গল্প: নীলামনির গল্প
১
পাচ্ছি না একটুও শান্তি। নীলামনিকে সেদিন স্বপ্নে দেখলাম। দেখলাম কি, সে আমাদের বাড়ির একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে। স্বপ্নে তো কতকিছুই দেখা যায়। আমি দেখলাম, এক ঘুঘু ডাকা স্তব্ধ দুপুরে ও ঘুমিয়েছে কিংবা ঘুমোনোর ভান করছে এমন সময় আমি গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছি। ধরে বিছানার ওপরে দুইটা পাক দিয়েছি। তারপর হুটোপুটি শুরু করে দিয়েছি দু'জনে মিলে। নাকের সঙ্গে নাক ঘষছি আর দুইজনই খুব হাসছি। ও আমাকে বজ্জাত, হাড়কেলো ইত্যাদি বলে বলে কিল দেয়ার আর রাগ দেখানোর চেষ্টা করছে। আমি একসময় দুইহাতে ওর হাত দু'টিকে বালিশের দু'পাশে ঠেসে ধরে আটকে দিলাম। ওর আর তখন নড়াচড়া করার কোনো উপায় থাকলো না। কিন্তু ভীষণ লজ্জা পাচ্ছিলো বলে তাকিয়ে ছিলো অন্যদিকে। আমি অবশ্য চেষ্টা করেও ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। নীলামনির মতো অনিন্দ্যসুন্দরী মেয়ে আমি আগে কখনো দেখি নি। পরে কখনো দেখবো এমনও মনে হয় না। ওর ঠোঁট থেকে আমার ঠোঁট তখন ঠিক এক ইঞ্চি দূরে। একটা রিনরিনে হাসির শব্দ ভাসছিলো অনেক দূরে কোথাও। আর আমি ওর বুকের ভেতর চলতে থাকা তোলপাড় স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলাম।
ঠিক এরকম একটা পর্যায়ে স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেল। পিচ্চিবোনটা এক ছটাক পানি এনে নাকে-মুখে ঢেলে দিয়েছে। এই মেয়েটি আমার একেবারে জন্মের শত্রু। অথচ ও জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিই প্রথম ওকে কোলে নিয়েছিলাম। আর ও আমার কোলে এসেই ভ্যাঁ করে দিয়েছিলো কেঁদে। তারপর থেকে আমাদের শত্রুতা। নাকে-মুখে পানির দমক সামলে নিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসতেই শুরু হলো ওর কানজ্বালানো খিকখিক হাসি। নিশ্চল আক্রোশে বারকয়েক দাঁত কিড়মিড় করলাম। এদিক-ওদিক হাতড়ে পাতলা একটা ম্যগাজিন ছাড়া আর কিছুই পেলাম না। সেটাই ওর দিকে ছুঁড়ে মারলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি প্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করলাম তা হলো, রে নরকের প্রহরী।
এটা ওকে উদ্দেশ্য করেই বলেছিলাম। শুনে ও আরো মজা পেয়ে গেল। আজকালকার ডেপোঁগুলো বড়দের একটু সম্মানও দেয় না। ভয় পাওয়া তো অনেক দূরের কথা। ও যখন আরেকটু ছোট ছিলো, তখন ওকে পাঁজা করে নিয়ে বারান্দার বাইরে ধরে বলতাম; ফেলে দেবো নাকি বল? সে সময়টায় ও একটু-আধটু ভয় পেতো। এখন আর তেমন করে শাসাই না। কোনোদিন যদি ও'র কলেজ বন্ধ থাকে তাহলেই হয়েছে। সকাল থেকে আমার সঙ্গে এইসব কর্মকাণ্ড ঘটানো শুরু করে। ছোট ভাই-বোনদের বন্ধু বানিয়ে নেয়ার ঝক্কি মোটেও কম না।
আজ ওর ওপর বেশি খাপ্পা হওয়ার কারণ আমি একটা দারুণ স্বপ্ন দেখছিলাম। নীলামনির গলার স্বরটা এত মিষ্টি যে লিখে বোঝানো সম্ভব না। আমি প্রথমবার শুনেই ওর সঙ্গে প্রেম শুরু করে দিয়েছিলাম। ও অবশ্য জানতো না। এখনও জানে কি না, আমি জানি না। ওর সঙ্গে প্রেমের সময় কতকিছুই তো করি। কিন্তু সেসবের কিছুই ওকে কখনো জানাই না।
সেদিন মধুর গোলঘরের ভেতর সবাই মিলে বসে আড্ডা পেটাচ্ছি। ঝন্টু ইদানীং খুব ফাঁকিবাজ হয়েছে। মোটেও কথা শুনতে চায় না। সেই কখন সিংগারা আর পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে যেতে বলেছি, কোনো খবর নেই। অবশ্য নীলামনির বাসা দরকার, এ সংবাদে আমরা সবাই তখন বিশেষ বিচলিত হয়েছি বলে সেদিকে খুব বেশি ভ্রুক্ষেপও ছিলো না কারো। মোনালিসা আর মন্দিরা বুদ্ধি দিলো, আজিমপুরে কোয়ার্টার পাওয়া যাবে। সেখানে দু'তিনজন মিলে উঠে যাওয়া যায়। আড্ডার আলোচনা বলেই হয়তো, ওরাও নীলামনির সঙ্গে উঠে যেতে চাইলো। যদিও জানি দু'টোর একটাও হল ছেড়ে কোথাও এক পা নড়বে না। খুব হিসেবী মেয়ে কি না।
ইশ্ আমার পুরান ঢাকায় তো নীলামনি যাবে না। গেলে নিশ্চিত ওর জন্য একটা ঘরের ভাড়াটে তুলে দিতাম। ওর কাছ থেকে এমনকি ভাড়াও নিতাম না। অবশ্য আম্মু সেটা কতটুকু মানতো জানি না। তাও আমি হই-চই একটা লাগিয়ে, বন্ধু থাকবে ইত্যাদি বলে ব্যবস্থা ঠিকই করে ফেলতাম। প্রতিদিন আমরা একসঙ্গে রিকশায় করে ক্যম্পাসে আসতে পারতাম। বেশ মজা হতো। আমি আড্ডার ভেতরেই বসে বসে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকি।
একসময় ঝন্টু সিংগারা-চা সবই দিয়ে গেলো। সেসব খেয়ে একে একে সবাই যার যার হলে, বাসায় বা টিউশনিতে রওনা হলো। আমি পত্রিকা অফিসের ছোটো চাকুরীটা ছেড়ে দিয়েছি। পড়াশোনা, আড্ডাবাজি আর সংগঠন সামলে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। গোলঘরে তাই আমি আর নীলামনি রয়ে গেলাম। আমাদের দু'জনের একটা বাড়তি কাজ আছে। পরদিনের মিছিলের ব্যানারটা বানিয়ে রেখে যেতে হবে।
সবাই চলে যাওয়ার পর নীলামনি বললো, এই সিগারেট আছে? দে না।
-নাই। রুবেলের কাছ থেকে আনতে হবে।
তো আন। বসে আছিস ক্যান? সারাদিন বসে বসে কি দেখিস?
