গল্প: পরোপকারী কাঁচপোকার ভিউফাইন্ডারে চড়ে কাটানো একটি দিন
আমি ছোটবেলা থেকেই কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। যে কারণে বাসায় কারুর সঙ্গে আমার সেই সখ্যতাটি নেই, যেটি বাবা-মাএর সঙ্গে থাকে ছেলের কিংবা ভাইএর সঙ্গে থাকে ভাইএর। নিজের মতো করে বড় হয়েছি। নিজের মতো করে পাশ দিয়েছি। এখন নিজের মতো করে দিন কাটাচ্ছি। খারাপ লাগে না বটে। আবার মাঝে মাঝে খানিকটা একাকীত্ব অনুভব করি।
মধ্যবিত্তের সংসারে আমার কিছু বিলাসীতার অভ্যাস আছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধূমপান। সেই কাজটি করার জন্য যা ব্যায় হয় সেটুকু নিজেই আয় করি। এছাড়া সংসারে একটি বাড়তি মানুষ থাকার কিছু খরচ আছে। সে খরচও নিজে জোগাই। এর বাইরে তেমন কোনো কাজ করি না। শুয়ে শুয়ে ভাবি। ছোটভাইটা মাঝে মাঝে এসে জ্বালাতন করে। ও-ও খানিকটা আমার মতো। চুপ-চাপ প্রকৃতির। কিন্তু চুপ-চাপ থাকার লাভ কি- সেটা সে জানে না। তাই আমাকে পেলে কখনো হয়তো জানতে চায়, ভাইয়া এত চুপ করে থাকিস কেন?
বাবা অনেক সময় রাতে আমার ঘরে আসেন। বিছানার ওপর পা তুলে বসেন। তিনি সিগারেট খাওয়া ছেড়েছেন বহু আগে। তখন বোধহয় আমি ছোট ছিলাম। একদিন আমাকে তার প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ‘আমি খাবো, আমি খাবো’ বলে তারস্বরে চেঁচাতে দেখে তিনি নাকি আম্মুকে বলেছিলেন, এইবেলা আমি ক্ষ্যান্ত দিই। নাহলে যে ছেলের ভাগে কম পড়বে। এরপর থেকে আর কখনো নিয়ম করে ধূমপান করেন নি।
তবে আমার ঘরে এলে মাঝে সাঝে তিনি একটা সিগারেট ধরান। আমাকে কখনোই তিনি তেমন কোনো প্রশ্ন করেন না। শরীরের খবরটা জানতে চান। নিজের শরীরের খবরও জানান। বেশ কিছুটা সময় হয়তো চুপ করে বসে থাকেন। আমার কোনোকিছু লাগবে কি না জিজ্ঞেস করেন। আমার তেমন কিছু লাগে না। তাও বলি, দেখি সামনের মাসে মনে হয় কিছু টাকা লাগবে। যদিও বিষয়টা এই বলা পর্যন্তই। তবে বাবা যে আমার রুমে এসে বসতে পছন্দ করেন সেটা আমি জানি। তিনি আসলে আমারো ভালো লাগে। কিন্তু সেটা তাকে বুঝতে দিই না।
মা’কে নিয়ে কোনোকথা আসলে বলা যাবে না। তিনি ডেঞ্জারাস্ মানুষ। আমি যখন তার আশেপাশে থাকি তখন আমাকে বকে বকে তার সময় কাটে। এটা মোটামুটি তার প্রধানতম কাজগুলোর মধ্যে একটা। আমার মতো একটা অসামাজিক প্রাণী তিনি কিভাবে পেটে ধরেছিলেন, তা এখন আর বুঝতে পারেন না। যখন ধরেছিলেন তখনও বুঝতে পারেন নি। তার অনেক সন্দেহ আছে, আমার শরীরে বোমা মারলেও আমি হয়তো কোনো কথা বলবো না। চুপ-চাপ মরে যাবো। এমন ছন্নছাড়া কেন আমি? বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দিয়ে বসে আছি, অথচ নিজেকে নিয়ে কিছু ভাবছি না! কোনো এ্যম্বিশনও নেই। এমন নরাধমও জগতে পাওয়া যায়!
তার অনেক অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা। মাঝে মাঝে তিনি চক্রান্তকারীর মতো স্বরে আমাকে বলেন, তোর ছোটখালা একটা মেয়ের কথা বলেছিলো। মেয়ে ভালো ছাত্রী। অনেক বিদ্বান। আমি বলি, আমি ক্লাসের তৃতীয় সারির ছাত্র। আমার সঙ্গে একজন বিদ্বান’কে জুড়ে দিলে তার সঙ্গে অবিচার করা হবে। এরপর তিনি আরো যুক্তি দিতে চান। সেগুলো না শুনেই আমি কেটে পড়ি। বাসায় খুব কম সময় থাকি, কারণ যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ না চাইলেও আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়। মাঝে মাঝে কথা বলতেও হয়।
এসবের চেয়ে মহল্লার শেষ মাথার বালুর ঘাটটা আমার অনেক বেশি প্রিয়। আমাদের মহল্লাটা সদরঘাট লাগোয়া। এই বালুর ঘাটে শুধুমাত্র বালুবাহী স্টীমারগুলো এসে ভেড়ে। চলাচল করে। আমি ঘাটটা খুব পছন্দ করি। দিন কিংবা রাতের সবরকম সময়ে আমি ঘাটটায় বসে থেকে দেখেছি। সবসময়ই ভালো লেগেছে। মানুষ সদরঘাট এলে পারতপক্ষে ওয়াইজ ঘাটের পর আর পা দেয় না। আহসান মঞ্জিলের পেছনে ফল-ফলাদি’র পচাঁয় ভরা যে ফুটপাথ, অভ্যস্ত না হলে সে জায়গা পেরোতে বমি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কষ্ট করে ফলের আড়ৎগুলো একটু পেরিয়ে এলে একসময় পানির বা আরকিছুর দুর্গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারা বন্ধ করে। তখন কখনো কখনো জায়গাটাকে সত্যি নদীর পাড় বলে মনে হয়। যেমন এই বালুর ঘাটটা। এখানে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা আর বোধিবৃক্ষের নিচে আরামে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেয়া আমার কাছে সমান।
