গল্প : ইনটু দ্য ওয়াইল্ড
ইনটু দ্য ওয়াইল্ড। আমার খুব প্রিয় সিনেমাগুলোর মধ্যে একটা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের জীবন মনে হয় আসলেই এ সিনেমাটির সঙ্গে মানানসই। কারো যদি কোনোকিছুতেই মন না বসে এবং সিরিয়াসলিই সেটা না বসে; যার কোনো রিমেডি নাই, তখন তাকে কি করতে বলা উচিত? পুরো পৃথিবী ছেড়ে একা একা বাস করার জন্য অরণ্যে গিয়ে ঠাঁই নেয়া সিনেমার সেই একরত্তি ছেলেটার জীবনের শেষ উপলব্ধিটি ছিলো, হ্যাপিনেস্ ইজ রিয়েল হোয়েন শেয়ার্ড। সুখটা তখনই আসল, যখন সেটা কারো সঙ্গে ভাগ করে নেয়া যায়। কিন্তু কোনো কোনো সুখ আছে, যেগুলো কারো সঙ্গে ভাগ করে নেয়ার সুযোগ থাকে না। সেই সুখানুভূতিগুলো নিয়ে আমাদের কি করা উচিত? আমি মাঝে মাঝে বসে বিষয়টা নিয়ে ভাবি।
সেদিন বিকেলে আনমনে ফুটপাথ ধরে ধরে হাঁটছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই হাতে কোনো কাজ ছিলো না। পথে আয়ার্স নামে একটা পাব দেখে চট করে ঢুকে পড়লাম। এখানে আসার পর সেদিনই প্রথম এলকোহল নেয়া। শরীরটা কেমন যেন শুকনো ভূমির মতো হয়েছিলো অনেকদিন এলকোহল না নেয়ার কারণে। দেশের সে সন্ধ্যাগুলোর কথা খুব মনে পড়তো; যখন আমি, ক্যানিজিয়া আর রিফাত প্রতিদিন একসঙ্গে ময়ূর রেস্তরায় বসে দেশি কেরু পান করতাম। এলকোহলিক পণ্য হিসাবে দেশি কেরুটা একটু বেশিই কড়া। তবে ওদের ভদকাটা বেশি করে পানি মিশিয়ে খেতে খুব একটা খারাপ লাগে না। আমার সেই দিনগুলো অনেক অ’সাম ছিলো, কেননা তখন জীবনটা ছিলো একরৈখিক। টাকা কামাও, খরচ করো। আর কিছু ভাবার প্রয়োজন পড়তো না।
এখানে আসার আগেই অবশ্য আমার সে অবস্থা চেঞ্জ হয়ে যায় এবং এখানে এসে যখন পৌঁছুই, তখন যাকে বলে পুরোদস্তুর একজন ঘরোয়া মানুষ আমি। অর্থ-কড়ি সাবধানে খরচ করি। চেষ্টা করি জমিয়ে রাখতে। আমার দিকে চেয়ে থাকা মানুষগুলোর কথা চিন্তা করে সবসময় একটা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যে থাকি এবং নিজের ইমেজটাকে ক্লিন রাখার চেষ্টা চালাই। এভাবে চলাটা আমার জন্য সহজ ছিলো না। নিজেকে সবসময় বন্দি বন্দি লাগতো এবং আমি অনেক সময় আমার আগের বুনো সত্ত্বাটাকে মিসও করতাম। কিন্তু আমার কোনো উপায় ছিলো না।
সেদিন পাবে ঢুকে এক মগ বয়লারমেকার নিয়ে বসে উপরের কথাগুলো ভাবছিলাম। আশপাশে খুব বেশি খেয়াল ছিলো না। নিজের ভেতরে ডুবে ছিলাম। যেটা আমি সচরাচর থাকি। এমন সময় ক্রিস্টেন নামের মেয়েটি আমার পাশের টুলে এসে বসেছিলো। আমাকে বন্ধু শওকত একদিন বলেছিলো, ‘পাবে যে মেয়ে একা তোমার পাশে এসে বসবে বা বসতে চাইবে সে মেয়ে আসলে… তুমি জানো সে কি।’
