাবে। একটা ভালো ইউনিভার্সিটিতে যখন এডমিশন নিয়ে নিলো, তখন মনে হলো অভি তাহলে যাচ্ছেই। আমাদের জন্য যাত্রা ১১ দিন পিছিয়ে দিলো। তাও সময় তো চলেই যায়, তাই এসে গেল ৭ জানুয়ারী অভির যাওয়ার সময়। আড্ডায় কত মানুষ আসে যায়, কত বন্ধু হারিয়ে যায়, কিন্তু আমার সাম্প্রতিক সময়ে এত মন খারাপ কখনো হয় নাই। শুধু আমার না, আমি- আবির পুলক তিনজনেরই ব্যাপক কষ্ট লাগছে। পুলক তো ওকে বিদায় দেয়ার জন্য জীবনের ঝুকি নিয়ে অবরোধের মধ্যে ছোট্ট পিকআপে করে রাজবাড়ী থেকে ফেরী ঘাট আসছে। সেখান থেকে মুড়ির টিন বাসে এলাকায় এসেই নিজের বাসায় না ঢূকে অভির বাসায় যাওয়া। অভি বিদেশে যাওয়ার মত লোকই না। শুধু মাত্র ফ্যামিলী প্রেশারে ওর এই বিদেশ যাত্রা। সেখানে এখন প্রত্যেক সকালে মুড়ি আর চা খায়। আর আমাকে জানায় ফেসবুকে, 'শান্ত ভাই বলছিলেন মুড়ি খাইতে- খাচ্ছি ভাই সমানে। আমি আইসা পড়বো ভাই, ভালো লাগে না এই বালের জায়গায়;। আমার চোখ বেয়ে না চাইতেই পানি এসে যায়। আহারে ছেলেটা, আমাদেরকেই যদি এত মিস করে, তাহলে ওর বউকে না কত মিস করতেছে। সেই মেয়েটাও এক অসাধারণ মেয়ে, অভি যে কেয়ার লেস, খেলাধুলা আর আড্ডা মেরে বেড়ায় কিছুই বলে না। বলতো শুধু সবাই তো একরকম মানুষ না, অভি অসাধারণ। অভি এই নিয়ে আমার সাথে কত মশকারি করতো, শান্ত ভাই এমবিএ করে কি হয়, বউ এর সনদপত্রই আসল, আপনারা কি করলেন জীবনে? অভির ভাগ্নেরাও ওর ব্যাপক ফ্যান, ছোটজন তো ব্যাগ গুছিয়ে সাথে করে এয়ারপোর্ট গেল, ডায়লগ একটাই- আমি মামার সাথে যাবো। মামা যা খাবে তাই খাবো। অভি যেয়েই সেখানে একটা পার্টটাইম ইভেন্টে জব করে কাল ১০০ রিংগিত কামিয়েছে। মেসেজ দিয়ে জানালো, শান্ত ভাই আপনারে এইটাকা দিয়ে আল্লাহরদানে মোরগ পোলাও খাওয়াতে পারলে কি যে শান্তি পেতাম। কথাটা শুনে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়। পিসির সামনে বসে আশাবাদী হই, যাক সময়ের ব্যবধানে আশা করি সব ঠিক হবে।
অভির কিছু ডায়লগ যা এখনো কানে বাজে অবিরাম--
১। কাভি নেহি, কাভি নেহি
২। পেয়সা কি কামি নেহি হে
৩। টাকা গেলে যাক, খেলা সুন্দর হোক
৪____ বারেক(গালি)
৫।ব্যাপারটা কি? জিনিসটা আগে বুঝতে হবে
৬। ভাই অর্ডার করেন শুধু
৭। বাস্তব অবস্থা ও সেই সময়ের পরিস্থিতি অনুকুলে না থাকার দরুন
৮। টিয়া তো টিয়াই, টেকা পয়সা তো চামার মুচিও কামায়!
