বিদায়, হে খেয়ালী জাদুকর..

আজ দুপুরের কড়া রোদ্দুরে একটু বৃষ্টি ভিজে,
অনেক অনেক প্রিয় লেখার একজন লেখক কে চির বিদায় জানিয়ে এলাম।
বলছি, আমাদের হুমায়ূন স্যারের কথা।
৪ দিন হয়েছে মাত্র, স্যার নেই। মনে হচ্ছে বিষাদের দিনলিপিতে স্তদ্ধ সময়ের বোবা সঙ্গী হয়ে গেছে পুরা দেশটা। অনেকেই হয়তো, যে যার মত করে ব্যাস্ত। তবুও অদ্ভুত বিষণ্ণতা ঘেরা অস্থিরতায় ঢেকে আছে একেকটা মন।
কিছুই ভাল লাগছে না। কি কি যেন লেখব বলে ভেবেছিলাম, ভুলে গেছি।
সব দুঃখ হয়তো বলে বোঝানো যায় না, বোঝাতে নেই।
গতকাল সকাল থেকেই লোকে লোকারণ্য শহীদ মিনার চত্বর, স্যার কে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন।
আমি যাইনি। বলা ভাল যেতে পারিনি। অথবা, এভাবে তাকে দেখতে যেতে ইচ্ছে করে নি।
এই মানুষটার যে চেহারা তার বই পড়ে পড়ে গড়ে উঠেছে, নয় তাই জমা থাক স্মৃতির করিডোরে।
তার জানাজা পড়ে এসেছি অবশ্য, তার লাখো ভক্তের সাথে দাড়িয়ে একসাথে দোয়া পাঠানো ছাড়া কিছুই তো বাকি ছিল না আর। সেখানেও কিছু মানুষের বক্রোক্তি শুনে আসতে হল, আজব দুনিয়া!
মানুষ যখন ছিলেন, অনেক অনেক গুনের সাথে কিছু দোষ ও যে থাকবে এমনটাই স্বাভাবিক।
তাই বলে শেষ বিদায়ের সময়টুকুতেও একটু ছাড় পেতে পারে না মানুষ টা?!
আর এতই যাদের শ্লেষ তারা ওখানে যায়ই বা কেন সেটাই বুঝলাম না!
কিছু ফটোসাংবাদিকের দিকে প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হয়েছে আজ। একটা মানুষ যে মারা গেছেন, একটা নুন্যতম সম্মান যে তার একান্ত প্রাপ্য। সে বোধটুকু পর্যন্ত তাদের নেই। যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল মঞ্চের উপর, ভেঙে পড়লেও কিছুই করার থাকতো না!
আর আমাদের শ্রদ্ধেয় আইনজীবীরা; এলাকার রাজা তারা। সবার সামনে না দাঁড়ালে কি আদের ইজ্জত থাকে?! তাই, একেবারে সামনে - এমনকি স্যারের মৃতদেহকে পিছনে ফেলেই লাইন করে নিলেন!
হুহ্! কি বলব ওঁদের?! কিছুই বলার নেই আর!
এই মুহূর্তে বারডেমের হিমঘরে ঘুমিয়ে আছেন খেয়ালী জাদুকর।
আর ঘণ্টাকয়েকের মাঝে কোন এক সময়ে তার শেষ যাত্রাপথের শুরু, অন্তিম শয়ান।
ভাবতেই অবাক লাগে!
যতদিন আছি এই দুনিয়ায়, প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই কি অদ্ভুত ভাবেই না জড়িয়ে ছিলেন তিনি!
জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি, বাসার সবাই একটু সময় করতে পারলেই বই এর ভেতর ডুব দিয়ে থাকে। আমি আর তার ব্যতিক্রম হই কি করে?! আমারও সেই পিচ্চিবেলা থেকেই বইপোকা হবার শুরু।
ছোটখাটো বই কতই পেয়েছি তখন, কিন্তু গিফট পাওয়া আমার প্রথম হার্ডকভার বই ছিল 'নীল হাতি'। লেখক আর কে, হুমায়ূন আহমেদ।
আমার ছেলেবেলা কেটেছে নানাবাসায়। নানা ছিলেন সাহিত্যিক। অনেকেই দেখা করতে আসতেন নানার সাথে। তেমনি একদিন, ২০ই এপ্রিল ১৯৯৫। আমি তখন পড়ি ক্লাস টু-তে। সন্ধ্যার পর হঠাৎ দেখি আমাদের বাসায় হাজির স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদ। কি অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
উনি কথা বললেন সবার সাথে। সারাটা সন্ধ্যা। সাথে একটার পর একটা সিগারেট, পুরোটা সময়।
চেইন স্মোকার কি এই জিনিস টা বোধহয় ওইদিন ই প্রথম জানা হয়।
আমি আর কি করব, নানার কাছ ঘেঁষে দাড়িয়ে ছিলাম, উনাকে দেখছিলাম। কি মজা করে কথা বলেন।
এত্ত বড় একজন লেখক আমাদের নিজের বাসায়, ভাবতেই তো কেমন লাগে!