আমার সিস্টেমটা কিন্তু মোটেও আশপাশের মানুষ কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে কনফ্লিকটিং নয়। বরং কো-অপারেটিভ’ই বলা যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মানুষের সঙ্গে কথা কম বলে সোজাসুজি অফিসে চলে যাই। দুপুর পর্যন্ত টানা কাজ। এ সময়টা আমার খুবই প্রিয়। কেউ কোনো কারণেই বিরক্ত করতে আসে না। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। সহকর্মীরা প্রথম প্রথম আমার অন্তর্মুখী স্বভাবে পীড়িত হলেও, এখন বুঝে গেছে আমি এমনই। তাই তারাও এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। দুপুরে কেন্টিনে গিয়ে খাওয়া। খেয়ে বাইরে গিয়ে একটা চা আর একটা সিগারেট। এরপরে আবার অফিসে ফিরে আসা। বিকাল পর্যন্ত কাজের চাপ কম থাকে। এসময় আমি একটু ই-মেইল, টি-মেইল ঘাঁটি। নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরা খাতা সই করে বেরিয়ে যাই।
সৌভাগ্যক্রমে আমার চলাচল পুরোপুরি পদভিত্তিক। এতে একদিকে যেমন শরীর খুশি থাকে, আরেকদিকে তেমন আমি নিজে খুশি থাকি। হাঁটতে হাঁটতে যে কত কথা ভাবা সম্ভব, সেটা আমি ছাড়া আর ক'জন জানে তার ঠিক নেই। তবে সংখ্যাটা যে হাতে গোণাই হবে তা নিশ্চিত। হাঁটতে হাঁটতে কি নিয়ে ভাববো, সেটাও আমি পারত আগে থেকে ঠিক করে রাখি। যাতে সময় নষ্ট না হয়। আমার ভাবতে ভালো লাগে খুব। ঘাটে বসে বসেও আমি মূলত ভাবি। রাজ্যের সব ভাবনা ভেবে ফেলি। সেরকমই সেদিন বসে বসে একটা মেয়ের কথা ভাবছিলাম। অচেনা কোনো একটা মেয়ের কথা ভাবতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো।
কি একটা কারণে যেন সরকার সবাইকে ছুটি দিয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর এদেশে কিছু ছুটি বাতিল হয়। সঙ্গে কিছু নতুন ছুটি পাঁচ বছর পর বাতিল হওয়ার জন্য যোগ হয়। এমনই এক ছুটির দিন সকালে নাস্তা-টাস্তা করে ফেলার পর আম্মুর যন্ত্রণায় ঘরে আর তিষ্ঠানো যাচ্ছিলো না। বাইরে বৃষ্টি হবে হবে একটা ভাব। আকাশ কালো হয়ে আছে অনেকক্ষণ থেকে। কিন্তু বৃষ্টি নামছে না। ভাবলাম শাদা ফুলহাতা শার্টটা পরে ঘাটে গিয়ে বসে থাকি। বৃষ্টি হলে ভিজবো না। কোনো ছাউনিতে ঢুকে বসে থাকবো। কিন্তু বৃষ্টিটাকে লাইভ উপভোগ করা হবে।
ঘাটে বসে বসে ভাবছিলাম ছোটবেলার বন্ধুদের কথা। ছোটবেলার বন্ধুরা বড় হলে কত পরিবর্তিত হয়ে যায়। একবার একটা মেয়ের আমাকে নিয়ে কি চিন্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ছিলো সে। আমি কেন কথা কম বলি তা নিয়ে সে লজ্জাষ্কর চিৎকার-চেঁচামেচি লাগিয়ে দিলো ডিপার্টমেন্টে। মেয়েরা আসলে যে কি পাগল হয়, সেটা ওদেরকে ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না। এই পর্যন্ত ভাবা শেষ হতেই, পেছন থেকে শুনতে পেলাম; এই যে শুনছেন।
পেছনে তাকিয়ে ক্যমেরাহাতে মেয়েটিকে দেখে ভালো লাগলো। কিন্তু সেটা বলতে ইচ্ছে হলো না। চেহারাটা কিউট আছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। দেখছিলাম, কোনো কথা না বলে পূর্ণ মনোযোগে একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে কোনো ভাবান্তর হয় কিনা। মনে হলো কোনো ভাবান্তর হয় না। কারণ মেয়েটিও আমার দিকে থাকিয়ে তাকলো।
বিষয়টা একটা মজার দিকে টার্ন করলো। সে আমাকে একটা প্রশ্ন করেছে। আমি সেটা শুনতে পেয়েছি। প্রশ্নটা এমন যে উত্তর না দিয়েও বুঝিয়ে দেয়া যায়। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি মানে তার কথা শুনছি। কিন্তু তাতে মনে হয় মেয়েটির ঠিক মন উঠছে না। সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন একটা উত্তর ছাড়া নড়বে না। অনেক সময়ে দেখেছি, এ অবস্থায় মেয়েরা অকারণেই ওড়না ঠিক করে। এই মেয়েটি টাইট একটা ফতুয়া পড়ে আছে। কোনো ওড়না নেই। ঠিক করবে কি?
