গল্প: ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে, তোমার নাম ধরে কেউ ডাকে
ঢাকা ইউনিভার্সিটির সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, দুইতলা। বেটি ফ্রাইডেনের দ্য ফেমিনিন মিসটিক বইটার মধ্যে নাক, চোখ, কান, মন সব ডুবিয়ে হারিয়ে গেছে তিতলি। মেয়েটার আর ক'দিন পরে সিক্সথ্ সিমেস্টার ফাইনাল। পড়াশোনার ভীষণ চাপ, দেখলেই বোঝা যায়। ওকে একটু দুর থেকে দেখতে দারুণ লাগছে! চেয়ারের ওপর দুই পা তুলে আশপাশের, টেবিল, মোটা ডিকশনারি, জানালার কাঁচ, বাইরের কুয়াশা, পুরো পরিবেশটাকে কেমন জমিয়ে নিয়ে বসে পড়ছে মেয়েটা।
সায়ানের ইচ্ছে করলো, পেছন থেকে গিয়ে ওর দুই গালে নিজের দু'হাতের চারটা-চারটা ঠান্ডা আঙ্গুল ছোঁয়াতে। তবে লাইব্রেরীর মধ্যে এই কাজটা করা ঠিক হবে না। আশপাশের পন্ডিতেরা বিরক্ত হতে পারে। যদিও পন্ডিতদের বিরক্তি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না, তবুও একটু টেকনিক্যল সমস্যা আছে। চাইলেই আদর করে ওর গালে হাত ছোঁয়ানো যাচ্ছে না। কয়দিন ধরে মেয়েটা ভেতরে ভেতরে কেমন একটা রাগ পুষে রেখেছে এবং সেটা বোঝা যাচ্ছে। আগে সেই রাগটা ভাঙানো দরকার।
সে গিয়ে ওর পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলো। লাইব্রেরীর চেয়ার টান দেয়ার সময় খেয়াল রাখতে হয়। ফোমের চেয়ারগুলো ছাড়া অন্যগুলোয় ছারপোকার আস্তানা। কামড়ে মেজাজটা সারাদিনের জন্য গরম করে দেয়। তাই ফোমের চেয়ার ছাড়া অন্যকোন চেয়ার না টানাই ভালো, এটা সে জানে।
সায়ানকে অনেকক্ষণ আগেই দেখেছে মেয়েটা। যখন ও দোতলার বড় দরজাটা দিয়ে লাইব্রেরী হলটায় ঢুকছিলো তখন থেকেই। পাশে এসে বসার পর তিতলি জিজ্ঞেস করলো, কি ব্যপার? এত দেরি হলো কেন?
-ঘুম থেকে উঠতে পারছিলাম না, আলসেমী লাগছিলো ভীষণ।
কেন? আমার সঙ্গে দেখা করতে হবে বলে?
সায়ান মনে মনে বললো, বাপ্রে বাপ্। গলার কি ভোল্টেজ!
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর তিতলি বললো, এত যদি বিরক্তি লাগে তুমি আমার সঙ্গে দেখা না করলেই পারো। কেউ তো মাথার দিব্যি দিয়ে বসে নেই দেখা করার জন্য, তাই না?
-কই, সকাল থেকে তো মাথা আর মোবাইলের ওপর তুমি চেপেই আছো। দিব্যি নেই মানে কি?
ও, আমি তোমাকে জোর করে টেনে এনেছি? ভালো কথা, আমি যেহেতু এনেছি, আমিই আবার বলছি, চলে যাও। আমার সঙ্গে সময় কাটানোর দরকার নেই।
-সকালে তাড়াহুড়োয় নাস্তা না করেই বাসা থেকে চলে এসেছি। না খেয়েই চলে যাবো?
অবশ্যই চলে যাবে এবং আর কখনো আমার সঙ্গে দেখা করবে না।
-এমনকি কোন টাকাও নিয়ে আসি নি। সেটাও না নিয়ে চলে যাবো?
