কবিতা: শুধু তোমার নামটুকু পার হতে পারি নি আজো
বয়সের সঙ্গে সবকিছুতে স্থিরতা চলে আসে। পৃথিবীর বয়সও বেড়ে চলেছে প্রতিদিন। সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে স্থিতাবস্থার দিকে। আজ-কাল মানুষের মধ্যে একটা প্রাইম পার্ফেকশনের ব্যপার কাজ করে। চেহারায়, আকারে, ভঙ্গিতে, সবকিছুতেই। আমার মনে হয় অনন্য সাধারণ একটি প্রজাতি বিবর্তনের প্রায় শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছে।
বিবর্তনের কথায় আরেকটা যে কথা মনে পড়লো, ইদানীং কালের মশাগুলো কিন্তু অন্যরকম হয়েছে। মশার বিবর্তন সবচে' দ্রুত হয়। যে কারণে সেটা সহজেই সবার চোখে পড়ে। আগে মশায় কামড়ে দেয়া জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে থাকতো এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত ব্যথা করতো। এখনকার মশাগুলো পোকার মতো তীক্ষ্ণ কামড় দেয়। যেখানে হুল ফুটায় একদম জ্বলে ওঠে। কিন্তু জ্বলুনি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। লাল দাগও পাই না তেমন একটা।
এ থেকে আরেকটা ধারণা জন্ম নিচ্ছে মাথায়। সেটা হলো, অনেকদিন মৌমাছির কামড় খাই না। অবশ্য খুব বেশি খাইওনি জীবনে। তবে এক-আধবার যা খেয়েছি, তাতে তীক্ষ্ণ কামড় সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিস্কার ধারণা হয়েছে। বোধহয় মৌমাছির কামড়েও এখন ভিন্নতা পাওয়া যাবে। আজ-কাল টিকটিকিগুলোর সাইজ বিশাল বিশাল হতে দেখি। তেলাপোকারা বংশবৃদ্ধি ঘটায় প্রচুর পরিমাণে। ইদানীং যত তেলাপোকা চোখে পড়ে আগে কখনো এত চোখে পড়ে নি।
আমার মনে হয় কি; কীটনাশক আবিস্কারের পর পোকা-মাকড়েরা যখন ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলো, তখন জাগতিক নিয়মে ওদের ভেতর অভিযোজন ঘটে। যার প্রথম ধাপ হিসেবে ওদের বংশবৃদ্ধির হার বেড়ে যায় এবং দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে কয়েক গুণ বেড়ে যায় বেঁচে থাকার ক্ষমতা। পোকা-মাকড় টাইপের সব প্রাণীই হয়তো এভাবে অভিযোজিত হয়ে গেছে।
বিবর্তন মানুষ প্রজাতির জন্য সমূহ মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ তারা নিজস্ব অবস্থানের সুযোগে অন্য প্রাণীদের ওপর কীটনাশক ছিটাতে সক্ষম। কিন্তু নিজেরা আবার প্রকৃতির কাছে ভীষণ অসহায়। যেকোন সময় ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যেতে পারে সবাই, সবকিছুসহ। আমি বলি কি, ভরপুর সম্ভাবনা আর ভয়ংকর আশঙ্কার সম্মিলনই জীবন। এর মাঝেই একটু ফাঁক বের করে নিতে হয় বেঁচে থাকার জন্য। নিজেকে ও অন্যকে ভালবাসার জন্য।
---
একটা হলুদ গাঁদা ফুলের মালা হতে পারতাম,
কিন্তু হই নি, ফুলগুলো শুকিয়ে যাবে বলে।
শুধু তোমার সংসারে ঝরে পড়া পাপড়ি হয়েছি।
হীরে কিংবা জহরত নয়
প্রিয় তোমার সঙ্গম চাই।
তুমি ভালবেসে ছুঁয়ে দিলে
আমি আরামে মরে যাই।
এই কোমল-পেলব-মধুর নিমীলনে হায়
কেউ উঠিয়ে দেয় নি লাল ঘোমটাটাও।
হয়তো দেবেও না, কেননা এভাবেও
তোমার দিকে এক বছর তাকিয়ে থাকা যায়।
উতল মনে ঢেউএর নেচে চলা
শশীদীপ্ত টুকরো টুকরো
আলোর ছলকে ওঠা,
তোমার নাকে মুক্তো হয়ে একটি ঘামের ফোঁটা
ঠিকরে পড়ে রাতের কালোর মাঝে।
আলতো করে আঙুলে তুলে নিই।
খুশিতে নেচে ওঠা এই দিন কিংবা
মুখর রাতগুলোয়
বার বার হারিয়ে যাই,
তোমার স্পর্শে মহাপুরুষ আমি
আরাধনায় বেলা কাটাই।
শুধু তোমার নামটুকু কেন পার হতে পারি না?
কেন আজো সেখানেই আটকে আছে সবকিছু?