মেয়েটির চোখ থেকে চোখ নামানো যাচ্ছিলো না, কারণ সেও নামাচ্ছিলো না। মনে মনে ভাবার চেষ্টা করলাম, আসলে সে আমাকে কেন ডেকেছে? হয়তো জায়গাটা চিনতে পারছে না বা জায়গাটার নাম জানা দরকার। এইজন্যই হবে। কিন্তু আমি কোনো কথা বলছিলাম না। শুধু তাকিয়ে ছিলাম।
আশপাশে কোনো মানুষ ছিলো না। ছুটির দিন বলেই হয়তো কারোরই বাইরে কোনো কাজ নেই। মেয়েটা এদিক-সেদিক তাকিয়ে, একটা ভ্যানের ওপর পা ঝুলিয়ে বসলো। ভ্যানটা খুব কাছেই তালা দিয়ে রাখা ছিলো। এখানকার কারো হবে।
বসে খানিকটা ভদ্রতার ধার না ধরেই সে আমার একটা ছবি তুলে ফেললো। আশ্চর্য! কারো ছবি তোলার আগে তার একটা অনুমতি নেয়ার চল কি আমাদের দেশে আছে না? যতদূর জানি আছে। তাহলে এটা কেমন কথা হলো? যাক্ তাও কিছু বললাম না। বোঝার চেষ্টা করি কাহিনীটা কি।
বেশ কিছুক্ষণ আপনমনে ক্যমেরায় কিসব খুটখাট করে হঠাৎ সেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, দেখেন কেমন হয়েছে। আমি সেটা হাতে নিয়ে দেখলাম। দেখে প্রায় মুগ্ধ হলাম। আমার মতো বানেভাসা মানুষেরও যে এমন ছবি হতে পারে, চিন্তাই করা যায় না। বললাম, থ্যংক য়ু ভেরী মাচ ম্যা’ম। রিয়েলি এপ্রিশিয়েট দিস্।
শুনে মেয়েটি বললো, আপনের কাছে যে একটা কথা জানতে চাইলাম, সেটার উত্তর দেন নি কেন? আমি তো ভেবে বসেছিলাম অন্যকিছু। আমি বললাম, আপনার কথা শুনতে না পেলে তো আর তাকাতাম না। তাই কথা বলি নি। শুনে মেয়েটি ঠোঁট বাঁকা করে কি একটা জানি ভাব করলো, ঠিক ধরতে পারলাম না। তারপরে বললো, ছবি তুলতে বের হয়েছি আর আকাশে মেঘ উঠে গেছে। কি সমস্যা।
আমি সিরিয়াসলি মাথা নাড়লাম। আসলেই এটা একটা গুরুত্ববহ সমস্যা। মেয়েটি সেই সহানুভূতির মাথা নাড়ানো দেখলো না মনে হয়। উল্টো নিজেই বললো, অবশ্য মেঘের জন্য কোনো সমস্যা নেই। আজকের দিনের ছবিটা অলরেডী নিয়ে ফেলেছি। একটা ঘাট, ঘাটের পরে নদী, নদীর পরে পাকা দালানের জনবসতি আর একটা ছেলে; নদীর দিকে ঠায় তাকিয়ে বসে আছে। ছবিটা তুলে খুশি হইসি। তাই আপনাকে থ্যংকুস্ দিতে চাচ্ছিলাম।
ছবির ব্যাখ্যা শুনে ভালো লাগলো। ব্যাখ্যা দেবার জন্য একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। মেয়েটা বোধহয় ছবি তোলা নিয়ে প্রচুর ভাবে। আমি জানতে চাইলাম সে কথা। সে বললো, না, অতো ভাবনা-চিন্তা করার সময় কই? অফিসের যন্ত্রণায় ঠিকমতো খাওয়া-ঘুমই দিতে পারি না। আর ভাবনা! আজকে একটু ছুটি পাইসি। বাইর হয়ে পড়সি। আসার সময় দুই বান্ধবীরে বলসিলাম। কিন্তু ওরা নাকি ঘুমায় ঘুমায় বিয়া করতেসে। একজন বিয়া করতেসে আরেকজন কন্যার মেইড হইসে। কেউই আসতে চাইলো না। তাই আমি নিজেই এসে পড়লাম। লঞ্চঘাটে ঢুকছিলাম। কিন্তু তেমন কোনো ছবি পাই নি। একটা ছবি শুধু দেখলাম। লঞ্চের ছাদে দুইটা খালি চেয়ার। মনে হইলো জামাই নিয়ে বসে থাকার জন্য একটা পার্ফেক্ট জায়গা। কিন্তু হাতের কাছে সেই সুযোগও নাই। তাই ঘুরে ঘুরে শাটার টিপে বেড়াচ্ছি। আকাশে আলো কম। কম আলোতেই ছবি তুলি। অ্যালবামের নাম দিবো, পরোপকারী কাঁচপোকার ভিউফাইন্ডারে চড়ে কাটানো একটি দিন। কভারে আপনের ছবিটা থাকবে। যেটা পেছন থেকে নিয়েছি।
হঠাৎ কেন যেন বললাম, আমার পোর্ট্রেটটা কিন্তু অ্যালবামে দেয়া যাবে না। মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেললো। কেন ভাবী দেখে ফেলবে না কি? অসুবিধা নাই। আমি ফেসবুকে দেবো না। অন্য জায়গায় তুলবো। আমি বললাম, যেখানেই তোলেন আমি কিংবা আমার পরিচিত কেউ দেখার সুযোগ নাই। কিন্তু তাও ওই ছবিটা দিয়েন না।
-ঠিক আছে। আপনার বিষয়টা আসলে বুঝতে পারছি না। আপনার বাসা কৈ?
সেটা দিয়ে কি করবেন? আপনাকে আমি আরো ভালো একটা ছবির আইডিয়া দিতে পারি। নদী, নদীর স্টীমার, লঞ্চ, নৌকা, সবকিছু একসাথে নিয়ে ফেলতে পারবেন। নদীটা যে মরে যাচ্ছে সেটা বোঝাতে পাবেন ছোট্ট একটা কবরস্থান। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে শুনছিলো। আমি শেষ করতেই ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে ভ্যান থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল।
-তাইলে আর বসে আছেন কেন? চলেন। বুড়িগঙ্গার পারে কোথাও কবরস্থান আছে বলে জানি না। জায়গাটা কেমন? সাপ-খোপ আছে নাকি? কবরস্থান’ই তো একটা ভালো সাবজেক্ট। আর যদি আপনে বলতে চান সেই জায়গার ভিতর থেকে এই নদীটাও পাবো ওয়াইড এ্যঙ্গেলে; তাইলে আমি বলবো, বাড়ায় বলতেসেন। কারণ সে ধরনের ভিউ বাড়ির ছাদ ছাড়া পাওয়া সম্ভব না। এসব বলতে বলতেই আমরা কিন্তু হাঁটতে শুরু করেছি। মেয়েটি ননস্টপ বকেই যাচ্ছে। একটা মানুষ এত কথা কিভাবে বলে? শুনলাম সে বলছে, আমি বুঝতে পারতেসি না আসলে। এই এলাকায় কোনো কবরস্থান আছে কখনোই শুনি নাই। টেনশন বাড়ছে, চলেন তো তাড়াতাড়ি। আর একটা কথা এইদিকে কোনো চাএর দোকানে বসে মজা পাইলাম না এখনো। বসার মতো কোনো দোকানই পাইলাম না আসলে। ওই দোকানটায় বসে একটু চা খেয়ে নেবেন নাকি?