মেজাজ খারাপ করে দিও না। তোমাকে চলে যেতে বলেছি, চুপচাপ চলে যাও।
লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আসলো সায়ান। এমনিতেও লাইব্রেরীর ভেতর ঢুকলে ওর কোনো কারণ ছাড়া মাথা বনবন করতে থাকে। কখন বের হবে সেই চিন্তায় চড়তে থাকে দুশ্চিন্তার পারদ। চট করে সরে পড়ার সুযোগটা তাই হাতছাড়া করলো না সে।
লাইব্রেরীর সামনে বেলালের দোকান। ক্যম্পাসটা আসলে এত ছোট যে চাইলেও কারো চোখের আড়াল হওয়া সম্ভব না। হয় বেলালের দোকান, নাহয় মধু, নয় আইবিএ, নাইলে সর্বশেষ ডিপার্টমেন্ট, এছাড়া আর কই-ই বা যাওয়া যায়?
সায়ান দোকানের রকে বসলো। প্রচুর নতুন-নতুন পোলাপান ক্যম্পাসে দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশেরই মুখ অচেনা। আগে যখন এই রকটা ছিলো না, বিশাল তেতুল গাছটার গোড়ায় হেলান দিয়ে বসার জায়গা ছিলো, তখন এখান দিয়ে যে যে যেত তাদের প্রায় সবার নাম বলে দিতে পারতো সায়ান। সেটা একটা সময়ই ছিলো। যখন ও এই এলাকার সবাইকে চিনতো, এই এলাকার সবাই ওকে চিনতো।
এখন অফিসের কাজের চাপে ক্যম্পাসে খুব কম আসা হয় সায়ানের। আর এটা এমন একটা জায়গা যে, একদিন কেউ না আসলে পরদিন সেটা নতুন একজন এসে দখল করে নেয়। তারপরদিনও যদি নতুন ছেলেটা সেখানে থাকে, তাহলে সে জায়গার মালিক সে'ই। পুরোনোজন বাদ। কারো জন্যই এখানে সময় থেমে থাকে না।
দেখতে দেখতে আটটা বছর পার হয়ে গেছে। কি আশ্চর্যের কথা! এই বেলালের দোকানের সামনে দিয়ে সবুজ ঘাসে ছাওয়া বিরাট জমিটার পরে ছিলো শালিক চত্বর। কেউ কেউ বলতো কাঠাল চত্বর। এখন সেই ঘাসে ছাওয়া শাড়ির জমিনও নেই, বিখ্যাত শালিক চত্বরও নেই। নেই সেখানকার সেলিমের চায়ের দোকান।
দোকানের সামনে কয়েকটা করে বড় বড় পাথর গোল করে বিছানো ছিলো। সে পাথরগুলোর ওপর বসে কত আড্ডা এক সময় পিটিয়েছে ওরা, কত চা আর সিগারেট ধ্বংস করা হয়েছে, করা হয়েছে আরো কত কিছু। সেইসব দিনগুলো হারিয়ে গেছে। শালিকে এখন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন উঠেছে। আগে মসজিদের যে দেয়ালটার ওপর বসে বসে এক-একটা ২৪ ঘন্টার দিন পার করতো সায়ান, সেই দেয়াল এখন জীর্ণ হতে হতে হারিয়ে গেছে।
এখন যেসব ছেলেপিলে ক্যম্পাসে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে তারা কি জানে এ জায়গাগুলো একসময় কেমন ছিলো? কিংবা এখনকার শিশুরা যখন বুড়ো হবে, ক্যম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে যাবে; তখন কি এখন যেমন দেখা যাচ্ছে ঠিক তেমনই থাকবে সবকিছু?