-টাকা নাই তাই বসে আছি। বসে বসে তোমাকে দেখি, এমন ভেবো না।
টাকা নাই বললেই হয়। কাজের কথা বললেই শুরু করে একগাদা ভ্যাজভ্যাজ। এই নে।
লাল প্লাস্টিকের বঙ্গবন্ধুকে ধরতে গিয়ে নীলামনির আঙুলের সঙ্গে ছোঁয়া লেগে গেল। উঠে রুবেলের কাছ থেকে চার টাকা দিয়ে একটা বেনসন কিনে আনলাম। এরকম বিকেলে সাধারণত মধুর কেন্টিনে লোক-জন কম থাকে। যে কারণে গোলঘরের দরজা ভিজিয়ে দেয়াটা একটু অস্বস্তিকর। বিশেষত ভেতরে যদি দুইটা ছেলে-মেয়ে থাকে। কিন্তু নীলামনি সেসব ফর্মালিটি মানলে তো। আমি কথাচ্ছলে সেরকম কিছু বোঝাতে নিলেই বলবে,
তো আমি কি বাজারের মধ্যে বসে বসে সিগারেট ধরাবো? আশ্চর্য!
-তা বলে দরজা ভিজিয়ে দেবো?
হ্যাঁ, সেটা তো দিবিই। দিয়ে আমার সামনের চেয়ারটায় এসে বসবি। যাতে বাইরে থেকে কেউ হুট করে ঢুকে গেলেও টের না পায়। ওকে?
-ওকে বাবা ওকে।
সন্ধ্যায় দু'জনে গিয়ে নীলক্ষেত বাকুশাহ মার্কেট থেকে সাড়ে তিন গজি নীল কাপড় কিনে আনলাম। ১৪ টাকা করে গজ। সাদা আর লাল রংএর কৌটা কিনলাম। একেকটা ৩৫ টাকা। গোলঘরে বসে বসে আমরা সেই কাপড়ের ওপর শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ কেন মানি না, তা লিখলাম। লিখে সেটা গোলঘরের মেঝেতেই টান টান করে রেখে দিলাম। রাত পোহালে জিনিসটা শুকিয়ে যাবে। কাজ শেষ করে গোলঘরে তালা দিতে দিতে নয়টা বেজে গেল। তড়িঘড়ি দু'জনে দৌড় লাগালাম। গন্তব্য তখন ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল। অকর্মণ্যতার সুবাদেই সম্ভবতঃ ওর সঙ্গে সবচে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ পেতাম আমি। কিংবা হয়তো আমার আগ্রহটাই সবচে’ অকৃত্রিম ছিলো।
পরদিন সকাল সাড়ে ১১টায় মিছিল। মধুর সামনে নামতেই দেখি বিশাল জটলা। সভাপতি এসে চমৎকার ব্যানারের জন্য ধন্যবাদ জানালেন। আমরা দু'জন কর্মী তখন খুবই খুশি। অনুপ্রেরণায় ভেসে গেলাম। স্লোগান দেয়ার সময় গলা ফাটিয়ে ফেলছিলাম উল্লাসে। দুপুরে দেখি দু'জনের গলা দিয়েই কোনো স্বর নেই। ভাত খেতে গেলাম বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ায়। সাকুল্যে খরচ হলো ৪০ টাকা। তাই দিয়ে ট্রে-ভর্তি ভাত, মুরগী এবং ভর্তাসহ আহার্য সেরে ফেরার সময় শুধু সিগারেট টানতে আমরা একটু ঢুঁ দিয়েছিলাম জিমনেশিয়ামের মাঠে। যাচ্ছিলাম কার্জন হলে। তখন একটা কর্মীসভা ছিলো। যেটাকে আমরা কৃমিসভা বলতাম। আমি কেবল নিউ সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। নীলামনি থার্ড ইয়ারে। কৃমিসভায় ফার্স্ট ইয়ারের কৃমিগুলোকে (আসলে কর্মী হবে) নাড়াচাড়া করতে খুব ভালো লাগতো। কোনো কোনোটার খুব তেজ থাকতো। মার্কস-লেনিনের গণ্ডি পেরিয়ে মাও সে তুং বা সুভাষ চন্দ্র বোসকে ধরে টান দিয়ে বসতো। সেসব টানাটানি খারাপ লাগতো না। অনেক রকমের আলোচনা হতো। আমরা ভোলগা থেকে গঙ্গা বা ছোটদের অর্থনীতি, ছোটদের রাজনীতি থেকে অর্জিত প্রাথমিক জ্ঞান শেয়ার করতাম। শেখাতাম টানাটানি না করে, জ্ঞানার্জনের আগ্রহ গড়ে তোলাটা জরুরি বেশি।
যাক্ সিগারেট খাওয়া শেষে গেলাম সেদিন সভায়। আলাপ-আলোচনায় ঠিক হলো এক মাসের কর্মসূচি। আমাদের দু'জনের দায়িত্ব পড়লো কার্জন হলের নতুন কর্মীদের ভালোমতো নাড়াচাড়া করার। ওদেরকে নিয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে পাঠচক্র আয়োজনের। কাজটা দু'জনেরই পছন্দ হলো।
দ্রুতই নীলামনি হল ছেড়ে আজিমপুরে বাসা নিয়ে ফেললো। এটা একটা দারুণ বিষয় হয়েছিলো। কারণ এরপরে রাত দশটা বা এগারোটা-কেও আমরা ভয় পেতাম না। অবশ্য এগারোটা পেরিয়ে গেলে একটু টেনশন হতো। কিন্তু সেটা খুব বেশি ঘটতো না। আমাদের আনন্দবিহ্বল পাখির মতো দিনগুলো উড়ে উড়ে পার হয়ে যেতো। সংগঠন, বই পড়া আর আবৃত্তি শিখে শিখে দিন কাটিয়ে দিতাম। মাঝে মাঝে ছিলো ডিপার্টমেন্টের ক্লাসের অত্যাচার। অবশ্য আমি এত কম ক্লাস করতাম যে, টীচারেরা আমাকে পেলে খুবই টিটকারী দিতো। ক্লাস কম করা ছেলেদের টিচারেরা ছাড়া আর সবাই ভালো পায়। খগেন স্যার তো একদিন ক্লাসে আমায় পেয়ে বলেই বসলেন, আরে আপনি আসবেন একটু যদি আগে জানাতেন; তাহলে কিছু চা-নাস্তার আয়োজন করতাম।
এদিকে আমি নীলামনিকে যতই নানাভাবে একটা জরুরি বিষয় বোঝাতে চাই, ততই দেখি সে আমাকে ঘুরায়। যেহেতু ব্যপারটি সম্পর্কে আমি নিজেও সেই সময় খুব বেশি নিশ্চিত ছিলাম না, তাই বেশি জোরাজুরি করতাম না। শুধু দেখতাম, এমনিতে একটি মেয়ে আমাকে ছাড়া নড়তে পারে না একফুটও। কিন্তু সবসময় বন্ধুত্ব নামক একটা সীমানা প্রাচীর তুলে আমার নড়াচড়া বন্ধ করে রাখে পুরোপুরি।
সেবার কুমিল্লার বেতিয়ারা'য় গেলাম একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পার্টি নেতাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদনের জন্য। দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার কর্মসূচি। সেখানে একটা স্মৃতিসৌধ আছে। সবকিছু শেষ করে ঢাকা ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। পথে একবার কুমিল্লায় নেমে দলের সবাই রসমালাই খেয়েছিলাম। ওতেই মূলত দেরীটা হয়েছে।