বন্ধুর বউভাত ছিল নয় তারিখে। ইচ্ছে ছিল না যাবার। তাও আবিরের জোর লবিংয়ে গেলাম, কিন্তু যাবো কিসে সায়দাবাদ থেকে বাস সব বন্ধ। তাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাওয়া। সকালে বাসা থেকে সিএঞ্জিতে সায়দাবাদ। সেখান থেকে বাসে করে কুমিল্লা ক্যান্টর্মেন্ট, সেখান থেকে সিএঞ্জিতে বিশ্বরোড, তারপর আরেক সিএঞ্জিতে লাকসাম, লাকসাম থেকে সিএঞ্জিতে সোনাইমুড়ি, সোনাইমুড়ি থেকে রিকশায় চৌমুহুনী, সেখান থেকে ইঞ্জিন রিকশায় সেনবাগ, সেনবাগে বন্ধুর বাড়ী। মোটামুটি জানে পানি নাই। সন্ধ্যায় বাড়ীতে আসছি, ১০ ঘন্টা লাগছে। নোয়াখালী অঞ্চলে যে হরতাল হয় তাঁর তুলনা হয় না। সিএঞ্জি নাই রাস্তায়, মানুষ নাই একটা, পুরো রাস্তা জুড়ে খালি গাড়ীর কাচ পড়ে আছে। আমাদের চোখের সামনে একটা নোয়া মাইক্রো গাছের ডাল দিয়ে মেরে পুরা ছাতু বানালো। সাধারণ সব মানুষ জন, হাতে অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে, আমাদের রিকশাওয়ালাকে মারলো এক ধমক, বেচারা সেই ধমক শুনে মনে হলো রিকশা চালানোই ভুলে গেছে। পুরো রাস্তা এত নীরব মনে হলো কারফিউ। বিএনপির উচিত নোয়াখালীতে তাঁদের হেড অফিস খোলা। রাস্তায় পুরো ছাত্রদলের ছেলেরা। তারা বাইক দিয়ে টহল দেয়, বিয়ের গাড়ী কিংবা এম্বুলেন্স- এ ছাড়া কারো ক্ষমা নাই। হয় আগুন নয় ছাতু। এরকম কড়া হরতাল মনে হয় বিএনপিও স্বপ্ন দেখে না। যাই হোক গেলাম প্রথম রাজুর বাসায়। ওদের পুরো বংশ আমাদের কাজ দেখে টাস্কিত, কি ভাবে আসলাম তা বিস্তারিত বর্ণনা করলাম। সেমি শহর সেমি গ্রাম, খারাপ না। সুন্দর জায়গা। সবুজ গাছপালা আর ক্ষেত খামার, তাঁর ভেতরে দালান বাড়ী। কেউ থাকে সাউথ আফ্রিকা, কেউ ইতালি, কেউ পর্তুগাল। বন্ধুর বড় ভাইকে প্রথম দেখলাম, কঠিন বিএনপি করে, বন্ধুর জেঠা আসলো তিনি হায়রে ভুলবাল বকে। সব শুনে গেলাম। একটা কংক্রিটের পুল আছে সেখানে বসে থাকি। শীতের বাতাস, অন্ধকার সব কিছু, দারুন অনুভুতি। সকালে ঘুম থেকে উঠলাম, ভোরে। বের হয়ে দেখি খুব চমৎকার এক অঞ্চল পিছনে। অনেক জমিতেই বউ নিয়ে কাজ করতেছে স্বামী। নোয়াখালী নাকি রক্ষণশীল কে বলে? বন্ধুর বউ বলে, এত কথা কেমনে বলো তোমরা? মেয়েরাও এত কথা বলে না। বন্ধুটি বললো এখন তো কমছে, ইন্টারমিডিয়েট এক্সামের পর আমাদের গল্পে বিরক্ত হতো না এমন কেউ নাই। সেই নাস্তা করলাম। বারোটায় বের হলাম। বাইকে করে আমাদের দুজনকে সোনাইমুড়ি পৌঁছে দিলো এক ছেলে। তারপর সিএঞ্জিতে আবিরের নানা বাড়ী, সেখানকার বন্ধুদের সাথে আবীরের আলাপ,আমার চুপচাপ বসে থাকা। কুমিল্লা থেকে সাড়ে পাঁচটার বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়া, আটটায় নামলাম যাত্রাবাড়ী। সেখান থেকে সিএঞ্জিতে চায়ের দোকানে নয়টায়। দশটা পর্যন্ত আড্ডা মেরে বাসায় আগমন। বুয়া আসে নাই। মামা রান্না করলো খিচুরী আর ডিমভাজি। ব্যাপক ভালো রান্না ছিল। দিলাম খাওয়া আর ভাবলাম- বছর যায় বছর আসে/ এই শহরে মামার চেয়ে কে আর আমায় বেশী ভালো ভাসে?





বরাবরের মত এবারো ভাল লাগছে
আপনার ঢাকা থেকে ভেঙে ভেঙে যাওয়ার কাহিনী দেখে আমার ঢাকা থেকে জার্মানি যাওয়ার কথা মনে পড়ে গেল।
প্রথমে বাসা থেকে গাড়ীতে করে এয়ারপোর্ট, সেখান থেকে ফ্লাইটে পাকিস্তানের করাচি, এক ঘণ্টা অবস্থানের পর সেখান থেকে তুর্কিস্তানের ইস্তানবুলে ফ্লাইট বদল, সেখান থেকে জার্মানির স্টুটগার্ট এবং অবশেষে সেখান থেকে ট্যাক্সিতে হোস্টেল। আপনার লেগেছে ১০ ঘণ্টা আর আমার ২০ এই যা
আপনি তো পুরো দুনিয়ার এ মাথা থেকে আরেক মাথায় গিয়েছেন। তার তুলনায় আমার জার্নি অতি সামান্য?
বরাবরের মতোই আরাম লাগলো পড়ে
বন্ধু আর তার বউ জীবনে এই সারপ্রাইজ ভুলবে না
ভালো পোলাপাইন সব বিদেশ চইলা যায়, বড়ই খারাপ ব্যাপার।
আপনেরে এত অনিয়মিত দেখলে ভালো লাগে না, ব্লগের আমরা আমরা ফিলিংটা পুরাপুরি আসে না..
সামনে থেকেই আরো নিয়মিত হবো এই আশাবাদ জানিয়ে রাখলাম।
তুমি আমারেও মুড়ি খাইতে কইছিলা বেশ কয়েকবার কিন্তু মুড়ি পাই নাই আশে-পাশে তবে মাঝে মাঝে খালি তেল- পেয়াঁজ-কাঁচামরিচ দিয়ে চানাচুর খাইতে সেইরাম লাগে
নোয়াখালী যাইতে এতো কষ্ট? আফসুস
খালি আপনারে না অনেকরেই কইছি। তাঁদের ভেতরে কেউ কেউ মুড়ি খেতে ভালোবাসে।
কষ্ট তো কষ্ট, সাথে জীবনের ঝুকি!
মন্তব্য করুন