সায়ান এই ভাবনাটার গভীরে পৌছে যাওয়ার ঠিক আগমূহুর্তে দেখলো তিতলি এক কাপ চা নিয়ে ওর পাশে এসে বসেছে। যদিও এখন সাড়ে এগারটার একটু বেশি বাজে, তাও শৈত্যপ্রবাহ চলার কারণে চারিদিকে কুয়াশা ধরে আছে ভালোমতোই। মানুষজনও কম ক্যম্পাসে। ডিসেম্বরের ছুটি শেষে এখনো অনেকে ঢাকায় ফেরে নি। মাএর ঊষ্ণ রাজত্বে রাজঅতিথির মতো জীবন কাটাচ্ছে। সে মোহ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা বড় কঠিন।
অনেকক্ষণ থেকে একটা চাপা মাথাব্যথা চিনচিন করে জানান দিচ্ছে নিজের অস্তিত্ব, কিন্তু সেটাকে পাত্তা না দিয়ে সায়ান বললো; চলো বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
-কোথায় যাবো?
এমনিই, কোথায় যাবো জানি না, কিছুক্ষণ ঘুরে আসি চলো।
রিকশা ঠিক হলো মোহাম্মদপুরের। শনিবার দিন রাস্তা-ঘাট এখন আর ফাঁকা থাকে না। বিশেষ করে নিউ মার্কেটের ওদিকটায় তো এদিন আন্টিদের সঙ্গে আঙ্কেলরাও শপিং করতে চলে আসেন। তবে হাতে কাজ না থাকলে মানুষের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ, অস্থির ছোটাছুটি দেখার মধ্যেও মজা আছে।
ওদের রিকশা যখন নিউমার্কেটের পেছনে শাহনেয়াজ হল-পোস্ট অফিস ঘুরে ঢাকা কলেজের সামনে এসে ঘন্টাখানেকের জ্যমে আটকে গেল, তখন ওরা দুইটা লেইস, একটা হাফ লিটার কোক, একটা প্রিমিয়াম আর একটা শেল এন কোর শেষ করে কিছুক্ষণ কর্মহীন বসেও থাকলো। তবে খারাপ লাগছিলো না কারোই।
তিতলি আজ কতদিন পর সায়ানের সঙ্গে বেরিয়েছে। ইদানীং ছেলেটাকে পাওয়াই যায় না। জ্যমে বসে থাকতে থাকতে বিষয়টা নিয়ে সে কিছুটা অনুযোগ জানানোর চেষ্টা করলেও, সায়ান সেটা পাত্তা দিলো না খুব একটা। তিতলি মনে মনে ভাবলো, ছেলেটা খুব কেজো হয়েছে। ফিলিংস্ গুলোকে পাত্তাও দেয়ার সময় নেই।
মোহাম্মদপুর পর্যন্ত যাওয়া হলো না। রাইফেলস স্কোয়ারের সামনে রিকশা ছেড়ে দিলো ওরা। যেহেতু একটা মার্কেট দেখাই যাচ্ছে, সুতরাং কিছু জরুরি জিনিস জোগাড় করে নেয়া যাক। সায়ান সোজা চারতলায় গিয়ে প্রথমেই একগাদা ডিভিডি কিনে ফেললো। ওর নুতন ল্যপটপের ডেডিকেটেড গ্রাফিক্স কি রকম সার্ভিষ দেয়, সেটা নাকি চেক করা ভীষণ দরকার।
তিতলি একটু একটু খেয়াল করছিলো, ছেলেটা বেতন পেয়েছে কিন্তু জানাচ্ছেও না। এমনকি ওর জন্য কিছু কেনা লাগবে কি না, এসব জানার ইচ্ছেও দেখাচ্ছে না। এসেই নিজের যা দরকার নেয়া শুরু করেছে। আর নিচ্ছেও কেমন হাভাতের মতো। কোনকিছু সম্পর্কে মতামত নেয়ারও দরকার মনে করছে না। যেন মত জানতে চাইলে ও বাঁধা দেবে। ভালোই তো, সপ্তাহে একটাদিন দেখা মেলে। তাও নতুন অফিসের কথা বলে আজ দু'মাস পর একটা দিন মিলেছে, যেদিনে নাকি ওর কোনো কাজই নেই। এই হচ্ছে কাজহীন দিনের বাহার? বাহ্ বাহ্ বেশ।
সায়ান ডিভিডি কেনা শেষে তিতলিকে নিয়ে আগোরায় গেল। চকলেট, প্রিঙ্গলস্ আরো কি কি সব কেনা শুরু করলো। প্রিঙ্গলস্ এর একটা নতুন ফ্লেভার দেখে দুইটা বড় বড় কৌটা কিনে ফেললো। বেশ কিছু দেশি-বিদেশি বাদামের এর কৌটাও ব্যগে ঢুকে গেল। তিতলি জানে, এগুলো সব ওর জন্য কিনছে এমন একটা ভাব করে থাকলেও, আসলে এসব বেশি পছন্দ করে সায়ানই।
তবে সায়ান কিন্তু নিজের জন্যই কিনছিলো। কেনা-কাটা সব শেষ করে বের হয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কিছু লাগবে?