সেদিন দুইজন শেষ পর্যন্ত দৌড়াতে দৌড়াতে ঠিক এগারোটায় আজিমপুরে পৌঁছেছিলাম। ও হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে বিদায় দিয়েছিলো। দেয়ার সময় আমার সঙ্গে খুব দারুণ করে হ্যন্ডশেক করেছিলো। বেশ কিছুক্ষণ নিবিড়ভাবে ধরে ছিলো আমার হাত। আমার তো হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে আসছিলো আস্তে আস্তে সে সময়। অবশ্য বেতিয়ারা'য় ঘটে যাওয়া দুপুরের ঘটনাটা সেজন্য অণুঘটকের কাজ করে থাকতে পারে।
সেদিন দুপুরে আমরা ক'জন অত্যূৎসাহী বালক-বালিকা গ্রামভ্রমণে বেরিয়েছিলাম, স্মৃতিসৌধে ফুল দেয়া এবং স্থানীয় হোটেলে ভাত-টাত খাওয়া শেষে পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা রুদ্ধদ্বার আলোচনা বসায় পর। গ্রামের চিলতে মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম বর্ডার লাইনে। সেখানে গিয়ে তো সীমানা ফলক দেখে সবাই ভীষণ উত্তেজিত! উচুঁ টিলার ওপর সীমানা ফলক। তারপরে ঢালুমতো জমি। একটা মরা খাল আছে। সে খালের ওপর বড় বড় ঘাস জন্মে গেছে। খালের ওইপারে ভারত। চারিদিকে গাছপালা। ভালোই লাগছিলো। আমরা খুব হৈ-হুল্লোড় করছিলাম। করতে করতে ঢাল বেয়ে খানিকটা নিচেও নেমে গেলাম। আমাদের সঙ্গে আসা বড়ভাইগুলো মোটেও সতর্ক ছিলো না। ওরা সিগারেটের ভেতরে গাঁজার মশলা ভরে টানছিলো। তাই দেখে আমরাও টানলাম। বেশ আমোদ হচ্ছিলো। হঠাৎ বাংলাদেশের ভেতর থেকে দু'তিনজন চাষীমতো লোক চিৎকার শুরু করে দিলে আমাদের সম্বিত ফিরলো। ততক্ষণে সীমানা পেরিয়ে বেশ খানিকটা নো ম্যানস্ ল্যন্ডে ঢুকে পড়েছি সবাই। যেকোন সময় গুলি খেয়ে মরে যেতে পারি। চাষী লোকগুলো আমাদের সাবধান করার সময় এত জোরে চিৎকার করছিলো যে মনে হচ্ছিলো, বিএসএফ এতক্ষণ না দেখলেও এবার ওদের চিৎকারে ঠিকই দেখে ফেলবে। সবাই পড়ি কি মরি কোনোদিকে খেয়াল না করে দ্রুতবেগে ঢাল বেয়ে ওঠা শুরু করলাম। নীলামনি আর আমি ছিলাম সবার পেছনে। সে সময় আমার বার বার মনে হচ্ছিলো, কেউ আর এক ধাপও ওপরে উঠতে পারবো না। কয়েকটা বুলেট এসে সবাইকে জায়গায় বিঁধে ফেলবে।
আসলে সে সময় অবস্থাটাও তেমনি ছিলো। প্রায়ই সীমান্তে মানুষ মারা যেতো। তাও একেবারে বিনাকারণে। প্রকৃত অর্থেই যেকোন সময় পেছন থেকে একটা গুলি এসে পিঠের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে পারে। বিদীর্ণ করে রেখে যেতে পারে ফুসফুস। কোনো শেষ সুযোগ না দিয়েই। সেটা জানা ছিলো বলেই মনে মনে চাচ্ছিলাম; গুলি যদি লাগেই সেটা আমার গাএ লাগুক, নীলামনির গাএ যেন না লাগে। ও বেঁচে থাকুক। এটা ওকে বলতেই ও ক্ষেপে উঠলো,
-কেন আমার গাএ লাগলে সমস্যা কি? আমি কি মারা যেতে পারি না?
এটা একটা ঝগড়া করার সময় হলো? আগে তো এখান থেকে সরতে হবে তাই না?
-না আগে এটার একটা হেস্তনেস্ত হবে। তারপর এখান থেকে সরা হবে। গুলি কেন খালি তুই'ই খাবি?
হ্যাঁ আমিই খাবো। তোমার ভাগের গুলিটাও খেয়ে নেবো তারপর দাঁত কেলিয়ে মরে যাবো। তখন তো আর হাজার খুঁজেও আমাকে পাবে না। খুব মজা হবে।
-পিটিয়ে তোর হাড্ডি গুঁড়ো করবো। তুই খালি বাংলাদেশে চল একবার।
আমরা দুইজনে ওই চরম বিপদের মধ্যেও তুমুল আগ্রহে ঝগড়া চালিয়ে নিচ্ছিলাম। বয়সে বড়গুলো সেসব দেখে কিছুটা অবাক হচ্ছিলো। কিন্তু ওরা জানের ভয়ে পড়িমরি করে ছুটছিলো। আমাদের সঙ্গে কথা বলে লাইফরিস্ক নেয়ার সাহস হয়তো ছিলো না। কিন্তু সংকীর্ণতা মানুষকে খুবই বিশ্রী চেহারা দেয়। যে কারণে সেদিনের ঐ ঘটনাটি একান্ত আমাদের দু’জনের ব্যপারে হলেও, পরে সেটা নিয়ে ইউনিভার্সিটি কমিটির মিটিংএর কথা উঠেছিলো। আমরা দুইজনও ছিলাম মিটিংএ। এরকম একটা বিষয় নিয়ে যে আলোচনা হতে পারে, সেটা আমাদের দু'জনের চিন্তারও বাইরে ছিলো। ব্যক্তিগত ব্যপারে অহেতুক নাক গলানো হচ্ছে বলে মনে হলো আমাদের কাছে। কিন্তু সংগঠনের শৃংখলা রক্ষার খাতিরে আমরা কেউই কিছু বললাম না। আর অবাকের পিঠে অবাক করে আমাদের দু'জনকেই পরামর্শ দেয়া হলো, চলাফেরায় সংযত হওয়ার জন্য। আমি ভাবনা-চিন্তা করে দেখেছিলাম, নামেই এরা প্রগতিশীল। আসলে ভেতরে লবডঙ্কা। তবে আমরা দু'জনে ঠিক করেছিলাম ওরা যেমনই হোক, আমরা মনে-মননে হবো প্রগতিশীল। সত্যিকারের আগামী দিনের পথ সন্ধানকারী।
যাক্ এসব পরের ঘটনা। ওই দিন রাতে ঢাকায় ফিরে প্রথমবার নীলামনির হাত ধরার পর থেকেই নানারকম স্বপ্ন দেখার উপদ্রব শুরু হলো। যার সর্বশেষ নিদর্শনটি এ গল্পের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২