---





আমি থাকবো না আর সব ঠিক এভাবেই থাকবে
গল্প: পরোপকারী কাঁচপোকার ভিউফাইন্ডারে চড়ে কাটানো একটি দিন
আমি ছোটবেলা থেকেই কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। যে কারণে বাসায় কারুর সঙ্গে আমার সেই সখ্যতাটি নেই, যেটি বাবার সঙ্গে ছেলের বা মায়ের থাকে। ভাইদের সঙ্গে ভাইদের থাকে। নিজের মতো করে বড় হয়েছি। নিজের মতো করে পাশ দিয়েছি। এখন নিজের মতো করে দিন কাটাচ্ছি। খারাপ লাগছে না কিছুতেই।
মধ্যবিত্তের সংসারে আমার কিছু বিলাসীতার অভ্যাস আছে। যার অন্যতম হচ্ছে ধূমপান। সেই কাজটি করার জন্য যা ব্যায় হয় সেটুকু নিজেই আয় করি। এছাড়া সংসারে একটি মানুষের থাকার জন্য কিছু খরচ হয়। সে খরচও নিজে জোগাই। এর বাইরে তেমন কোনো কাজ করি না। শুয়ে শুয়ে ভাবি। ছোটভাইটা মাঝে মাঝে এসে জ্বালাতন করে। ও-ও খানিকটা আমার মতো। চুপ-চাপ প্রকৃতির। কিন্তু চুপ-চাপ থাকার লাভ কি- সেটা সে জানে না। তাই আমাকে পেলে কখনো হয়তো জানতে চায়, ভাইয়া তুমি এত চুপ করে থাকো কেন?
বাবা অনেক সময় রাতে আমার ঘরে আসেন। বিছানার ওপর পা তুলে বসেন। তিনি সিগারেট খাওয়া ছেড়েছেন বহু আগে। তখন বোধহয় আমি ছোট ছিলাম। একদিন আমাকে তার প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ‘আমি খাবো, আমি খাবো’ বলে তারস্বরে চেঁচাতে দেখে তিনি নাকি আম্মুকে বলেছিলেন, এইবেলা আমি ক্ষ্যান্ত দিই। নাহলে যে ছেলের ভাগে কম পড়বে। এরপর থেকে আর কখনো নিয়ম করে ধূমপান করেন নি।
তবে আমার ঘরে আসলে মাঝে মাঝে তিনি একটা সিগারেট ধরান। আমাকে কখনোই তিনি তেমন কোনো প্রশ্ন করেন না। শরীরের খবরটা জানতে চান। নিজের শরীরের খবরও জানান। বেশ কিছুটা সময় হয়তো চুপ করে বসে থাকেন। আমার কোনোকিছু লাগবে কি না জানতে চান। আমার তেমন কিছু লাগে না। তাও হয়তো বলি, দেখি সামনের মাসে মনে হয় কিছু টাকা লাগবে। যদিও এই বলা পর্যন্তই। কখনো সামনের মাসে আমি টাকা নিই নি। তবে বাবা যে আমার রুমে এসে বসতে পছন্দ করেন সেটা আমি জানি। তিনি আসলে অবশ্য আমারো ভালো লাগে। কিন্তু সেটা তাকে বুঝতে দিই না।
মা’কে নিয়ে কোনোকথা আসলে বলা যাবে না। তিনি ডেঞ্জারাস্ মানুষ। সারাক্ষণ আমাকে বকাবকি করে সময় কাটান। এটা মোটামুটি তার প্রধানতম কাজগুলোর মধ্যে একটা। আমার মতো একটা অসামাজিক প্রাণী তিনি কিভাবে পেটে ধরেছিলেন, তা এখন আর বুঝতে পারেন না। যখন ধরেছিলেন তখনও বুঝতে পারেন নি। তার অনেক সন্দেহ আছে, আমার শরীরে বোমা মারলেও আমি হয়তো কোনো কথা বলবো না। চুপ-চাপ মরে যাবো। এমন ছন্নছাড়া কেন আমি? বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দিয়ে বসে আছি, অথচ নিজেকে নিয়ে কিছু ভাবছি না! এমন নরাধমও জগতে পাওয়া যায়।
তার অনেক অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা। মাঝে মাঝে তিনি চক্রান্তকারীদের মতো স্বরে আমাকে বলেন, তোর ছোটখালা একটা মেয়ের কথা বলেছিলো। মেয়ে ভালো ছাত্রী। অনেক বিদ্বান। আমি বলি, আমি ক্লাসের তৃতীয় সারির ছাত্র। আমার সঙ্গে একজন বিদ্বান’কে জুড়ে দিলে তার সঙ্গে অবিচার করা হবে। এরপরে তিনি আরো যুক্তি দিতে চান। যেগুলো না শুনেই আমি কেটে পড়ি। বাসায় খুব কম সময় থাকি, কারণ যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ না চাইলেও আমাকে কথা শুনতে হয়। মাঝে মাঝে বলতেও হয়।
এসবের চেয়ে মহল্লার শেষ মাথার বালুর ঘাটটা আমার অনেক বেশি প্রিয়। আমাদের পুরো মহল্লাটাই আসলে সদরঘাট লাগোয়া। এই বালুর ঘাটে শুধুমাত্র বালুবাহী স্টীমারগুলো এসে ভেড়ে। চলাচল করে। আমি ঘাটটা খুব পছন্দ করি। দিন কিংবা রাতের সবরকম সময়ে আমি ঘাটে বসে থেকে দেখেছি। সবসময়ই ভালো লেগেছে। মানুষ সদরঘাট এলে পারতপক্ষে ওয়াইজ ঘাটের পর আর পা দেয় না। আহসান মঞ্জিলের পেছনে ফল-ফলাদি’র পচাঁয় ভরা যে ফুটপাথ, অভ্যস্ত না হলে সে জায়গা পেরোতেই বমি হয়ে যাওয়ার কথা।
