তখন আমার বুকের রক্ত জমে যায়
একটি প্রথম দিন সম্পর্কে যদি কেউ আমাকে বলতে বলে তাহলে আমি তৃষার সঙ্গে প্রথমবার দেখা হওয়ার কথা বলবো। আমি দেখলাম আমার সামনের টেবিলে আগুনের মতো একটা মেয়ে এসে বসেছে। পেছনে বসার কারণে শুধু পিঠ, হাত আর ঘাড় দেখতে পাচ্ছিলাম। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম সেগুলোও কথা বলে।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর যেটা একটা ইনট্রোডাকটরী ক্লাস ছিলো ফার্স্ট ইয়ারের, আমি ওকে সামনা-সামনি দেখলাম। স্টাক শব্দটার বাংলা বোধহয় তব্দা খাওয়া হবে, পুরোপুরি দুইটা তব্দা খাইলাম। একটা খাইলাম, মনীষা কৈরালার মতো সামনের দুইটা দাত একটার ওপর একটা ওভারল্যাপ করেছে দেখে। হাসলে ঝর ঝর করে মুক্তো পড়ে। আরেকেটা তব্দা খাইলাম মেয়েটা সারাক্ষণ হাসছে, এটা দেখে।
ওইদিন কি হয়েছিলো আল্লাই জানে, জীবনে প্রথম একটা মানুষকে গিয়ে বললাম, হাই। এরপরে যে কাউকে হাই বলাটা এখন আর কোনো ব্যপার না। কিন্তু আশ্চর্যের হলেও সত্য, হাই্ কথাটা জীবনে সর্বপ্রথম বলেছিলাম সেদিনই। এটা আমি পরে চিন্তা করে পেয়েছি।
তৃষার সঙ্গে ওটাই প্রথম কথা ছিলো, মেয়েটা এত সুন্দর করে হাই্ বললো, আমি আবার তব্দা খাইলাম। এবং আবার একটা নতুন কথা বলে ফেললাম, লুকিং গ্রেট। দেখি চোখ ছোট ছোট করে ফেলেছে। বললাম, না, তোমাকে আসলেই দারুণ লাগছে বলে বললাম। এই কথা আর কাউকে বলি নাই।
-থ্যংক ইউ।
আমি এর আগে সবসময় এর জবাবে ওয়েলকাম বলে অভ্যস্ত। এইবার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল, ইউ আর ওয়েলকাম।
এই প্রথম দিনটার কথা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। যেমন আমার আজকের রাতটির কথাও আমি কখনো ভুলতে পারবো না। ওয়েলকাম বাক্যটি কাজে এসেছিলো। পরের দিন থেকে মেয়েটিকে নিজের সম্পদের মতোই ব্যবহার করতে শুরু করেছিলাম। মজার বিষয় হচ্ছে, মেয়েটিরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে বা মেয়ে কোনো বন্ধু ছিলো না। এবং আরো মজার বিষয়, ক্যম্পাসে যেখানে ছেলে-পিলে একসাথে ঘোরাঘুরি করে এক-একটা বন্ধুচক্র গড়ে তোলে, সেরকম কিছু আমাদের কারো ক্ষেত্রেই ঘটলো না।
এটা ছিলো একটা ভয়াবহ ঘটনা। এরপরে মাইগ্রেশন করে অন্য বিভাগে চলে যাওয়ায় আমরা দুইজন একই ক্লাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। আজ বুঝি, সেটা ভালোই ছিলো। এটলীস্ট, আমি পড়াশুনা না করে সম্পর্কটার পেছনে সময় দেয়ার সুযোগ পেয়েছি। ওই ডিপার্টমেন্টটায় এত পড়ার চাপ ছিলো যে অসহ্য লাগতো। যে কারণে তৃষার রেজাল্ট খুব ভালো ছিলো, আমার রেজাল্ট খুব খারাপ ছিলো। দু'জন চুটিয়ে প্রেম করতাম।