তখন মাঝে মাঝে ভাবতাম, বাম রাজনীতি করতে এসে প্রেমে পড়াটা একটু কেমন যেন স্টেরিওটাইপড্ ব্যাপার-স্যাপার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিজেকে একদমই ধরে রাখতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে গর্ভধারীনির জয়িতা'র কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। একটা বিপ্লবী মেয়ে। কিন্তু ভালবাসার কাছে সমর্পিত। আমি ওর ভালবাসাটাকে অনুভব করার চেষ্টা করি। মনে মনে ভাবি, আসলেই কি এমন হতে পারে? নাকি লেখক স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ নিয়েছেন? মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নেই- এটা ফুটিয়ে তুলতে যদি লেখার স্বাধীনতাকে ব্যবহার করতে হয়; তাহলে নিশ্চই সেটা পাঠককে হতাশ করে। বিষয়গুলোর স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসা জরুরি। তবে জয়িতা’র একটা বিষয় আমি বুঝতে পারি। মানুষের পক্ষে ভালবাসার মোহ থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।
যাক, নীলামনি'র সঙ্গে কোনো কারণ ছাড়াই সম্পর্কটা একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। হয়তো মানুষ একটু বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলো বলে আমরাও বিষয়টাকে একটা বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছিলাম। কিন্তু একদিন হঠাৎ খেয়াল হলো, আমরা একজন আরেকজনের রাতের-দুপুরের খাবার বা সকালের নাস্তার খোঁজখবর রাখছি। একজনের পরীক্ষার জন্য রাত জেগে পড়া দরকার হলে, মোবাইলের অপর প্রান্তে আরেকজন জেগে থাকছি। ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পড়ার কারণে ক্লাসের সময়টুকু ছাড়া অন্যান্য কাজগুলো সাধারণত একসঙ্গেই করা হচ্ছে।
একদিন পার্টি অফিসে যাওয়ার পথে নীলামনির সঙ্গে ব্যপারটা শেয়ার করে ফেললাম। ও অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দিলো না। কি যে বিরক্ত লাগলো, তা বলে বোঝানোর নয়। আমার আকির্মিডিসের ইউরেকাসম আবিস্কার ওর কাছে কোনো পাত্তাই পেলো না! এটা একটা কথা? তবে এর পরপরই একটা ঘটনা ঘটেছিলো। যেটা দু'জনের জীবনের স্টিয়ারিংই একটু ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। হয়তো আমাদের যাওয়ার কথা ছিলো অন্য কোথাও। আমরা যাওয়া শুরু করলাম অন্য একটা অন্য কোথাও।
শাহবাগ মোড়ে ইকোনোমিক্সএর এক ছাত্র একদিন রোড এক্সিডেন্টে মারা গেল। ছেলেটাকে চিনতাম না। কিন্তু তবুও বিষয়টা ছিলো হৃদয় বিদারক। আমাদের সবাইকে বিদীর্ণ করলো। ক্যম্পাসের প্রতিটি বিন্দুতে ছড়িয়ে পড়লো হাহাকার। আমাদের মধ্যে একজন নেই। একজন দুম করে হারিয়ে গেছে।
সেই কালো মেঘে ঢাকা দিনগুলোয় কলাভবন, ক্লাসরুম, মধু, লাইব্রেরী বা শালিক চত্বরে প্রত্যেকটি মানুষই মন খারাপ করে বসে ছিলো। বেলাল ওর চাএর কাপে ঠিংঠিং শব্দে স্টিলের চামুচে নাড়িয়ে চিনি গোলাচ্ছিলো ঠিকই, কিন্তু মুখটা ছিলো মলিন। জাকির ভাইএর কাছে যাওয়া যাচ্ছিলো না সিগারেটের জন্য। গ্যরেজের স্টিকগুলো ভরা হচ্ছিলো হতাশার মুঠো থেকে মশলা তুলে তুলে।
কিন্তু সে অবস্থা খুব বেশি দিন টিকলো না। আমরা সর্বপ্রথম ভেবে বের করলাম, এভাবে বসে থাকা যায় না। সমাজের প্রতিটি মানুষ একটি দুঃখজনক ঘটনার মুখে বোবা হয়ে গেলে চলে না। একদলকে শোক পাশ কাটিয়ে আর যেন এমন দুঃখ না পেতে হয়, সেজন্য কাজ করা লাগে। সেই উপলব্ধি থেকে আমরা নিজের ভাইএর মৃত্যূশোকে দিশেহারা হওয়া বাদ দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিলাম। ক্যম্পাসের বেশির ভাগ ছেলে-মেয়ে তখন আমাদের ডাকে সাড়া দিলো। সাড়া এত অভূতপূর্ব ছিলো যে, আজীবন বছরটিকে মানুষ মনে রাখবে। ক্যম্পাসের তথাকথিত ‘পোলাপান’ কোনোমতে একবার এক হয়ে গেলে, সেই মব যে কি প্রচণ্ড শক্তি ধরে তা আমি সেদিন সশরীরে উপস্থিত থেকে দেখেছি। দেখেছিলো সরকারও। সে শক্তি একটা নষ্ট সময়কে হটিয়ে নতুন সম্ভাবনাকে পথ করে দিতে পারে।
টানটান সুতোর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই সময়গুলোয় ছেলেরা ক্যন্টিন কিংবা করিডর থেকে পিলপিল করে রাস্তায় নেমে আসছিলো। আমি একদিন আজম ভাইকেও দেখেছিলাম, গ্যারেজের অন্ধকারের বাইরে, দিনের আলোয়; একটা কালো চাদর গাএ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার পাশে।
আন্দোলনে পুলিশের নির্যাতন সইতে হয়েছিলো ডান-বাম নির্বিশেষে সবাইকে। তবে আন্দোলন সফল হয়েছিলো। দেশে বোধহয় সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো নিহতের পরিবার সেবারই প্রথম হাতেনাতে বিচার পেয়েছিলো। ঘাতক ড্রাইভারের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজা হয়েছিলো। সঙ্গে আদেশ হয়েছিলো, বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় যেকোন রকম যান্ত্রিক বাহন চালানোর ওপর কড়াকড়ি নিয়মারোপের। সে আদেশ আজো বহাল রয়েছে। মৎস্য ভবন থেকে সায়েন্স ল্যাব কিংবা চানখাঁর পুল থেকে আজিমপুর যেতে যেকোন গাড়ি চালাতে হয় শক্ত নিয়ম মেনে। আজ যে ক্যম্পাসের মধ্যে ছেলে-শিশু-বুড়ো সব ধরনের মানুষের নিশ্চিন্তে বিচরনের একটা সুযোগ আছে, সে সুযোগটা আমাদের বিস্তর কাঠ-খড় পুড়িয়ে আদায় করে নিতে হয়েছিলো।