ততক্ষণে পুরোনো আমের্নীয় গোরস্থানটার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি। মেয়েটির চা খেতে ইচ্ছে করছে, তাকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। সমস্যা হলো এই দোকানটায় মহল্লার ছেলে-পিলে আড্ডা মারে সারাদিন। আমিও একসময় বন্ধুদের সঙ্গে এ দোকানে বসে প্রচুর সময় কাটিয়েছি। একই সে বাগানে আজ এসেছে নতুন কুঁড়ি, শুধু সেই সেদিনের মালি নেই। এখন বন্ধুরা আর সময় পায় না, আমিও কোনো সুযোগ পাই না। হয়তো কালে-ভদ্রে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে একটু হাঁকডাক করে এখানে বা অন্যকোথাও বসা হয়।
মেয়েটাকে নিয়ে ঢুকলাম। পোলাপান আমাকে দেখে চুপ করে গেল বুঝলাম। মেয়েটি অবশ্য ষড়যন্ত্রীদের মতো গলায় বললো, দেখেছেন। আমরা ঢুকতেই বদমাশ ছেলেগুলো কেমন সুলসুল করে তাকাচ্ছে। আমি মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকালাম। নাহ্ দেখে তো আমার সমবয়েসীই মনে হয়। কিন্তু প্রায় বাচ্চা মেয়েদের মতো চিন্তা-ভাবনা। অবশ্য শহরের ইভ টিজারগুলোর কল্যাণে মেয়েরা এরচে’ ভালো ধারণাও খুব যে জোগাড় করতে পারে তা নয়।
সে জিন্সের পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা নিজে ধরালো, তারপর প্যাকেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। অপরিচিত প্যাকেট। নিউমার্কেটের সামনে বোধহয় এ ধরনের প্যাকেট দেখেছি। সেগুলোর কোনটিই আমার ভালো লাগে না। আর ওগুলো বোধহয় রেগুলার সিগারেটের মতো করে খাওয়ার জন্যও না। আমি তাই নেবো না এমন একটা ভাব চেহারায় ফুটিয়ে তুলতেই; সে মাথা নেড়ে বললো, দারুণ সিগারেট। খেয়ে দেখেন। আপনে কি সিগারেট খান? বেনসন? আমি অবশ্য গোল্ড লীফ খাই। আর যখন দেশের বাইরে ছিলাম তখন ক্রোলিজ খেতাম। সেদিন এক বন্ধু দেশে ফিরেছে। তাকে বলে রেখেছিলাম আমার জন্য ক্রোলিজ নিয়ে আসতে। কয়দিন এটা খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। ঢাকায় অনেক জায়গায় খুঁজেছি। পাই নি। দু’একজন এনে দিতে চেয়েছে, কিন্তু সেজন্য প্রচুর দাম দিতে হবে। তাহলে তো আর সিগারেট খাওয়া পোষায় না। নেন, একটা ধরান।
জিনিসটা টানতে ভালোই লেগেছিলো। আমি পরে আরো একটা রেখে দিয়েছিলাম। চা-সিঙ্গারা আর সিগারেট শেষে দোকান থেকে বের হলাম। গোরস্থানে ঢুকে অবশ্য আমারই একটু গা ছমছম করে উঠলো। বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর কাছেই জায়গাটা। এখানে রাস্তার পাশেই লোকালয়। মানুষের বাসা-বাড়ি। দোকান-পাট কম আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। তাই বারোয়ারী মানুষের আনাগোণাও কম। মোড়ের বাইরেই অনেক বড় বড় আড়ৎ আছে। কিন্তু এই ভেতরে সেখানকার কোনো লোক ঢোকে না। আমার গা প্রথমে ছমছম করছিলো কারণ, ছোটবেলায় এই গোরস্থানটায় বন্ধুদের সঙ্গে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি। এরপরে আর তেমন একটা এখানে আসি নি। এরমধ্যে অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। যেমন দেখে গিয়েছিলাম তেমন সবকিছু নেইও। কবরগুলো ভেঙ্গে গেছে। অনেকগুলো কবরের সামনে ইংরেজীতে নামফলক লেখা ছিলো। কোনটিই চোখে পড়লো না। একটা ঝাকড়া কড়ই গাছ চোখে পড়লো। এটাকে অনেক ছোট দেখেছিলাম। এখন একটা ভয়ংকর চেহারা হয়েছে। দিনের বেলায়ও ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে একটা শিহরণে আক্রান্ত হওয়ার পরিবেশ। আক্রান্ত হলামও। টের পেলাম মেয়েটিও আক্রান্ত হয়েছে। আমি দেখেছি, যে মেয়ে বাস্তব জীবনে যতো বেশি সাহসী, সে অবাস্তব ভুতের ভয়ে আক্রান্ত হয় তত বেশি। ও বোধহয় ঢোকার সময়ই একবার ‘ঢুকবো না’ বলে দিতে চেয়েছিলো। নেহায়েত চক্ষুলজ্জার খাতিরে পারে নি। বুঝতে পারছি, সহজ হওয়া যাচ্ছে না।
এরমধ্যেই কানের খুব কাছে অচেনা একটা পাখি লম্বা ককর্শ স্বরে ডেকে উঠলো। এত হঠাৎ করে যে, মস্তিষ্কে গিয়ে ইকো হলো সেই ডাকের। চমকে মেয়েটি আমার হাত খামচে ধরলো। এই আচমকা পাখির ডাকটি আমাদের খুব দরকার ছিলো। কারণ খামচিটা দিয়েই মেয়েটি হেসে উঠলো খিল খিল করে। পরিবেশ হঠাৎ বেশ সহজ হয়ে গেল। ও বললো, কি একটা জায়গায় নিয়ে যে আসলেন! পুরা হরর মুভির সেট। এইখানে কিসের যে ছবি তুলি, আসলে কোনটা রাইখা কোনটা তুলি বুঝতেসি না। আপনারে একটু সিস্টেম করে বসায় দিলে মনে হবে গোরস্থানে নিজের কবরের পাশে বসে আছে একজন অতৃপ্ত মানুষ। কি কন?
আমি মেয়েটিকে নিয়ে একদিকে খানিকটা জংলামতো পথ পার হয়ে, দেয়ালের কাছে এসে সামনে তাকাতে ইশারা করলাম। এখানে থেকে লঞ্চঘাট, পুরো নদী আর বুড়িগঙ্গা সেতু- একসাথে দেখা যায়। মেয়েটি দেখলাম বেশ অবাক হলো। সদরঘাটের আবর্জনামুখর পরিবেশে এমন কোনো নয়নাভিরাম দৃশ্য অচিন্ত্যনীয়। মেয়েটি অবশ্য কোনো ছবি নিলো না। বললো, আজকে এই ছবিটা নেবো না। আরেকদিন এসে নিয়ে যাবো। চলেন। আজকে অন্য কোথাও যাই।
গোরস্থান থেকে বের হয়ে মেয়েটিকে বললাম, যান। আমিও চলে যাই।
-আপনে কই যাবেন? এইমাত্র না আমার সঙ্গে অন্যকোথাও যাইতে রাজি হলেন?