সাহস ছিল না বেশি, এক আধটু কথা বলেছিলাম হয়তো। আর ওই সময়ে হাতের কাছে থাকা দুটি বই 'পুতুল' আর 'নুহাশ এবং আলাদিনের আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ', সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে সেই ম্যাজিকাল মোমেন্টগুলার।
বেড়ে উঠার সাথে সাথে পরে আরও পড়া হয়, 'বোতল ভূত', 'একী কাণ্ড', 'পিপলী বেগম'। আরও কিছু গল্পের বই পার হতেই 'সূর্যের দিন'। ওই সময় গুলোতে এরকম বই পড়তে পাওয়ার আনন্দ বলে বোঝানোর ভাষা আমার আজও শেখা হয়নি।
ততদিনে নুহাশ,বিপাশা, নোভা, শীলা সবাই বড় হয়ে গেছে। এজন্যই হয়ত তিনিও ছোটদের জন্য লেখা বন্ধ করে দিলেন। আমি আর কি, কয়েক দিন পরেই তারই ছোট ভাই জাফর ইকবালের লেখায় ডুবতে শুরু করলাম। কিশোর উপন্যাস আর সাইন্স ফিকশন যাই পড়ি তাই ভাল লাগে। সেখান থেকেই আবার তার লেখা সাইন্স ফিকশন গুলাও পড়া হয়ে গেল। আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়, উনার কাছে আরও কিছু সাইন্স ফিকশন পাওনাই রয়ে গেল।
দিন যায়, পরিচয় হয় হিমু - শুভ্র - মিসির আলির সাথে। পড়তে থাকি, মিস হয় না কোনটাই।
আরেকটু বড় হই, আর কোন বাধানিষেধ নাই। খুঁজে বের করে কিনি আর পড়ি; 'এইসব দিনরাত্রি', 'কোথাও কেউ নেই', 'বহুব্রীহি'। অবাক হয়ে ভাবি, এমন করে কেউ কিভাবে লেখে। এই ইচ্ছা হল হাসাইতেছে, এই আবার চোখের কোণে জল টলমল। প্রত্যেকটা বই এর একেকটা চরিত্র এত্ত চেন লাগে, সবাই মনে হয় আমার আশেপাশেই থাকে। কি অসাধারণ মায়াময় একেকটা লেখা।
পড়ি; 'কবি', 'রুমালি', 'মেঘ বলেছে যাব যাব' আরও কত কি! যা-ই পাই তা-ই গিলি!
একবার ধরলে পড়া না শেষ করে আর উঠার উপায় নেই, লেখার কি নেশা।
সিনেমাও দেখি। 'আগুনের পরশমণি', একবার- দুইবার- আরও অনেকবার। একইরকম মুগ্ধ করে।
জীবনে প্রথমবারের মত সিনেমাহলে যাই সিনেমা দেখতে, বাসার সবার সাথে। আবারঅ সেই হুমায়ূন আহমেদ। 'শ্রাবণ মেঘের দিনে' - একেকটা গান শুনি, গলার কাছটা ভারী হয়ে আসে - চোখে হয়তো ধূলাও পড়ে দুএকটা। আর নয়তো, চোখের পাতা ভিজে আসবে কেন?! দেখি 'দুই দুয়ারি'- মনে হয়, এই তো আমাদের দেশের সিনেমা আবার পুরানো দিনের সৌরভ ফিরে পাচ্ছে! মন ভাল হয়ে যায়।
মনে পরে যায়। সেই ছোট্ট বেলা থেকে। বাসার সবাই মিলে দেখা কত শত নাটক। 'এইসব দিনরাত্রি', 'কোথাও কেউ নেই' আর 'আজ রবিবার'। এক অসাধারণ সময়ের প্রতিচ্ছবি। আবার ঈদ মানেই হুমায়ূন আহমেদের নাটক। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিয়ে যদি পেট ব্যাথাই না করে তাহলে আবার কিসের কি?!
ভাঁড়ামি ছাড়াও যে মানুষকে হাসানো যায়, বাঙ্গালি জীবনে সে আসার আগে কে জানতো?!