শওকত আমাকে এখানে রেখে পাশের দেশে ওর বাবা, বড় বোন, বোনের দুই পিচ্চি, দুলাভাই আর বড় ভাই যেখানে থাকে সেখানে চলে গেছে। চার সপ্তাহ পরে ওর আসার কথা আমাকে দেখবার জন্য। এখনো সেই সময়কাল পার হয় নি। আমি বুড়ো বাড়িওয়ালার সঙ্গে বিকালের দিকে খানিকক্ষণ দাবা খেলি আর সন্ধ্যার দিকে শুকনো পাতা ঝরে থাকা কংক্রীটের রাস্তা দিয়ে হাঁটি। এই ছিলো আমার কাজ।
পাশের টুলে কেউ এসে বসলে তার দিকে তাকিয়ে সৌজন্যমূলক হাসি দিতে হয়। এটাও শওকতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য। আমি কোনো হাসি দিলাম না বা দিতে পারলাম না। তবে মেয়েটির দিকে তাকালাম। সে আমার লম্বা বয়লারমেকারের মগের দিকে গোল গোল চোখ করে তাকালো। অপরিচিত মানুষের মুখে পরিচিত জনদের মতো অভিব্যক্তি দেখলে আমি সবসময় কনফিউজ হয়ে যাই। সেদিন মেয়েটির অভিব্যক্তি দেখেও তাই ঘটলো। কিন্তু তার অভিব্যক্তির জবাবে কি বলা যায়, সেটা ভেবে বের করতে পারলাম না। বিল মারে হয়তো পারতো। কিন্তু বসের সঙ্গে আমার আছে যোজন যোজন তফাৎ।
মেয়েটি জানতে চাইলো, তোমার বাড়ি কোথায়?
-এশিয়া।
এখানে?
-কি এখানে?
এখানে কি করো?
-কিছু করি না। মগে ককটেল বিয়ার নিয়ে বসে থাকি।
আহা এখানে বলতে কি এই পাবের কথা বলছি নাকি? এই শহরে তুমি কি করো?
-কিছু করি না। কিন্তু তুমি কেন এসব জানতে চাইছো? তুমি কি কপ?
আমাকে দেখে কি কপ মনে হচ্ছে?
মেয়েটি এ প্রশ্ন করার পর আমি তার দিকে ভালো করে তাকালাম এবং সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেললাম সে বয়সে আমার চেয়ে অন্তত ১০ বছরের ছোট হবে। ভাবলাম একটু মজা করা যাক।
আমি চোখ সরু জানতে চাইলাম, ওকে নাইস্ ইয়াং লেডি, কিন্তু আমার কথার আগে তুমি নিজের কথা বলা শুরু করো। তুমি কি আঠেরো হয়েছো আদৌ?
-ইহ্ আসচে একজন আমার বয়সের হিসাব করতে। তুমি আমাদের শহরে কি করো সেইটা বলো।
বললাম তো, কিছু করি না। এখানে থাকতে আসছি। আমার থাকার কোনো জায়গা নেই তো। সে যাকগে, তুমি কি কিছু পান করবে?
-হ্যাঁ তোমারটাই।
আমি কি তোমার জন্য একটা বাই করবো?
-না আমি বরং তোমার জন্য একটা বাই করি, কি বলো ভিনদেশি?
‘ভিনদেশি’। মেয়েটি আমাকে ঠিক এই শব্দটি দিয়েই সম্বোধন করেছিলো সেদিন। আমি ওর সঙ্গে বসে আরো দু’টো বয়লারমেকার শেষ করে বেশ খানিকটা উঁচুতে উঠে গেলাম এবং ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি এলকোহলিক?
-হ্যাঁ, তুমি কিভাবে বুঝলে?