-না, আমার কিছু লাগবে না সোনা।
না লাগলে তো হবে না, চলো দেখি তোমার জন্য কি কেনা যায়?
-না প্লিজ, আমি কিছু কিনবো না।
ওয়াই ম্যন্? জিনিস-পাতি কেনা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। মন-টন তো ভালো থাকেই, শরীরও ফুরফুরা লাগে। ঘুরতে বের হয়েছি এখন যদি শরীর ম্যজম্যজ করে তাহলে কেমনে কি? তুমি বলেছিলে তোমার নাকি জিন্সের প্যান্ট লাগবে। চলো প্যান্ট কেনা যাক্।
তিতলি খানিকটা অনিচ্ছা স্বত্তেও আবার মার্কেটে ঢুকলো। তিনতলায় কিছু ভালো ভালো দোকান আছে, এক্সপোর্ট কোয়ালিটির প্যান্ট পাওয়া যায়। দুইটা গ্যবাডিনের প্যান্ট, দুইটা জিন্স কেনা হলো। দেখে ভালো লাগায় একটা ফতুয়াও নিয়ে নেয়া হলো। যদিও তিতলির খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো। এভাবে টাকা খরচ করতে দেখলে ওর ভালো লাগে না। অকারণেই এসব কেনা হচ্ছে। কোনটিই যে খুব দরকার, না কিনলেই নয়; এমন না। যে কারণে ও প্রবল বাঁধা দিচ্ছিলো। সেসবের কিছুই কানে তুলছিলো না ছেলেটা।
রং থেকে কেনা হলো খানদুই কামিজ। এবার তিতলি ক্ষেপেই উঠলো। কি হলো টাকা-পয়সা উড়াচ্ছিস মনে হচ্ছে?
-কই? দুইটা মাত্র কাপড় কিনলাম। তুই যে কী কিপটুস হইছিস!
দে পকেটে টাকা যা আছে আমার কাছে দে।
-টাকা নাই। আর আমার টাকার দিকে তোর এত চোখ কেন?
আমার চোখ থাকবে না তো কার চোখ থাকবে? দে বলছি মানিব্যগ?
সায়ান ওর মানিব্যগ বের করে দিলো। সেটা থেকে তখন মাত্র এক-দেড়শ' টাকা বের হলো। যা করার এর আগেই করা হয়ে গেছে। তিতলির খুব মেজাজ গরম হলো। সে এটা লুকালোও না। বললো, বেতনের টাকা দিয়ে সারা মাসের খরচ চালানোর দায়িত্ব তো তোর থাকে না। তুই পেইনের বুঝবিটা কি? সুযোগ পাইলেই খালি ফুটানি। এইসব ভালো লাগে না একদম।
-না লাগলে একটা কাজ করি চল্। ম্যলা ঘুরাঘুরি হইসে, তিনটা বাজে, এবার খাই।
হ, এইটা ভালো কথা। চল খাই। কই খাবি?
-জিয়ান।
ওই কুত্তা, তোর পকেটে আছে দুই টাকা। তুই যাইতে চাস জিয়ান?