আন্দোলনের ফলাফল আমাদের পক্ষে আসলেও সেবার জল ঘোলা হলো বিস্তর। যদিও ছাত্ররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কনস্পিরেসি'র স্বীকারই হয়েছে। তবে নোংরা চক্রান্তগুলোর কোনোটিই কাজে আসে নি। ঠুনকো অজুহাতে পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর চড়াও হয়েছিলো। আমরা যারা ন্যায়বিচারের আশায় রাস্তায় নেমে এসেছিলাম, তাদের শরীর-মাথায় লাঠি ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়া হয়েছিলো। আমাকেও ঠাঁই খুঁজে নিতে হয়েছিলো ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে। এসবের প্রতিশোধ হিসেবে আমরাও প্রতিদিন কয়েকটা করে নীল বাঁদর (পুলিশ) ধরে পিটিয়ে তক্তা বানাতাম। আসলে ওরা যেমন উপরওয়ালার নির্দেশ পালন করছিলো, আমরাও তেমনি জঘন্য উপরওয়ালা গোষ্ঠীকে আঘাত ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। মারের চোটে ভর্তা হয়ে যাওয়া একেকটি বাঁদরকে আমার অত্যচারীদের পিঠে এক প্রস্থ বাড়তি চামড়ার মতো মনে হতো। এমন পেটানো পেটাতাম যে সেই চামড়া ফেটে মারের আঘাত ওদের হৃৎপিন্ডে গিয়ে পৌঁছাতো।
এরই মধ্যে একটি নিয়মিত দিনকে একদম ভিন্ন করে দিলো নীলামনি। ও সবসময়ই আমার পাশে পাশে ছিলো। ও একদিন আমার মাথার ড্রেসিংএ হাত বুলাতে বুলাতে হাসপাতালের মধ্যেই একফোঁটা চোখের জল ফেলেছিলো। ওটাই ছিলো আমার জন্য ফেলা ওর প্রথম জলকণা। এরপরে অবশ্য আর আমার কপালে ব্যান্ডেজ জোটে নি। আর মেয়েরা যে কি নিষ্ঠুর হতে পারে! মাথায় ব্যান্ডেজ না দেখা পর্যন্ত একটু কাঁদেও না। ঐ একফোঁটা মুক্তোদানার মতো জল আমার ভেতরটা আমূল কাঁপিয়ে তোলে। আমি উপলব্ধি করতে পারি, সেই ছোট্ট বাবুদের মতো চুলে বয়কাট দেয়া ফানলাভিং মেয়েটিকে কত গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছি।
এরপর বেশ কিছুদিন ধরে পার হয়েছে জীবনের একটা জটিল পর্যায়। নানাদিক থেকে ঝামেলা এসে আমাদেরকে জড়িয়ে ধরতে শুরু করে। বেশ কিছু দায়িত্বও এসে ঘাড়ের ওপর চেপে বসে। দু'জনে আগের মতো রিকশায় করে ঘুরে-ফিরে, দুপুরে খেয়ে সিগারেট টানতে মাঠে বা চারুকলার ছাদে নিদেনপক্ষে মোল্লায় ঢুঁ দেয়ার সুযোগ পাচ্ছিলাম না একদমই।
সে সময়ও দিনের মালা গেঁথে গেঁথে সপ্তাহের ভেলা ভেসে যেতো মহাকালের নদীতে। আমরা একে অপরকে খুব বেশি দূরে সরে যেতেও দিতাম না। মাঝে মাঝে মাথার তারগুলো এত ছিঁড়ে থাকতো যে, মিথুন ভাই বা সংগঠনের অন্যান্য ছেলেগুলোর দিকে ক্রূর চোখে তাকিয়ে থাকতাম। কারণ আমার মনে হতো ওরা সবাই নীলামনিকে ভালবাসে। ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। কখনো আবার মেয়েটির ওপরেই রাগ ধরতো। মনে হতো ও বোধহয় আমাকে একটুও চায় না। নাহলে ও অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে এত মেশে কেন? কিন্তু এর বেশিরভাগই ছিলো হিংসাপ্রসূত। সেটাও আমি নিজেই বুঝতে পারতাম, যখন ঠান্ডা মাথায় সবকিছু ভাবতে বসতাম।
একবার আমরা সব বন্ধু-বান্ধব, মানে যারা একসঙ্গে মধুর টেবিলে বসে সারাদিন পিটাপিটি করি; তারা মিলে গেলাম গাইবান্ধা। সংগঠনে জুনিয়র একটা ছেলে এসেছিলো। গ্রামে ওর দাদার আছে বিশাল বাড়ি। এমনিতেও ক্যম্পাস বন্ধ থাকায় হাতে তেমন কাজ ছিলো না। তারমধ্যে পেয়ে গেছি পাকা আম খাওয়ার এমন জরুরী একটা নিমন্ত্রণ। আমাদের কেউই বাঁধা দিতে পারলো না। মোনালিসা আর মন্দিরাও ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাওয়ার এ সুযোগ ছাড়ে নি।
আমরা গাইবান্ধায় কয়টা দিন এ্যকোরিয়ামের মাছের মতো ছোটাছুটি করে কাটিয়েছি। দিনে গ্রাম চষে বেড়ানো, বাঁশঝাড় পর্যবেক্ষণ, পুকুরে ছিপ ফেলা আর নদীতে গোসল করা ছিলো কম্পালসারি। বিকেলে বিশাল পানকৌড়ি নৌকায় চেপে ঘুরতে বের হতাম। যে ছেলেটার বাড়িতে গিয়েছিলাম ওর দাদার নৌকা। প্রতিদিন নদীতে ঘুরলে এক সময় সেটাকে শহরের রাস্তার মতো লাগতে থাকে। এমনকি সেখানে খুঁজলে একটা পরিচিত শহুরে মোড়ও পাওয়া সম্ভব। হয়তো শাহবাগের মতো কোনো মোড়। সময় সময় যেখানে এসে মিশতে পারে বাংলাদেশের সবগুলো মানুষের সকল গন্তব্য। এটা সেবারই আমি প্রথম জানতে পারি। এর আগে জানতাম না।
সন্ধ্যা থেকে নানারকম ইনডোর-অনপেপার টাইপ গেম শুরু হয়ে যেতো। লুডুটা খুব জনপ্রিয় ছিলো। আবার কার্ডও খেলতাম একটু রাত হয়ে গেলে। নীলামনি শুতে যাওয়ার আগে হয়তো আমাকে বলে যেতো, গুড্ডু নাইট বেইব্। দেখে অতনু বণিক খুব দুঃখী দুঃখী চেহারা করে বলতো, কোপাল সবই কোপাল। অতনু আসলে দুষ্টামী করে বলার চেষ্টা করতো আমি ওর প্রেমিকাকে চুরি করেছি। আমি জানতাম, ওগুলো আসলে ছিলো বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি।