আমি তো বাসায় যাবো। আপনার সঙ্গে যাওয়ার জন্য আমি রাজি হইসি কখন?
আমার হাসি দেখে তার অবশ্য কোনো ভাবান্তর হলো না। বললো, আপনেই তো রাজি হইলেন। চলেন এখন কেরানীগঞ্জের ওদিকে যাই। আমার নানুর বাসা আছে। দারুণ সুন্দর গ্রাম। দুপুরের ক্ষুধাটাও হালকা হালকা টের পাচ্ছি। কিছু ফ্রেশ ফুড দরকার শরীরের জন্য। আপনার আরো কয়েকটা চমৎকার ছবি তুলে দেবো নাহয়। আমাকে রিয়েলি এপ্রিশিয়েট করার আরো সুযোগ পাবেন। চলেন।
প্রায় প্রমাদ গুণলাম মনে মনে। কারন একটা জায়গায় গিয়ে কথা কম বলার কারণে কি কি বিপত্তিতে পড়তে হয়, তা আমি জানি। আমাকে নিয়ে কেউ কোথাও গেলে সে নিজেই প্রথমে একচোট বিরক্ত হয়। বুঝতে পারছিলাম না, এই মেয়েটা শেষ পর্যন্ত আমার ওপর কি পরিমাণ বিরক্ত হবে।
চুপ-চাপ হাঁটছিলাম। মেয়েটির একটা বিষয় ভালো লাগছিলো। হাঁটতে পারে প্রায় আমার মতোই। বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে রিকশা ছেড়ে আবার হাঁটা শুরু হলো। এইদিকে পুরোই গ্রামাঞ্চল। হাতের তালুর মতো চিনি সব এলাকা। কিন্তু কথা হলো, হাঁটা দুরত্বে নানুর বাসা হলে যদি পরিচিত কেউ বের হয়ে আসে?
মেয়েটির আরো একটা জিনিস দেখলাম, ছবি তোলায় কোনো ক্লান্তি নেই। খারাপ লাগছিলো না। দুপুরনাগাদ ওর নানুর বাড়িতে পৌছে গেলাম। বাড়িতে মানুষ দুইজন। নানা আর নানু। সেখানে প্রচুর খানা-খাদ্যের আয়োজন করা ছিলো। কি উপলক্ষে কে জানে। আমি কাউকে কিছু না বলে মেয়েটির পাশে বসে প্রচুর পরিমাণ খেয়ে নিলাম। আমার সবসময়ই খেতে ভালো লাগে।
খেয়ে কিছুক্ষণ আমরা দু’জন দাবা খেলতে খেলতে নানা-নানুর সঙ্গে গল্প করলাম। মেয়েটির নানাভাই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক। নেতাজী’র অনুসারী লোক ছিলেন। তার ঝোলা একবার খুললে মজার মজার গল্পের দীর্ঘ লাইন লেগে যায়। এর মধ্যে আমার হাতি এবং ঘোড়া দুইটা কাটা পড়লো। ভালো ভালো। দাবা খেলা সহজ ব্যপার না। এজন্য ভাবনা-চিন্তার জোর থাকতে হয়। মেয়েটি আসলেই দারুণ ভাবতে পারে। কিন্তু স্বীকার করে না। ইচ্ছে করেই করে না মনে হয়।
একটা বিষয় হচ্ছে ডানহাতি মানুষের বামদিক আর বামহাতি মানুষের ডানদিক থেকে সামলে চলতে হয়। আমি বাঁহাতি মেয়েটির ডানদিকে সৈন্য দিয়ে ব্যস্ত করে বামদিকে মন্ত্রী আর কিশতি দিয়ে আক্রমণ চালালাম। মেয়েটির ঘোড়াও আড়াই চালে কম বিরক্ত করছিলো না। আমি শুধু ওকে পরিচিত চালগুলো দিতে দিচ্ছিলাম না।
তবে নিজের অন্যমনস্কতার সুযোগে হঠাৎ সবকিছু প্রায় তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়লো। আমি একটু নানা’র গল্প শোনায় মনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম। তিনি নেতাজীর সঙ্গে গান্ধীজীর বিরোধের ব্যপারে একটা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। মনোযোগ দিয়ে না শুনে উপায় ছিলো না। ঘটনাগুলো উনার খুব কাছ থেকে দেখা। নানু’ই তাকে ধমকে থামালেন, দেখছো ছেলেটা তোমার কথায় তাল দিতে গিয়ে প্রায় হারতে বসেছে। তারপর নিজের নাতনীকে খুব উৎসাহ জোগালেন, সাবাস বেটি, চালিয়ে যা।
এ তাদের দীর্ঘদিনের সংসারের চেনা গলি। নানু’কে একপক্ষে চলে যেতে দেখে নানাভাই ক্ষেপে উঠলেন। কি? এত বড় কথা! তবে রে বেটি। আমার ঘরে আসা মেহমানকে তুই দাবা খেলায় হারানোর সাহস দেখাস। দাঁড়া এখনই সব ঠিক করে দিচ্ছি। বুড়িটাকেও একটা জবাব নিশ্চই দিতে হবে।
খুব মজা লাগলো। আর মেয়েটাও ভীষণ পাজি প্রকৃতির। কোথা থেকে খেলা শিখেছে কে জানে। আমাদের পাড়ার ক্লাবে এ মেয়েটিকে পেলে নিশ্চই বছর বছর শিল্ড জিতে আসতাম। শেষ পর্য্যন্ত খেলা ড্র হলো। আমার একলা রাজা ধরতে চায় খালি দুইটা ঘোড়া আর একটা মন্ত্রী দিয়ে। তাও মাত্র ষোল চালের ভেতর। এতই সোজা?