সময়ের চাকা গড়াতে থাকে। তার নাটকগুলোও একই রকম হতে থাকে। হয়তো একটু বিরক্তি, আস্তে আস্তে দেখা বন্ধ। আজ অবাক হয়ে দেখছি; এত্ত চ্যনেলের ভিড়ে কত ঈদ চলে যায় একটা নাটক তো নাটক টিভি-ই দেখা হয় না। হয়তো, সেই হুমায়ূন আহমেদের নাটক নেই বলেই! কে জানে!
দিন যায়। প্রতিবছরই নতুন নতুন বই বের হয়। আগের সেই ম্যাজিকটা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
মনে হয়, তার ব্যাক্তিজীবনের নানান পট পরিবর্তনেই হয়তো এই অবস্থা। আস্তে আস্তে তার বই কিনে পড়া কমে আসে, ঈদসংখ্যাগুলোতেই পড়া হয়ে যায়। মনে হয়, এবারই শেষ- আর হয়তো পড়া হবে না।
তবুও পড়া হয়- আশা রয়েই যায়। প্রতিদানও মিলে; 'কে কথা কয়', 'হিমু মামা','জোছনা ও জননীর গল্প' কিংবা নিছক 'কিছুক্ষন'-এ।
এভাবেই চলছিল, আশায় আর ভালবাসায়। ছোটগল্পের মত হুট করেই শেষ হয়ে গেল নানা রঙের দিনগুলি।
বইমেলা আসবে প্রতিবছর, অন্যপ্রকাশের ভিড় ভিড় স্টলের কথা মনে পড়বেই। অজান্তেই হয়ত উঁকি দিয়ে আসবো, কেউ আছে নাকি ভিড়ের আড়ালে। মন খারাপ হয়ে যাবে।
দিন আসবে, দিন যাবে। একেকটা দিন বুকশেলফ থেকে ডাক দিয়ে যাবে হুমায়ূন আহমেদ। মনের কোন ছুঁয়ে যাবে আরও একবার, হয়তো যতদিন বেঁচে আছি ঠিক ততদিন।
কিছু কিছু মানুষ তাদের না থাকার মাঝেও বড় বেশি করে রয়ে যান।
এভাবেই- বেঁচে থাকুক হুমায়ূন আহমেদ। একজন খেয়ালী জাদুকর।
মহান সৃষ্টিকর্তা তার আত্মাকে শান্তি দান করুন।
তার জন্য রইল অজস্র শুভকামনা, দোয়া আর ভালবাসা।





'নুহাশ এবং আলাদিনের আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ'. .....
মিস ইউ!!
কথার এই জাদুকর বেঁচে থাকবে আজীবন তাঁর মুগ্ধ পাঠকদের হৃদয়ে। পাঠকেরা তাঁর বই পড়বে আর চোখের জলে ভাসবে। এভাবে কেন চলে গেলেন সবাইকে কাঁদিয়ে!!!!
একা থাকি। ফ্লোরে বিছানো তোষক, বালিশ ডিমভাজার মত গুটিয়ে ফেলে সকালেই দৌড়াই অফিসে।দীর্ঘ জ্যাম ঠেলে ক্লান্ত হয়ে ফিরি। একটু ফ্রেশ হযেই তোষক বালিশ বিছিয়ে শূয়ে পরতে পরতে কিছু একটা পড়তে হাত বাড়াই।গত ফেব্রুয়ারী থেকেই সেলফ থেকে নামানো কিছু বই ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে হাত বাড়ালেই যেন পাওয়া যায়- সেজন্যে এই ব্যবস্থা।ডানদিকে “কখন নামিবে আধার, মেঘের উপর বাড়ী, হিমু এবং হাভার্ড পি এইচডি বল্টু ভাই”। মাথার কাছাকাছি ”বাদশাহ নামদার, ময়ূরাক্ষী, হিমুর আছে জল, জাফর ইকবালের দঃসপ্নেরে দ্বিতীয় প্রহর। বাদিকে হিমুসমগ্র- হলুদ মলাটে মায়ায় মাখামাখী।
কেউ প্রশ্ন করোনা , এই বইগুলো আমি কতবার পড়েছি ? কারন উত্তর আমার জানা নেই। তবে এইটুকু বলতে পারি প্রতিবার পড়ার পর মনে হয়েছে, কী করে এমন লিখতে পারে ? কেন চোখে পানি চলে আসে ?
ভাল থেকো হুমায়ূন আহমেদ।
লেখাটা ছুঁয়ে গেল । আমাদের অনেকেরই অনুভূতি আজ অনেকটা একইরকম ।
ভালো থাকুন বাদশাহ অন্যভুবনে!
ভালো থাকুন বাদশাহ অন্যভুবনে!
মন্তব্য করুন