সেবার গাইবান্ধা থেকে ফিরে এসে একটি বিষয় দেখে মনে কষ্ট পেলাম। কিভাবে যেন মেয়েটির বাড়িতে আমার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। জানার তেমন কিছু ছিলো না। কিন্তু ওর রক্ষণশীল পরহেজগার বাবা ও বড়বোন যতটুকু জানার ততটুকুও মানতে নারাজ। বড়বোনকে মনে হলো আরো এককাঠি সরেস। পুঁজিপতির স্ত্রী হিসেবে তার ছিলো একটা অনেক লম্বা চাওয়ার ফর্দ। তিনি নাঁক সিঁটকে ফোনে ধমকালেন, ঢাকা ভার্সিটির ছেলে? ছিহ্ নজরটা আরো বড় কর বোন। আর নীলামনির মা তো কাঁদো কাঁদো গলায় ফোনে একদিন বলেই দিলেন, তোমার বাবা কিন্তু শুনে খুব রাগ করেছে মা। আমরা তোমাকে পড়াশোনার জন্য ওখানে পাঠিয়েছি। অনেক আশা করে বসে আছি, আমাদের বাসার ছোট মেয়েটি পড়াশোনা করে অনেক বড় হবে।
আমরা দু'জনে মিলে ঠিক করেছিলাম, এমন সেন্টিমেন্টাল একটা জাজমেন্টকে শ্রদ্ধা না করলেই নয়। কিন্তু একেকটা দিন কাটানো খুব কষ্টকর হয়ে উঠেছিলো। তখন আবার তোড়জোড় চলছিলো কাউন্সিলের। আমরা দু'জনই শক্ত দু'টো পদে দাঁড়িয়েছি, মনের ভেতর কালবৈশাখীর তোলপাড় নিয়েই। কাউন্সিলের রাতে কেউ কারো সঙ্গে কথা বলি নি। ভোরে শহীদবেদীতে ফুল রেখে অশ্রুসজল চোখে একজন আরেকজনকে অভিনন্দন জানাই নি। অথচ একই শপথবাক্য আউড়েছিলাম।
গণশপথের সময় আসলে মনের ভেতর একটা ভিন্নরকম অনুভূতি জেগে ওঠে। সবাই মুষ্টিবদ্ধ হাতে একটা প্রতিজ্ঞাপত্র পাঠ করা। এ যেন সেই অবুঝ আবেগ, যা সবসময় ছাত্রদের তৃষ্ণার্ত করে রাখে। ছাত্র আজীবন বেঁচে থাকতে চায় ওই ভাসিয়ে নেয়া আবেগের ভেতরেই। কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণে নীলামনিটা আমার ঠিক পাশে এসে দাঁড়ায় নি। আমিও যেতে পারি নি। নিজের অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পারছিলাম ওর কষ্টটা।
এরইমধ্যে কিছু জেলা সফর পড়ে গেল। একা একা কাজগুলো করে আসা ছিলো বেশ কষ্টকর আমার জন্য। বুঝতে পারছিলাম আস্তে আস্তে আমি নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছি। পটুয়াখালী গিয়ে একবার খুব মন খারাপ হলো। একটা খাঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বঙ্গোপসাগর দেখছিলাম। সাগরের ঢেউগুলো জোরোলো শব্দে পাথুরে পাহাড়ের গাএ এসে আছড়ে পড়ছিলো। সাগরের ঠান্ডা জল ছিটিয়ে পড়ছিলো আমার ওপর। আমি কাতরমনে নীলামনিকে মিস্ করছিলাম।
সফর শেষ করে আসতে আসতে বেশ ক'টা দিন পার হয়ে গেল। এসে দেখলাম, সময়ের ব্যবধানে দু'জনেই একটু সহজ হতে পেরেছি। যেন দু'জনের মনই এতদিন ফুটন্ত গরম ছিলো, কেউ কারো পাশে ঘেঁষতেই পারছিলাম না। এতদিনে ও দু'টো একটু জুড়িয়ে এসেছে। আস্তে আস্তে টুক-টাক ও জরুরী কথা বলা শুরু হলো আবার। আমরা সবাই মিলে গোলঘরে বা আইবিএ'র ঘাসের জমিতে বসে কমিটি মিটিং সারতাম। টিএসসি'তে সন্ধ্যার পর নিজেদের ঘাঁটিতে বসে আড্ডা হতো। আলাপ হতো সবার সঙ্গেই। কিন্তু আমাদের দু'জনের আড্ডাশেষে একসঙ্গে আজিমপুরে ফেরা হতো না। আমি অনেক রাত পর্যন্ত টিএসসি'তে বসে থেকে একসময় আমার সদরঘাটের বাড়ির পথে হতাশাগ্রস্থ যুবকের মতো হাঁটা দিতাম।
আমাদের দু'জনের ভেতর চলছিলো একটা পুরোপুরি রাজনৈতিক মেলামেশা। তবে কিছুটা হয়তো রাজনীতি বহির্ভূত ব্যপার ছিলো তার মধ্যেও। যেমন গভীর রাতে কেউ কাউকে ফোন দিতাম না। মনটা হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া কেঁপে উঠলেও কিচ্ছু বলতাম না। চুপ করে নিজের ভেতর সেটাকে লুকিয়ে রাখতাম। স্বাভাবিক একটা সম্পর্ক থাকলে নিশ্চই এভাবে সন্তপর্ণে নিজেকে সবসময় লুকিয়ে রাখতে হয় না। তবে সেভাবে একেবারে যে চলছিলো না, তা না। চলছিলো ঠিকই। তবে শরীরের ভেতর ভীষণ ক্ষরণ টের পাচ্ছিলাম। বিশেষত বুকে।
৩
এর মধ্যে ঘটে গেল এক ভয়াবহ ঘটনা। নীলামনিদের মাস্টার্স পরীক্ষা চলছিলো। আর আমাদের চলছিলো নিউ মাস্টার্সের ক্লাস। কারা যেন একদিন রাঙ্গামাটিতে ইউপিডিএফ-এর কয়েকজন নেতাকে গুলি করে মেরে ফেললো। কেউ বললো সরকার, কেউ বললো সেনাবাহিনী আর কেউ আঙ্গুল তুললো সন্তু লারমার দিকে। কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ কিছুই বলতে পারলো না।
আসলে ঘটনাটা কি ঘটেছে সেটা যারা নিশ্চিত করে বলতে পারতো তারা, কোনো কথা না বলে একদিন জগন্নাথ হলের চারটা ছেলে আর শামসুন্নাহার হলের একটা আদিবাসী মেয়েকে দিনেদুপুরে গুলি করে মেরে ফেললো। ক্যম্পাসের ভেতর। প্রত্যেকটা ডেডবডি পড়ে ছিলো বিভিন্ন পরিচিত রাস্তাগুলোর ওপর। কেউ পড়েছিলো ডাস থেকে শামসুন্নাহার হলের দিকে যাবার রাস্তায়। কেউ জগন্নাথ হলের পুকুর আর মন্দিরের ঠিক মাঝের রাস্তায়, আর কেউ বা অপরাজেয় বাংলার সামনে। ক্যম্পাসে এমন ছোপ ছোপ রক্তমাখা রাস্তা একাত্তরের পরে আর কখনো দেখে নি মানুষ।
তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে, সেটা ছিলো একটা রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ। যা অনেককাল থেকেই চলে আসছে। এবার সেই নোংরা আদিবাসী-বাঙালি রাজনীতির বলি হলো কয়েকটা নিষ্পাপ শিশু। দেশের মানুষ হতবাক হয়ে গেল ঘটনায়। কোনো ঝগড়ার মাশুল যে শেষপর্যন্ত আত্মজা'র প্রাণের বিনিময়ে চুকাতে হবে সেটা কোন্ বাবা ভাবতে পারে?