কষ্ট করে ফলের আড়ৎগুলো একটু পেরিয়ে এলে একসময় পানির বা আর কিছুর দুর্গন্ধ নাকে এসে আর ধাক্কা দেয় না। বরং কখনো কখনো জায়গাটাকে সত্যি সত্যি নদীর পাড় বলে মনে হয়। যেমন এই বালুর ঘাটটা। এখানে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা আর বোধিবৃক্ষের নিচে আরামে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেয়া আমার কাছে সমান। শরীর, মন সব ঠান্ডা হয়ে আসে।
আমার সিস্টেমটা কিন্তু মোটেও আশপাশের মানুষ কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে কনফ্লিকটিং নয়। বরং কো-অপারেটিভ’ই আমি বলবো। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মানুষের সঙ্গে কথা কম বলে সোজাসুজি অফিসে চলে যাই। দুপুর পর্যন্ত টানা কাজ। এ সময়টা আমার খুবই প্রিয়। কেউ কোনো কারণেই বিরক্ত করতে আসে না। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। সহকর্মীরা প্রথম প্রথম আমার অন্তর্মুখী স্বভাবে পীড়িত হলেও, এখন বুঝে গেছে আমি এমনই। তাই তারাও এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। দুপুরে কেন্টিনে গিয়ে খাওয়া। খেয়ে বাইরে গিয়ে একটা চা আর সিগারেট। এরপরে আবার অফিসে ফিরে আসা। বিকাল পর্যন্ত কাজের চাপ কম থাকে। এসময় আমি একটু ই-মেইল, টি-মেইল ঘাঁটি। নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরা খাতা সই করে বেরিয়ে আসি রাস্তায়।
আমার চলাচল পুরোপুরি পদভিত্তিক। এতে একদিকে যেমন শরীর খুশি হয়, আরেকদিকে আমি নিজে খুশি হই। হাঁটতে হাঁটতে যে কত কথা ভাবা সম্ভব, সেটা আমি ছাড়া আর ক'জন জানে তার ঠিক নেই। তবে সংখ্যাটা যে হাতে গোণাই হবে তার ঠিক আছে।
হাঁটতে হাঁটতে কি নিয়ে ভাববো, সেটাও আমি পারত আগে থেকে ঠিক করে রাখি। যাতে সময় নষ্ট না হয়। আমার ভাবতে ভালো লাগে খুব। ঘাটে বসে বসেও আমি মূলত ভাবি। রাজ্যের সব ভাবনা ভেবে ফেলি। সেরকমই সেদিন বসে বসে একটা মেয়ের কথা ভাবছিলাম।
কি একটা কারণে যেন সরকার সেদিন ছুটি দিয়েছে সবাইকে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর এদেশে কিছু ছুটি বাতিল হয়। সঙ্গে নতুন কিছু ছুটি পাঁচ বছর পর বাতিল হবার জন্য যোগ হয়। এমনই এক ছুটির দিন সকালে নাস্তা-টাস্তা করে ফেলার পর আম্মুর যন্ত্রণায় ঘরে আর তিষ্ঠানো যাচ্ছিলো না। বাইরে বৃষ্টি হবে হবে একটা ভাব। আকাশ কালো হয়ে আছে অনেকক্ষণ থেকে। কিন্তু বৃষ্টি নামছে না। ভাবলাম পাতলা টাইপ কাপড় পরে ঘাটে গিয়ে বসে থাকি। বৃষ্টি হলে ভিজবো না। কোনো ছাউনিতে ঢুকে বসে থাকবো। কিন্তু পাতলা কাপড়ে ঠান্ডা ভাবটা উপভোগ করা হবে।
ঘাটে বসে বসে ভাবছিলাম ছোটবেলার বন্ধুদের কথা। ছোটবেলার বন্ধুরা বড় হলে কত পরিবর্তিত হয়ে যায়। একবার একটা মেয়ের আমাকে নিয়ে কি চিন্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ছিলো সে। আমি কেন কথা কম বলি তা নিয়ে সে লজ্জাষ্কর চিৎকার-চেঁচামেচি লাগিয়ে দিয়েছিলো ডিপার্টমেন্টে। মেয়েরা আসলে যে কি পাগল হয়, সেটা ওদেরকে ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না। এই পর্যন্ত ভাবা শেষ হতেই, পেছন থেকে শুনতে পেলাম; এই যে শুনছেন।
পেছনে তাকিয়ে ক্যমেরাহাতে কিউট চেহারার মেয়েটিকে দেখে ভালো লাগলো। কিন্তু সেটা বলতে ইচ্ছে হলো না। শুধু তাকিয়ে থাকলাম। দেখছিলাম, কোনো কথা না বলে পূর্ণ মনোযোগে একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে কোনো ভাবান্তর হয় কিনা। মনে হলো কোনো ভাবান্তরই হয় না।
এখন বিষয়টা একটা মজার দিকে টার্ন করেছে। মেয়েটা আমাকে একটা প্রশ্ন করেছে। আমি সেটা শুনতে পেয়েছি। প্রশ্নটা এমন যে উত্তর না দিয়েও বুঝিয়ে দেয়া যায়। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি মানে তার কথা শুনছি। কিন্তু তাতে মনে হয় মেয়েটার ঠিক মন উঠছে না। সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন একটা উত্তর ছাড়া নড়বে না। সে একদম সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তরের অপেক্ষা করছিলো। অনেক সময়ে দেখেছি, এ অবস্থায় মেয়েরা অকারণেই একটু পর পর ওড়না ঠিক করে। এই মেয়েটি টাইট একটা ফতুয়া পড়ে আছে। কোনো ওড়না নেই। ঠিক করবে কি?