জানি না। মনে হলো তাই বললাম। কিন্তু তোমার মতো এত অল্পবয়েসী একজন মানুষ কেন এলকোহলিক হবে সেটা বুঝতে পারলাম না।
-তোমার নিজের বয়স কত? নিজেও তো মেনিছানাটির মতো চুক চুক করে বিয়ার টানছিলে। আমি খেয়াল করি নি ভেবেছো? খালি সবাই আমার বয়স নিয়ে টানাটানি করে। অসহ্য।
ঠিক আছে। বয়স নিয়ে তোমার মধ্যে যদি কোনো হার্ড-ফিলিং থাকে তাহলে এটা নিয়ে আর কথা বলবো না। আমি ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো বয়সকে খুব বেশি পাত্তা-টাত্তা না-দেয়াদের দলের লোক।
-আমি আসলে তাই। আমার বয়স এখন ২৬। কিন্তু সেটা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। অবসেসড্ লাগে মাঝে মাঝে।
কথাটা শুনে কষ্ট হলো মেয়েটির জন্য। বেচারী আসলে এক ধরনের ঝামেলার মধ্যে আছে। এটা এমন একটা সংকট, যেটার স্বরূপ জানেন কেবল ভুক্তভোগীই এবং কাকতালক্রমে আমিও ছিলাম তেমন একজন ভুক্তভোগী। তাই মেয়েটি যখন চুপ করে গেলো শেষ কথাটি বলে, আমিও চুপ হয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে নীরবতা খুবই স্বস্তিকর হয়ে ওঠে। সেদিনের নীরবতা আমাদেরকে ঠান্ডা হাওয়াসমৃদ্ধ শহুরে রাস্তায় বেশ খানিকটা পথ একসঙ্গে হাঁটার সুযোগ করে দিয়েছিলো।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে রিজ ব্রীজ নামের শহরের সবচে’ বড় ব্রীজটিতে চলে গিয়েছিলাম। ব্রীজটা অবশ্য কাছেই অবস্থিত। আমার বাসার জানালা থেকে দেখা যায়। ব্রীজের ওয়াকওয়েটা অনেক প্রশস্ত ছিলো। আমরা দু’জন অনেকক্ষণ ব্রীজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মেয়েটিকে যতোটা অবসেসড্ ভেবেছিলাম, একসময় দেখলাম সে ততোটা অবসেসড্ না। বরং জীবন নিয়ে একটু বেশিই চিন্তিত। আমার উড়নচন্ডী জীবনের কথা শুনলে হয়তো অবাক হয়ে চোখ গোল গোল করে তাকাবে। সে অবাক হলে দারুণ একটি অভিব্যক্তি দিতে পারে। সেদিন মেয়েটির এই একটি জিনিসই কেবল নোটিশ করতে পেরেছিলাম। এছাড়া বাকি সবকিছু ডুবে ছিলো সন্ধ্যার মায়াবী অন্ধকারে।
মেয়েটি হলিউডি সিনেমা খুব বেশি দেখতো না। আমি ওকে ইনটু দ্য ওয়াইল্ডের একটা ডিভিডি দিয়েছিলাম। সেটা দেখে ও খুব মজা পেয়েছিলো এবং ওর এমপিথ্রি প্লেয়ারটায় ‘সোসাইটি য়ু আর আ ক্রেইজি ব্রীড’ গানটা ঢুকিয়ে নিয়েছিলো। সন্ধ্যার দ্বিতীয় বিয়ারটা শেষ করার পর ওর ওই গানটা হেডফোনে শুনতে নাকি দারুণ লাগতো। আমি ওকে ‘পিনিক’ শব্দটার প্রচলিত অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। নেশাদ্রব্য সেবনের পর যে নেশাটা মানুষের হয় সেটাকে পিনিক বলে। এটা বেশি হতে পারে, কম হতে পারে, ভালো হতে পারে আবার মাঝে মাঝে খারাপও হয়ে যেতে পারে। খারাপ পিনিক হলে সেদিন মানুষ অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। আমার কাছ থেকে এ জিনিসগুলো জানার ব্যপারে ওর ছিলো অসীম আগ্রহ। এই ব্যপারটি আমি বেশ উপভোগ করতাম। ও বলতো, গানটা নাকি ওর পিনিককে সবসময় ভালো দিকে বাড়িয়ে দেয়। শুনে আমার মজা লাগতো এবং আমি ওকে জানাতাম, এটাই নিয়ম। আমাদের দেশে শুধু পিনিক করে আর গান গায়- এমন একটা জাতিই আছে। তাদেরকে বাউল বলা হয়। তবে সব বাউল পিনিক করে না।