এ ঘটনার পর থেকে পাহাড়ে প্রতিদিনই গোলাগুলির শব্দ শোনা যেতে লাগলো। শোনা যেতে লাগলো গুলিবিদ্ধ কিশোরের শেষ আর্তচিৎকার। হয়তো তপ্ত সীসার বুলেট তাকে বিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত সে জীবনের মূল্যই বুঝতে পারে নি। আর শেষমূহূর্তে পুরোটা হঠাৎ বুঝতে পেরে কলিজাফাটা চিৎকার দিয়ে মরে গেছে। হয়তো চিৎকার করে ডেকে উঠেছিলো নিজের মা'কেই। ভেবেছিলো মা’কে ডাকতে পারলেই সব বিপদ থেকে বেঁচে যাবে। আমি নিশ্চিত সেই ডাক যদি একবার কোনো মাএর কানে যেতো, কেউ আর কোনোদিনও তার ছেলেকে এমন পথে পা বাড়াতে দিতো না।
একসময় সেই ঘটনায় সরকার জড়িয়ে গেল, সেনাবাহিনী জড়িয়ে গেল। আমাদের পাহাড়ী বন্ধুগুলোও কেমন যেন হয়ে গেল। কোনোকিছুই যেনো ঠিক-ঠাক চলছে না। এদিকে আমাদের ক্যম্পাস ছুটি দিয়ে হল ভ্যাকেন্ট করে দেয়া হয়েছে। তাও প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটছেই। আমরা মিছিল-বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছি। নিজেরা একা একবার একটা মিছিল করি। এরপরে কয়েকটা সমমনা দল মিলে আরেকটা মিছিল করি। অন্যান্য সংগঠনগুলোও এসবের মধ্যেই ছিলো। কিন্তু তাতে পাহাড়ের পরিবেশ ঠান্ডা হচ্ছিলো না। এমনকি ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠছিলো সারাদেশও। বিভিন্ন জায়গায় গুপ্তহত্যা, বদলা নেয়ার ঘটনা ঘটছিলো। পত্রিকাগুলো প্রতিদিন গরম গরম ছাপা হতো। টিভির রিমোটটাও গরম হয়ে থাকতো সবসময়। একটু টিপলেই ভীষণ একটা খবর নিয়ে মনিটরটা হাজির হয়ে যেতো চোখের সামনে।
নীলামনি আর আমি সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আমাদের হাঁকডাকে ক্যম্পাসে গণ্ডগোল-মারপিট বেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু হচ্ছিলো না। অবস্থা দিনে দিনে খারাপ থেকে খারাপতর হয়ে ওঠার কারণে একসময় নীলামনিকে বাড়ি থেকে ডেকে পাঠানো হলো। বাবা আর বড়বোন ফোন করে বাড়ি ফিরতে বললেন। মাস্টার্স পরীক্ষা দেয়া বাদ। প্রবাসী পাত্র পাওয়া গেছে। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
সেবার পাহাড়ের যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়েছিলো আরো অনেক কিছু। ক্যম্পাসের ছুটি শেষ হয়েছিলো। নীলামনির মাস্টার্স পরীক্ষাও শেষ হয়েছিলো। ও বাসায় অনেক বলে-কয়ে মাস্টার্স পর্যন্ত বিষয়টা ঠেকিয়ে দিয়েছিলো। মেয়েটিকে সুপরিণত চিন্তা করার জন্যও একটা এ্যওয়ার্ড দেয়া দরকার। আর আমি বলা যায় ক্যম্পাস লাইফের একেবারে প্রায় শেষ-এ এসে উপস্থিত হয়েছি। আর কিছুদিন পর শেষ হয়ে যাবে ঢাকা ভার্সিটি নামক বাড়িটায় আমার এতদিনের পদচারণা। সেই সময়টায় আমি একটু সুযোগ পেলেই ক্যম্পাস লাইফে কি পেয়েছি আর কি পাই নি, হিসেব করতে বসতাম প্রায়ই। আমার পাওয়ার খাতায় কিছু অমলিন স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই জমা ছিলো না। নিজেকে খুব পরাজিত আর হতাশ একটা মানবভ্রুণ বলে মনে হতো। এমন সময় নীলামনি একদিন ফোন দিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এল।
তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। সাত বছরের কর্মব্যস্ত ক্যম্পাস জীবন শেষ করে এখন ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। প্রথমে বাবার বাড়ি। সেখানে থেকে খুব শ্রীঘ্রই হয়তো অন্য কোথাও। অন্য কোনো বাড়ি। সবই জানতাম। ও আমাকে কোনোকিছুই না জানিয়ে রাখে নি। কিন্তু আমার কেন যেন সেদিন ওকে যেতে দিতে ইচ্ছেই করছিলো। ওর মুখটা বুকের সঙ্গে খুব শক্ত করে চেপে ধরে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো।
ইচ্ছে হচ্ছিলো ওকে নিয়ে অনেকদূরে কোথাও চলে যেতে। যেখানে এই কোলাহলপূর্ণ জনপদ নেই। কোনো সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নেই। পরিবারের চাপিয়ে দেয়া বোঝা কাঁধে বয়ে বেড়ানোর নিয়ম নেই। এমন কোথাও, যেখানে মানুষ তার নিজের ইচ্ছায় স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারে। কেউ দাঁড়িপাল্লা হাতে সবকিছু মাপার জন্য গ্যাঁট হয়ে বসে থাকে না।
খুবই ইচ্ছে হচ্ছিলো, তেমন কোনো একটা জায়গায় গিয়ে দু'জন মিলে একটু ছোটাছুটি করতে। আমরা একদিন রাত তিনটার সময় রাজু ভাস্কর্যের সামনে খালি পাএ ছোঁয়াছুয়ি খেলেছিলাম। সেটা ছিলো একটা কাউন্সিলের রাত। দুই সেশনের মাঝের মুক্ত সময়ে আমার দু'জন সেদিন কংক্রীটের রাস্তায় ফুটিয়েছিলাম নাইটকুইনের ফুলকি ছড়ানো আলো। আমার আরো একবার সেভাবে ওর সঙ্গে ছোটাছুটি করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো।
নীলামনিকে বললাম, তারচে' চলো সুন্দরবন চলে যাই।
-সেখানে গিয়ে?
গিয়ে একটা ব্যবস্থা করে নেবো।
-কি ব্যবস্থা?
এই এটা-সেটা কিছু একটা।
-কি ব্যবস্থা একটু খুলে বললেই না ভাবতে পারি।
কোনো পরিকল্পনা নেই আপু। শুধুই চলে যাবো এই অপ্রিয় জীবন ছেড়ে। কোনো মুক্ত পৃথিবীতে। হয়তো বন থেকে মধু খুঁজে আনার পেশাকে আপন করে নেবো। তাও তুমি আর আমি একসাথে চুপ করে বসে থাকবো। কোনো এক ছোট্ট কুঁড়েঘরে, একজন আরেকজনের খুব কাছে। আমাদের দিন আর রাত কেটে যাবে মুগ্ধতায়। চলো যাবে? কি হয় ওই লোকটার সঙ্গে বিদেশে না গেলে? মানবসমাজের যে অসম বিন্যাসকে সারাজীবন ঘৃণা করেছো, সেই ব্যবস্থাকেই মেনে নিতে চাও? আমরা তো জানতাম বাঁধা আসবেই। তাও কি এই রাস্তাই বেছে নিই নি? অথচ আজ কেবল শ্রেণীশত্রু হয়েছি বলেই তুমি আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছো।
-তুমি কেন আমার শ্রেণীশত্রু হবে? কি আশ্চর্য!