খেলা শেষ করে আবার বের হলাম। কাহিনী আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না। ওর নানুর বাসায় গিয়ে খুব ভালো লেগেছে। কেউ আমাকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করে নি। সবাই কেমন ধীর-স্থির, শান্ত, চুপ-চাপ। এমন সাধারণত দেখা যায় না। তবে এই মেয়েটি ননস্টপ বকবক করতে পারে।
এবার গ্রামের কিছুটা ভেতরে চলে গেলাম। এখানে একটা শাখা এসেছে বুড়িগঙ্গার। শাখা দিয়ে শুধু নদীর পানিই এসেছে। আর কোনো উপসর্গ পেছনে পেছনে ভেসে আসে নি। শান্ত-নিস্তব্ধ মাটির ওপর বসে দূরের কাশবনে কাশ ফুলের নড়া-চড়া দেখতে তাই বেশ ভালো লাগছিলো। আশপাশেও কেউ নেই। নির্জনতাই ছিলো তখনকার সবচে’ দরকারী উপাদান। আর সে মহার্ঘ্যের ছড়াছড়িও ছিলো প্রচুর। দারুণ একটা পরিবেশ।
হঠাৎ স্থানীয় ছেলেপিলেদের একটা দল নির্জনতা ভেঙ্গে খুব হৈ চৈ লাগিয়ে দিলো। ওরা মনে হয় কোনো বিয়ে-বাড়িতে বিয়ে খেতে গিয়েছিলো। সেখান থেকে ফেরার পথে এই অদম্য উল্লাস। বয়সেরও তো একটা ব্যপার আছে। আমি ওদের বয়েসী থাকাকালে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে বিয়ে খেতে যেতাম। দাওয়াত ছাড়া বিয়ে খাওয়ার মতো মজার কাজ খুব কমই আছে। ছেলেদের হৈ-হুল্লোড় দেখতেও ভালো লাগছিলো। ওরা সরে যাবার পর আরো কিছুক্ষণ বসে থেকে আমরা দু’জন উঠে পড়লাম।
সেদিন এপার ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। অবশ্য আমি বাসায় না ঢুকে মেয়েটিকে নিয়ে অগ্রসর হলাম। ভাবলাম অন্ধকারে ওকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি। সেটা অবশ্য বড়-সড় একটা ভুল ডিসিশন ছিলো। কেননা রিকশায় বকবকিয়ে সে আমার কানের পোকা পুড়িয়ে ক্ষ্যান্ত হয়। আলোচনা পর্বটি শুরু করে দেয়ার জন্য অবশ্য এক অর্থে আমিই দায়ী।
মানুষের সঙ্গে কথা না বলে বলে, সব নিয়ম-কানুন ভুলে গেছি। একটা মেয়ের সঙ্গে কি টাইপ কথা বলে আলাপ চালাতে হয়, স্বাভাবিক সৌজন্যে একটা কি প্রশ্ন করলে কোনো গোল বাঁধে না; ঠিক ঠাহর করতে পারছিলাম না। একসময় জিজ্ঞেস করে বসলাম, আপনার বয়স কত? এই প্রশ্নটা শুনে হয়তো ওর রেগে যাওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু না রেগে সে গোরস্থানের সেই খিলখিল হাসিটা দিয়ে বসলো আবার। তখনই আমার মনে পড়লো, মেয়েদেরকে আর ছেলেদেরকে জিজ্ঞেস না করার আলাদা আলাদা কিছু প্রশ্ন আছে। তার মধ্যে একটা নাড়িয়ে দিয়েছি। কি মর্কট আমি!
তারপরের প্রশ্নটা ছিলো আরো ভয়াবহ। আপনি কি ম্যারেড? মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচু-নিচু করে বললো, নো। আমি বললাম, জানতে চান আমি ম্যারেড কি না? মেয়েটি আবারো একইভাবে বললো, নো। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, আসলে আমার পক্ষে আলাপ-আলোচনা চালানো সম্ভব না। কোনোকালে সম্ভব ছিলোও না। তারচে’ আপনে কথা বলেন, আমি শুনি।
ব্যাস্ শুরু হয়ে গেল, একেবারে প্রাইমারী স্কুল থেকে। শেষ করলো বিদেশে ছেলেরা কিভাবে বাঙালি মেয়েদের দেখে লুল ফেলে সেখানে এসে। তারপরে ধরলো আজ সকালের কাহিনী। যার কিছু কিছু আগেই শোনা আমার। আর নতুন যা শুনলাম তা হলো, সে দুর থেকে আমাকে ওভাবে আনমনা বসে থাকতে দেখে ভেবেছে আমার হয়তো মন খারাপ। না হয়েই যায় না। প্রথমে গিয়ে একটা ছবি তুলেছে পেছন থেকে। এরপর বসেছে খানিক আলাপ করার জন্য। স্বাভাবিকভাবে মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করলে যেকোন ছেলের মন কিছুটা ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। সেই মহান উদ্দেশ্য পালনের জন্যই নাকি সকালে আমাকে গিয়ে পেছন থেকে ডাক দেয়া। কিন্তু বিধি বাম। আমি নাকি ফেভিকলের মতো চিপকে গেলাম।
শুনে খুবই আশ্চর্য হলাম। আমি চিপকে গেলাম? নাকি আমার সঙ্গে কেউ চিপকে গেল? অবশ্য ভালো লাগলো যখন বাসার সামনে পৌছে রিকশা থেকে নেমে সে বললো, কিন্তু খানিক আলাপ করেই আপনাকে ছেড়ে দিই নি কেন জানেন? কারণ আপনার প্রথম কথাটা শোনার পর থেকে আর ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না। আরো অনেক কথা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। অবশ্য আপনে এত কম কথা বলেন যে সেটা হয় নাই খুব একটা। যাক্ বেটার লাক নেক্সট্ টাইম। সী ইয়্।
বললাম, আই উইশ। তারপর একা একা ফিরে আসলাম বালুর ঘাটে।
---





এইটা মীর ভাইয়ের বেস্ট লেখা।
আপনের পরীক্ষা এখনো শেষ হয় নাই? এতদিন পরীক্ষা দিলে সর্দিজ্বর হওয়ার কথা।