আমার কথা শুনে মেয়েটি অবাক হওয়ার সেই সুন্দর অভিব্যক্তিটা দিতো। আমরা দু’জনে একেক দিন চার মগ-পাঁচ মগ পর্যন্ত বিয়ার খেয়ে ফেলতাম। শওকতটার আসার সময় পেরিয়ে গিয়েছিলো। সে আসতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করার চেষ্টা করছিলো কিন্তু আমি ওকে নিষেধ করে দিয়েছিলাম। দুঃখ প্রকাশের প্রয়োজন নেই। যখন সুযোগ হবে তখন আসিস। আমি খারাপ নেই।
মেয়েটির বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে একদিন আমার পরিচয় হলো। ওদের মহল্লায় একদিন গেলামও। সেখানে দারুণ মজা হয়েছিলো। মহল্লার সব হল্লাবাজ পোলাপানের সঙ্গে ছিলো ওর খাতির। আর সবাই ওকে খুব পছন্দও করতো। ওখানে গিয়ে আমি দেশের বাইরে প্রথম ‘মারিযুয়ানা’র দেখা পেলাম। ওদের বানানো জয়েন্টগুলো ভালো ছিলো। আর ওরা ছিলো অনেক সহজ-সরল। এতদিন মেয়েটির অভিব্যক্তি দেখে আমি অবাক হতাম আর ভাবতাম, এত সুন্দর অভিব্যক্তি দেয়া সে রপ্ত করলো কিভাবে? কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম, ছেলে-মেয়ে সবার মুখেই অভিব্যক্তিগুলো চমৎকার ফুটছে। সুন্দর অভিব্যক্তি দেয়ার গুণটি বোধহয় জাতিগতভাবেই ওদের ভেতরে আছে। আর তাই ওদের সঙ্গে অনেক সহজে ও নির্ভুলভাবে কমিউনিকেট করা যাচ্ছিলো। এমনকি আমার মতো আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগে দুর্বল লোকও যখন খুব সহজে ওদের সঙ্গে মিশে গেলো, তখন আমি আসলেই অবাক হয়েছিলাম।
আর ছেলেপিলেগুলো ফূর্তিবাজও ছিলো অনেক। সেই আনন্দের বলি হয়ে যেতে হয়েছিলো একটা নাদুসনুদুস ভেড়াকে। মেয়েটি আসলে ওই শহরে যারা ভেড়ার খামার করে, সেখানে থাকতো এবং ওদেরও একটা ভেড়ার খামার ছিলো। খামারের ভেড়া বিক্রির একটা সিস্টেম হচ্ছে পছন্দের ভেড়াটাকে শিকার করে নিয়ে যেতে হয়। এজন্য আবার শিকারীও থাকে সঙ্গে। চাই কি শিকার ধরার পর সেটাকে ঝলসে সেখানেই একটা বার্বিকিউ পার্টির আয়োজন করার মতো বন্দোবস্তও থাকে সব খামারেই।
সেদিন রাতে সেরকমই একটা বার্বিকিউ পার্টির ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। কোনো কারণ ছাড়াই। আমরা সারারাত ভেড়ার ঝলসানো মশলাদার মাংস, মেক্সিকান টাকুইলা, ফ্রিটো লে কোম্পানির বিভিন্ন রকম চিপস্ আর বড় বড় জয়েন্ট টেনে সময় কাটালাম। আমি অনেক আগে চারটা রিজলা জোড়া দিয়ে আতিকায় সাইজের ক্যানন বানানোর একটা পদ্ধতি শিখেছিলাম। অনিশ্চিতভাবে সেটা একবার বানানোর ট্রাই করলাম আর জিনিসটা দাঁড়িয়েও গেলো। অনেকক্ষণ ধরে টানতে হচ্ছিলো বলে সেটা টানতে কারো কারো বেশ কষ্টই হয়েছিলো। তারপরেও ক্যাননটা শেষ করে ওরা একেকজন অকারণেই হাসিতে ঢলে পড়ছিলো। আর একেকবার হাসি শুরু হলে সেটা থামার কোনো নামই নিচ্ছিলো না। সে সময় মেয়েটি কোথা থেকে যেন আমার পাশে এসে বসে বললো এবং জিজ্ঞেস করলো; ওদের খুব ভালো পিনিক হয়েছে, তাই না?