সবচে' মজার বিষয়গুলোর মধ্যে একটা ছিলো, এক-একদিন ভোর ছয়টায় দুইজন বাসা থেকে বের হয়ে একসাথে ক্যম্পাসে চলে আসতাম। রাস্তায় কেবল ঘুম থেকে ওঠা একটা মহানগরীকে জেগে উঠতে দেখতে দেখতে। মোল্লায় সকালের নাস্তা করতাম। সেটা তখন এখনকার ছবির হাট হয়ে ওঠে নি। প্রতিদিন সকালে তেল ছাড়া বা তেল দিয়ে কড়া ভাজা পরোটা, সঙ্গে ভাজি, ডিম মামলেট আর চা পাওয়া যেতো। পেছনে বিশাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কিছুই ছিলো না। একটা বড় গাছের গুড়ি ছিলো। এরকম প্রাতঃভ্রমণ আমি শুধুমাত্র তৃষার সঙ্গেই করেছিলাম। এছাড়া জীবনে আর কখনো প্রাতঃভ্রমণে বেরোনোর সৌভাগ্য হয় নি।
ফার্স্ট ইয়ারে ওদের ডিপার্টমেন্ট থেকে যখন ট্যূরে গেল, তখন আমার এত খারাপ লেগেছিলো যে; নিতান্ত অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। তৃষা রাতের বাসার বাইরে থাকলে যে কেমন লাগতে পারে সেটা বলে বোঝানো যাবে না। ভুক্তভোগীদের বুঝে নিতে হবে। এটা অনেকটা বুকের ভেতরে দুইটা কালো পিপড়াঁর নিরন্তর কামড়ে যাওয়ার মতো। এ সময় চাইলেও গলার স্বর আদ্র রাখা যায় না। আমি পরীক্ষা করে দেখেছি।
ডিজুসের সিম নিয়ে একবার গন্ডগোল লেগেছিলো। সে সিম একসঙ্গে না কিনে কেন আমি আগে কিনে ফেলেছিলাম, সেটা নিয়ে তুমুল ঝগড়া হলো। এবং আমার এমন কপাল খারাপ, এরপর থেকে আর ডিজুস সিম পাওয়া যাচ্ছিলো না। সে সময় কয়েকটা সপ্তাহ এত বিপর্যস্ত লেগেছিলো নিজেকে, যা আগে আর কখনো লাগে নি। সেইসব ঝামেলাগুলোই আসলে সম্পর্কটাকে পোক্ত করেছিলো। যে কারণে এরপরে প্রথম মারামারি, দ্বিতীয় মারামারি, তারপরে এক পর্যায়ে নিয়মিত হয়ে যাওয়া এবং গুরুত্ব হারিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া মারামারি, কোনকিছুতেই টলে নি সেটা।
টলে গেল এসে, পারিবারিক ঝামেলায় জড়িয়ে। এবং সে সময় আমি বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম। ঝগড়া করে তুমি যখন আমার সঙ্গে ব্রেক আপ করে চলে গেলে, তখন ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারি নি, সামনে আসছে আমার জীবনের একটি অন্ধকার মাস। আমি যে কয়েকটা কি দিন পার করেছিলাম, সেটা তৃষা জানে না। বরং ওকে যখন ছোটমামার বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি স্টেজে সবার সঙ্গে নাচতে দেখি, আনন্দ করতে দেখি, যখন ওর মুখে আর চুলে গীতি'স বিউটি পার্লারের ছোঁয়া টের পাই; তখন আমার বুকের রক্ত জমে যায়।





ঢুকে আছি অনেক দিন ধরেই। এরকম আরো অনেক গানের ভেতর। তবে জুইতমতো পরিবেশ না পেলে গান শুনে মজা পাই কম। যেমন রাত তিনটা-সাড়ে তিনটার দিকে, যখন এমনকি ব্লগেও কেউ থাকে না; সে সময়টায় বিশেষ কিছু গান/ইন্সট্রুমেন্টাল শুনতে ভালো লাগে। হয়তো চোখ বন্ধ করে একটা উপভোগ চক্রে ঢুকে অনুভব করি সময়টা। আপনার জন্য আরেকটা স্কালা এন' কলাক্নি ব্রাদার্সএর সঙ্গে ইউটু'র উইথ অর উইদাউট ইউ।
মন্তব্য করুন