যাক্ শুভকামনা রইলো। পরীক্ষা ভালো হোক।
এপ্রিল মাসে জিন্দেগীর মত পড়াশোনা ঘুচিয়ে দিব। তাই সময় লাগছে বেশি। এরপর ধুমায় ব্লগিং।
এইটা আপনার সেরা কাজ। কিছু টাইপো রয়ে গেছে কিন্তু।
ক্যমেরাহাতে > ক্যামেরা হাতে
মহার্ঘ্য > মহার্ঘ (রেফ এর পর য ফলা হয় না)
কি > কী
চুপ-চাপ > চুপচাপ
....ইত্যাদি।
আশা করি কিছু মনে করবেন না।
মাস্টার্স দিচ্ছেন।
আমার মাস্টার্সের কথা মনে পড়ে গেল। তখন ছোট অফিসের চাকুরী ছেড়ে একটা বড় কোম্পানীতে ঢুকেছি। দিনে দুইটা করে এ্যসাইনমেন্ট থাকে। এর সঙ্গে স্পেশাল নিউজ দেয়ার চাপ। অফিসে পান থেকে চুন খসলেই সেটা মার্কিং হয়ে যাচ্ছে কারো না কারো চোখে। এমন সময় পড়লো মাস্টার্স পরীক্ষার ডেট। সে এক টেনশনের দিন ছিলো জীবনে। রিয়েল বেস্ট অভ লাক ফর ইয় ব্রাদার।
আর ইয়ে, টাইপো'র ব্যপারে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে; প্রফেশনাল প্রুফ রিডার ছাড়া একদম সব টাইপো থেকে আসলে চাইলেও মুক্ত হওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে লেখা ও কমেন্ট দেয়ায় একজন মানুষকে একসঙ্গে মনোযোগ দিতে হচ্ছে সেখানে। এই দ্রুতগতির জীবনে এতটুকু আসলে থাকবেই। এটা অজ্ঞতাজনিত ভুল নয়। কিছু কিছু আবার সফটওয়্যারের কল্যাণেও ঘটে থাকে। যেমন, অভ্রতে র্য লিখলে রএ য ফলা দেখায়। সেটা আবার এই প্যানেলে পোস্ট করলে র্য্য হয়ে যায়। এরকম একটা পর্য্যন্ত বানানও লেখার ভেতরে আছে। এর অনেকগুলো একাধিক দিন সময় নিয়ে ঠিক করেছি। তারপরও থেকে গেছে। এটুকু আসলে মেনে নিতেই হবে। আর একটা ছোট্ট বিষয় হচ্ছে, আমি কিছু বানান নিজস্ব রীতিতেও লিখি। এটা একদমই নিজের ব্যপার।
তবে হ্যাঁ, সত্যিকারের ভুল অবশ্যই ধরিয়ে দেয়া উচিত। যেমন আমার একটা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প লেখার অপচেষ্টায় একবার ভাঙ্গা পেন্সিল তথ্যগত অসঙ্গতি ধরিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা ভিন্ন। এবং সেজন্য আমি কৃতজ্ঞও তার কাছে।
সুপার্ব লেখা

পড়তে একদম ক্লান্তি আসে নাই
সমস্যা টা ঐখানেই
লেখতে বসলেই মাথায় আর কিছু আসে না 
লেখা মাথায় নিতে গেলে সমস্যা হবেই। এখন থেকে লেখা হাতে নিয়ে আসার চেষ্টা করবেন শাতিল ভাই। তারপর সেগুলো কী-বোর্ডের ওপর ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করবেন।
এত বড় একটা লেখা কিভাবে যে শেষ হলো বুঝলামনা...
সেইরম মীর ....
অসাধারন
মনে হয় আপনের আগে পড়া ছিলো। সেইজন্য তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে।

আত্মজীবনী পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। এই আত্মজীবনীও ভালো পাইলাম
থ্যংকিউ আপু। আপনাকে তো সেদিন অনেকগুলো আত্মজীবনীর কথা বললাম, কিন্তু আপনি শুনতেই চাইলেন না। আছেন কেমন?
মাথার উপ্রে দিয়া যাওনের মতো কথা বললেতো বিপদে পইড়া যাই
চব্বিশ ঘন্টায় একটা এই রুটিনটা কিন্তু ভালোই ছিল 
আছি-যেমন থাকি টাকি আরকি।
এত কম লেখেন কেন? বেশি বেশি লিখবেন, নইলে আইডিয়াগুলো সব ভেস্তে যাবে
বললাম যে কবিতা লিখতে। সেইটা তো লিখলেনই না। এখন উল্টো আমাকে ধমকাচ্ছেন! ভালু ভালু। ধমক-টমক দিয়ে হৈলেও পুস্ট দিয়েন। গদ্য-কবিতা-পাঁচমিশালী...। তাইলেই চলবে।
পড়ালেখা শেষ হইলে জানাইয়েন যে, কি পড়লেন
এই রকম লেখাতে আমার কমেন্ট করার যোগ্যতাও নাই।তাই খালি পড়তেছি।

বাপরে। ব্যপক!
আপনার লাইফ টা দারুন। এমন নির্জন জায়গা আমি খুজি কিন্তু পাই না। খুব ইচ্ছা একা একা বসে দিন পার করে দেওয়ার। জায়গাও পাই না আর সুযোগ ও পাই না।
আপনার অনেক লেখা পড়া হইছে। আগেরগুলার মত এটাও অসাধারন হইছে।
অতিথির জন্য চা-বিস্কিট।
কিন্তু নামটুকুও জানতে পারলাম না, এ আক্ষেপ রয়ে গেল।
এই তাইলে দাবা কাহিনী?

খেলে একজনের সাথে আর আমারে আজাইরাই কি সব জানি আবল তাবল কয়
বস্ আমরা আমরাই তো।
১.পড়তে পড়তে পুরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এমন লিখেন কেমনে? আপনাকে সাততারা।
২. আমারো ভাবতে খুব ভালো লাগে।কত কি যে ভাবি! আগডুম বাগডুম।
৩. বালুর ঘাটে আমাদের একদিন দাওয়াত দেন। আপনার সাথে আড্ডাবো।
৪. মেয়েরা আসলে যে কি পাগল হয়, সেটা ওদেরকে ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না।
৫.অনেক সময়ে দেখেছি, এ অবস্থায় মেয়েরা অকারণেই ওড়না ঠিক করে। --জটিল অবজার্ভেশন
৫. এইটা মেয়েরা ইচ্ছা কৈরা ছেলেদের বিব্রত করতে করে ...