বাকী রাতটা আমি মেয়েটির সঙ্গে খামারের একটা দীঘির পাশে শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলাম। সেই দেশেও দেখলাম, লোকজন দরকারে পেপার বিছিয়ে সেটার ওপর শুয়ে-বসে থাকতে পারে। আমি ভেবেছিলাম, সেটা বুঝি কেবল আমাদের দেশেই হয়। দুই টাকা দিয়ে মানুষ একটা পত্রিকা কিনে প্রথমে সেটা পড়ে, তারপরে সেটার ওপর বসে থাকে, কখনো কখনো সেটা দিয়ে বাতাস খায়; কত কিছু যে করে।
যা হোক, আমরা দু’টো পেপার বিছিয়ে সেগুলোর ওপর দু’জন শুয়ে অনেক গল্প করলাম। আমাদের সঙ্গী-সাথীরা যে যার মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছে। তাদেরকে নিয়ে মেয়েটির মধ্যে কোনো চিন্তা সৃষ্টি হতে দেখা গেলো না। আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম ওদের কথা। মেয়েটি বলেছিলো; সবাই যার যার মতো আছে, থাকুক না। পৃথিবীর সব মানুষেরই প্রাইভেসি বলে একটা ব্যপার আছে। আর সেটার প্রয়োজন তার যে কোনোখানেই পড়তে পারে।
লজিকটা ভালো লেগেছিলো। ও আমাকে সেদিন রাতে বলেছিলো, ওর প্রথম আফেয়ারের কথা। সেটা কিভাবে ভেঙ্গে যায় তার কথা। বলেছিলো, ও এখন স্বপ্ন দেখে ছোটো-খাটো একটা কারখানা দেবার। যেখানে তাদের খামারের ভেড়াগুলোর লোম প্রসেস করে উল বানানো হবে। ওদের এলাকায় এ ধরনের কারখানা একটাও নেই। তাই সবাইকে ভেড়ার লোম বিক্রি করে দিতে হয়। যদিও তাতে যথেষ্টই ইনকাম হয় তাদের সবার। কিন্তু কারখানা করা গেলে পুরো উপার্জনটাই নিজেদের কাছে থেকে যাবে এবং ওর ধারণা সেটা একটা ভালো পিনিকের ব্যপার হবে।
আমি জানতে চাইলাম, কেন পিনিকের ব্যপার হবে কেন? এর সঙ্গে পিনিকের কনজাঙ্কশনটা কি?
-নাই কোনো সংযোগ। তারপরেও ধরো পিনিক আমরা কেন করি? মজা পাবার একটা বিষয় আছে আর অভ্যস্ত হয়ে যাবার একটা বিষয় আছে, তাই না? কারখানার ব্যবসাটা করতে পারলে কিন্তু ভিন্নরকমের একটা মজা আর অভ্যাস দুই’ই পাওয়া যাবে। তো সেটা ভিন্ন একটা মাত্রা থেকে পিনিকের ব্যপার না?