মেয়েটির চোখ থেকে চোখ নামানো যাচ্ছিলো না, কারণ সেও নামাচ্ছিলো না। মনে মনে ভাবার চেষ্টা করলাম, আসলে সে আমাকে কেন ডেকেছে? হয়তো জায়গাটা চিনতে পারছে না বা জায়গাটার নাম জানা দরকার। এইজন্যই হবে। কিন্তু আমি কোনো কথা বলছিলাম না। শুধু তাকিয়ে ছিলাম।
আশপাশে কোনো মানুষ ছিলো না। ছুটির দিন বলেই হয়তো কারোরই বাইরে কোনো কাজ নেই। মেয়েটা এদিক-সেদিক তাকিয়ে, একটা ভ্যানের ওপর পা ঝুলিয়ে বসলো। ভ্যানটা খুব কাছেই তালা দিয়ে রাখা ছিলো। এখানকার কারো হবে।
বসে খানিকটা ভদ্রতার ধার না ধরেই সে আমার একটা ছবি তুলে ফেললো। আশ্চর্য! কারো ছবি তোলার আগে তার একটা অনুমতি নেয়ার চল কি আমাদের দেশে আছে না? যতদূর জানি আছে। তাহলে এটা কেমন কথা হলো? যাক্ তাও কিছু বললাম না। দেখি এর কাহিনী কি?
বেশ কিছুক্ষণ আপনমনে ক্যমেরায় কিসব খুটখাট করে হঠাৎ সেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, দেখেন কেমন হয়েছে। আমি দেখলাম। দেখে প্রায় মুগ্ধ হলাম। আমার মতো বানেভাসা মানুষেরও যে এমন ছবি হতে পারে, চিন্তাই করা যায় না। বললাম, থ্যংক য়ু ভেরী মাচ ম্যা’ম। রিয়েলি এপ্রিশিয়েট দিস্।
শুনে মেয়েটি বললো, আপনের কাছে যে একটা কথা জানতে চাইলাম, সেটার উত্তর দেন নি কেন? আমি তো ভেবে বসেছিলাম অন্যকিছু। আমি বললাম, আপনার কথা শুনতে না পেলে তো আর তাকাতাম না। তাই কথা বলি নি। মেয়েটি ঠোঁট উল্টে কি একটা জানি ভাব করলো, ঠিক ধরতে পারলাম না। তারপরে বললো, ছবি তুলতে বের হয়েছি আর আকাশে মেঘ উঠে গেছে। কি সমস্যা।
আমি সিরিয়াসলি মাথা নাড়লাম। আসলেই এটা একটা গুরুত্ববহ সমস্যা। মেয়েটি সেই সহানুভূতির মাথা নাড়ানো মনে হয় না দেখলো। ও'ই উল্টো আমাকে বললো, অবশ্য মেঘের জন্য কোনো সমস্যা নেই। আজকের দিনের ছবিটা অলরেডী নিয়ে ফেলেছি। এই ঘাট, তারপরে নদী, নদীর উল্টোপাড়ে জনবসতি আর একটা ছেলে; ধনুকের মতো পিঠ বাঁকা করে গালে হাত দিয়ে বসে বসে নদীর দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। ছবিটা তুলে খুশি হইসি। তাই আপনাকে থ্যংকুস্ দিতে চাচ্ছিলাম।
ছবির ব্যাখ্যা শুনে ভালো লাগলো। ব্যাখ্যা দেবার জন্য একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। মেয়েটা বোধহয় ছবি তোলা নিয়ে প্রচুর ভাবে। আমি জানতে চাইলাম সে কথা। সে বললো, না, অতো ভাবনা-চিন্তা করার সময় কই? অফিসের যন্ত্রণায় ঠিকমতো খাওয়া-ঘুমই দিতে পারি না। আর ভাবনা! আজকে একটু ছুটি পাইসি। বাইর হয়ে পড়সি। আসার সময় দুই বান্ধবীরে বলসিলাম। কিন্তু ওরা নাকি ঘুমায় ঘুমায় বিয়া করতেসে। একজন বিয়া করতেসে আরেকজন কন্যার মেইড হইসে। কেউই আসতে চাইলো না। তাই আমি নিজেই এসে পড়লাম। লঞ্চঘাটে ঢুকছিলাম। কিন্তু তেমন কোনো ছবি পাই নি। একটা ছবি শুধু দেখলাম। লঞ্চের ছাদে দুইটা খালি চেয়ার। মনে হইলো জামাই নিয়ে বসে থাকার জন্য একটা পার্ফেক্ট জায়গা। কিন্তু হাতের কাছে সেই সুযোগও নাই। তাই ঘুরে ঘুরে শাটার টিপে বেড়াচ্ছি। আকাশে আলো কম। কম আলোতেই ছবি তুলি। অ্যালবামের নাম দিবো, দিনের আলোয় চাঁদের আলো। কভারে আপনের ছবিটা থাকবে। যেটা পেছন থেকে নিয়েছি।
হঠাৎ কেন যেন বললাম, আমার পোর্ট্রটেটা অ্যালবামে দিয়েন না। মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেললো। কেন ভাবী দেখে ফেলবে না কি? অসুবিধা নাই। আমি ফেসবুকে দেবো না। অন্য জায়গায় তুলবো। আমি বললাম, যেখানেই তোলেন আমি কিংবা আমার পরিচিত কেউ দেখার সুযোগ নাই। কিন্তু তাও আমার ওই ছবিটা দিয়েন না।
-ঠিক আছে। আপনার বিষয়টা আসলে বুঝতে পারছি না। আপনার বাসা কৈ?