-জিয়ানতো সস্তারই দোকান। চল্।
দুইজনের এক হাজার টাকা লাগবে।
-তুই দিবি। তোকে আমি এত কিছু কিনে দিলাম, তুই আমাকে খাওয়াবি না?
ওই, খাওয়াবো না বলসি? রিকশা ঠিক কর।
সাড়ে তিনটা থেকে সব চীনে রেস্তোরা বন্ধ। এটা দেখে তিতলির আবারো মেজাজ খারাপ হলো। সায়ানের অবশ্য খুশি ধরে না। খ্যক খ্যক হাসি সে গোপনও করলো না। ওর হাসি দেখে তিতলিও একসময় হেসে ফেললো। রিকশা নিয়ে চলে আসলো আইবিএ'তে। শামসু মামাকে জানানো হলো, তাদের দুইজনের ড্রাগনের মতো ক্ষিদে লেগেছে। দুইজনকে দুইটা হাতি রোস্ট করে দিতে হবে।
মামা বললো, বসেন। ব্যবস্থা হচ্ছে।
ওরা বসে বসে দেখলো, ভাজা রুই, ইলিশের তরকারি, দেশি মুরগীর ঝোল, সিঙ্গারার আলু, মিষ্টি কুমড়ার সবজি, আলুভর্তা, ঘনডাল, গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত -আসতে থাকলো। শামসু মামাকে এইজন্য সায়ানের ভালো লাগে। কোনদিন এই ভদ্রলোক কোনকিছুতে না বলেন নি।
বেলা গড়িয়ে উঠলো খেতে বসে। খেয়ে দু'জনে সেখানেই দুই পা ছড়িয়ে দিলো। এক কাপ চা, একটা সিগারেট; ভাগ করে খাওয়া শুরু হলো। সকালের রাগ ততক্ষণে পড়ে এসেছে তিতলির। এটা দেখে অবশ্য সায়ানের ইচ্ছে হলো, ওকে খানিকটা ক্ষেপিয়ে দেয়ার। নাহলে আসলে মজা পায় না ছেলেটা। বললো, অফিস থেকে পিকনিকে যাচ্ছে সবাই।
-কোথায়?
গাজীপুর, সম্পাদকের এক বন্ধুর বাগানবাড়িতে, দুইদিনের পিকনিক।
-ওইখানে কি তোদের অফিসের ওই মেয়েটা, কি নাম, দীবা; সেও যাবে?
ইয়াপ্। ওর সঙ্গে আমার আলাপ-আলোচনাও ঠিক হয়েছে।
-কি আলাপ-আলোচনা?
পিকনিকে গিয়ে কি কি করবো।
-সেটা ওর সঙ্গে ঠিক হয়েছে মানে?
মানে সবাই-ই একসঙ্গে বসে ঠিক করসি। ওর সঙ্গে আমি একলা না।
-তুই ওখানে যাইতে পারবি না।
কেনো?
-আমি বলসি তাই। যাইতে পারবি না ব্যস্, যাইতে পারবি না।
আচ্ছা, তাইলে তুই চল।
-আমি কই যাবো?
আমার সঙ্গে পিকনিক করতে। একজন করে গেস্ট নেয়া যাবে, কোন অসুবিধা নাই।
-না তোর অফিসের পিকনিকে আমি কেন যাবো?
অফিসের পিকনিকে না গেলে না যা। অন্য কোথাও চল্।
-কই যাবো?