আমি বিজ্ঞের মতো মাথা উঁচু-নিচু করলাম। যেন মেয়েটির কথা ঠিক ঠিক ধরতে পেরেছি। এমন অনেক আবোল-তাবোল কথা বলতে বলতেই সেদিন আমরা একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তখন কেবল রাতের আঁধার কাটতে শুরু করেছিলো। আমাদের শোয়ার জায়গাটা ছিলো চমৎকার ও নিষ্কন্টক। আমরা ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত একে অপরের সঙ্গে গল্প করছিলাম। বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলাম এবং সেগুলোর উত্তরও দেয়া হচ্ছিলো। আমার স্পষ্ট মনে নেই, শেষ ওর কি যেন একটা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগেই ঘুমকুমারী আমাকে পৃথিবী থেকে তুলে ঘুমের রাজ্যে নিয়ে চলে এসেছিলেন। আমি আর সেই প্রশ্নটার উত্তর ওকে দিতে পারি নি।
সকালে উঠে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাতের ওই প্রশ্নটা কি ছিলো, যেটার জবাব দেবার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মেয়েটি অবাক হবার ভঙ্গি করে জানতে চাইলো, তাই নাকি? তুমি আমার কথার উত্তর না দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলে? দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। বলে সত্যি সত্যি সে আমার দিকে তেড়ে আসার একটা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলো। আমি বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরে কেবল একটা দৌঁড় দেবো দেবো ভাবছি, এমন সময় বেরসিক সেল ফোনটা বেজে উঠলো এবং দেখলাম শওকত ফোন করেছে।
সে আমার বাসায় এসে আমাকে না পেয়ে ফোন করেছিলো। আমি তাকে বাসায় থাকতে বলে মেয়েটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এসেছিলাম। বিদায় নেবার সময় মেয়েটি আমাকে জানিয়েছিলো, আমরা মূলত ওদের খামারেই আগের রাতটি কাটিয়েছি। শুনে আমি চারপাশে তাকিয়ে ভালো করে জায়গাটা দেখলাম এবং মনে মনে ওর প্রতি বেশ খানিকটা নির্জলা হিংসা অনুভব করলাম। উন্নত একটি জীবন পেয়েছে সে। তৃতীয় বিশ্বের একজন কৃষক পরিবারের কোনো সদস্য তার মতো জীবনের কথা স্বপ্নেও কখনো চিন্তা করতে পারে না। এমনকি দিঘীর পাড়ে ঘাসের জমিটা এত সুন্দর, পরিস্কার আর সাজানো-গোছানো যে ভালোমতো তাকিয়ে রীতিমতো হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। রাতে একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরছিলো। দেশটায় কি মশা নেই নাকি? সেটার উত্তর পেয়ে গেলাম। এমন জায়গায় যদি কোনো মশা ভুল করে একটা ডিম পেড়েও যায়, তো অন্য মশারা এসে নিশ্চই ধরাধরি করে সেই ডিমটা তুলে নিয়ে যাবে।
ফেরার সময় মূলত আমিই কথা বলছিলাম। মেয়েটি চুপচাপ শুনছিলো। আমি ওকে ধন্যবাদ জানালাম। চমৎকার পার্টিসহ অন্য সব কিছুর জন্যই। ধন্যবাদ জানালাম সেই প্রথম দিনের জন্যও। সে আমার ড্রিংকটি বাই করেছিলো বলে। কারণ আমি নিজে নিজে কখনো ওর মতো চমৎকার একজন বন্ধু জোগাড় করতে পারতাম না। এ পুরো ব্যপারটির জন্য কৃতিত্বের দাবিদার মূলত সে’ই।
আমার কথাগুলো শুনে মেয়েটি হাসলো, জীবনে প্রথমবারের মতো আমার হাত ধরলো, আমার সঙ্গে সঙ্গে খামারের প্রবেশপথ পর্যন্ত এলো এবং সবশেষে আমাকে বেশ খানিকটা অবাক করে দিয়ে গালে একটা ছোট্ট চুমুও দিয়ে দিলো। এটা বোধহয় একটা স্থানীয় এটিকেট। কিন্তু এর জবাবে কি করতে হয়, সেটা শওকত আমাকে শেখায় নি। তাই প্রত্যুত্তরে কেবল একটা হাসি দেয়া এবং ‘দ্রুতই আবার দেখা হবে’ বলে ফিরে আসা ছাড়া আমার আর বিশেষ কিছু করার ছিলো না।