সেটা দিয়ে কি করবেন? আপনাকে আমি আরো ভালো একটা ছবির আইডিয়া দিতে পারি। নদী, নদীর স্টীমার, লঞ্চ, নৌকা, সবকিছু একসাথে নিয়ে ফেলতে পারবেন। নদীটা যে মরে গেছে সেটা বোঝাতে পারবেন সামনে একটা কবর স্থান রেখে। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে শুনছিলো। আমি শেষ করতেই ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে ভ্যান থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল।
-তাইলে আর বসে আছেন কেন? চলেন। বুড়িগঙ্গার পারে কোথাও কবরস্থান আছে বলে জানি না। শুনি নি কখনো। সেখানে জায়গাটা কেমন? সাপ-খোপ আছে নাকি? কবরস্থান’ই তো একটা ভালো ছবি তোলার সাবজেক্ট। আর যদি আপনে বলতে চান সেই জায়গার ভিতর থেকে এই নদীটার ওয়াইড এ্যঙ্গেল ভিউ পাবো; তাইলে আমি বলবো, আপনে বাড়ায় বলতেসেন। কারণ সে ধরনের ভিউ বাড়ির ছাদ ছাড়া পাওয়া সম্ভব না। এসব বলতে বলতে আমরা কিন্তু হাঁটতে শুরু করেছি। মেয়েটি ননস্টপ বকেই যাচ্ছে। বলছে, আমি বুঝতে পারতেসি না আসলে। এই এলাকায় কোনো কবরস্থান আছে এমনও শুনি নাই। এসব কারণে টেনশন বাড়ছে। চলেন তো তাড়াতাড়ি। আর একটা কথা এইদিকে কোনো চাএর দোকানে বসে মজা পাইলাম না এখনো। বসার মতো কোনো দোকানই পাইলাম না আসলে। ওই দোকানটায় বসে একটু চা খাবেন? তাইলে আমিও এক কাপ খাইতাম।
ততক্ষণে পুরোনো আমের্নীয় গোরস্থানটার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি। মেয়েটির চা খেতে ইচ্ছে করছে, তাকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। সমস্যা হলো এই দোকানটায় মহল্লার ছেলে-পিলে আড্ডা মারে সারাদিন। আমিও একসময় বন্ধুদের সঙ্গে এ দোকানে বসে প্রচুর সময় কাটিয়েছি। একই সে বাগানে আজ এসেছে নতুন কুঁড়ি, শুধু সেই সেদিনের মালি নেই। এখন বন্ধুরা আর সময় পায় না, আমিও কোনো সুযোগ পাই না। হয়তো কালে-ভদ্রে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে একটু হাঁকডাক করে এখানে বসা হয়।
মেয়েটাকে নিয়ে ঢুকলাম। পোলাপান আমাকে এসময় এখানে দেখে একটু চুপ করে গেল বুঝলাম। মেয়েটি অবশ্য ষড়যন্ত্রীদের মতো গলায় বললো, দেখেছেন। আমরা ঢুকতেই বদমাশ ছেলেগুলো কেমন সুলসুল করে তাকাচ্ছে। আমি মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকালাম। নাহ্ দেখে তো আমার সমবয়েসীই মনে হয়। কিন্তু প্রায় বাচ্চা মেয়েদের মতো চিন্তা-ভাবনা। অবশ্য শহরের ইভ টিজারগুলোর কল্যাণে মেয়েরা এরচে’ ভালো ধারণাও খুব যে জোগাড় করতে পারে তা নয়।
আমি শুধু মনে মনে চাচ্ছিলাম, এরা যে আমার পরিচিত সেটা বের না হয়ে পড়ুক। সুবিধাটা মেয়েটাই করে দিলো। সে পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা নিজে ধরালো, তারপর প্যাকেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। অপরিচিত প্যাকেট। নিউমার্কেটের সামনে বোধহয় এ ধরনের সিগারেট দেখেছি। সেগুলোর কোনটিই আমার ভালো লাগে না। আর ওগুলো বোধহয় রেগুলার সিগারেটের মতো করে খাওয়ার জন্যও না। আমি তাই নেবো না এমন একটা ভাব চেহারায় ফুটিয়ে তুলতেই; সে মাথা নেড়ে বললো, দারুণ সিগারেট। খেয়ে দেখেন। আপনে কি সিগারেট খান? বেনসন? আমি অবশ্য গোল্ড লীফ খাই। আর যখন দেশের বাইরে ছিলাম তখন ক্রোলিজ খেতাম। সেদিন এক বন্ধু দেশে ফিরেছে। তাকে বলে রেখেছিলাম আমার জন্য ক্রোলিজ নিয়ে আসতে। কয়দিন এটা খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। ঢাকায় অনেক জায়গায় খুঁজেছি। পাই নি। দু’একজন এনে দিতে চেয়েছে, কিন্তু সেজন্য প্রচুর দাম দিতে হবে। তাহলে তো আর সিগারেট খাওয়া পোষায় না। নেন, একটা ধরান।