হ্যাঁ সেটাই, আমি তোমার শ্রেণীশত্রু হয়েছি। কারণ আজ তুমি একজন স্বার্থক লুম্পেনের মতো নিজের শ্রেণী বদলাতে যাচ্ছো। এতদিনের শোষিত জীবন তোমাকে আজ মুক্তি দিয়েছে। তুমি নাম লেখাতে যাচ্ছো পেটিবুর্জোয়াদের দলে। এখন আস্তে আস্তে তোমার বাড়ি-গাড়ি-বিমান টিকেট সবই হবে। তুমি ইতালি-ফ্রান্স-লুভরে ঘুরে বেড়াবে আর রেনেসাঁর প্রবর্তকদের দেখে হা-হুতাশ করবে। ভুলে যাবে একসময় নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেছিলে। হতে চেয়েছিলে সত্যিকারের প্রগতিশীল। মনে, মননে, চিন্তায়, চেতনায়।
-না আমি তা চাই না। আমি সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। সুখ একটু কম পেলেও..
হা হা, ওসব গোলঘরে আওড়ানো বুলি বাদ দাও। বদলাও সোনামনি, আমি চাই তুমি বদলে যাও। মুদ্রার অপর পিঠ না দেখলে সেটার প্রকৃত স্বরূপ বোঝা যায় না। আমার ভালবাসাটাকেও তুমি কখনো বুঝতে পারবে না, এভাবে হারিয়ে না ফেললে। আজীবন আমায় পেয়ে পেয়ে তোমার ভেতর আমার ঘাটতি কি জিনিস, সে উপলব্ধি জন্মানোর সুযোগই পায় নি। এবার একটা সুযোগ এসেছে। খারাপ কি? তুমি বদলে যাও।
-আমি সেই উপলব্ধি চাই না। কি হবে আরেকজনের সঙ্গে দূরে চলে গিয়ে সেটা বুঝতে পারলে? আমি সত্যি তোমায় ছেড়ে যেতে চাই না জানো?
না আমি তোমায় আটকাবো না। যাও, তুমি তোমার পথ খুঁজে নাও। জীবন আজ তোমার জন্য মোহময় মোড়কে সুখ নিয়ে এসেছে। তুমি সেই সুখের ভেলায় উঠে বসো। আমার শুভকামনা সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে। য়ু ক্যান গো গার্ল।
-আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতে পারবো না ছেলে। তুমি প্লীজ এভাবে কথা বলা বন্ধ করো।
ও হঠাৎ দু'জনের দুরত্বটা একধাপে পেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। আমিও খুব শক্ত করে ও'কে জড়িয়ে ধরলাম। আমি জানতাম ও কখনোই আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারবে না। মানুষের পক্ষে ভালবাসার মোহ থেকে বের হয়ে আসা কঠিন। সেই সময়টায় কেন যেন আমার পোড়াচোখ দু'টোও খালি ঝাপসা হয়ে আসছিলো বারবার।
---
(এই লেখাটা লীনা আপুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত
)





আহ... এ্যন্ড আ হ্যাপী এন্ডিং...
ইমোটা দারূণ লাইক হৈছে
এই সময়ে সুন্দর বনে যেওনা ভাই খালি জোঁক। ইয়া বড় বড়। প্রতিটি গাছের উপরের পাতায় আবার মাটিতে পরে থাকা পাতাতেও। রক্তের গন্ধে বের হয়ে আসে।
নীলামনি লালরুবী হয়ে যাবে তারপর বৃত্তবন্দীর মন্তব্য----
আর আমার কপালে নীলামনি!!!
আছেন-টাছেন কেমন বলেন? বাচ্চারা কেমন আছে?
ইস, শেষ হয়ে গেলো...?
বেশতো ঘুরছিলাম ক্যাম্পাসে...
মনে হচ্ছিল আমিও আছি তোমাদের সাথে...
সেই চেনা জায়গা, চেনা সুর, চেনা মুখগুলো...
স্মৃতির জাবর কাটলাম ম্যালাদিন পর...
থ্যাংকস মীর
তাইলে তো এরুম কৈরে আরো লেখা লাগে। আপনে কুন ডিপার্টমেন্টে পড়তেন বলেন।
য়ু আর অলওয়েজ ওয়েলকাম ব্রাদার।
পড়তাম আর কী !

রাষ্ট্রবিজ্ঞান জাতীয় কিছু একটা ছিল...
বাবাহ্। রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে কি দুইটা ফার্স্ট ক্লাস পাইসিলেন?
আর একটা কথা, যেটা জিজ্ঞেস করার মতো কাউকে পাচ্ছি না, আপনাকেই করতে হচ্ছে; আপনের না ছোট একটা বোন ছিলো- বিআইএফসি'র অফিসার, তার খবরাখবর জানেন কিছু?
ভাল লাগছে!
পড়ার পর থেকে লাগছে না আগে থেকেই লাগছিলো?
গল্প বরাবরের মতই উপাদেয়
মন্তব্যও।
আমিও তাই ই বেবেচিলুম! ধুরো!
খুব ভালো হৈসে যে, আপনাদের দু'জনের দুষ্ট আশা পূরণ হয় নি।
নিজে যে বেডসিনের স্বপ্ন দ্যাখাইলো, তাতে কিছু না? আমরা চাইলেই দুষ্ট আশা?
কলিকাল! ঘোর কলি!
কলিকাল যে তা তো বোঝাই যাচ্চে। মানুষজন কি সব শব্দ কত অনায়াসে টাইপ করে ফেলে।
এধরনের গল্পের অনেক ধরনের সমাপ্তি আমি জানি
। লেখক ভগবান তিনি যা ইচ্ছে করেন
মেল শোভেনিষ্ট
তার মানে এন্ডিংটা স্বতঃস্ফূর্ত হয় নি?
কই আপনে বললেন না, এন্ডিংটা আরোপিত আরোপিত লাগছে কি না?
লুকজন প্রায়শই বকওয়াজ করার চেষ্টা করলেও, আমার লেখালেখির অপচেষ্টা কতখানি ফালতু হয়; সেটা আমি জানি। সো বিন্দাস্ আপনে বলেন তো দেখি শুনি একটু।
মানুষের পক্ষে ভালবাসার মোহ থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।
-কথাডা হাচা আছে ।
আর আপনে কিরাম আছেন? আমারে তো মনে রাখনের কারণ নাই। কিন্তু তাই বইলা একদমই ব্লগে আসেন্না, কিছু লেখেনও না, খালি মাঝে মধ্যে দুষ্প্রাপ্য দু'একটা কমেন্ট ছাড়েন, আর কিছু করেন না- কি সমস্যা ভাইজান?
গল্প ভালো লাগছে।
করে নাই!!
তাই তো দেখা যায়..
মীর কত গল্প জানে!!!!
এই অংশটা মারাত্মক লেগেছে
অসাম আপনার লেখা।
ঐ লাইনটা লেখার সময় আমিরের রঙ দে বাসন্তী-র কথা মনে পড়ছিলো..

আপনার লেখা আরো অসাম লীনা আপু
ভালো লাগল অনেক......................
মন্তব্য করুন