এহহহহহহহহহ। আসছে বড় হুজুর। তুমি কেমনে জানো! বদ পুলা।
কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে গেলেই এরম করে... ভাবখান এরম যে হা কৈরা চাইয়া রইছি
ইউনির অন্য ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা তাদের বান্ধবীদের দিয়ে এই ফর্মুলা প্রয়োগ করে নাকি পরীক্ষা পিছাতো। আমরা একবার প্রয়োগ করতে চাইছিলাম কিন্তু তার আগেই স্যাররা পরীক্ষা পিছায় দিসিলো।
হা হা হা। আমাদের এক বন্ধু রুবেল পরীক্ষার সময়ে ওর পাশে যে মেয়েটা বসতো তাকে বলতো "স্যার সামনে আসলে ওড়নাটা একটু সরাবি, তাইলে চলে যাবে।''ওই মেয়ে তো রেগে একটা বকা দিতো। তবু রুবেল ছিলো নাছোরবান্দা।
কোন রুবেল?
আমার সাথে পড়তো। আমার বন্ধু। দোকানের সামনে গিয়ে বলতো, টাকা দে..বিড়ি কিনবো। না দিলে সবার সামনে পাজাকোলে নিয়ে নিতে পারি। সবাই ওকে ভয় পেতো।
নিছিলো?
যে মেয়েকে ও আপু বলতো, আমাদের ২ ব্যাচ সিনিয়র সেই মেয়ে। তাকে ঈদে পা ধরে সালাম করছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। তাকে পরে বিয়ে করছে ।
ওই পাগলারে এসব করার সুযোগ দেয়া হতো না। তবে আমাদের প্রিয় বন্ধু ছিলো সে।
ছেলেটার নাম রুবেল ছিল, ছেলেটা বেলির বন্ধু ছিল !! @ রায়হান ভাই
এবং বেলি ছেলেটার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল।
আহ কী সুন্দর লেখা! আচ্ছা, মেয়েটার চুল বয়কাট তাইনা?
মেয়েটারে চিনছি মনে হয়।

কে?
ওই যে!
কারোটা হয় নাই। তিনজনরেই
রায়হান ভাইর কমেন্টে লাইক দিলাম
আমিও লাইক দিলাম। ডেভু একটা কমেন্ট লাইক অপশন দেন
ডেভু কমেন্ট লাইক অপশন দিয়েন না।
মীরের দেখার চোখকে হিংসা করলাম, আবারও
হাফিজ ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ইমোটা ভালো লাগলো আরো।
ভালো থাকবেন। শুভেচ্ছা নিরন্তর।
লেখাটা এতো ভালো লাগছে যে, প্রথমে কোন কমেন্ট করতে ইচ্ছা হয় নাই । সোজা প্রিয়তে চলে গেছে । অসাধারণ লিখছেন মীর
২ নম্বর ইমোটা কিউট । পসন্দ হইছে ।
মীর, সত্যি করে বলি- আমি একটা প্রিন্টিং প্রেসের মালিক হব। তারপর আপনার অনেকগুলো এরকম লেখার ভান্ডার নিয়ে একটি বই প্রকাশ করবো আমার প্রেস থেকে। সম্ভব হলে আগামী বই মেলার আগেই। আপনি কি রাজি ?
আপনি তো বড় ভাই। আপনার কথায় রাজি না হয়ে পারে?আপনার প্রস্তাবে ভোট দিলাম।
বিনয় বাবু এই পথে আগামী এক সাপ্তাহ আসবে না।
বাজী।

মেসবাহ ভাই আমাকে ঘাড় ধরে লজ্জা দিচ্ছেন। সঙ্গে আরো দুইজন তাল দিচ্ছে। যেটা একদুম টিক্না।
এই লেখাগুলো শুধুমাত্র প্রিয় এবি ব্লগ ও এর ব্লগারদের জন্য। কারণ আমার অপচেষ্টাগুলো কেবল এখানেই বন্ধুত্বপূর্ণ পক্ষপাতের কারণে খানিকটা পৃষ্ঠপোষকতা পায়।
তবে জীবনের প্রথম অফারের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে না? সেই জায়গা থেকে বলবো, আমার কোনোদিন বই লেখার মতো যোগ্যতা হলে আমি কেবল মেসবাহ ভাইএর কাছেই গিয়ে হাত পাতবো। আর কোথাও নয়।
থ্যংক ইউ ভেরী মাচ বিগ ব্রাদার। রিয়েল থ্যংকস্।
মীর, আপনার পায়ের ধুলা নিতে চাই...
নতুন পোস্ট কই ভাইসাব? আপনের প্রথম কাহিনী পড়ার পর থেইকা অপেক্ষা নিয়া বইসা আছি।
মীর এক কথায় অপূর্ব।
আপু অসংখ্য ধন্যবাদ।
অসাধারণ!!!
বস্ অসাধারণ হইসে বলে বিশ্বাস করি না, কিন্তু আপনের মন্তব্য পাইলে অশেষ খুশি হই এইটা সত্য।
প্রিয়তে...
ক্রোলিজ কি??
ঠিকই আছে, ক্রোলিজ'ই।

জানতাম আপনে এইটা জিজ্ঞেস করবেন।
মানে? জিনিষটা কি!
ক্রোলিজ না ক্রাউলিজ?
সেইটাই বা কি?
আমি সিগারেটটার নাম দিসি ক্রোলিজ।
মীর, রোদ উঠলেই আমি হাটি। বাসা থেকে হেটে স্টেশন আর স্টেশন থেকে হেটে ফিরে আসা ৯.৮ কিমি। অনেকেই আমার সাথে যেতে চায়, আমি পিছলাই। একা একা হাঁটা আমার খুব প্রিয়। মানুষ ভুল বুঝে। একা হাঁটার কী আনন্দ যে না হাটে সে জানবেই না। একা সুইমিং ও যাই। অনেকে সন্দেহ করে আমি "একা" নাকি। এটা থেকে অনেক মজার ঘটনার উদ্ভব হয়
একাকীত্বেরও আলাদা আনন্দ আছে, একা না থাকলে সেটা উপভোগ করা যায় না।
ইয়েস্। একা না থাকলে সেটা উপভোগ করা যায় না।

কী লিখলেন ভাই? অসাধারণ। এত সহজ ভাষায়,নিজের একাকীত্ব ফুটিয়ে তোলা। বাবার সাথে জায়গাটুকু খুব সুন্দর হয়েছে
ধন্যবাদ।
আরে! এই লেখাটা কেম্নে মিস করলাম!!... :|
দারুন! একটুও থেমে যেতে হয় না এমন লেখায়... ভালো লাগছে... :)
কই আপনি? কেমন আছেন? ভালো আছেন তো? নতুন লেখা কেন দেন না? মিস করি তো।
মন্তব্য করুন