জিনিসটা টানতে ভালোই লেগেছিলো। আমি পরে আরো একটা রেখে দিয়েছিলাম। চা-সিঙ্গারা আর সিগারেট শেষে দোকান থেকে বের হলাম। গোরস্থানে ঢুকে অবশ্য আমারই একটু গা ছমছম করে উঠলো। বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর কাছেই জায়গাটা। এখানে রাস্তার পাশেই লোকালয়। মানুষের বাসা-বাড়ি। দোকান-পাট কম আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। তাই বারোয়ারী মানুষের আনাগোণাও কম। মোড়ের বাইরেই অনেক বড় বড় আড়ৎ আছে। কিন্তু এই ভেতরে সেখানকার কোনো লোক ঢোকে না। আমার গা প্রথমে ছমছম করছিলো কারণ, ছোটবেলায় এই গোরস্থানটায় বন্ধুদের সঙ্গে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি। এরপরে আর তেমন একটা এখানে আসি নি। এরমধ্যে অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। যেমন দেখে গিয়েছিলাম তেমন সবকিছু নেইও। কবরগুলো ভেঙ্গে গেছে। অনেকগুলো কবরের সামনে ইংরেজীতে নামফলক লেখা ছিলো। কোনটিই চোখে পড়লো না। একটা ঝাকড়া কড়ই গাছ চোখে পড়লো। এটাকে অনেক ছোট দেখেছিলাম। এখন একটা ভয়ংকর চেহারা হয়েছে ওর। দিনের বেলায়ও ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে একটা শিহরণে আক্রান্ত হওয়ার পরিবেশ। আক্রান্ত হলামও। টের পেলাম মেয়েটিও আক্রান্ত হয়েছে। আমি দেখেছি, যে মেয়ে বাস্তব জীবনে যতো বেশি সাহসী, সে অবাস্তব ভুতের ভয়ে আক্রান্ত হয় তত বেশি। ও বোধহয় ঢোকার সময়ই একবার ‘ঢুকবো না’ বলে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু নেহায়েত চক্ষুলজ্জার খাতিরে পারে নি হয়তো। বুঝতে পারছি, সহজ হওয়া যাচ্ছে না।
এরমধ্যেই ককর্শ তীক্ষ্ণ সুরে কানের কাছেই কোথাও একটা অচেনা পাখি লম্বা একটা ডাক দিয়ে বসলো। একদম কানের খুব কাছেই কোথা থেকে। এত হঠাৎ করে যে, মস্তিষ্কে গিয়ে ইকো হলো সেই ডাকের। চমকে মেয়েটি আমার হাত খামচে ধরলো।
এই আচমকা পাখির ডাকটি আমাদের দু’জনের জন্য খুব দরকার ছিলো। কারণ খামচিটা দিয়েই মেয়েটি হেসে উঠলো খিল খিল করে। পরিবেশটা সহজ হয়ে গেল। ও বললো, কি একটা জায়গায় নিয়ে যে আসলেন! পুরা হরর মুভির সেট। এইখানে কিসের যে ছবি তুলি। কোনটা রাইখা কোনটা যে তুলি আসলেই বুঝতেসি না। আসেন আপনের আরেকটা ছবি তুলি। একটু সিস্টেম করে বসায় দিলে আপনারে মনে হবে গোরস্থানে নিজের কবরের পাশে বসে আছে একজন অতৃপ্ত মানুষ। কি কন?
আমি মেয়েটিকে নিয়ে একদিকে খানিকটা জংলামতো পথ পার হয়ে, দেয়ালের কাছে এসে সামনে তাকাতে ইশারা করলাম। এখানে থেকে লঞ্চঘাট, পুরো নদী আর বুড়িগঙ্গা সেতু- একসাথে দেখা যায়। মেয়েটি দেখলাম বেশ অবাক হলো। সদরঘাটের আবর্জনামুখর পরিবেশে এমন একটা দৃশ্য আসলে একদমই অচিন্ত্যনীয়। মেয়েটি অবশ্য কোনো ছবি নিলো না। বললো, চলেন। আজকে এই ছবিটা নেবো না। আরেকদিন এসে নিয়ে যাবো। আজকে অন্য কোথাও যাই।
গোরস্থান থেকে বের হয়ে মেয়েটিকে বললাম, যান। আমিও চলে যাই।
-আপনে কই যাবেন? এইমাত্র না আমার সঙ্গে অন্যকোথাও যাইতে রাজি হলেন?
আমি তো বাসায় যাবো। আপনার সঙ্গে যাওয়ার জন্য আমি হইসি কখন?