শওকত আমার জন্য একটা ইতিবাচক খবর নিয়ে এসেছিলো। ও যেখানে থাকে সেখানে আমার জন্য একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করা গেছে। এখন আমাকে শুধু ওই দেশে যাবার জন্য ভিসা চেয়ে আবেদন করতে হবে। আর ভিসার ব্যবস্থাটাও সে এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে রেখেছে যে, আমি আবেদন করলেই সবকিছু হয়ে যাবে। শুনে আমার পুরোদস্তুর খুশিতে ফেটে পড়ার কথা ছিলো। কারণ এই লক্ষ্যেই আমি মূলত বিদেশে এসেছি। একবার চাকুরী-টাকুরী পেয়ে সেটেল হতে পারলে দেশে আমার ধর্মভীরু পরিবারটির প্রতিটি সদস্য অত্যন্ত খুশি হবে। আর তারপরে আমি যদি তাদের জন্য কিছু করতে পারি, তাহলে অত্যন্ত খুশি হবো আমি নিজেই। কারণ এই পরিবারের সদস্যরাই বিগত ২৭টি বছর ধরে আমার দেখাশোনা করে এসেছে। আমার প্রত্যেকটা দুঃখ ভাগ করে নিয়েছে। প্রত্যেকটা প্রাপ্তির অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করেছে। পুরো পৃথিবীতে এরাই সম্ভবত আমার সবচে’ আপনজন। আমাকে এদের জন্য অবশ্যই ভালো একটা কিছু করতে হবে। এই সমীকরণটাকে সামনে রেখেই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমার দেশের বাইরে পা দেয়া। আজ সেই সমীকরণ প্রায় মিলে এসেছে। কিন্তু কেন যেন শওকতের কাছ থেকে খবরটা পেয়ে আমি পুরোদস্তুর খুশিতে ফেটে পড়তে পারছিলাম না। আমি জানতাম, এখান থেকে চলে যাবার পর মেয়েটির সঙ্গে আমার আর খুব বেশি দেখা হবে না। হয়তো অন্য কারো সঙ্গে দেখা হবে, অন্য কারো সঙ্গে সময়গুলো উপভোগ করবো। কিন্তু ক্রিস্টেন নামের এই মায়াবী মেয়েটির সঙ্গে আর নয়। কারণ এটাই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম।
তখনও আমার মনে হয়েছিলো, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইনটু দ্য ওয়াইল্ডে দেখানো লাইফটা মানুষের সঙ্গে আসলেই মানানসই। কারণ কোনো কোনো সুখ ভাগ করে নেয়া যায় না এবং আমরা অধিকাংশ সময়ই জানি না, সেই সুখানুভূতিগুলো নিয়ে আমাদেরকে কি করতে হবে।
---





সত্যি বলতে কি, ব্লগটা পড়ে আমারও একটা কিছু লিখে ফেলতে ইচ্ছা করছে।
ভাইজান আপনার কথা শুনে আমি লাজওয়াব! অসংখ্য
আর কোনো কিছু ইচ্ছা হলে সেটা চেপে রাখাও ঠিক না।
দুইবার পড়লাম ফেসবূকেও শেয়ার দিলাম!
দারুন
মীর ভাই ব্যাক ইন দ্যা একশন
মেনি মেনি কনগ্রেচুলেশন!
সত্যি কথা বলতে কি, অনেকদিন ধরেই একটা কিছু লিখতে করছিলো। কিন্তু লেখা আসছিলো না। যেটা আপনের জোরাজুরিতে এইবার এসেছে। হয়তো খুব বেশি ভালো কিছু হয় নি, কিন্তু এই লেখাটার কথা আমি সবসময় মনে রাখতে চাই। অনেকদিন পর একটানে একটা লেখা শেষ করেছি। মনে থাকবে আপনার কথাও।
তবে আপনার কথা শুনে যে লেখাটা ধরেছিলাম, সেটা কিন্তু এখনো শেষ করতে পারি নাই। কারণ, সেটায় একটা পছন্দসই ফিনিশিং টানতে পারছি না। নিচে রুনা'পু বলেছেন, তার নাকি আমার অপচেষ্টাগুলোর ফিনিশিংটাই বেশি ভালো লাগে। সেটা জেনে আমি আরো কনফিউজড্। কেননা এই লেখাটার ফিনিশিংও আমার মনমতো ছিলো না। পেরেশানির মধ্যে আছি বলা যায় ব্রাদার।
দারুন। তোমার গল্পের উপসংহার সব সময়ই বেশী ভাল লাগে।
বাইরে থেকে যখন দেখি আপনে মন্তব্য করেছেন, তখন সবসময়ই আমি ভয়ে ভয়ে পোস্ট খুলি। কারণ, আপনি একজন কড়া পাঠক। কিন্তু সেই আপনার কাছ থেকে প্রশংসা পাই, তখন মনের ভেতর ভালোলাগা মিশ্রিত এক ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়। লেখালেখির চেষ্টা চালানোটা আসলে সহজ নয় রুনা'পু। আপনাকে ভালো পাই
জীবনটা আসলে এমনই।
এমন জায়গায় যদি কোনো মশা ভুল করে একটা ডিম পেড়েও যায়, তো অন্য মশারা এসে নিশ্চই ধরাধরি করে সেই ডিমটা তুলে নিয়ে যাবে। - এই লাইনগুলো পড়ে হাসলাম, আবার কষ্টও হল। জাতি হিসেবে আমরা চাইলেই পরিষ্কার থাকতে পারি। অথচ আমাদের কি দৈন দশা !!