শীতের দিন যেহেতু, সেহেতু চল কক্সবাজার যাই। সেন্টমার্টিন-টার্টিন ঘুরে আসবো। চল।
-এহ্, তুই বললি আর হয়ে গেল মনে হয়।
তো আর কি? বললাম দেখেই তো হয়ে গেল। হয় আমি পিকনিকে যাবো, নাইলে তুই আমার সঙ্গে কক্সবাজার যাবি।
-কোথাও যাবো না, যা ভাগ। আর তুইও কোথাও যাইতে পারবি না। আমার পাশে বসে থাক। আরেকটা সিগারেট নিয়ে আয়। খেয়ে-টেয়ে হলে চলে যাই। সামনের সপ্তাহ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা। পড়তে হবে।
কেন? হলে যাওয়ার চিন্তা এখনই কেন? তোর সঙ্গে আমার দীর্ঘ-দীর্ঘদিন ধরে দেখা নাই, সাক্ষাৎ নাই, পাশাপাশি বসে একটু মনের কথা বলার সুযোগ নাই। মোবাইলে কথা বলতে গেলে খালি ঝাড়ি মারিস। আজকে একটু দেখা হইসে। আর সন্ধ্যা না হতেই তুই শুরু করলি হলে যাওয়ার কথা।
-আচ্ছা হলে যাওয়ার কথা বলবো না। কিন্তু তুই পিকনিকে যাইতে পারবি না।
সেইটা আমি যাবোও না। কিন্তু কোথাও তো যাওয়া দরকার। এইজন্য একটা প্ল্যান করসি।
-কি প্ল্যান?
আজকে রাতে চিটাগাং যাওয়ার প্ল্যান।
-কি?
হ, হলে গিয়ে ব্যগ-বুগ গুছায়ে নিয়ে আয়। একসাথে বাইর হই। এখান থেকে আমার বাসায় যাবো। সেখান থেকে আমিও রেডী হয়ে দুইজন একবারে বাইর হবো। ১১ টা ৪৫ এ বাস। এই যে টিকিট।
পকেট থেকে সত্যি সত্যি দুইটা গ্রীন লাইন স্কানিয়া'র টিকিট বের করলো সায়ান। বি৩ আর বি৪। রাত পৌনে বারোটায়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সামনে থেকে ছাড়বে গাড়ি। টিকিট দেখে একটা বড় ঢোক গিললো তিতলি। তুই টিকিট-মিকিট কেটে এনেছিস?
-ইয়া বেইবিহ্। আমরা কালকে সকালে হোটেল আগ্রাবাদে উঠবো। রুম বুকিং দেয়া আছে। একদিন-একরাতের জন্য দুইদিনের পুরা বিল এ্যডভান্স করতে হয়েছে। এখন নাকি সিজনাল টাইম ওদের। রুম-টুম পাওয়া সমস্যা। চিটাগাংয়ে দেখার সবচে' সুন্দর যে জায়গাটা ছিলো ফয়'স লেক, সেখানে এখন কনকর্ডের পার্ক একটা বানিয়ে কি অবস্থা করেছে জানি না। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন একদিকে চিড়িয়াখানা, একদিকে ফয়'স লেক দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। মুগ্ধ হয়ে হেঁটে হেঁটে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে চলে যেতাম। চল তোকে নিয়ে জায়গাটা দেখে আসি।
তারপর?
-তারপর কক্সবাজার। ওইখানেও দুইদিন-দুইরাত। ভালো হোটেলে রুম পাইসি। অতনু আর মলয় হেল্প করসে। ভার্সিটির ফ্রেন্ডশীপও জীবনে কোনো কাজে আসে, এটা এই প্রথম দেখলাম। বীচ-টীচ দেখা হবে, বার্মিজ মার্কেটে ঘোরা হবে। বৌদ্ধদের পাহাড়গুলায় চড়বো-টড়বো। বুধবার সকালে সেন্ট মার্টিন যাবো। সারাদিন ঘুরতে হবে। মাছভাজা খেতে হবে। নির্জনে বসে তোর হাতে হাত রেখে নারকেল গাছের গুঁড়ির ওপর সমুদ্রের ঢেউএর আছড়ে পড়া দেখতে হবে। সন্ধ্যায় কক্সবাজার ব্যক্ করতে হবে। রাতটা আবার হোটেলে কাটাবো। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঢাকার উদ্দেশ্যে ব্যক্ দিবো। এই দ্যাখ, ফিরতি টিকিট।
আবার পকেট থেকে দুইটা টিকিট বের করে দেখায় সায়ান। অস্ফুট বিস্ময়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে তিতলি।
---





মন্তব্য করুন