আমার হাসি দেখে তার অবশ্য কোনো ভাবান্তর হলো না। বললো, আপনেই তো রাজি হইলেন। চলেন এখন কেরানীগঞ্জের ওদিকে যাই। আমার নানুর বাসা আছে। দারুণ সুন্দর গ্রাম। ঘুরে আসি। ক্ষুধাটাও লাগছে আস্তে আস্তে। গিয়ে কিছু ফ্রেশ ফুড খেয়ে আসি। আপনার আরো কয়েকটা চমৎকার ছবি তুলে দিবো। আপনে আমাকে রিয়েলি এপ্রিশিয়েট করার আরো সুযোগ পাবেন। চলেন।
প্রায় প্রমাদ গুণলাম মনে মনে। কারন একটা জায়গায় গিয়ে কথা কম বলার কারণে কি কি বিপত্তিতে পড়তে হয়, তা আমি জানি। আমাকে নিয়ে কেউ কোথাও গেলে সে নিজেই প্রথমে একচোট বিরক্ত হয়। বুঝতে পারলাম না, এই মেয়েটা শেষ পর্যন্ত আমার ওপর কি পরিমাণ বিরক্ত হবে। আবার এমনভাবে বলছে যে, কোনো শক্ত অজুহাত থাকলে অসুবিধা হতো না। নেই তাই যত অসুবিধা। বিপাক হয়ে গেল।
এরকম সময়ে আমি সাধারণত যা করি, তাই করলাম। চুপ-চাপ হাঁটতে থাকলাম। মেয়েটির একটা বিষয় আমার ভালো লাগছিলো। হাঁটতে পারে প্রায় আমার মতোই। বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে রিকশা ছেড়ে আবার হাঁটা শুরু হলো। এইদিকে পুরোই গ্রামাঞ্চল। হাতের তালুর মতো চিনি সব এলাকা। কিন্তু কথা হলো, হাঁটা দুরত্বে নানুর বাসা হলে যদি পরিচিত কেউ বের হয়ে আসে?
মেয়েটির আরো একটা জিনিস দেখলাম, ছবি তোলায় কোনো ক্লান্তি নেই। খারাপ লাগছিলো না। দুপুরনাগাদ ওর নানুর বাড়িতে পৌছে গেলাম। বাড়িতে মানুষ দুইজন। নানা আর নানু। সেখানে প্রচুর খানা-খাদ্যের আয়োজন করা ছিলো। কি উপলক্ষে কে জানে। আমি কাউকে কিছু না বলে মেয়েটির পাশে বসে প্রচুর পরিমাণ খেয়ে নিলাম। আমার সবসময়ই খেতে ভালো লাগে।
খেয়ে কিছুক্ষণ আমরা দু’জন দাবা খেলতে খেলতে নানা-নানুর সঙ্গে গল্প করলাম। মেয়েটির নানাভাই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক। নেতাজী’র অনুসারী লোক ছিলেন। তার ঝোলা একবার খুললে মজার মজার গল্পের দীর্ঘ লাইন লেগে যায়। এর মধ্যে আমার হাতি এবং ঘোড়া দুইটা কাটা পড়লো। ভালো ভালো। দাবা খেলা সহজ ব্যপার না। এজন্য ভাবনা-চিন্তার জোর থাকতে হয়। মেয়েটি আসলেই দারুণ ভাবতে পারে। কিন্তু স্বীকার করে না। ইচ্ছে হয় না মনে হয়।
একটা বিষয় হচ্ছে ডানহাতি মানুষের বামদিক আর বামহাতি মানুষের ডানদিক থেকে সামলে চলতে হয়। আমি বাঁহাতি মেয়েটির ডানদিকে সৈন্য দিয়ে ব্যস্ত করে বামদিকে মন্ত্রী আর কিশতি দিয়ে আক্রমণ চালালাম। মেয়েটির ঘোড়াও আড়াই চালে কম বিরক্ত করছিলো না। আমি শুধু ওকে পরিচিত চালগুলো দিতে দিচ্ছিলাম না।
তবে নিজের ভুল কয়েকটা চালে হঠাৎ সবকিছু প্রায় তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়লো। আমি একটু নানা’র গল্প শোনায় মনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম। তিনি সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর বিরোধের ব্যপারে একটা বক্তব্য দিচ্ছিলেন গল্পের মধ্য দিয়ে। মনোযোগ দিয়ে না শুনে উপায় ছিলো না। কারণ তিনি ঘটনাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। নানু’ই তাকে ধমকে থামালেন, দেখছো ছেলেটা তোমার কথায় তাল দিতে গিয়ে প্রায় হারতে বসেছে। সাবাস বেটি, চালিয়ে যা।
নানাভাই ক্ষেপে উঠলেন। কি এত বড় কথা! তবে রে বেটি। আমার ঘরে আসা মেহমানকে তুই দাবা খেলায় হারানোর সাহস দেখাস। দাঁড়া এখনই সব ঠিক করে দিচ্ছি। বুড়িটাকেও একটা জবাব নিশ্চই দিতে হবে।
খুব মজা লাগলো। এই মেয়েটাও ভীষণ পাজি। কোথা থেকে খেলা শিখেছে কে জানে। আমাদের পাড়ার ক্লাবে এ মেয়েটিকে পেলে নিশ্চই বছর বছর শিল্ড জিতে আসতাম। শেষ পর্য্যন্ত খেলা ড্র হলো। আমার একলা রাজা ধরতে চায় খালি দুইটা ঘোড়া আর একটা মন্ত্রী দিয়ে। তাও মাত্র ষোল চালের ভেতর। এতই সোজা?