ধন্যবাদ রেজা ভাই, সদয় মন্তব্যের জন্য। বন্ধু শান্তর লেখায় আপনার মন্তব্য দেখতাম। এখন আমার লেখায়ও দেখতে পাচ্ছি। এটা আসলেই চমৎকার একটা ব্যপার হয়েছে। আপনি কিন্তু চাইলে এখানে রেজিস্ট্রেশন একটা করে ফেলতে পারেন এবং সেটা সম্ভবত গ্রেট হবে
সাত সকালে অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম...
পুরোনো মীর
ক্যামন আছেন স্যার?
আম্রা ভালু
ভালো আছি স্যার। আপনের মন্তব্যগুলো পড়তে সবসময়ই খুব মজা লাগে।
আরেকটা সুন্দর লেখা.....
আরেকটি সুন্দর মন্তব্য...
প্রিয় প্রোফাইলটির কাছ থেকে।
চমৎকার গল্প। চমৎকার গল্প। চমৎকার গল্প।
পড়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল পুরান কোন ক্লাসিক ছোটগল্প পড়তেছি।
যদিও আপনার একই সময়ে দুই পোস্ট প্রথম পাতায় না রাখার বিষয়টাকে আমি শ্রদ্ধা করি তবুও এই লেখাটা এত তাড়াতাড়ি প্রথম পাতা থেকে সরায় দেওয়ার জন্য আপনেরে মাইনাস প্রদান করা হল!
মাইনাস মাথা পেতে নেয়া হলো। আছেন কেমন ভাইজান? আজকাল দেখা-সাক্ষাৎ প্রায় পাচ্ছিই না যে।
একটু বিজি যাচ্ছে দিনকাল।
আর মন মেজাজ ব্লগিং করার মত ভাল রাখতে পারছি না সবসময়!
মন-মেজাজ ভালো রাখতে পারছেন না কেন ভাই? বলেন তো শুনি আর দেখি কিছু করা যায় কিনা।
কিছু সমস্যা আছে বা থাকে যার সমাধান হল মাথাব্যাথায় মাথা কেটে ফেলে দেওয়ার মত। এই আর কি!
এই গল্পটা দিয়ে একটা সিনেমা বানানো যাবে।
দারুণ!
রাসেল ভাই, আপনে বিফোর সানরাইজ আর বিফোর সানসেট দেখছেন?
না দেখি নাই। তবে তোমার কথা শুনে নামায় রেখেছিলাম। ইন টু দ্যা ওয়াইল্ড ও একই অবস্থা
আর লস্ট ইন ট্রান্সলেশন?
না। এইবার কি কইবা যান মিয়া এই গুলা দেইখা আসেন তারপরে আমার গল্প নিয়ে সিনেমা বানায়েন?
না, সেইটা কেন বলবো? বলতে চাচ্ছিলাম, সিনেমা চারটা দেখলে বুঝতেন আমার গল্পটা নিয়ে একাধিক সিনেমা অলরেডি বানানো হয়ে গেছে।
আর ভালো কথা, শীতকাল আসতেছে। কম্বলের নিচে ঢুকে এই সিনেমাগুলো দেখতে ভালোই লাগার কথা। তবে সঙ্গে লোকজন থাকলে ইনটু দ্য ওয়াইল্ড না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন মাসুম ভাই ও ভাস্করদা'।
ওকে।
মন্তব্য করুন