খেলা শেষ করে আবার বের হলাম। মেয়েটির কাহিনী বুঝতে পারছি না। ওর নানুর বাসায় গিয়ে খুব ভালো লেগেছে। কেউ আমাকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করে নি। সবাই কেমন ধীর-স্থির, শান্ত, চুপ-চাপ। এমন সাধারণত দেখা যায় না। তবে এই মেয়েটি ননস্টপ বকবক করতে পারে।
এবার গ্রামের কিছুটা ভেতরে চলে গেলাম। এখানে একটা শাখা এসেছে বুড়িগঙ্গার। শাখা দিয়ে শুধু নদীর পানিই এসেছে। আর কোনো উপসর্গ পিছে পিছে ভেসে আসে নি। শান্ত-নিস্তব্ধ মাটির ওপর বসে দূরের কাশবনে কাশ ফুলের নড়া-চড়া দেখতে তাই বেশ ভালো লাগছিলো। আশপাশেও কেউ নেউ। নির্জনতাই ছিলো তখনকার সবচে’ দরকারী উপাদান। আর সে মহার্ঘ্যের ছড়াছড়িও ছিলো ভীষণ। দারুণ একটা পরিবেশ।
হঠাৎ স্থানীয় ছেলেপিলেদের একটা দল নির্জনতা ভেঙ্গে খুব হৈ চৈ লাগিয়ে দিলো। ওরা মনে হয় কোনো বিয়ে-বাড়িতে বিয়ে খেতে গিয়েছিলো। সেখান থেকে ফেরার পথে এই অদম্য উল্লাস। বয়সেরও তো একটা ব্যপার আছে। আমি ওদের বয়েসী থাকাকালে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে বিয়ে খেতে যেতাম। দাওয়াত ছাড়া বিয়ে খাওয়ার মতো মজার কাজ খুব কমই আছে। ছেলেদের হৈ-হুল্লোড় দেখতেও ভালো লাগছিলো। ওরা সরে যাবার পর আরো কিছুক্ষণ বসে থেকে আমরা দু’জন উঠে পড়লাম।
সেদিন এপার ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। অবশ্য আমি বাসায় না ঢুকে মেয়েটিকে নিয়ে অগ্রসর হলাম। ভাবলাম অন্ধকারে ওকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি। সেটা অবশ্য বড়-সড় একটা ভুল ডিসিশন ছিলো। কেননা রিকশায় বকবকিয়ে সে আমার কানের পোকা নাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য সেজন্য আমিই দায়ী। কারণ কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো আমারই বেশি।
কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা না বলে বলে, সব নিয়ম-কানুন ভুলে গেছি। একটা মেয়ের সঙ্গে কি টাইপ কথা বলে আলাপ চালাতে হয় সেটা বুঝতে পারছিলাম না। ওকে একসময় জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বয়স কত? এই প্রশ্নটা শুনে হয়তো রেগে যাওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু না রেগে সে গোরস্থানের সেই খিলখিল হাসি দিয়ে বসলো আবার। তখনই আমার মনে পড়লো, মেয়েদেরকে আর ছেলেদেরকে জিজ্ঞেস না করার আলাদা আলাদা কিছু প্রশ্ন আছে। তার মধ্যে একটা নাড়িয়ে দিয়েছি। কি মর্কট আমি!
তারপরের প্রশ্নটা ছিলো আরো ভয়াবহ। আপনি কি ম্যারেড? মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচু-নিচু করে বললো, নো। আমি বললাম, জানতে চান আমি ম্যারেড কি না? মেয়েটি আবারো একইভাবে বললো, নো। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, আসলে আমার পক্ষে আলাপ-আলোচনা চালানো সম্ভব না। কোনোকালে সম্ভব ছিলোও না। তারচে’ আপনে কথা বলেন, আমি শ্রোতা ভালো। আমি শুনি।
আর কই যে যাই! মেয়েটি শুরু করলো প্রাইমারী স্কুল থেকে। শেষ করলো বিদেশে ছেলেরা কিভাবে বাঙালি মেয়েদের দেখে লুল ফেলে সেখানে এসে। এরপরে আজ সকালের কাহিনী। যার কিছু কিছু আগেই শোনা আমার। সে আমাকে দুর থেকে বসে থাকতে দেখে ভেবেছে আমার বোধহয় মন খারাপ। তাই প্রথমে গিয়ে একটা ছবি তুললো পেছন থেকে। এরপর বসলো খানিক আলাপ করার জন্য। স্বাভাবিকভাবে মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করলে যেকোন ছেলের মন কিছুটা ভালো হয়। এই মহান উদ্দেশ্য পালনের জন্যই নাকি সকালে আমাকে গিয়ে পেছন থেকে ডাক দেয়া। কিন্তু বিধি বাম। আমি নাকি ফেভিকলের মতো চিপকে গেলাম।
আমার কেবল ভালো লাগলো যখন বাসার সামনে পৌছে রিকশা থেকে নেমে সে বললো, কিন্তু খানিক আলাপ করেই আপনাকে ছেড়ে দিই নি কেন জানেন? কারণ আপনার প্রথম কথাটা শোনার পর থেকে আর ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না। আরো অনেক কথা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। অবশ্য আপনে এত কম কথা বলেন যে হইলো না কিছুই। যাক্ বেটার লাক নেক্সট্ টাইম। সী ইয়্।
বললাম, আই উইশ। ফিরে আসলাম বালুর ঘাটে। ব্যপারটা নিয়ে ভাবতে হবে।
---
মন্তব্য করুন